Pages

Tuesday, April 9, 2019

নবদুর্গার নবম তথা শেষ রূপ হল সিদ্ধিদাত্রী

সিংহবাহিনী দেবীর চার হাতে আশীর্বাদী মুদ্রা | তিনি সিদ্ধি দান করেন | অর্থাত্‍ তাঁর উপাসনায় সংসারে আসে সুখ এবং সমৃদ্ধি | সবাইকে বরাভয় দেন এই মাতৃকামূর্তি | দেবী ভগবত্‍ পুরাণে আছে, স্বয়ং মহাদেব দেবী দুর্গাকে সিদ্ধিদাত্রী রূপে পুজো করেছিলেন | এবং তার ফলে মহাদেব সকল সিদ্ধি লাভ করেন | সিদ্ধিদাত্রীর আশীর্বাদেই অর্ধনারীশ্বর রূপ লাভ করেন মহাদেব |

নবরাত্রিতে দেবী দুর্গার পুজোয় যোগসাধনার যোগপদ্ধতি অত্যন্ত উচ্চ মার্গের সাধনক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত। যথা এই নবরাত্রির প্রথম দিনের পুজোয় যোগীগণ তাঁদের মনকে ‘মূলাধার’ চক্রে স্থিত করেন। যা মানুষের শরীরের অভ্যন্তরেই প্রতিষ্ঠিত ‘কুলকুণ্ডলিনী’ রূপে – যিনি স্বয়ং মহাশক্তি, দৈবী ও ঐশী শক্তি, মহামায়া, মহাদুর্গা। নবদুর্গা রূপের প্রথম দিনের রূপটি হল ‘ ‘শৈলপুত্রী’, দ্বিতীয়ায় দ্বিতীয় রূপটি হল ‘ব্রহ্মচারিণী’। বেদ-এ এর উল্লেখ আছে। এদিন যোগী সাধক তাঁর মনকে ‘স্বাধিষ্ঠান’ চক্রে স্থিত করেন যোগসাধনার মাধ্যমে। নবরাত্রি আরাধনার তৃতীয় দিনে মা দুর্গার তৃতীয় শক্তির নাম ‘চন্দ্রঘণ্টা’, উপাসনায় যোগী তাঁর মনকে ‘মণিপুর’ চক্রে প্রবিষ্ট করান। মা দুর্গার চতুর্থ রূপের নাম হল ‘কুষ্মাণ্ডা’, এই চতুর্থী তিথিতে সাধকের মন ‘অনাহত’ চক্রে অবস্থান করে। মহাপঞ্চমীতে দেবী দুর্গা ‘স্কন্দমাতা’ রূপে পূজিতা হন। এই দিনে সাধক তাঁর মনকে ‘বিশুদ্ধ’ চক্রে স্থাপন করেন। দেবী দুর্গাকে প্রথম আরাধনা করেন মহর্ষি কাত্যায়ন – কন্যারূপে। তাই দেবী দুর্গা মহাষষ্ঠীতে ‘কাত্যায়নী’ রূপে পূজিতা হন। শ্রীকৃষ্ণ-সহ সমস্ত গোপ ও গোপী দেবী কাত্যায়নীর পূজা করেন, এর উল্লেখ মহাভারতে পাওয়া যায়। দেবী কাত্যায়নীর আরাধনায় সাধক ‘আজ্ঞা’ চক্রে তাঁর মনের উত্তরণ ঘটান। দুর্গাপূজার সপ্তম দিনে মহাসপ্তমীতে দেবী দুর্গাকে ‘কালরাত্রি’ রূপে পূজা করার বিধান। সে দিন সাধকের মন ‘সহস্রার’ চক্রে অবস্থান করে। মহাষ্টমীতে দেবী দুর্গার রূপ হয় ‘মহাগৌরী’ – সন্ত তুলসীদাস এই দেবীর উপাসনা করতেন। এই দিন সাধকের সাধনা ‘সন্ধিচক্র’-এ অধিষ্ঠিত হয়। নবদুর্গার শেষ রূপটি হল ‘সিদ্ধিদাত্রী’। ‘মার্কণ্ডেয় পুরাণে’-এ ‘সিদ্ধিদাত্রী’ অষ্টভুজা, ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণের শ্রীকৃষ্ণজন্ম খণ্ডে ‘সিদ্ধিদাত্রী’ অষ্টাদশভুজা। ‘সিদ্ধিদাত্রী’ চতুর্ভুজা রূপেও দেখা যায়। সেখানে তিনি অর্ধনারীশ্বররূপী। এই হল নবদুর্গার চর্চিত কাহিনি।

মহাগৌরী হচ্ছেন কাশীর অন্নপূর্ণা দেবী, যাঁর কাশীখণ্ডের নাম ভবানী।

মহাগৌরীর মন্দিরে প্রবেশকরে সামনেই বারোটি নানা অলংকার খোদাই করা সুন্দর লাল পাথরের স্তম্ভের উপর নাটমন্দিরটি দাঁড়িয়ে আছে। নাটমন্দির তিনদিক খোলা। সাদা-কালো মার্বেল পাথরের মেঝে। এখান থেকেই ভক্তদের সামনের ছোট্ট গর্ভমন্দিরে অধিষ্ঠিতা মা অন্ন্পূর্ণাকে দর্শন করতে হয়। সিলিং থেকে ঝুলছে ছোট ঘণ্টা। গর্ভমন্দিরের তিনটি ছোট ছোট দরজা।

