Pages

Saturday, December 29, 2018

গায়ত্রী মন্ত্র দিয়ে শুধু পূজাই হয় না, গায়ত্রী মন্ত্রকেও পূজা করা হয়।

গায়ত্রী মন্ত্র
দেবী গায়ত্রীর তিন রূপ। সকালে তিনি ব্রাহ্মী; রক্তবর্ণা ও অক্ষমালা-কমণ্ডলুধারিনী। মধ্যাহ্নে বৈষ্ণবী; শঙ্খ, চক্র, গদা ধারণকারিনী। সন্ধ্যায় শিবানী; বৃষারূঢ়া, শূল, পাশ ও নরকপাল ধারিনী এবং গলিত যৌবনা। শব্দ-কল্পদ্রুম অনুসারে, যজ্ঞকালে একবার ব্রহ্মার স্ত্রী সাবিত্রী একা যজ্ঞস্থলে আসতে অস্বীকৃত হলে, ব্রহ্মা ক্রুদ্ধ হয়ে অন্য নারীকে বিবাহ করে যজ্ঞ সমাপ্ত করার পরিকল্পনা করেন। তাঁর ইচ্ছানুসারে পাত্রী খুঁজতে বের হয়ে এক আভীরকন্যাকে (গোয়ালিনী) পাত্রী মনোনীত করেন ইন্দ্র। বিষ্ণুর অনুরোধে তাঁকে গন্ধর্ব মতে বিবাহ করেন ব্রহ্মা। এই কন্যাই গায়ত্রী।

গায়ত্রীর ধ্যানে আছে, তিনি সূর্যমণ্ডলের মধ্যস্থানে অবস্থানকারিনী, বিষ্ণু বা শিবরূপা, হংসস্থিতা বা গরুড়াসনা বা বৃষবাহনা। তিনি একাধারে ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিব। হিন্দু বিধান অনুসারে, সকাল, দুপুর ও সন্ধ্যায় গায়ত্রী ধ্যান করতে হয় এবং এই মন্ত্র ধ্যান বা পাঠে মুক্তি প্রাপ্ত হয় বলে এর নাম ‘গায়ত্রী’। বেদজ্ঞ আচার্যের কাছে এই মন্ত্রে দীক্ষিত হলে তাঁর পূণর্জন্ম হয় ও তিনি দ্বিজ নামে আখ্যাত হন। সেই কারণে দ্বিজ অর্থাৎ ব্রাহ্মণগণের উপাস্য। বৈদিক গায়ত্রী মন্ত্রে আদলেই অন্যান্য দেবতার গায়ত্রী রচিত হয়েছে, দ্রষ্টব্য গণেশ, কালী, গুহ্যকালী, নারায়ণ, রাধা প্রভৃতি ।

গায়ত্রী মন্ত্র

গায়ত্রী মন্ত্র হল বৈদিক হিন্দুধর্মের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্র। প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে, বেদের অন্যান্য মন্ত্রের মতো গায়ত্রী মন্ত্রও "অপৌরষেয়" (অর্থাৎ, কোনো মানুষের দ্বারা রচিত নয়) এবং এক ব্রহ্মর্ষির কাছে (গায়ত্রী মন্ত্রের ক্ষেত্রে ব্রহ্মর্ষি বিশ্বামিত্র) প্রকাশিত। এই মন্ত্রটি বৈদিক সংস্কৃত ভাষায় রচিত। এটি ঋগ্বেদের  একটি সূক্ত। গায়ত্রী মন্ত্র গায়ত্রী ছন্দে রচিত। হিন্দুধর্মে গায়ত্রী মন্ত্র ও এই মন্ত্রে উল্লিখিত দেবতাকে অভিন্ন জ্ঞান করা হয়। তাই এই মন্ত্রের দেবীর নামও গায়ত্রী। গায়ত্রী মন্ত্র দিয়ে শুধু পূজাই হয় না, গায়ত্রী মন্ত্রকেও পূজা করা হয়।

গায়ত্রী মন্ত্র দিয়ে হিন্দু দেবতা সবিতৃকে আবাহন করা হয়। তাই গায়ত্রী মন্ত্রের অন্য নাম "সাবিত্রী মন্ত্র"। সাবিত্রীর ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা অনুসারে এই মন্ত্র সূর্যপূজা, যোগ, তন্ত্র বা শাক্তধর্মের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

মন্ত্রটির শুরুতে ওঁ-কার এবং "মহাব্যাহৃতি" নামে পরিচিত "ভূর্ভুবঃ স্বঃ" শব্দবন্ধটি পাওয়া যায়। এই শব্দবন্ধটি তিনটি শব্দের সমষ্টি - ভূঃ, ভূবঃ ও স্বঃ। এই তিনটি শব্দ দ্বারা তিন জগতকে বোঝায়। ভূঃ বলতে বোঝায় মর্ত্যলোক, ভূবঃ বলতে বোঝায় স্বর্গলোক এবং স্বঃ হল স্বর্গ ও মর্ত্যের সংযোগরক্ষাকারী এক লোক। বেদে যে সপ্তভূমি বা সাত জগতের উল্লেখ আছে, এগুলি তার মধ্যে তিনটি জগতের নাম। ধ্যান অনুশীলনের ক্ষেত্রে ভূঃ, ভূবঃ ও স্বঃ - এই তিন লোক চেতন, অর্ধচেতন ও অচেতন - এই তিন স্তরের প্রতীক।

বৈদিক সাহিত্যে বহুবার গায়ত্রী মন্ত্র উল্লিখিত হয়েছে। মনুস্মৃতি, হরিবংশ, ও ভগবদ্গীতায় গায়ত্রী মন্ত্রের প্রশংসা করা হয়েছে। হিন্দুধর্মে উপনয়ন সংস্কারের সময় গায়ত্রী দীক্ষা একটি প্রধান অনুষ্ঠান এবং হিন্দু দ্বিজ সম্প্রদায়ভুক্তেরা এই মন্ত্র নিত্য জপ করেন। আধুনিক হিন্দু ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলনের ফলে গায়ত্রী মন্ত্র নারী ও সকল বর্ণের মধ্যে প্রচলিত হয়েছে।

Sunday, December 23, 2018

দেবীর একটি নাম চণ্ডঘণ্টা-যিনি প্রচণ্ড শক্তিসম্পন্ন আওয়াজ সৃষ্টিকারী ঘন্টা ধারণ করে আছেন

দেবী চন্দ্রঘন্টা
রম্ভাসুরের ছেলে মহিষাসুর যখর প্রচণ্ড বিক্রমে দেবতাদের হারিয়ে দিয়ে স্বর্গরাজ্য দখল করেছিল, তখন দেবতারা একত্রিত হয়ে তাঁদের নেতা ব্রহ্ম-বিষ্ণু-মহেশ্বরের শরণাপন্ন হলে সেই তিন দেবতা অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হলেন। তখন তাঁদের শরীর থেকে তেজ বাইরে এসে এক জায়গায় পুঞ্জীভূত হতে লাগলো। ক্রমে অনান্য দেবতারাও উত্সাহিত হয়ে নিজের নিজের শরীর থেকে তেজরাশি বাইরে এনে ঐ তেজকে সমৃদ্ধ করলেন। ফলে দেবতাদের দেহসঞ্জাত তেজ থেকে সৃষ্টি হলো এক অতুলনীয়া দেবীমূর্তির। ইনিই আদিশক্তি।সকল দেবতাদের অন্তরের শক্তিরূপেই তিনি তাদের ভেতরে ছিলেন।তাঁরই শক্তিতে এইসব দেবতারা শক্তিমান ছিলেন। আজ বিপদাপন্ন হয়ে সেই শক্তিকে বাইরে এনে তাকে দেওয়া হল ঐশী শক্তির দেবীমূর্তি। নানা দেবতার শক্তিতে শক্তিমতী সেই দেবীকে দেখে আহ্লদিত দেবতারা তাঁদের নিজের নিজের অস্ত্রাদি থেকে নূতন অস্ত্র সৃষ্টি করে দেবীর করকমলে সেগুলি ধরিয়ে দিলেন। তাঁকে নানা অলংকার বস্ত্রাদিও তাঁরা দিলেন-মনের মত করে নানা দ্রব্যসম্ভারে তাঁকে সাজিয়ে তাঁর বন্দনা করে প্রার্থনা জানালেন-মা আমাদের সমূহ বিপদ। অসুর মহিষরাজের হাত থেকে তুমি আমাদের রক্ষা কর, স্বর্গরাজ্য আমাদের ফিরিয়ে দাও।

