Pages

Thursday, October 1, 2015

দূর্গাপূজার ইতিহাস

দুর্গোৎসব বাঙালি হিন্দুদের সর্বশ্রেষ্ঠ পূজা। বিভিন্ন পুরান শাস্ত্রে দুর্গা দেবী আদ্যাশক্তি মহামায়া, চণ্ডী, উমা, ভগবতী, পার্বতী প্রভৃতি নামে পূজিত হন। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ, কালিকা পুরাণ, দেবী পুরাণ,দেবী ভাগবত প্রভৃতি গ্রন্থে দেবী দুর্গার কাহিনী, কাঠামো ও লীলার বর্ণনা পাওয়া যায় এবং সেখানে কিছু কিছু পার্থক্য ও দেখা যায়। শরতের দুর্গাপূজা অর্থাৎ শারদীয়া দুর্গোৎসব মূলত মার্কয়ে পুরাণের অন্তর্গত শ্রীশ্রী চণ্ডীগ্রন্থ অনুসারে হয়ে থাকে। চণ্ডীগ্রন্থ খ্রি. তৃতীয় শতাব্দীতে রচিত হয় এবং ভাগবত পুরাণের আগে রচিত হয়। মার্ক-েয় পুরাণের মূল অংশ চণ্ডী। কেউ কেউ মনে করেন, ভারতের নর্মদা অঞ্চল অথবা উজ্জয়িনীতে চণ্ডীর উৎপত্তি। কিন্তু অধিকাংশ গবেষক মনে করেন,চট্টগ্রামের করালডাঙ্গা পাহাড় শ্রীশ্রী চণ্ডীর আবির্ভাব স্থল। দূর্গাপূজা বৈদিক যুগ থেকেই দুর্গা নাম প্রচলিত। দুর্গাপূজা কেবল শাক্ত সমাজেই নয়, প্রাচীন বৈষ্ণব সমাজেও অনুষ্ঠিত হয়েছে। মহাপ্রভু চৈতন্যদেব চণ্ডীম-পেই চতুষ্পঠী চালু করেন। বৈষ্ণব কবি চণ্ডীদাস, বৈষ্ণবাচার্য্য নিত্যান্দজীও দুর্গা দেবীর ভক্ত ছিলেন। মার্ক-েয় পুরাণ মতে, সত্যযুগে রাজা সুরথ, সমাধি বৈশ্য দেবীর মৃন্ময়ী মূর্তি গড়ে পূজা আরম্ভ করেছিলেন। কৃত্তিবাস রামায়ণ থেকে জানা যায়, ত্রেতা যুগে লঙ্কার রাজা রাবণ দেবী পূজার আয়োজন করে দেবীর আশীর্বাদ ধন্য হয়েছিলেন। অন্যদিকে রাবণ-বধ এবং জানকীকে উদ্ধার করার জন্য শ্রী রামচন্দ্র বসন্তকালের আগে শরৎকালে দেবী পূজা করেছিলেন। উল্লেখ্য, শ্রী রামচন্দ্র দেবী ভগবতীকে অকালে বোধন করেছিলেন। মূলত দেবী পূজা বসন্তকালে হয়ে থাকে। সেই থেকে শরতে দেবী পূজা অকাল বোধন নামে পরিচিত। শরতের এই পূজাই আমাদের দুর্গোৎসব। শরতের সঙ্গে সঙ্গে হেমন্তে কাত্যায়নী দুর্গা, বসন্তে বাসন্তী পূজারও প্রচলন আছে। বাল্মীকি রামায়ণে দেখা যায়, রামের জয়লাভের জন্য স্বয়ং ব্রহ্মা দুর্গার স্তব করেছিলেন। মহাভারতে পাওয়া যায়, কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধের আগে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আদেশে অর্জুন দুর্গার স্তব করেছিলেন। দেবী দুর্গা দেবতাদের ঐক্য ও সংহতির প্রতীক। সবচেয়ে প্রাচীন মহিষমর্দিনীর মূর্তিটি পাওয়া যায় পঞ্চম শতাব্দীতে। জানা যায়, প্রথম শতকে কুষান যুগে, পঞ্চম শতকে গুপ্ত যুগে, সপ্তম শতকে পল্লব যুগে এবং ১১-১২ শতকে সেন বংশের আমলে দেবী মহিষমর্দিনী রূপে পূজিত হয়েছেন। কুষান যুগে দুর্গা ছিলেন লাল পাথরের তৈরি। পাল যুগে অর্থাৎ ১২৮৯ সালে দেবী ত্রিনয়নী এবং চার হাতবিশিষ্ট। দশভুজা