মা বেদীর ওপর বিরাজ করেছেন, পশ্চিমাস্যা, ফুট দুয়েক মতো উঁচু, সর্বাঙ্গ বস্ত্রবৃতা। মুখখানি শুধু একটি সোনার মুকুটসহ মুখোশ দিয়ে আবৃত। মুকুটের পিছনে আসল মূর্তির মাথায় চূড়াটি দেখা যায়। তার ওপর হলুদ-চন্দন-আলোচাল দূর্বাদিয়ে একটি অর্ঘ্য সকালেই স্নান পূজোর পরে দিয়ে রাখা হয়। দেবীর আসলমূর্তি কালো কষ্টিপাথরের। কোন কোন দিন খুব ভোরে চারটে সাড়ে চারটেয় এলে সেই মূর্তি দেখতে পাওয়া যায়। পূজারীরা দরজা বন্ধ করে স্নান-পূজা-বস্ত্রপরিবর্তন করিয়ে দরজা যখন খোলেন সেসময় মায়ের খোলামুখখানি দেখতে পাওয়া যায়। একখানি আড়াই হাত মতো পাথরের স্ল্যাবে দেবীর মূর্তি রিলিফের মতো খোদাই করা আছে। দেবী দাঁড়িয়ে আছেন। দুই হাতের একটিতে হাতা, অন্য হাতে ছোট হাঁড়ি। সবই পাথরের। মায়ের মাথায় চূড়ার মতো করে চুল বাঁধা। মুখখানি অপূর্ব। চোখে অন্য সব প্রতিমার মতো সাদা শঙ্খ বা কোন ধাতু নেই। একেবারে খোলা চোখ। এতো প্রশান্তি করুণামাখা মুখ মায়ের, দেখে আশ মেটে না। এই চূড়ার ওপরই হলুদ চন্দন এই সব দিয়ে রোজ একটি অর্ঘ্য সাজিয়ে রাখা হয়। সেটি বিশ্রাম পর্যন্ত থাকে। একটু পরেই মুখে কোনোদিন সোনা কোনোদিন রুপোর মুখোশ লাগিয়ে দেওয়া হয়। তারপরে নানাফুলের মালা দিয়ে সাজিয়ে দেওয়া হয়। দেবীর আসনের নিচে একটি অষ্টধাতুর দেবী যন্ত্র আছে। বিশেষ দিনে সেটি বাইরে আনা হয় কুঙ্কুম অভিষেক করার জন্য। দেবীর গর্ভমন্দিরে তাঁর সামনে দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে একটি ধাতুময়ী দীপধারিণী মূর্তি আছে। যাঁরা জানেন না, তাঁরা মনে করেন এটি বুঝি বাবা বিশ্বনাথের মূর্তি। কিন্তু এখানে সবসময়ের জন্য ভিখারী শিবের কোনো মূর্তি থাকে না। বিশেষ বিশেষ পর্বে দেবীর যখন বিশেষ বিগ্রহ নামিয়ে সাজানো হয় তখনই রুপোর শিবও সাজিয়ে দেওয়া হয়। তখন নিত্যপূজিতা প্রস্তরময়ী এই দেবীর বিগ্রহের সামনেই রুপোর আলাদা সিংহাসন দিয়ে রৌপ্যময়ী সিংহাসনে আসীনা দেবী অন্নপূর্ণার হাঁড়ি হাতা হাতে সুন্দর ছোট বিগ্রহ বসিয়ে দেওয়া হয় নিত্যপূজিতা দেবীকে আড়াল করে। বছরে দু’তিন দিন এই বিগ্রহ নামানো হয়। নবান্ন, রংভরি একাদশী, অন্নপূর্ণা পূজা, শিবরাত্রি-এই সব পর্বে।

আর ধনতেরস অর্থাৎ কার্তিক কৃষ্ণা ত্রয়োদশীর দিন থেকে দীপান্বিতা অমাবস্যার পরে প্রতিপদ পর্যন্ত মন্দিরের পেছনে দোতলায় সোনার অন্নপূর্ণা দর্শন হয়। ঐ প্রতিপদেই দেবীর অন্নকূট উত্সব। সে এক বিরাট পর্ব। নিরেট সোনার তিনটি বিগ্রহ-দেবী অন্নপূর্ণা আসন করে সিংহাসনে বসা, নানা রত্নালংকারে সর্বাঙ্গভূষিতা, বাঁ হাতে হাঁড়ি, আর ডান হাতে হাতা নিয়ে মাঝখানে; দুই পাশে একটু ছোট সোনার মূর্তি ঐ একই রকমভাবে বসা, নানা গয়নাতে সর্বাঙ্গ সাজানো-এঁরা শ্রীদেবী ও ভূদেবী। তন্ত্রমতে একজন সরস্বতী, অন্যজন মহালক্ষ্মী। আর দেবী মধ্যস্থিতা ভবানী মহাগৌরী অন্নপূর্ণা। তাঁদের ডান দিকে কোণে দাঁড়িয়ে আছেন রুপোর শিব, নৃত্যের ভঙ্গিতে, একটা পা একটু তোলা, সোনার বাঘছাল, একহাতে ত্রিশূল অন্যহাতে ভিক্ষাপাত্র, কাঁধে ভিক্ষার ঝোলা। মা অন্নদাত্রী অন্নপূর্ণার কাছে স্বয়ং বিশ্বনাথও কাশীতে ভিক্ষুক। বড় সুন্দর মায়েদের এই ভবময়ী মূর্তিগুলি। টানাটানা বড় বড় তিনটি চোখ, সম্পূর্ণ খোলা, অনিমেষ দৃষ্টিতে সন্তানদের দিকে চেয়ে আছেন। মুখে মৃদু হাসির রেখা। বছরের এই তিনটি দিন মায়ের এই স্বর্ণময়ী, অনিন্দ্যসুন্দর মূর্তি সর্বসাধারণের জন্য অনাবৃতদ্বার থাকে। অন্যসময় প্রত্যহ পূজারী ওপরেই মায়ের পূজা করেন। যা সর্বসাধারণের অগোচর।

দেবী মহাগৌরী, বৃষভবাহনা চতুর্ভুজা, শ্বেতবর্ণা, শ্বেতবস্ত্রাবৃতা। অলংকারাদিও শ্বেতবর্ণের-শঙ্খবলয়, কণ্ঠ ও কর্ণের ভূষণও শঙ্খনির্মিত। শিরে রজত মুকুট। সদা অষ্টবর্ষা দেবী কুন্দপুষ্পের মাল্যধারিণী বিধুমুখী সদাপ্রসন্না। এঁর ঊর্ধ্ব দক্ষিণ হস্তে ত্রিশূল, নিচের দক্ষিণ হাতে অভয় মুদ্রা। বাম ঊর্ধ্ব হস্তে বরমুদ্রা, নিচের হাতে ডমরু।