তাঁকে নানা অস্ত্র-শস্ত্রাদি যখন সব দেবতারা দিচ্ছিলেন, তখন দেবরাজ ইন্দ্র, “দদৌ তস্যৈ সহস্রাক্ষোঘণ্টাম ঐরাবতং গজাৎ” তাঁর বাহন ঐরাবৎ হাতির গলায় ঘণ্টা থেকে একটি ঘণ্টা নিয়ে দেবীর একটি হাতে দিলেন। ঘণ্টা সর্ববাদ্যময়ী।যুদ্ধ উত্সবে প্রাচীনকালে ,এমনকি এখনও নানা বাদ্যাদি বাজানো হয়। যাকে মিলিটারী ব্যান্ড বলে। দেবীর সেই যুদ্ধে এই ঘণ্টা সেই রকম একটি বাদ্য ও বাজনা। তবে এটি দৈবশক্তিসম্পন্ন। এই ঘণ্টানাদ বিকট শব্দ সৃষ্টি করেছিল “হিরস্তি দৈত্য তেজাংসি স্বনেনাপূর্য্য যা জগৎ”। সেই ঘণ্টার শব্দেই দৈত্যদের প্রাণ ভয়ে খাঁচাছাড়া অবস্থা হয়েছিল। তাদের তেজ হরণ করবার জন্য দেবী সেই প্রচণ্ড শব্দের ঘণ্টাবাজিয়েছিলেন। তাই যুদ্ধের পরে দেবতারা মায়ের কাছে প্রার্থনা করেছিলেন,মা তোমার ঐ যে ঘণ্টা অসুরদের তেজ হরণ করেছিল সেই ঘণ্টার আমরাও শরণ নিচ্ছি, আমাদের পাপকে সেই ঘণ্টা যেন হরণ করে নেয়। “সা ঘণ্টা পাতু নো দেবি পাপেভ্যো নঃ সুতাম্ইব ”। এই জন্য দেবীর একটি নাম চণ্ডঘণ্টা-যিনি প্রচণ্ড শক্তিসম্পন্ন আওয়াজ সৃষ্টিকারী ঘন্টা ধারণ করে আছেন,তিনি চণ্ডঘণ্টা।

এছাড়া, এই ঘণ্টাধ্বনি নিয়ে কাশীর আরও একটি প্রবাদ চলিত আছে, দেবী চণ্ডঘণ্টার পূজায় তাঁকে প্রসন্ন করতে পারলে সেই সাধকের মৃত্যুকালে যমঘণ্টার অর্থাৎ যমের বাহন মহিষের গলায় ঘণ্টার আওয়াজ আর ভয় দেখাতে পারে না। অর্থাৎ সে মৃত্যুভয় থেকে মুক্ত হয়। ভোগাসক্ত জীব মৃত্যুভয়ে সদা ভীত, কখন সে যমঘণ্টা শুনবে এই ভয়ে সে অস্থির। কিন্তু মাতৃভক্ত সাধক এই ঘণ্টাকে মাতৃহস্তস্থিত পবিত্র ঘণ্টার নাদধ্বনি হিসাবে শুনতে পায়, আর দেবী চণ্ডঘণ্টার কৃপায় তার জীবনের যত কামনা-বাসনার অসুর আছে তখন সব হীনবল হয়ে পড়ে এবং সে মাতৃচরণাভিলাষী হয়ে সানন্দে দেহবন্ধন মুক্ত হয়ে মাতৃাঅঙ্ক লাভ করে সিদ্ধ হয়।একটু দূরে চিত্রগুপ্তেশ্বর শিবের মন্দির ও চিত্রকূপ। চিত্রগুপ্ত যমরাজের প্রধান সচিব মাতৃভক্ত সাধক চণ্ডঘণ্টার কৃপায় চিত্রগুপ্তের হিসাবের খাতার পরোয়া করে না। শিব ও তাঁর শক্তি চণ্ডঘণ্টার কৃপায় সে বহু পাতক ও ধর্মচ্যুতি থেকেও রক্ষা পায়-এই রকম জনশ্র“তি কাশীতে এই দেবী সম্পর্কে। সাধক সাধনার গভীরে প্রবেশ করলে এই নাদধ্বনি শুনতে পায়। ক্রমে তার মন স্থির হতে হতে সে জীবনের পরমপ্রাপ্তি মাতৃদর্শন লাভ করে ধন্য হয়।

Wednesday, December 19, 2018

দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন করে সেই বৈষ্ণবী শক্তিই হলেন দেবী আদিশক্তি