দুর্গার আত্মপ্রকাশ ঘটে ১৮ শতকে। বাংলাদেশে প্রথম দুর্গাপূজার প্রচলন হয় মোগল সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে ষোড়শ শতাব্দীতে। মোগল সম্রাটের বিদূষক কুল্লুক ভট্টের পিতা উদয় নারায়ণের পৌত্র অর্থাৎ কুল্লুক ভট্টের পুত্র তাহিরপুরের রাজা (বর্তমান রাজশাহী) কংশ নারায়ণ রায় প্রায় সাড়ে আট লাখ টাকা ব্যয়ে প্রথম শারদীয় দুর্গোৎসবের আয়োজন করেন। পরে তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ভাদুড়িয়ার (রাজশাহী) রাজা জগৎ নারায়ণ প্রায় ৯ লাখ টাকা ব্যয় করে বাসন্তী দুর্গোৎসব করেন। তারপর থেকে রাজা ভূঁইয়ারা নিয়মিতভাবে দুর্গাপূজা আরম্ভ করেন।দূর্গাপূজা.দূর্গাপূজা ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিপ্লবের সময় বিক্রমপুর পরগনার ভাগ্যকুল জমিদার বাড়ির রাজা ব্রাদার্স এস্টেটের এবং সাটুরিয়া থানার বালিহাটির জমিদার বাড়ির দুর্গাপূজা আয়োজনের ব্যাপকতা আজও কিংবদন্তি হয়ে আছে। ঢাকা শহরে সর্বপ্রথম দুর্গাপূজার প্রচলন ঘটে নবাব সলিমুল্লাহর আমলে। সে সময় সিদ্ধেশ্বরী জমিদার বাড়ি ও বিক্রমপুর হাউসে জাঁকজমকপূর্ণ পূজা হতো। ১৯২২-২৩ সালে আরমানিটোলার জমিদার ছিলেন বিক্রমপুরের রাজা ব্রাদার্সের বাবা শ্রীনাথ রায়। তার বাড়ির পূজাও সে সময়ে বিখ্যাত ছিল। লালবাগ থানার ঢাকেশ্বরী মন্দিরের পূজা অনেক পুরনো। প্রায় ৮০ বছর ধরে এখানে নিয়মিত পূজা হয়ে আসছে। কিংবদন্তি আছে, ঢাকেশ্বরী মন্দিরে পূজিতা দুর্গারই আরেক রূপ দেবী ঢাকেশ্বরীর নামেই ঢাকার নামকরণ। দুর্গাপূজার কথা বলতে গেলে শাঁখারিবাজার, তাঁতিবাজারের নাম চলে আসে। শাঁখারিবাজারে প্রথম দুর্গাপূজা শুরু হয় ইংরেজ আমলের একেবারে শেষের দিকে। এককভাবে পূজাটি করেন ব্যবসায়ী সুরেশ্বর ধর। ১৯৫৫ সালে বারোয়ারি পূজা হয় বলরাম ধরের বাড়িতে। তাঁতিবাজারের মোক্তার ফণীভূষণ ধর নিজ বাড়িতে এককভাবে পূজা করেন ২৫-২৬ বছর একটানা। ১৯৭১-এর পর শৃঙ্খলমুক্ত স্বাধীন মাতৃভূমিতে সর্বপ্রথম মাতৃবন্দনার আয়োজন করে শাঁখারিবাজারের প্রতিদ্বন্দ্বী নাট্যগোষ্ঠী। মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটি গঠিত হয় ১৯৭৭ সালে।>দুর্গাপূজার অনুষ্ঠান ব্যাপক। দুর্গাষষ্ঠী থেকে বিজয়া দশমী পর্যন্ত নানা আচার-উপাচার ও ভক্তিশ্রদ্ধায় দুর্গোৎসব অনুষ্ঠিত হয়। সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের অবদান এ পূজাকে সার্বজনীন করে তুলেছে। দুর্গা পূজাতেই আমরা ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে এক হয়ে যাই সবাই। সবার প্রাণের উৎসবে পরিণত হয় দুর্গাপূজা।

 
Design by দেবীমা | Bloggerized by Lasantha - Premium Blogger Themes | Facebook Themes