এক পুরাণের মতে দেবী শিবের তপস্যার সময় অত্যন্ত কৃচ্ছ্রতার ফলে শীর্ণ ও কৃষ্ণকায়া হয়ে গিয়েছিলেন। তখন তাঁর একটি নাম হয়েছিল অসিতা। পরে শিবের সঙ্গে বিবাহ হয়ে যাওযার পরে কোন এক সময় শিব দেবীর সেই কালো দেহবর্ণের জন্য উপহাস করে তাকে কালী বা কালোমেয়ে বলেছিলেন। এই কথা শুনে দেবী অভিমানে কৈলাস ছেড়ে চলে গিয়ে কঠোর তপস্যায় নিযুক্ত হলেন। সেই তপস্যার ফলে তাঁর দেহের কৃষ্ণ কোষ খুলে গিয়ে ভেতর থেকে এক দিব্যজ্যোতির্ময়ী রজতশুভ্রবর্ণা দেবীমূর্তি প্রকাশিত হলেন। বিদ্যুত্বর্ণা সেই দেবীই শিবের বাহন ও সব অস্ত্রাদি নিয়ে তাঁর কাছেই হাজির হলেন।শিবও অভিমানিনী দেবীর অভিমান ভাঙাতে ও তাঁর জন্য এতোদিন ব্যাকুল অপেক্ষায় থাকার পরে অপরূপা দেবীকে কাছে পেয়ে তাঁর নাম দিলেন মহাগৌরী-শুধু গৌরী নন।

আরেকটি মত আছে-শিব নিজেই সেই কৃষ্ণবর্ণা তপস্বিনীর বরতনু গঙ্গাজল দিয়ে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে তাঁকেই বিদ্যুৎবর্ণা মহাগৌরী করে তোলেন।

অন্নপূর্ণা দেবীর কাশীর আবির্ভাব নিয়েও অনেক কাহিনী আছে। হিমালয়-পত্নী মেনকার গৃহে তখন কন্যা পার্বতী তাঁর স্বামীকে নিয়ে বাস করছেন। অবশ্য কৈলাসও হিমালয়ের অন্তর্গত যদি হয়ে থাকে। দীর্ঘদিন কন্যা পিতাগৃহে আছেন। মায়ের মনে একটু ক্ষোভ-সে আর কতদিন বাপের বাড়ি থাকবে। এবার তো শ্বশুরবাড়ি যাওয়া দরকার। নইলে প্রতিবেশীরা বদনাম করবে। তাই একদিন কন্যাকে ডেকে বললেন, ‘হাঁরে মেয়ে, আমার জামাই মহেশ্বরের ঠিকানা কী? সে থাকে কোথায়? তার বন্ধু-বান্ধব সব কারা? মনে হয় জামাইয়ের আত্মীয়স্বজন বা বাড়িঘর কিছুই নেই।’ কন্যা পার্বতী মায়ের এই কথা শুনে লজ্জা পেয়ে সময়মতো একরাত্রে স্বামী ভোলানাথ শংকরের কাছে মায়ের এই অণুযোগের কথা তুললেন, ‘হে কান্ত, হে নাথ! আজই আমি এখান থেকে চলে যেতে চাই। তোমার নিজের কোন স্থান থাকলে আমাকে সেখানেই নিয়ে চলে।’ এই কথা শুনে দেবাদিদেবের বিশ্বনাথ সেইদিনই হিমালয় ছেড়ে দেবী পার্বতীকে সঙ্গে নিয়ে মর্ত্যে তাঁর আনন্দকাননে অবিমুক্ত পুরীতে এসে উপস্থিত হলেন।

পঞ্চক্রোশ পরিমিত এই স্থান শিবময়-‘কাশীকে হর কংকর হ্যায় ভোলা শংকর’। এর প্রতিটি নূড়িও শিবময়। শিবস্বরূপ। শিব স্বয়ং কাশী সৃষ্টি করে নিজের ত্রিশূলের ওপর সেটিকে ধরে রেখেছিলেন। তাই সেখানে পৃথিবীর কোন মলিনতার ছোঁয়া ছিল না। নিত্য আনন্দ বিরাজিত তাই এর নাম আনন্দকানন। জীব এখানে এসেই মরণ মাত্রই মুক্ত হয়। শিবক্ষেত্র মুক্তিক্ষেত্র -মহাশ্মশান-জীবের অন্তিম শয়ান স্থান। অন্তে মুক্তি পাওয়ার জন্য জীব এখানে মরতেই আসে। তাই এটি মহাশ্মশান। শিব তাঁর রুদ্র অনুচরদের নিয়ে এখানে নিত্য বাস করেন-তাই এটি রুদ্রাবাস। এই বিশ্বনাথের নিজের রাজ্যে এসে দেবী ভবানী ও বিশ্বেশ্বর পরমানন্দে বাস করতে লাগলেন। দুজনে এখানে কেমন করে থাকেন সেকথা কাশীখণ্ডে বলা হচ্ছে। কেমন তঁদের রূপ-‘ভালে লোচনম্ কণ্ঠে কালং বৃষধ্বজং বামাঙ্গসন্নিবিষ্টাদ্রিতনয়া চন্দ্রশেখরা। কপর্দ্দিনো বিরাজন্তং ত্রিশূলাজগবায়ুধং। স্ফুরৎ কর্পূর গৌরাঙ্গং পরিণদ্ধ গজাজিনম্ অর্কশতাধিকম্ শম্ভুম্ নমামি শ্রীচরণাজয়ো।।”

পার্বতীকে নিয়ে শিব তাঁর বিচিত্র বেশবাসে ঘুরে বেড়ান তাঁর রাজ্যের সর্বত্র। মাও খুশি নিজের আলয়ে এসে। এখানে তাঁর নাম ভবরানী বা ভবানী। তাঁর কাজ এখানে সমগ্র কাশীর অন্নভাণ্ডার রক্ষা ও অন্নদান। এই অন্ন শুধু জীবের শরীরের পরিপুষ্টির খাদ্যই নয়। তার পরমার্থ জ্ঞান দান ও আত্মার পরিপুষ্টিও এতে আছে। তাই কাশীখণ্ডে বলা হয়েছে, ‘সর্বেভ্যঃ কাশি-সংস্থেভ্যো মোক্ষ-ভিক্ষাং প্রযচ্ছতি।’ সমগ্র বারাণসী ও বিম্বের নাথ যিনি তিনিও একবার কোথাও অন্ন জোটাতে না পেরে মায়ের কাছে এসে ভিক্ষার পাত্র হাতে দাঁড়াতে বাধ্য হন। মানতে বাধ্য হন এখানে মা অন্নপূর্ণাই রাজরাজেশ্বরী। তাঁর ইচ্ছাতেই সব কিছু হয়-রয়-যায়। তাঁর কৃপাতেই সকলেই অন্ন-পানে পরিতৃপ্ত হয়। শিবও তার বাইরে নন। শাস্ত্রমতে-‘দর্বী স্বর্ণ বিচিত্ররত্নখচিতা দক্ষে করে সংস্থিতা পলান্নঘৃতা পুরিতম্। আর বামে কারণামৃতা পুরীতম্ স্বাদু পয়োধরী মাণিক্যচষকম্।’ দুই হাতে অমৃতময় পলান্ন ও কারণবারি পান করিয়ে মা মহাদেবকে সেদিন এতো আনন্দ দিয়েছিলেন যে ভোলানাথ পরিতৃপ্তির আনন্দে উদ্বাহু হয়ে ‘পীত্বা ভূত্বানন্দময়ং নৃত্যন্তং শশিশেখরম্’ নৃত্যে মেতে উঠেছিলেন। তাঁর সেই নৃত্যরত আনন্দবিহ্বল মূর্তিই সোনার অন্নপূর্ণা দর্শনের সময় উপরে দেখা যায়।