বৈষ্ণবী দেবী

শরৎকালের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের আড়ম্বরপূর্ণ উৎসবের নাম শারদোৎসব বা দুর্গাপূজা। বলা হয়ে থাকে এ পূজা অতি প্রাচীন। শ্রীশ্রী চন্ডী গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে পুরাকালে মেধা মুনির উপদেশানুসারে রাজা সুরথ এবং সমাধি বৈশ্য দেবীর আরাধনা করেছিলেন। উল্লেখ্য ত্রেতা যুগে ভগবান শ্রী রাম চন্দ্র নাকি রাবণ বধের নিমিত্তে এ পূজা করেছিলেন। 'কৃত্তিবাসী রামায়ণে' এর উল্লেখ থাকলেও প্রামাণিক গ্রন্থ বাল্মীকি রচিত ‘রামায়ণে’ এর সত্যতা পাওয়া যায় নি। এ পূজার প্রচলন সম্পর্কে ইতিহাস থেকে জানা যায় সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে অর্থাৎ ১৫৮০ খ্রিষ্টাব্দে টীকাকার কল্লুক ভট্টের পুত্র রাজশাহী জেলার তাহেরপুরের রাজা কংস নারায়ণ তৎকালীন নয় লক্ষ টাকা ব্যয়ে বঙ্গদেশে দেবীপূজার প্রচলন করেন। সেই থেকে আজ অবধি বাংলায় এ পূজা প্রচলিত হয়ে আসছে বলে অনেকে মনে করেন। যা হোক এখন দেখা যাক, এই জড় জগতে পূজিতা দুর্গাদেবী কে, কি তার পরিচয় এবং তিনি কার ইচ্ছায় বা আজ্ঞায় এই জড় জগৎ পরিচালনা করছেন তা সম্পর্কে শাস্ত্রে কি বলা হয়েছে, তার সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ।
‘দুর্গা’ শব্দটি দুর্গবিশিষ্টা। ‘দুর্গ’ শব্দের অর্থ কারাগৃহ। তাই সংক্ষেপ বলা যায় কারাগৃহ সদৃশ জড় জগতের যিনি কর্তা তিনিই হচ্ছেন দুর্গা। আর এই জড় জগৎটা হচ্ছে দুর্গাদেবীর দুর্গ। দুর্গার উৎপত্তি সম্পর্কে শ্রী শ্রী চন্ডী গ্রন্থে  উল্লেখ আছে, অন্যেষাবৈষ্ণব দেবানাং সম্ভবস্তেজসাং শিবা অর্থাৎ বিশ্বকর্মাদি দেবতাগণের তেজঃপুঞ্জ থেকে মহামায়া দুর্গার উৎপত্তি। যিনি দশভুজাযুক্তা, সিংহবাহিনী, প্রতাপশালী, মহিষাসুরমর্দ্দিনী, সিদ্ধিরূপ সন্তানদ্বয়, কার্তিক ও গণেশের জননী, জড়ৈশ্বর্য্য ও জড়বিদ্যা প্রদায়িনী লক্ষ্মী সরস্বতীর মধ্যবর্ত্তিনী। তাঁর রয়েছে ত্রিবিধ শক্তি আদ্যাশক্তি, মহাশক্তিও যোগমায়াশক্তি। আবার মায়া শক্তির রয়েছে তিনটি গুণ সত্ত্ব, রজ ও তমঃ। যে যে গুণের অধিকারী সে ঐ গুণানুসারে দেবীর ঐ মায়াকে আরাধনা করে থাকেন। দক্ষরাজ নন্দিনী ভোলানাথের ঘরণী পরম বৈষ্ণবী দেবী শিবানী কুড়ি প্রকার অস্ত্রে সু-সজ্জিতা। এ গেল দেবীর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি। এবার দৃষ্টিপাত দেওয়া যাক-তিনি কার ইচ্ছায় এই জড় জগতের কার্যভার গ্রহণ করেছেন এবং কিভাবে তা সম্পাদন করছেন তার উপর।
পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের দু'টি প্রকৃতি রয়েছে-পরা প্রকৃতি ও অপরা প্রকৃতি। পরা প্রকৃতি হচ্ছে চিন্ময় জগৎ আর অপরা প্রকৃতি হচ্ছে জড় জগৎ। চিন্ময় জগৎটা হচ্ছে গোলক বৃন্দাবন যেখানে পরমেশ্বর ভগবান নিত্যলীলা বিলাস করছেন। আর আমরা যে প্রকৃতিতে বসবাস করছি তা হচ্ছে জড় প্রকৃতি বা জড় জগৎ। যাহা ভূমি, জল, বায়ু, অগ্নি, আকাশ, মন, বুদ্ধি ও অহংকার এই আট প্রকারের স্থূল ও সূক্ষ্ম উপাদান দ্বারা গঠিত । শাস্ত্রে বর্ণিত এই জড় প্রকৃতি অনন্ত কোটি ব্রহ্মান্ড নিয়ে গঠিত। যেগুলো মহাবিষ্ণুর প্রতিটা লোমকূপ থেকে সৃষ্টি। আবার এই মহাবিষ্ণু যার শয্যায় শায়িত সেই অনন্তশেষ নাগ তার ফণায় প্রতিটা ব্রহ্মান্ডকে এক একটি সর্ষের দানার মতো ধারণ করে আছে। বৈদিক শাস্ত্র অনুযায়ী প্রতিটা ব্রহ্মান্ডতে আবার চৌদ্দটি ভুবন রয়েছে। এর সাতটি ভুবন উপরে এবং সাতটি ভুবন নিম্নে। ঊর্ধ্বে রয়েছে ভূলোক, ভূবলোক, স্বলোক, মহলোক, জনলোক, তপলোক এবং সত্যলোক আর নিম্নে রয়েছে অতল, বিতল, সুতল, মহাতল, তলাতল, রসাতল, পাতাল। তার মধ্যবর্তীটি হচ্ছে ভূমন্ডল, যেখানে আমরা বসবাস করছি। এই ভূমন্ডলের যে স্থানটিতে আমরা আছি তার নাম জম্বুদ্বীপ। এই জম্বুদ্বীপকে ঘিরে রয়েছে লবণ সমুদ্র। এভাবে লবণ, ইক্ষু, সুরা, সর্বি আদি সাতটি সমুদ্র রয়েছে এবং তার মধ্যে সাতটি দ্বীপ রয়েছে। এখন এই চৌদ্দভুবনাত্মক জগৎকে একত্রে বলে 'দেবীধাম "। আর এই দেবীধামের অধিষ্ঠাত্রী দেবী হচ্ছেন দুর্গা। যিনি ভগবান মদন মোহনের ইচ্ছানূরূপ আজ্ঞা পালন করছেন। দুর্গা দেবী কিভাবে ভগবানের আজ্ঞা পালন করছেন সে সম্বন্ধে ব্রহ্ম সংহিতাতে ব্রহ্মা বলেছেন-সৃষ্টি-স্থিতি প্রলয় সাধন শক্তিরেকা, ছায়েব যস্য ভুবানানি বিভর্তি দুর্গা। ইচ্ছানুরূপমপি যস্য চ চেষ্টাতে সা গোবিন্দম আদি পুরুষং তমহং ভজামি।। ব্রহ্মঃসং-৫/৪৪ অর্থঃ স্বরূপ শক্তি বা চিৎশক্তির ছায়া স্বরূপা প্রাবঞ্চিক জগতের সৃষ্টি, স্থিতি, প্রলয় সাধিনী মায়া শক্তিই ভুবন পূজিতা দুর্গা তিনি যাঁর ইচ্ছানুরূপ চেষ্টা করেন, সেই আদি পুরুষ গোবিন্দকে আমি ভজনা করি। শ্রী চন্ডী গ্রন্থেও অনুরূপ একটি উক্তি আছে, সর্বভূতেষু ছায়ারূপেন সংস্থিতা।
এখন উপরের শ্লোক সংবলিত সরলার্থের আরেকটু বিশদভাবে ব্যাখ্যা করলে প্রতীয়মান হয় যে, আমরা এই জড় জগতে যে দুর্গা দেবীর পূজা করি তিনি হচ্ছেন চিৎ শক্তির ছায়া স্বরূপা অর্থাৎ চিৎ জগতে যে দুর্গাদেবী আছেন তিনি হচ্ছেন চিন্ময়ী কৃষ্ণদাসী। আর সেই দুর্গাদেবীর ছায়াশক্তি হচ্ছেন এই জড় জগতে পূজিতা দুর্গা। যিনি পরমেশ্বর ভগবান আদি পুরুষ গোবিন্দের ইচ্ছানুরূপ তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছেন।
সমস্ত ব্রহ্মান্ডকে যদি একটি রাষ্ট্র হিসেবে ধরা হয় তবে সেই রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। আর দেব-দেবীরা হচ্ছেন তাঁর বিভিন্ন বিভাগের অধ্যক্ষ। তেমনিভাবে ভগবান দুর্গাদেবীকে এই জড় জগৎ পরিচালনার ভার দিয়েছেন, যিনি জড় জগৎ পরিচালনা বিভাগের অধ্যক্ষ। যেহেতু দুর্গাদেবী ভগবান মদন মোহনের ইচ্ছানুরূপ কার্য সম্পাদন করছেন সেহেতু বিষ্ণু শক্তিতে বলীয়ান পরম বৈষ্ণবী দুর্গাদেবীর কাছে আমরা জড়ৈশ্বর্য্য কামনা না করে তাঁর নিকট এই প্রার্থনা করি যাতে তিনি আমাদেরকে কৃষ্ণভক্তি প্রদান করেন। কারণ এই কলি যুগের যুগধর্ম হচ্ছে হরিনাম সংকীর্তন করা। 'চারিযুগের চারিধর্ম জীবের কারণ। কলি যুগে ধর্ম হয় নাম সংকীর্তন। 'যেটা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। তাই এটাই হোক আমাদের দুর্গা পূজার প্রকৃত উদ্দেশ্য।

Monday, December 17, 2018

সন্তোষী মা

সন্তোষী মা হিন্দুধর্ম-এর একজন তুলনামূলকভাবে নবীন দেবী। সন্তোষী মাকে সন্তোষের অধিষ্ঠাত্রী দেবী বলে অভিহিত করা হয়। বিশেষত উত্তর ভারত ও নেপাল-এর মহিলারা সন্তোষী মায়ের পূজা করে। বার্ষিক ১৬টা শুক্রবার সন্তোষী মা ব্রত নামক এক ব্রত পালন করলে দেবী সন্তুষ্ট হন বলে তাঁরা বিশ্বাস করেন।