কালরাত্রি নবদুর্গার অন্যতম এবং দেবী দুর্গার সপ্তম শক্তি

কালরাত্রি ভীষণদর্শনা দেবী। তাঁর গায়ের রং ঘন অন্ধকারের মতো কালো। তিনি এলোকেশী। তাঁর গলায় বজ্রের মালা দোলে। তিনি ত্রিনয়না এবং তাঁর চোখগুলি ব্রহ্মাণ্ডের মতো গোলাকার। তাঁর নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের সঙ্গে ভয়ংকর অগ্নিশিখা নির্গত হয়। কালরাত্রির বাহন গর্দভ বা গাধা। তিনি চতুর্ভূজা; তাঁর চার হাতে বর ও অভয়মুদ্রা এবং খড়্গ ও লোহার কাঁটা রয়েছে। কালরাত্রির রূপ ভয়ংকর হলেও তিনি শুভফলের দেবী। তাঁর অপর নাম শুভঙ্করী।
হিন্দুদের বিশ্বাস করেন, কালরাত্রি দুষ্টের দমন করেন, গ্রহের বাধা দূর করেন এবং ভক্তদের আগুন, জল, জন্তুজানোয়ার, শত্রু ও রাত্রির ভয় থেকে মুক্ত করেন। তাঁরা বিশ্বাস করেন, কালরাত্রির উপাসক তাঁকে স্মরণ করলেই দৈত্য, দানব, রাক্ষস, ভূত ও প্রেত পালিয়ে যায়।
কালরাত্রি দুর্গাপূজার সপ্তম দিনে পূজিত হন। শাক্ত শাস্ত্রানুযায়ী, "সেই দিন সাধকের মন সহস্রার চক্রে অবস্থান করে। তাঁর জন্য ব্রহ্মাণ্ডের সকল সিদ্ধির দ্বার অবারিত হয়ে যায়। এই চক্রে অবস্থিত সাধকের মন সম্পূর্ণভাবে মাতা কালরাত্রির স্বরূপে অবস্থান করে। তাঁর সাক্ষাৎ পেলে সাধক মহাপুণ্যের ভাগী হন। তাঁর সমস্ত পাপ ও বাধাবিঘ্ন নাশ হয় এবং তিনি অক্ষয় পুণ্যধাম প্রাপ্ত হন।

Monday, April 8, 2019

নবরাত্রির পঞ্চম রাতে দুর্গা পূজিত হন স্কন্দমাতা রূপে

নবদুর্গার পঞ্চম রূপ স্কন্দমাতা। নবরাত্রি উৎসবের পঞ্চম দিনে তাঁর পূজা করা হয়। দেবসেনাপতি কার্তিকের অপর নাম স্কন্দ। দেবী দুর্গা কার্তিকের মা। তাই তিনি পরিচিতা ‘স্কন্দমাতা’ নামে।

কার্তিক-জননী বেশে দুর্গার রূপটি একটু আলাদা। এই রূপে তিনি চতুর্ভুজা; উপরের দুই হাতে দুটি পদ্মফুল; নিচের এক হাতে ধরে থাকেন স্কন্দ অর্থাৎ কার্তিককে, অপর হাতে দেখান বরমুদ্রা। দেবী পদ্মাসনা, তবে দেবীর বাহন সিংহ। দেবীর কোলে স্কন্দের যে মূর্তিটি দেখা যায়, সেটি আমাদের বাংলায় সচরাচর দেখা কার্তিক মূর্তির চেয়ে একটু আলাদা। ইনি হাতে তীর-ধনুক থাকে বটে, কিন্তু এঁর ছয়টি মস্তক। ষড়ানন কার্তিকের এই শিশুমূর্তিটিই শোভা পায় দেবী স্কন্দমাতার কোলে।

দেবী স্কন্দমাতার কথা জানা যায় স্কন্দ পুরাণ থেকে। অসুররাজ তারক বরলাভ করেছিল, কেবল শিব ও দুর্গার পুত্রই তার প্রাণবধে সক্ষম হবে। তাই দেবতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে সে সহজেই দেবতাদের কাছ থেকে স্বর্গরাজ্য কেড়ে নিতে পেরেছিল। এই ঘটনার ঠিক আগেই সতী দেহত্যাগ করেছিলেন, শিবও হয়েছিলেন ধ্যানমগ্ন। তাই দেবতারা দুর্গাকে পুনরায় জন্মগ্রহণ করার অনুরোধ করলেন। দুর্গা শৈলপুত্রী রূপে গিরিরাজ হিমালয়ের গৃহে জন্ম নিলেন। তারপর ব্রহ্মচারিণী রূপে শিবকে পতিরূপে পাওয়ার জন্য করলেন কঠোর তপস্যা। শেষে শিবের সঙ্গে তাঁর বিবাহ হল। তারপর যথাসময়ে জন্ম হল শিব ও দুর্গার পুত্র কার্তিকের। কার্তিকের জন্মের বিবরণ নানা পুরাণে নানাভাবে বর্ণিত হয়েছে। সে সবের উল্লেখ এখানে না করলেও চলবে–শুধু এটুকু বলে রাখি, কার্তিকের ছিল ছয়টি মাথা। তাই তিনি পরিচিত হয়েছিলেন ষড়ানন নামে। এই ষড়ানন স্কন্দই তারককে যুদ্ধে পরাজিত করে দেবতাদের স্বর্গরাজ্য ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। স্কন্দ ও স্কন্দমাতা উভয়েই তারকাসুর বধে দেবতাদের সাহায্য করেছিলেন বলে, মাতাপুত্রের পূজা একসঙ্গে করাই নিয়ম।

দেবী স্কন্দমাতার পূজা করলে ভক্তের সকল মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হয়; তাঁর জীবন সুখ ও শান্তিময় হয়ে ওঠে এবং তাঁর মোক্ষের পথ সহজতর হয়। এছাড়া স্কন্দমাতার পূজা করলে, সেই সঙ্গে কার্তিকের পূজাও হয়ে যায়।

কাশীর নাগকুরার কাছে দেবী স্কন্দমাতা ও বাগেশ্বরীর মন্দির অবস্থিত। মন্দিরটি দোতলা, গর্ভমন্দিরটি ছোটো। সেখানে প্রমাণ আকারের স্কন্দমাতার মূর্তিটি প্রতিষ্ঠিত। বাগেশ্বরী সরস্বতীর মন্দিরটি স্কন্দমাতার মন্দিরের ঠিক পাশেই অবস্থিত। শারদীয়া ও বাসন্তী নবরাত্রি উৎসবের পঞ্চমীর দিন এই মন্দিরে প্রচুর জনসমাগম হয়।

দেবী দুর্গা তাঁর চতুর্থ স্বরূপে "কুষ্মাণ্ডা" নামে পরিচিতা

 নবরাত্রের চতুর্থদিনে, অর্থাৎ চতুর্থী তিথিতে মাতৃপ্রাণ ভক্তগণ এই কুষ্মাণ্ডারূপেই আদ্যাশক্তিকে আহ্বান করে থাকেন।
কারুণ্যে ভরপুর মায়ের সৌম্যপ্রতিমা। দেবী সিংহবাহিনী, ত্রিনয়নী ও অষ্টভুজা। আটটি হাতে সুদর্শনচক্র, ধনুর্বাণ, রক্তপদ্ম, কমণ্ডলু, ইত্যাদি দৃষ্টিগোচর হয়। মায়ের বামহস্তে একটি অমৃতপূর্ণ কলসও রয়েছে। এখানে অমৃত ব্রহ্মের রূপক, দেবী ভগবতী অমৃতপূর্ণ কলস অর্থাৎ ব্রহ্মজ্ঞানের আধার হাতে নিয়ে বসে রয়েছেন। যোগ্য সাধক আপন তপোবল ও কৃচ্ছ্রতা দ্বারা মহামায়াকে প্রসন্ন করতে পারলে তবেই মা সেই অমৃতভাণ্ডের অমৃতধারায় সাধককে স্নান করিয়ে তৃপ্ত করবেন, ব্রহ্মজ্ঞান প্রদানে কৃতার্থ করবেন।

মায়ের হাতে আরও একটি বস্তু রয়েছে, সেটি হল জপমালা। সেই জপমালা সিদ্ধমন্ত্রে মন্ত্রিত, তাহা অষ্টসিদ্ধি ও নবনিধি দান করতে সমর্থ। এবার যে ভক্ত রুচি অনুযায়ী যা চাইবে, কল্পতরু মা সেই অনুসারেই বাঞ্ছা পূর্ণ করবেন। যে সিদ্ধি ও সিদ্ধাই চাইবে, মা তাকে তাই দিয়ে ভোলাবে। আর যে পার্থিব সম্পদে অনীহা প্রকাশ করে ওই অমৃতপূর্ণ কলস, অর্থাৎ ব্রহ্মজ্ঞান চাইবে, মা তাকেও তাই দিয়েই সন্তুষ্ট করবেন।

এবার আসি মায়ের নাম বিশ্লেষণে। শাস্ত্রে বলা হয়েছে, বলিদানের মধ্যে কুমড়ো বলি মায়ের অধিক প্রিয়। কুমড়োকে সংস্কৃতে "কুষ্মাণ্ড" বলে, কুষ্মাণ্ডপ্রিয় দেবী তাই কুষ্মাণ্ডা নামে স্তুতা। এ তো গেল সহজ একটি ব্যাখ্যা, কিন্তু এর সুগভীর অর্থও রয়েছে। যেমন-

"কুৎসিত উষ্মা সন্তাপস্তাপত্রয়রূপো যস্মিন সংসারে। স সংসারে অণ্ডে উদর রূপায়াং যস্যাঃ।।"

সংসার তাপযুক্ত, ত্রিবিধ তাপে জরজর। সেই সংসারকে যিনি ভক্ষণ করেন, তিনিই কুষ্মাণ্ডা। কু- কুৎসিত, উষ্মা সন্তাপত্রয়ে পূর্ণ জগৎ যাঁর অণ্ডে (উদরে) বিদ্যমান, তিনিই কুষ্মাণ্ডা।

দেবী কুষ্মাণ্ডার যেহেতু আটটি হাত, তাই তিনি "অষ্টভুজা" নামেও পরিচিতা। এনাকে "কৃষ্ণমাণ্ড" নামেও ডাকা হয়। মহাপ্রলয়ের পরে যখন সর্বত্র শুধু নিশ্ছিদ্র অন্ধকার ছেয়ে রয়েছে, তখন এই ভগবতী কুষ্মাণ্ডা "ঈষৎ হাস্য" করে ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি করেছিলেন। তাই আদ্যাশক্তি বলতে আমরা যাঁকে বুঝি, তিনিই ইনি। দেবীর বাসস্থান সৌরমণ্ডলে। ভীমাপর্বতেও দেবী নিবাস করেন বলে উল্লেখ আছে।