বর্ণনা
ষাটের দশকের শুরুতে সন্তোষী মায়ের প্রথম প্রচার হয়েছিল । মৌখিক কথা-কাহিনী, ব্রতের বিবরণী সম্বলিত পুথি, পোষ্টার ইত্যাদির মাধ্যমে তাঁর জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। ১৯৭৫ সালে বলিউডের চলচ্চিত্র 'জয় সন্তোষী মা'-র মুক্তির পর পরই তাঁর জনপ্রিয়তা তুংগে ওঠে; অবশ্য যোধপুরে অনেক আগে থেকেই সন্তোষী দেবীর একটি মন্দির আছে। চলচ্চিত্ৰটিতে তাঁকে গণেশ দেবতার কন্যা তথা মূল প্রকৃতির এক অংশাবতার হিসেবে দেখানো হয়েছিল। দেবীর জন্ম শুক্রবারে পূর্ণিমা তিথিতে হয়, সেহেতু সন্তোষী মার পূজার জন্য শুক্রবার দিনটি শ্রেষ্ঠ। ইনি চর্তুভূজা তথা রক্তবস্ত্র পরিহিতা, নিজের চারটি হাতের দুটিতে ত্রিশূল ও তলোয়ার ধারণ করেন ও বাকী দুটি হাতে বরাভয় ও সংহার মুদ্রা ধারণ করেন। এনার ত্রিশূলপাত তিনটি গুণের (সত্ত্ব,রজ,তম) প্রতীক ও তলোয়ারটি জ্ঞানের প্রতীক। হিন্দুধর্মগ্রন্থএ সন্তোষী মায়ের কোনো আখ্যানের উল্লেখ নেই যদিও দেবী ভাগবতে পার্বতীর জন্ম শুক্রবারে পূর্ণিমা তিথিতে হয়েছিল বলে উল্লেখ আছে। এর সাথে পার্বতী দেবীর সেই স্বরূপকে চতুর্ভূজা হিসাবে গণ্য করা হয়েছে যা হিমালয়কে দেবীগীতের মাধ্যমে সন্তোষ প্রদান করেছিল। বৈষ্ণব আদর্শে ভগবতী যোগমায়াকেই বিভিন্ন দেবীর রূপে ভিন্ন ভিন্ন নামে উপাসনা করা হয় বলে বিশ্বাস করা হয়।


সন্তোষী মা হিন্দুধর্ম-এর একজন তুলনামূলকভাবে নবীন দেবী। সন্তোষী মাকে সন্তোষের অধিষ্ঠাত্রী দেবী বলে অভিহিত করা হয়। বিশেষত উত্তর ভারত ও নেপাল-এর মহিলারা সন্তোষী মায়ের পূজা করে। বার্ষিক ১৬টা শুক্রবার সন্তোষী মা ব্রত নামক এক ব্রত পালন করলে দেবী সন্তুষ্ট হন বলে তাঁরা বিশ্বাস করেন।

বর্ণনা
ষাটের দশকের শুরুতে সন্তোষী মায়ের প্রথম প্রচার হয়েছিল । মৌখিক কথা-কাহিনী, ব্রতের বিবরণী সম্বলিত পুথি, পোষ্টার ইত্যাদির মাধ্যমে তাঁর জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। ১৯৭৫ সালে বলিউডের চলচ্চিত্র 'জয় সন্তোষী মা'-র মুক্তির পর পরই তাঁর জনপ্রিয়তা তুংগে ওঠে; অবশ্য যোধপুরে অনেক আগে থেকেই সন্তোষী দেবীর একটি মন্দির আছে। চলচ্চিত্ৰটিতে তাঁকে গণেশ দেবতার কন্যা তথা মূল প্রকৃতির এক অংশাবতার হিসেবে দেখানো হয়েছিল। দেবীর জন্ম শুক্রবারে পূর্ণিমা তিথিতে হয়, সেহেতু সন্তোষী মার পূজার জন্য শুক্রবার দিনটি শ্রেষ্ঠ। ইনি চর্তুভূজা তথা রক্তবস্ত্র পরিহিতা, নিজের চারটি হাতের দুটিতে ত্রিশূল ও তলোয়ার ধারণ করেন ও বাকী দুটি হাতে বরাভয় ও সংহার মুদ্রা ধারণ করেন। এনার ত্রিশূলপাত তিনটি গুণের (সত্ত্ব,রজ,তম) প্রতীক ও তলোয়ারটি জ্ঞানের প্রতীক। হিন্দুধর্মগ্রন্থএ সন্তোষী মায়ের কোনো আখ্যানের উল্লেখ নেই যদিও দেবী ভাগবতে পার্বতীর জন্ম শুক্রবারে পূর্ণিমা তিথিতে হয়েছিল বলে উল্লেখ আছে। এর সাথে পার্বতী দেবীর সেই স্বরূপকে চতুর্ভূজা হিসাবে গণ্য করা হয়েছে যা হিমালয়কে দেবীগীতের মাধ্যমে সন্তোষ প্রদান করেছিল। বৈষ্ণব আদর্শে ভগবতী যোগমায়াকেই বিভিন্ন দেবীর রূপে ভিন্ন ভিন্ন নামে উপাসনা করা হয় বলে বিশ্বাস করা হয়।

পূজা পদ্ধতি
মা সন্তোষীর পূজাতে টক বস্তু, আমিষ দ্রব্য প্রদান নিষেধ । সাধারণত আমিষ দ্রব্যকে তমঃ গুন সম্পন্ন আহার বলা হয় । টক পদার্থ হল রজগুনী আহার । মিষ্ট দ্রব্য হল সত্ত্ব গুনী আহার । মায়ের ভক্তদের ঐ তম, রজ গুনের ওপরে সত্ত্ব গুনে অধিষ্ঠিত হতে হয় । তাই ভক্ত গন মাকে কেবল মিষ্ট দ্রব্য ভোগে অর্পণ করেন। মায়ের প্রসাদ গো জাতীয় প্রানীকে অল্প প্রদান করার নিয়ম। কারন গো মাতা হিন্দু দিগের আরাধ্য। গো জাতিকে রক্ষা ও ভরন পোষণের জন্য এই নিয়ম । প্রতি শুক্রবারে মায়ের ব্রত করার নিয়ম। মায়ের পূজোতে সরিষার তৈল নিষেধ। ঘিয়ের প্রদীপ দিতে হয়। সরষের তেল রজ গুনী। তাই একাদশী তিথিতে সরিষার তৈল বর্জনীয় । শুক্রবারে স্নান সেড়ে শুদ্ধ বস্ত্রে মায়ের পূজো করতে হবে। তিথি নক্ষত্র দোষ নেই এই পূজাতে।
সাধারণত উদযাপন ছাড়া এই পূজোতে পুরোহিত লাগে না। সবাই করতে পারবেন । খেয়াল রাখবেন এই দিন গৃহে কোন সদস্য বা যিনি ব্রত পূজা করবেন- ভুলেও যেনো টক পদার্থ না গ্রহণ করেন। অনান্য সদস্য গন হোটেলে বা রেষ্টুডেন্ট, বিয়ে , অন্নপ্রাশনে খাবেন না। ঘট স্থাপন করবেন বট, কাঠাল, পাকুড় পল্লব দ্বারা। আম পল্লব দেবেন না । পূজোতে সব পুষ্পই  চলবে। বিল্বপত্র আবশ্যক । ঘটে পুত্তলিকা অঙ্কন করবেন সিঁদুরে ঘি মিশিয়ে। ঘি প্রদীপ পূজাতে ব্যবহার করবেন । ঘটে গোটা ফল হিসাবে কলা দেবেন । এরপর আচমন , বিষ্ণু স্মরণ, আসন শুদ্ধি, সূর্য অর্ঘ, সঙ্কল্প করে গুরুদেব ও পঞ্চ দেবতার পূজা করে মায়ের পূজা করবেন । ধ্যান মন্ত্র প্রনাম মন্ত্র বলবেন । মনের প্রার্থনা মায়ের চরণে জানাবেন। পূজা শেষে মায়ের প্রসাদ গোমাতা কে অল্প দিয়ে নিজে গ্রহণ করবেন ।
এই ভাবে ১৬ শুক্রবার ব্রত করবেন । ভোগে দেবেন ভেজানো ছোলা ও আঁখের গুড়। ইচ্ছা হলে মিষ্ট ফল নিবেদন করতে পারেন । শুক্রবার যিনি ব্রত করবেন সারা দিন উপবাস থাকবেন । দুধ, ছোলা ঘিতে আলু সহিত ভেজে, মিষ্ট ফল, জল গ্রহণ করবেন । অসমর্থ হলে একবেলা উপবাস রেখে অপর বেলা আলু সেদ্ধ, ঘি, আতপ অন্ন গ্রহণ করতে পারেন । ১৬ শুক্রবার ব্রত হলে উদযাপন করবেন । উদযাপনের দিন ৭ টি বালককে ভোজোন করাবেন । খেয়াল রাখবেন সাত বালক যেনো সেই দিন টক বস্তু না খায় । উদযাপনের দিন ১৬ টি নিমকী চিনির রসে ডুবিয়ে মায়ের কাছে উৎসর্গ করবেন। ছানা থেকে তৈরী কোন মিষ্টি মাকে দেবেন না। উদযাপনের দিন মায়ের কাছে একটি নারকেল ফাটিয়ে নারকেলের জল মায়ের চরণে দেবেন । নারকেল মায়ের সামনে ফাটাবেন এক আঘাতে। ফাটানোর সময় মায়ের নামে জয়ধ্বনি দেবেন । এই ভাবে মা সন্তোষীর ব্রত করুন। দেখবেন মায়ের কৃপায় আপনার জীবন সুখে শান্তিতে ভরে যাবে । মায়ের কৃপায় সব অমঙ্গল, দুঃখ, অশান্তি নষ্ট হবে ।