মস্তকে অর্ধচন্দ্র থাকে , তাই দেবীকে চন্দ্রঘণ্টা নামে ডাকা হয়

আশ্বিনের উষালগ্নে বহুবলধারিণী, রিপুদলবারিণী দেবীর আবির্ভাবে জেগে ওঠে ধরণী। প্রাণিত হয় ভক্তকুল। মহামায়ার শাশ্বত অভয়বাণীতে দিক হারানো, শঙ্কিত মানুষজন আলোর দিশা খুঁজে পায়। আগমনির আলোয় উদ্ভাসিত হয় চারধার। দেবী অসুরবিনাশিনী। দুর্গা মানে দশভুজা, মহাশক্তি, মহামায়া। তিনি মাতৃরূপিণী, শক্তিরূপিণী, বিপত্তারিণী জননী। দেবী দুর্গা দশভুজা ছাড়াও আরও নানারূপে আবির্ভূতা হন। সব রূপেই দেবী মহাশক্তির আধার। অশুভ শক্তি বিনাশকারী মাতৃরূপা। মা দুর্গার আরেক বিশেষ রূপ হল দেবী চন্দ্রঘণ্টার রূপ। এই রূপ দেবীর শক্তির রূপ।
এই রূপে দেবী দুর্গার কপালে থাকে অর্ধচন্দ্র। যা কিনা চাঁদের মতোই সুন্দর, স্নিগ্ধ ও উজ্জ্বল। চন্দ্রঘণ্টা হলেন দেবীর সেই শক্তির রূপ, যা অসুর বিনাশিনী। তিনি দশপ্রহরণধারিণী। তাঁর গায়ের রং সোনার মতো উজ্জ্বল, পরনে লাল শাড়ি, গায়ে নানা বৈচিত্র্যময় অলঙ্কার। এই রূপে দেবী দশভুজা আটটি হাতে আটটি অস্ত্রে সজ্জিত, বাকি দুই হাতে বরাভয় মুদ্রা।
রম্ভাসুরের ছেলে মহিষাসুর যখন বীর বিক্রমে দেবতাদের হারিয়ে দিয়ে স্বর্গরাজ্যের দখল নিয়েছিল, তখন দেবতারা একত্রিত হয়ে ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বরের শরণাপন্ন হয়েছিল। সে সময় ওই তিন দেবতা অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হওয়ায় তাঁদের দেহ থেকে তেজোরাশি নির্গত হতে থাকে। ক্রমে অন্যান্য দেবতারাও নিজেদের শরীর থেকে তেজোরাশি বাইরে এনে ওই তেজকে সমৃদ্ধ করেন। দেবতাদের দেহসঞ্জাত এই সম্মিলিত তেজ থেকে সৃষ্টি হল অপরূপা এক দেবীমূর্তির। সমস্ত দেবতার শক্তিতে শক্তিময়ী দেবীর আবির্ভাবে আনন্দিত দেবতারা তাঁকে সজ্জিত করলেন নিজ নিজ অস্ত্রে। তাঁকে নানা অলঙ্কার, বস্ত্রে ও দ্রব্যসম্ভারে সাজিয়ে তুলেছিলেন। ইন্দ্র সেই সময় তাঁর বাহন ঐরাবতের গলা থেকে ঘণ্টা খুলে দিয়ে তা থেকে আরেকটি ঘণ্টা তৈরি করে দেবীর হাতে দিলেন। যুদ্ধে, উত্‌স঩বে সুপ্রাচীনকাল থেকে নানান বাদ্য বাজানো হয়ে থাকে। তবে এই দৈবশক্তিসম্পন্ন ঘণ্টার ভুবনবিদারী শব্দে দৈত্যরা ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিল। দেবী তাদের তেজ হরণ করে নিয়েছিলেন। এই কারণেই দেবীর আরেকটি নাম চন্দ্রঘণ্টা।
যুদ্ধের সময় দেবী যখন এই ঘণ্টাটি বাজান তখন অসুরকুল নিস্তেজ হয়ে পড়ে। শ্রীশ্রী চণ্ডীর স্তবেও এর উল্লেখ রয়েছে। অসীম সাহস আর সৌন্দর্যের প্রতীক হলেন এই দেবী যাঁর কপালে থাকে অর্ধচন্দ্র। নবরাত্রির উত্‌স঩বের তৃতীয় দিনে তাঁর পুজো করা হয়। চন্দ্রঘণ্টা বা চিত্রঘণ্টা নামেও তিনি পরিচিত। নবরাত্রির সময়ে দেবীকে দুধ, মিষ্টি ও ক্ষীর ভোগ হিসেবে সাজিয়ে দেন ভক্তরা।

Sunday, April 7, 2019

শৈলরাজ হিমালয়ের কন্যা হবার জন্য দেবীর এক নাম শৈলপুত্রী



আশ্বিন মাসের শুক্লা প্রতিপদ তিথিতে (সর্বপিতৃ অমাবস্যা বা মহালয়ার পরদিন) দেবী শৈলপুত্রীর পূজার মাধ্যমে শুরু হয় নবরাত্রি উৎসব। ‘শৈলপুত্রী’ নামের অর্থ ‘পর্বতের কন্যা’; সেই অর্থে ‘পার্বতী’ ও ‘শৈলপুত্রী’ সমার্থক। ইনিই দেবীকবচোক্ত নবদুর্গার প্রথম রূপ।

দেবী শৈলপুত্রী দ্বিভুজা–তাঁর এক হাতে পদ্ম, অপর হাতে ত্রিশূল। দেবীর মস্তকে অর্ধ্বচন্দ্র; বাহন বৃষ; ভৈরব শৈলেশ্বর।

শৈলপুত্রী সম্পর্কে যে পৌরাণিক কাহিনিটি প্রচলিত, সেটি সতীর দেহত্যাগ ও হিমালয়ের গৃহে দুর্গার জন্মগ্রহণের বৃত্তান্ত ছাড়া আর কিছুই নয়। এই কাহিনিটি আমাদের সকলেরই জানা–সতীর পিতা দক্ষ এক শিবহীন যজ্ঞের আয়োজন করেছিলেন। এই যজ্ঞে বিনানিমন্ত্রণে উপস্থিত হওয়ায় পিতৃমুখে সতীকে শুনতে হল শিবনিন্দা। তৎক্ষণাৎ যজ্ঞস্থলেই দেহত্যাগ করলেন শিবপ্রিয়া সতী। শিব ও তাঁর অনুচরবৃন্দ দক্ষযজ্ঞ পণ্ড করলেন। তারপর সতীবিরহে কাতর শিব বসলেন ধ্যানে। এদিকে তারকাসুরের অত্যাচারে দেবতারা অস্থির হয়ে উঠলেন। তারকাসুর বর পেয়েছিল, শিবের পুত্র ভিন্ন কারো হাতে সে মরবে না। কিন্তু শিব বসেছেন ধ্যানে, সতী করেছেন দেহত্যাগ। শিব-দুর্গার পুত্র এখন আসবে কোত্থেকে? দেবতারা কাতর হয়ে মহামায়া দুর্গার নিকট প্রার্থনা জানাতে লাগলেন পরিত্রাণের জন্য। এদিকে গিরিরাজ হিমালয় ও তাঁর পত্নী মেনকা অনেক দিন ধরে দুর্গাকে কন্যারূপে লাভ করার জন্য করছিলেন তপস্যা। তাঁদের ভক্তিতে তুষ্ট হয়ে সতী দেবতাদের পরিত্রাণের জন্য হিমালয়ের গৃহেই পুনর্জন্ম গ্রহণ করলেন। শৈলরাজের পুত্রীরূপে মহামায়া দুর্গা হলেন শৈলপুত্রী। সতীর অপর নাম ‘হৈমবতী’–হিমবৎ (হিমালয়) পর্বতের কন্যা।

মা দুর্গার নবশক্তির দ্বিতীয় রূপ ব্রহ্মচারিণী

মা দুর্গার নবশক্তির দ্বিতীয় রূপ ব্রহ্মচারিণী। এখানে ‘ব্রহ্ম’ শব্দের অর্থ হল তপস্যা। ব্রহ্মচারিণী অর্থাৎ তপশ্চারিণী--- তপ আচরণকারী। দেবী ব্রহ্মচারিণীর রূপ- জ্যোতিতে পূর্ণ, অতি মহিমামণ্ডিত। তিনি ডান হাতে জপের মালা এবং বাঁ হাতে কমণ্ডলু ধারণ করে আছেন।

পূর্বজন্মে যখন হিমালয়ের কন্যারূপে জন্মেছিলেন তখন তিনি নারদের পরামর্শে ভগবান শঙ্করকে পতিরূপে লাভ করার জন্য কঠিন তপস্যা করেন। সেই কঠিন তপস্যার জন্য তাঁকে তপশ্চারিনী বা ব্রহ্মচারিণী বলা হয়। তিনি সহস্র বর্ষ ধরে মাত্র ফল-মূলের আহার করে জীবন ধারণ করেছিলেন। শতবর্ষ তিনি শাক আহার করে জীবন নির্বাহ করেছিলেন। কিছুকাল কঠিন উপবাসে থেকে খোলা আকাশের নিচে বর্ষা ও গ্রীষ্মের দাবদাহে কাটিয়েছেন। এই কঠোর তপশ্চর্যার পরে তিন সহস্র বছর শুধুমাত্র গাছ থেকে মাটিতে ঝরে পড়া বেলপাতা আহার করে অহর্নিশ ভগবান শঙ্করের আরাধনা করেছেন। তারপর তিনি সেই শুষ্ক বেলপাতা আহার করাও পরিত্যাগ করেন। অতঃপর কয়েক সহস্র বছর নির্জলা, নিরাহারে থেকে তপস্যা করতে লাগলেন। পাতা (পর্ণ) খাওয়া পর্যন্ত পরিত্যাগ করায় তাঁর অন্য একটি নাম হয় ‘অপর্ণা’। কয়েক সহস্র বছর এই তপস্যা করায় ব্রহ্মচারিণী দেবীর পূর্বজন্মের শরীর কৃশ-একদম ক্ষীণ হয়ে গেল।
 তিনি অতি কৃশকায় হয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর এই দশা দেখে মা মেনকা অত্যন্ত দুঃখিত হলেন। তিনি তাঁকে এই কঠিন তপস্যা থেকে বিরত করার জন্য বললেন, ‘উ মা, না ওরে আর না!’ তখন থেকে দেবী ব্রহ্মচারিণীর পূর্বজন্মের আর এক নাম হয় ‘উমা’। তাঁর তপস্যার কঠোরতায় ত্রিলোকে হাহাকার পড়ে গেল দেবতা, ঋষি, সিদ্ধগণ, মুণি সকলেই ব্রহ্মচারিণী দেবীর এই তপস্যাকে অভূতপূর্ব পুণ্যকাজ বলে তাঁকে প্রশংসা করতে লাগলেন। অবশেষে পিতামহ ব্রহ্মা তাঁকে সম্বোধন করে প্রসন্ন হয়ে আকাশবাণীর মাধ্যমে বললেন, হে দেবী! আজ পর্যন্ত কেউ এরূপ কঠোর তপস্যা করে নি। তোমার দ্বারাই এরূপ তপস্যা সম্ভব। তোমার এই অলৌকিক কাজে চতুর্দিকে ধন্য ধন্য রব উঠেছে। তোমার মনোষ্কামনা সর্বতোভাবে পূর্ণ হবে। ভগবান চন্দ্রমৌলি শিবকে তুমি পতিরূপে পাবে। এবার তুমি তপস্যায় বিরত হয়ে গৃহে ফিরে যাও। তোমার পিতা শীঘ্রই তোমাকে নিতে আসবেন।’ মা দুর্গার এই দ্বিতীয় রূপ ভক্ত এবং সিদ্ধদের অনন্ত ফল প্রদান করে। তাঁর উপাসনা দ্বারা মানুষের স্বভাবে তপ, ত্যাগ, বৈরাগ্য, সদাচার, সংযম বৃদ্ধি পায়। জীবনের কঠিন সংঘর্ষেও তাঁর মন কর্তব্যে বিচলিত হয় না। মা ব্রহ্মচারিণী দেবীর কৃপায় তাঁর সর্বদা সিদ্ধি ও বিজয় প্রাপ্তি হয়। দুর্গাপূজার দ্বিতীয় দিনে এঁর স্বরূপেরই আরাধনা করা হয়। এই দিন সাধকের মন ‘স্বাধিষ্ঠান চক্রে’ স্থিত হয়। এই চক্রে চিত্ত-প্রতিষ্ঠ যোগী তাঁর কৃপা ও ভক্তি লাভ করে।

Thursday, March 28, 2019

শাস্ত্রে দুর্গার নয়টি নির্দিষ্ট মূর্তিকে ‘নবদুর্গা’ বলে



দুর্গা—এই নামটি শুনলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটা দেবীমূর্তি। তাঁর দশ হাতে দশ রকম অস্ত্র, এক পা সিংহের পিঠে, এক পা অসুরের কাঁধে। তাঁকে ঘিরে থাকেন গণেশ, লক্ষ্মী, সরস্বতী আর কার্তিক ঠাকুর। যাঁরা সেকেলে কেতায় ঠাকুর বানান, তাঁদের ঠাকুরের পিছনে চালচিত্রে আরও নানারকম ঠাকুরদেবতার ছবিও আঁকা থাকে। আর যাঁরা আধুনিক, তাঁরা প্রতিমার মাথার উপর একখানা ক্যালেন্ডারের শিবঠাকুর ঝুলিয়ে রাখেন। মোটামুটি এই মূর্তি বছর বছর দেখে আমরা অভ্যস্ত। তবে মাঝে মাঝে পুজো উদ্যোক্তারা একটু স্বাদবদলের জন্য বানান পঞ্চদুর্গা, নবদুর্গা, একাদশ দুর্গা, একান্ন দুর্গা ইত্যাদি। শাস্ত্রে কতরকম মাতৃমূর্তির কথা আছে। তার থেকেই সামর্থ্য অনুযায়ী কয়েকটা বেছে নিয়ে পঞ্চদুর্গা, নবদুর্গা ইত্যাদি বানানো। আমাদের ছেলেবেলায় দেখেছি, থিমপুজো শুরু হওয়ার আগে এই সব প্যান্ডেল নিয়ে ঠাকুর-দর্শনার্থীদের মধ্যে একটা বিশেষ আগ্রহ থাকত। এখনও আছে। মায়ের সনাতন মূর্তির আবেদন কখনও ম্লান হয় না ঠিকই, কিন্তু মানুষ এই সুযোগে অন্যান্য রূপগুলি দেখে চোখ জুড়িয়ে নিতেও ছাড়েন না।