Friday, December 14, 2018

স্বাহা অগ্নিদেবী পরকাল, নরক, মাতৃত্ব, জীবন এবং বিবাহের দেবী


স্বাহা অগ্নিদেবী পরকাল, নরক, মাতৃত্ব, জীবন এবং বিবাহের দেবী

হিন্দুধর্ম ও বৌদ্ধধর্ম মতে, সংস্কৃত আভিধানিক শব্দ স্বাহা হচ্ছে একটি নির্দেশক যা মন্ত্রের শেষ বুঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয়। আক্ষরিক অর্থে, এটির অনুবাদ হচ্ছে "ভাল বলেছেন"।তিব্বতি ভাষায়, "স্বহা" অনুবাদ করা হয় "তাই হোক" হিসেবে এবং প্রায়ই "সোহা" হিসাবে উচ্চারিত করা হয় এবং স্বতন্ত্রভাবে উপস্থাপিত করা হয়। যখনই অগ্নি উৎসর্গ করা হয়, স্বাহা মন্ত্রোচ্চারন করা হয়। ব্যুৎপত্তিগতভাবে, এই শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে সু মানে ভালো এবং মূল আহ মানে "থেকে" হতে।

একটি স্ত্রীবাচক শব্দ হিসেবে, ঋগ্বেদ স্বাহা মানে "অর্ঘ্য" (অগ্নি বা ইন্দ্রের প্রতি) বোঝানও হতে পারে,এবং যখন অর্ঘ্যকে ব্যক্তিত্ব হিসাবে মূর্ত করা হয়, তখন স্বাহা হচ্ছে একজন অপ্রধান দেবী এবং অগ্নিদেবের স্ত্রী। তিনি মূলত একজন অপ্সরা ছিলেন [তথ্যসূত্র প্রয়োজন] কিন্তু অগ্নিদেবের সাথে বিবাহের পর চিরজীবী হয়ে উঠেন। কিছু কিছু বর্ণনায়, তিনি কার্তিকের অনেক ঐশ্বরিক মায়েদের মধ্যে একজন। তিনি অগ্নিদেবের কন্যা অগ্নেয়ারও মা। তিনি প্রজাপতি দক্ষের কন্যা বলে ধারনা করা হয়।ধারনা করা হয় তিনি হোমবলি যজ্ঞের প্রধান হচ্ছে তিনি।বলা হয়ে থাকে তার দেহ চার বেদের সমন্বয়ে গঠিত এবং তার ছয় অঙ্গপ্রতঙ্গ বেদের ছয় অঙ্গকে প্রকাশ করে।এটা বলা হয়ে থাকে যে, কোন দেবতাকে উদ্দেশ্য করে যজ্ঞের মাধ্যমে যদি কোন কিছু উৎসর্গ করা হওয়া তাহলে সেই দেবতা তখন পর্যন্ত উৎসর্গ গ্রহণ করেননা যতক্ষন পর্যন্ত না স্বাহা মন্ত্রোচ্চারন করা হয়।
কাহিনী
মহাভারতের বন পর্বে, মার্কণ্ডেয় ঋষি তার গল্প পাণ্ডবদের কাছে বর্ণনা করেন। স্বাহা ছিলেন প্রজাপতি দক্ষের কন্যা। তিনি অগ্নিদেবের প্রেমে পরে যান এবং তাকে কামনা করতে থাকেন। অবশ্য অগ্নিদেব তার প্রতি লক্ষ্য করতেন না। অগ্নিদেব সপ্তর্ষিদের যজ্ঞ আচারের সভাপতিত্ব করতেন। তিনি সপ্তর্ষিদের স্ত্রীদের প্রতি বিমোহিত হয়ে পরেন যারা অনেক সুন্দর ও আকর্ষণীয় ছিলো, এবং তাদের দিকে তাকিয়ে থাকেন।

অবশেষে, অন্যের স্ত্রীদের প্রতি কামনা পোষণ করার অপরাধবোধের কারনে তিনি বনে গমন করেন তপস্যা করার জন্য। স্বাহা তাকে অনুসরন করে এবং তার ইচ্ছাকে উপলব্ধি করতে পারেন। তিনি সপ্তর্ষিদের স্ত্রীদের রূপ ধারণ করেন (যদিও তিনি বৈষিষ্ঠের স্ত্রী অরুন্ধতীর রূপ ধারণ করতে পারেননি), এবং অগ্নি দেবের সাথে মিলিত হোন। অগ্নি এবং স্বাহা বনে অনেক প্রেমময় মুহূর্ত অতিবাহিত করেন এবং অগ্নিদেব তাকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেন।

Thursday, December 13, 2018

রাধিকা বা রাধারাণী হলেন হিন্দু বৈষ্ণবধর্মের একজন বিশিষ্ট দেবী


রাধিকা বা রাধারাণী

রাধা  হলেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রেয়সী। তাঁর রাসমণ্ডলের গোপিনীদের মধ্যে সৰ্বশ্রেষ্ঠ। বঙ্গীয় এবং নদীয়া বৈষ্ণব শাখায়  রাধাকেই মূলপ্রকৃতি বলে অভিহিত করা হয়েছে। সংস্কৃত শব্দ রাধার  অন্যতম অৰ্থ হ'ল “ভাগ্যবান, সফল”।

রাধিকা বা রাধারাণী হলেন হিন্দু বৈষ্ণবধর্মের একজন বিশিষ্ট দেবী। বৈষ্ণব ভক্তেরা তাঁকে বলেন শ্রীমতী। হিন্দুধর্মের বহু গ্রন্থে বিশেষত শাক্তধর্মে, রাধাকে বৈকুণ্ঠের লক্ষ্মীদেবীর বিস্তার (অবতার) বলা হয়েছে। গৌড়ীয় বৈষ্ণব তত্ত্ববিদ্যা অনুসারে, রাধা হলেন পরম সত্ত্বা শ্রীকৃষ্ণের শাশ্বত সঙ্গী বা তাঁর দিব্যলীলার শক্তি । রাধা ও কৃষ্ণের যুগলমূর্তিকে রাধাকৃষ্ণ রূপে আরাধনা করা হয়। যদিও ভগবানের এই রূপের অনেক প্রাচীর উল্লেখ রয়েছে, কিন্তু দ্বাদশ শতাব্দীতে যখন জয়দেব গোস্বামী সুবিখ্যাত কাব্য গীতগোবিন্দ রচনা করেন, তখন থেকেই দিব্য কৃষ্ণ ও তাঁর ভক্ত রাধার মধ্যেকার আধ্যাত্মিক প্রেমের সম্বন্ধিত বিষয়টি সমগ্র ভারতবর্ষে উদযাপিত হতে শুরু করে।