শাস্ত্রে দুর্গার নয়টি নির্দিষ্ট মূর্তিকে ‘নবদুর্গা’ বলে। এঁরা হলেন—ব্রহ্মাণী, কৌমারী, বৈষ্ণবী, কৌমারী, নারসিংহী, বারাহী, ইন্দ্রাণী, চামুণ্ডা, কাত্যায়নী ও চণ্ডিকা। দুর্গাপূজার সময় দেবীদুর্গার আবরণদেবতা হিসেবে এঁদের পূজা করা হয়। আবার নবপত্রিকা (কলাবউ)-এর নয়টি গাছও নয় দেবীর প্রতীক। এঁরা হলেন—ব্রহ্মাণী (কলা), কালিকা (কচু), দুর্গা (হলুদ), জয়ন্তী (জায়ফল), শিবা (বেল), রক্তদন্তিকা (ডালিম), শোকরহিতা (অশোক), চামুণ্ডা (মান) ও লক্ষ্মী (ধান)। এঁরা পূজিত হন ‘ওঁ নবপত্রিকাবাসিন্যৈ নবদুর্গায়ৈ নমঃ’ মন্ত্রে।

তবে এঁরা ছাড়াও তন্ত্রে, পুরাণে আরও কয়েকজন দুর্গা-নামধারিণী দেবীর সন্ধান পাই। আবার দেবী দুর্গার অন্যান্য কয়েকটি রূপেরও দেখা পাওয়া যায়। আমরা সাধারণত দুর্গার যে মূর্তিটি শারদীয়া উৎসবে পূজা করি, সেই মূর্তিটির শাস্ত্রসম্মত নাম মহিষাসুরমর্দিনী-দুর্গা। স্মার্তমতে যাঁরা পঞ্চদেবতার পূজা করেন, তাঁরা জয়দুর্গার নাম ও ধ্যানমন্ত্রের সঙ্গে পরিচিত। এছাড়া আছেন মহিষমর্দিনী-দুর্গা, কাত্যায়নী-দুর্গা, নীলকণ্ঠী-দুর্গা, ক্ষেমঙ্করী-দুর্গা, হরসিদ্ধি-দুর্গা, রুদ্রাংশ-দুর্গা, বনদুর্গা, অগ্নিদুর্গা, বিন্ধ্যবাসিনী-দুর্গা, রিপুমারি-দুর্গা, অপরাজিতা-দুর্গা প্রমুখ দেবীগণ। এঁরা সবাই আগম-শাস্ত্রপ্রসিদ্ধ দেবী। এছাড়া তন্ত্রশাস্ত্রে দুর্গা-নাম্নী দেবীর যে ধ্যানমন্ত্র পাওয়া যায়, সেটিও আমাদের দেখা দশভুজা-মূর্তির মতো নয়।

মহিষাসুরমর্দিনী-দুর্গাকে নিয়ে আমাদের নতুন করে কিছুর বলার নেই। দুর্গাপূজায় প্রচলিত ‘জটাজুটসমাযুক্তা’ ইত্যাদি ধ্যানমন্ত্রের আধারে নির্মিত এই দেবীমূর্তি আমাদের সকলেরই পরম-পরিচিত। তবে বিষ্ণুধর্মোত্তর পুরাণ-এ মহিষাসুরমর্দিনীর একটু আলাদা রকমের বর্ণনা আমরা পাই। চণ্ডিকা নামে উল্লিখিত এই দুর্গার দশের জায়গায় কুড়িটি হাত। শ্রীশ্রীচণ্ডী-তে অষ্টাদশভূজা মহালক্ষ্মীর কথা আছে, এঁর হাত তাঁর থেকেও দুটি বেশি। ডান দিকের দশ হাতে থাকে শূল, খড়্গ, শঙ্খ, চক্র, বাণ, শক্তি, বজ্র, অভয়, ডমরু, ছাতা; আর বাঁদিকের দশ হাতে থাকে নাগপাশ, খেটক, পরশু, অঙ্কুশ, ধনুক, ঘণ্টা, পতাকা, গদা, আয়না ও মুগুর। বাকি সবই আমাদের চেনা মূর্তিটির মতো। দেবী কাত্যায়নী-দুর্গার মূর্তিটিও আমাদের দশভূজা-দুর্গার অনুরূপ। তবে আমাদের পরিচিত মহিষাসুরমর্দিনী ও তন্ত্রকথিত মহিষমর্দিনীর রূপে সামান্য ফারাক আছে। দেবী মহিষমর্দিনী অষ্টভুজা। এঁর ধ্যানে সিংহের উল্লেখ পাওয়া যায় না। দেবীকে মহিষের মাথার উপর বসে থাকতে দেখা যায়। হাতে থাকে শঙ্খ, চক্র, খড়্গ, খেটক, ধনুক, বাণ, শূল ও তর্জনীমুদ্রা। এর পূজার বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল—শঙ্খপাত্রে অর্ঘ্যস্থাপনের উপর নিষেধাজ্ঞা; মৃৎপাত্রে এই কাজটি করতে হয়।

কুলাচারে পূজিতা দেবী জয়দুর্গার মূর্তিটি কিছুটা আমাদের পরিচিত জগদ্ধাত্রী মূর্তির মতো। শুধু দেবীর চার হাতে থাকে শঙ্খ, চক্র, খড়্গ ও ত্রিশূল এবং দেবীর গায়ের রং কালীর মতো কালো। কপালে থাকে অর্ধচন্দ্র। সিংহের পদতলে হাতি অনুপস্থিত। কেউ কেউ মনে করেন, জয়দুর্গা কালী ও দুর্গার সম্মিলিত মূর্তি।

 
Design by দেবীমা | Bloggerized by Lasantha - Premium Blogger Themes | Facebook Themes