ভাগবত অনুযায়ী, তিনি হলেন গোকুলনিবাসী বৃষভানু ও কলাবতীর কন্যা। ব্রহ্মবৈবৰ্ত পুরাণ ও দেবীভাগবতের মতে, রাধার সৃষ্টি ভগবান কৃষ্ণের শরীরের বামভাগ থেকে হয় এবং সেই রাধাই দ্বাপর যুগে বৃষভানুর পুত্রী রূপে জন্ম গ্রহণ করেন। রাধা শ্রীকৃষ্ণের সহস্রাধিক গোপিনী প্রেমিকাগণের মধ্যে শিরোমণি। তাঁকে কৃষ্ণলীলার মধ্যে ব্রজে আয়ান (সংস্কৃত: অভিমন্যু) পত্নীর ভূমিকাতেও পাওয়া যায়।

শ্রীকৃষ্ণ এবং রাধার প্রেম বিষয়ক বহু গাঁথা কবিতা বৈষ্ণব পদাবলি সাহিত্যের অন্যতম উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে যা বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য ঐশ্বর্য। শ্রীকৃষ্ণকীর্তনেও রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা সুবিস্তৃতভাবে বর্ণিত হয়েছে। বাংলার ভক্তি আন্দোলনেও এর সুদুরপ্রসারী প্রভাব পড়েছিল।

Monday, December 10, 2018

সীতাকে জনকের কন্যা বলে জানকী বলা হয়


সীতা

সীতা হিন্দু মহাকাব্য রামায়ণের কেন্দ্রীয় বা প্রধান নারী চরিত্র যিনি জনকপুরে (বর্তমানে মিথিলা, নেপাল) জন্মগ্রহণ করেন। হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী তিনি ছিলেন হিন্দু অবতার শ্রী রামের (বিষ্ণুর সপ্তম অবতার) সঙ্গী এবং শক্তিরূপা লক্ষ্মীর অবতার, এবং ধনসম্পদের দেবী ও বিষ্ণুর পত্নী। হিন্দুসমাজে তাকে আদর্শ স্ত্রী তথা আদর্শ নারীর উদাহরণ হিসেবে মনে করা হয়। সীতা মূলত তার উৎসর্গীকরণ, আত্মবিসর্জন, সাহসিকতা এবং বিশুদ্ধতার জন্যে পরিচিত হয়।

অদ্ভুত রামায়ণ’ থেকে জানা যায়, সীতা নাকি রাবণ ও মন্দদরীর কন্যা। আবার অন্যত্র বলে রাবণ তার ভ্রাতুষ্পুত্র নলকুবেরের স্ত্রী রম্ভাকে বলপূর্বক ধর্ষণ করেন। এই ধর্ষণের ফলে রাবণের ঔরসে রম্ভার গর্ভে সীতার জন্ম হয়। তাঁর জন্মের আগে গণকরা জনিয়েছিলেন, তিনি নাকি রাবণের ধ্বংসের কারণ হবেন। তাই রাবণ তাঁকে পরিত্যাগ করেন। ‘আনন্দ রামায়ণ’ নামক গ্রন্থে বলা হয়েছে, রাজা পদ্মাক্ষের কন্যা পদ্মাই নাকি পরবর্তী জন্মে সীতা হন। রাবণ পদ্মার শ্লীলতাহানি করতে চাইলে তিনি আগুনে আত্মঘাতী হন। পরজন্মে তিনিই সীতা হিসবে অবতীর্ণা হন এবং রাবণের ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ান। আর একটি প্রচলিত ধারণা এই— সীতা পূর্বজন্মে ছিলেন বেদবতী নামে এক পুণ্যবতী নারী। রাবণ তাঁর শ্লীলতাহানি করতে চাইলে তিনি রাবণকে অভিশাপ দেন যে, তিনি পরবর্তী জন্মে রাবণকে হত্যা করবেন। ‘রামায়ণ’-এর কিছু অন্য লিখন জানায়, রাবণ নাকি প্রকৃত সীতাকে হরণ করেননি। যাকে রাবণ হরণ করেছিলেন, সে মায়াসীতা। দেবী পার্বতী আসল সীতাকে লুকিয়ে রেখেছিলেন এবং রাম-রাবণের যুদ্ধের পরে আসল সীতা প্রকট হন। মায়াসীতা নাকি পরে দ্রৌপদী হিসেবে জন্মগ্রহণ করেন।

নামকরণ
রামায়ণে সীতা বহু নামে উল্লেখিতা হয়েছেন। তবে তিনি মুলতঃ সীতা নামেই পরিচিতা। জনকের কন্যা বলে সীতাকে জানকী বলা হয়। মিথিলা রাজ্যের কন্যা হওয়ায় তিনি মৈথিলি নামেও পরিচিতা। এছাড়া তিনি রাম-এর স্ত্রী হওয়ায় তাঁকে রমাও বলা হয়ে থাকে।

জীবনী
রামায়ণ অনুসারে, সীতা ভূদেবী পৃথিবীর কন্যা ও রাজর্ষি জনকের পালিতা কন্যা। রামচন্দ্র চৌদ্দ বছরের জন্য বনবাসে গেলে সীতা তাঁর সঙ্গী হন। পরে রাবণ সীতাকে হরণ করে লঙ্কায় নিয়ে গেলে রাম ও রাবণের মধ্যে সংঘাতের সূত্রপাত হয়। কিষ্কিন্ধ্যার বানরদের সহায়তায় রাম রাবণকে পরাজিত ও নিহত করে সীতাকে উদ্ধার করেন। রাজা হওয়ার পর লোকনিন্দার ভয়ে তিনি সীতাকে পরিত্যাগ করেন। মহর্ষি বাল্মীকির তপোবনে সীতা লব ও কুশ নামে দুই যমজ পুত্রসন্তানের জন্ম দেন। পরে রাম সীতাকে দ্বিতীয়বার অগ্নিপরীক্ষা দিতে বললে মর্মাহতা সীতা জননী পৃথিবীর কোলে আশ্রয় প্রার্থনা করেন। ভূগর্ভ থেকে উত্থিতা হয়ে ভূদেবী পৃথিবী সীতাকে নিয়ে পাতালে প্রবেশ করেন।

রামায়ণের বিভিন্ন পাঠান্তরে সীতার সম্পর্কিত নানা উপাখ্যানের সন্ধান মেলে। হিন্দু পঞ্জিকা অনুযায়ী, বৈশাখ মাসের শুক্লানবমী তিথিটিকে সীতানবমী বলা হয়। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী এই যে এ দিনেই সীতা জন্মগ্রহণ করেছিলেন। উত্তর ভারতে সীতানবমী একটি অন্যতম প্রধান উৎসব।

রামায়ণে সীতা
সীতার পিতা ছিলেন রাজা জনক। পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে জমি চাষ করার সময় লাঙলের আঘাতে ভূমি বিদীর্ণ করে সীতার জন্ম হয়।
অযোধ্যার রাজকুমার রাম তার ভাই লক্ষ্মণ কে নিয়ে বিশ্বামিত্র মুনির সাথে উপস্থিত হন মিথিলায়।মিথিলার রাজসভায় শিব প্রদত্ত ধনুক ভেঙ্গে সীতাকে জয় করেন রাম।
সীতাকে বিবাহের পর, রাম ১৪ বছরের জন্য বনবাসে গমন করলে, চিত্রকূট পর্বতে অবস্থান করেন। সেখানে স্বর্ণমৃগ রূপী মারীচ ছল করে রামলক্ষ্মণকে দূরে নিয়ে যান, আর রাবণ সীতাকে হরণ করে।
রামলক্ষ্মণ বানরসেনা ও ভল্লুকসেনার সাহায্যে রাবনবধ ও সীতা উদ্ধার করলেও, প্রজার প্রশ্ন নিরসন করতে অগ্নিপরীক্ষা দিতে বলেন। সীতা অগ্নিপরীক্ষা দিলে স্বয়ং অগ্নিদেব সীতাকে রক্ষা করে। এরপর সীতাকে নিয়ে রাম ফেরেন অযোধ্যায়। সীতা কোশলদেশের সম্রাজ্ঞী হন। রামের ঔরসে সীতার গর্ভসঞ্চার হয়। কিন্তু প্রজাদের মধ্যে সীতাকে নিয়ে বক্রোক্তি শুনে রাম তাকে ত্যাগ করেন। সন্তানসম্ভবা সীতা আশ্রয় নেন বাল্মীকি মুনির আশ্রমে। ওখানেই সীতা কুশ ও লব নামে দুই পুত্রসন্তান প্রসব করেন। পরবর্তীতে লব ও কুশ রামের অশ্বমেধের ঘোড়া আটকে রাখেন। ফলে রামের সাথে যুদ্ধ হয় তাদের। কিন্তু রাম পরাস্ত হন। পরে বাল্মীকির সাহায্যে লব কুশ কোশল দেশে ফেরেন সীতাকে নিয়ে। রাম পুনরায় সীতাকে অগ্নিপরীক্ষা দিতে বললে অভিমানী ও অপমানিতা সীতা তার মা জগদ্ধাত্রী ধরিত্রীকে আবাহন করেন। দেবী জগদ্ধাত্রী সিংহাসনে উপস্থিত হন ও সীতাকে নিয়ে পাতালপ্রবেশ করেন।

Monday, December 3, 2018

সতী দেবী আদ্যাশক্তি মহামায়ার এক রূপ

দাক্ষায়ণী বা সতী  হিন্দুধর্মে বৈবাহিক সুখ ও দীর্ঘ দাম্পত্যজীবনের দেবী। হিন্দুনারীরা সাধারণত স্বামীর দীর্ঘায়ু কামনায় সতীর পূজা করে থাকেন। সতী দেবী আদ্যাশক্তি মহামায়ার এক রূপ। তিনি ছিলেন শিবের প্রথমা স্ত্রী। হিন্দু পুরাণ অনুসারে তিনি তপস্বীর জীবনযাত্রা থেকে শিবকে বের করে আনেন এবং গৃহী করেন। দক্ষযজ্ঞের সময় পিতা দক্ষ প্রজাপতি কর্তৃক স্বামীর অসম্মান সহ্য করতে না পেরে তিনি প্রাণত্যাগ করেন। পরে হিমালয়ের গৃহে কন্যা পার্বতীর রূপে জন্ম নিয়ে পুনরায় শিবকে বিবাহ করেন।
সতী দেবী আদ্যাশক্তি মহামায়ার এক রূপ

দাক্ষায়ণীর অপরাপর নামগুলি হল উমা, অপর্ণা, শিবকামিনী ইত্যাদি। ললিতা সহস্রনাম স্তোত্রে তাঁর এক সহস্র নাম লিখিত হয়েছে।

সতীর আত্মত্যাগের অনুকরণে হিন্দুধর্মে সতীদাহ প্রথা প্রবর্তিত হয়েছিল। এই প্রথানুসারে স্বামীর মৃত্যুর পর হিন্দু বিধবারা স্বামীর চিতায় আরোহণ করে প্রাণ বিসর্জন দিতেন।

পৌরাণিক কাহিনি:-
ব্রহ্মাপুরাণ অনুযায়ী, প্রজা সৃষ্টির অভিপ্রায়ে সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা ধর্ম, রুদ্র, মনু, সনক ভৃগু প্রমুখ কয়েকজন মানসপুত্রের সৃষ্টি করেন। তাঁর দক্ষিণ অঙ্গ থেকে উৎপত্তি হয়েছিল প্রজাপতি দক্ষের। দক্ষের কনিষ্ঠা কন্যারূপে জন্মগ্রহণ করেন দেবী সতী, যিনি পতিরূপে গ্রহণ করেছিলেন দেবাদিদেব মহাদেবকে।

মহাদেবের প্রতি প্রজাপতি দক্ষ ছিলেন অত্যন্ত বিরূপ। ভৃগু ঋষি এবং অন্যান্য প্রজাপতি কর্তৃক অনুষ্ঠিত মহাযজ্ঞে একমাত্র শিব ও ব্রহ্মা ছাড়া অন্য দেবতারা প্রজাপতি দক্ষের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করেছিলেন; এর ফলে মহাদেবের উপর ক্রুদ্ধ হয়ে প্রজাপতি দক্ষ এই অভিসম্পাত দেন যে, শিব অন্যান্য দেবতার মতো যজ্ঞভাগের অধিকারী হবেন না।

পরবর্তী সময়ে ব্রহ্মা কর্তৃক দক্ষ সকল প্রজাপতির রাজা নির্বাচিত হওয়ার আনন্দে ও গর্বে দক্ষ আয়োজন করেন এক মহাযজ্ঞের। ত্রিভুবনের সকলেই এই মহাযজ্ঞে আমন্ত্রিত হয়েছিলেন, শুধু কন্যা সতী ও কন্যা জামাতা শিব ছিলেন নেমন্তন্নের বাইরে। বিনা আমন্ত্রণেই সতী উপস্থিত হন যজ্ঞস্থলে; সেখানে পিতার মুখে পতি শিবের নিন্দাবানী ও কটূক্তি শুনে ক্রোধে ও ক্ষোভে অধীরা সতী দেহত্যাগ করেছিলেন এবং শিবকে আবার পতিরূপে পাওয়ার আকাঙ্খায় গিরিরাজ হিমালয়ের কন্যা পার্বতীরূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন।

সতীর দেহত্যাগের সংবাদ পেয়ে ক্রোধে উন্মত্ত শিব নিজ অনুগামীদের নিয়ে দক্ষযজ্ঞ লণ্ডভণ্ড করেন এবং সতীর নিথর দেহ নিজের কাঁধে তুলে প্রলয়নৃত্য শুরু করেন। এতে জগৎ ধ্বংস হওয়ার উপক্রম হলে সমস্ত দেবতাদের অনুরোধে জগৎপালক বিষ্ণু নিজ সুদর্শন চক্র দ্বারা সতীর দেহ ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে দেন; সেই খণ্ডিত দেহ যেসব জায়গায় পতিত হয়েছিল, সেখানেই গড়ে ওঠে শক্তিপীঠ। শাক্ত ধর্মের অনুসারীদের কাছে এই শক্তিপীঠগুলি পবিত্র তীর্থস্থানরূপে গণ্য হয়।

Monday, November 26, 2018

দেবী ভৈরবী কান্তির রজোগুণ এবং শক্তির প্রতীক


দেবী ভৈরবী

দশমহাবিদ্যার পঞ্চম মহাবিদ্যা হলেন দেবী ভৈরবী। শান্ত ও রুদ্রমুর্তি, ধৈর্য ও চাঞ্চল্য, কঠোরতা এবং কোমলতা - এইরকমই পরস্পর বিরুদ্ধভাবের সমন্বয় এবং সহাবস্থান ঘটেছে ভৈরবীতত্ত্বে। কুব্জিকাতন্ত্রের মতে, কালভৈরবের সহধর্মিণী বলে দেবীকে ভৈরবী বলা হয়। শারদাতিলকে উল্লিখিত দেবীর ধ্যানমন্ত্র অনুযায়ী, দেবী উদিয়মান সহস্র সূর্যের মতো দীপ্তিময়ী। তার পরিধানে রক্তবর্ণ ক্ষৌমবস্ত্র (রেশমিবস্ত্র বা পট্টবস্ত্র) এবং গলায় মুন্ডমালা। দেবীর পয়োধর রক্তলিপ্ত। তাঁর চারহাতে জপমালা,পুস্তক,অভয় এবং বর। দেবী ত্রিনয়নী, তাঁর মুখমন্ডল প্রস্ফুটিত পদ্মের মতো সুন্দর। তাঁর মস্তকে রত্নমুকুট এবং চন্দ্রকলা। উদীয়মান সহস্রসুর্যের মতো দেবীর কান্তির রজোগুণ এবং শক্তির প্রতীক।দেবীর সৃজনক্ষমতার জন্য তাঁর অপর নাম বৈরোচনী।
 "বিরোচন" শব্দের অন্যতম অর্থ সূর্য। ঋগ্বেদে সূর্য কৃষির দেবতা। তাই দেবীর মহা শক্তির সঙ্গে সূর্যের তেজোময় রূপ এবং প্রকৃতিপালনের তাৎপর্য প্রকাশ করা হয়েছে। দেবী রজোগুণময়ী বলে তাঁর বর্ণ অরুণকান্তি। ক্ষৌমবস্ত্র বা পট্টবস্ত্র সুক্ষাতিসুক্ষ্ম বাসনার প্রতীক। দেবীর মুন্ডমালার পঞ্চাশটি মুন্ড সংস্কৃত বর্ণমালার পঞ্চাশৎ মাতৃকাবর্ণের প্রতীক। আদিবর্ণ থাকে দেবীর গ্রীবার পশ্চাতে এবং বাকি উনপঞ্চাশটি দৃশ্যমান বর্ণে থাকে উনপঞ্চাশ রকম দৈবীশক্তির প্রকাশ। দেবী সকল জীবকে বীজরূপে আপন গর্ভে ধারণ করেন এবং তপঃ, ক্লেশ ও ইচ্ছাশক্তির প্রভাবে তাঁদের প্রাকৃত জগতে ব্যক্ত করেন। এইভাবে অব্যক্ত থেকে ব্যক্ত জগতে প্রকাশিত করার জন্যই জীবসত্ত্বাকে খন্ড খন্ড বিষয়জ্ঞান দ্বারা পরিপুষ্ট করতে হয়। এই বিষয়জ্ঞানেরই প্রতীক হল রক্ত। সেই কারণেই দেবীর স্তনদ্বয় রক্তলিপ্ত। দেবীর জপমালা নিরন্তর কর্মশক্তি এবং পুস্তক জ্ঞানের প্রতীক। দেবী ভৈরবী সর্বশক্তির সম্মিলিত প্রকাশ।তিনিই সৃষ্টি,স্থিতি এবং লয়ের আধারস্বরুপা।

Wednesday, November 21, 2018

বৈষ্ণবীয় রাসযাত্রা



রাস যাত্রা সনাতন ধর্মালম্বীদের একটি বাৎসরিক উৎসব। রাস মূলতঃ শ্রীকৃষ্ণের ব্রজলীলার অনুকরণে বৈষ্ণবীয় ভাবধারায় অনুষ্ঠিত ধর্মীয় উৎসব। ভগবান কৃষ্ণের রসপূর্ণ অর্থাৎ তাত্ত্বিক রসের সমৃদ্ধ কথাবস্তুকে রাসযাত্রার মাধ্যমে জীবাত্মার থেকে পরমাত্মায়, দৈনন্দিন জীবনের সুখানুভূতিকে আধ্যাত্মিকতায় এবং কামপ্রবৃত্তিসমূহকে প্রেমাত্মক প্রকৃতিতে রূপ প্রদান করে অংকন করা হয়েছে।
হর্ষচরিতের টীকাকার শঙ্করের মতে, রাস হলো এক ধরণের বৃত্তাকার নাচ যা আট, ষোলো বা বত্ৰিশ জনে সম্মিলিতভাবে উপস্থাপনা করা যায়।

ভারতের উত্তরপ্রদেশের মথুরা ও বৃন্দাবনে, পশ্চিমবঙ্গের নদীয়াসহ অন্যান্য জায়গায়, ওড়িশা, আসাম ও মণিপুরে রাসযাত্রার উৎসব বিশেষভাবে উদযাপিত হয়। এই উৎসবের অংশ হিসেবে গোপিনীবৃন্দ সহযোগে রাধা-কৃষ্ণের আরাধনা এবং অঞ্চলভেদে কথ্থক, ভরতনাট্যম, ওড়িশি, মণিপুরি প্রভৃতি ঘরানার শাস্ত্রীয় ও বিভিন্ন লোকায়ত নৃত্যসুষমায় রাসনৃত্য বিশেষ মর্যাদার অধিকারী।

রাস উৎসবের তাৎপর্য
পদ্মপুরাণে  শারদরাস ও বাসন্তীরাসের উল্লেখ পাওয়া যায়। ব্ৰহ্মবৈবর্তপুরাণে (ব্রহ্মখণ্ড, পঞ্চম অধ্যায়) বাসন্তীরাস এবং শ্ৰীমদ্ভাগবত ও বিষ্ণুপুরাণে  শুধুমাত্র শারদরাসের বর্ণনা আছে। হরিবংশে ও ভাসের বালচরিতে উল্লেখ আছে যে, কৃষ্ণ গোপিনীদের সঙ্গে হল্লীশনৃত্য করেছিলেন। হল্লীশনৃত্য যদি তালযুক্ত ও বিবিধ গতিভেদে বৈচিত্র্যপূর্ণ হয় তবে তাঁকে "রাস" নামে অভিহিত করা হয়। বিষ্ণুপুরাণের মতে, কৃষ্ণ রাস অনুষ্ঠান করেছিলেন গোপরমণীদের সঙ্গে। শ্ৰীধর স্বামী বলেছেন, বহু নৰ্তকীযুক্ত নৃত্য বিশেষের নাম রাস– “রাসো নাম বহু নৰ্ত্তকীযুক্তে নৃত্যবিশেষঃ।” শ্ৰীমদ্ভাগবতের অন্যতম টাকাকার বিশ্বনাথ চক্রবর্তী বলেছেন, —“নৃত্যগীতচুম্বনালিঙ্গনদীনাং রসানাং সমূহো রাসস্তন্ময়ী যা ক্রীড়া বা রাসক্রীড়া”। শ্ৰীমদ্ভাগবতের মতে, কৃষ্ণ যোগমায়াকে সমীপে গ্রহণ করেই রাস অনুষ্ঠান করেছিলেন। বস্ত্রহরণের দিন গোপিনীদের কাছে কৃষ্ণ প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে, পরবর্তী পূর্ণিমা তিথিতে তিনি রাসলীলা করবেন-

"যখন করেন হরি বস্ত্ৰহরণ।
গোপীদের কাছে তিনি করিলেন পণ।।
আগামী পূর্ণিমাকালে তাঁহাদের সনে।
করবেন রাসলীলা পুণ্য বৃন্দাবনে।।"
শ্রীকৃষ্ণের সুমধুর বংশীধ্বনিতে মুগ্ধ হয়ে গোপিনীবৃন্দ আপনাপন কর্তব্যকর্ম বিসর্জন দিয়ে সংসারের সকল মোহ পরিত্যাগ করে বৃন্দাবনে উপস্থিত হয়েছিলেন এবং শ্রীকৃষ্ণের চরণে নিজেদের সমর্পন করেছিলেন। প্রথমে শ্রীকৃষ্ণ গোপিনীদের স্ব-গৃহে ফিরে যেতে অনুরোধ করেন; বলেন, তাঁদের সংসার-ধর্ম পালন করা উচিত। কিন্তু গোপিনীরা নিজেদের মতে দৃঢ় ছিলেন। ভগবান ভক্তের অধীন। শ্রীকৃষ্ণ গোপিনীদের দৃঢ়ভক্তি দেখে তাঁদের মনোকামনা পূরণার্থে রাসলীলা আরম্ভ করেন। কিন্তু যখনই শ্রীকৃষ্ণ তাঁদের অধীন বলে ভেবে গোপিনীদের মন গর্ব-অহংকারে পূর্ণ হল, তখনই শ্রীকৃষ্ণ গোপিনীদের মধ্য থেকে অন্তর্ধান হয়ে গেলেন। শ্রীকৃষ্ণ যখন রাধাকে নিয়ে উধাও হলেন, তখন গোপিনীবৃন্দ নিজেদের ভুল বুঝতে পারেন। ভগবানকে ‘একমাত্র আমার’ বলে ভেবে অহংকারের ফলে শ্রীকৃষ্ণকে তাঁরা হারিয়ে ফেলেছিলেন। যেহেতু শ্রীকৃষ্ণ ত্রিজগতের পতি, তাই তাঁকে কোনো মায়া-বন্ধনে বেঁধে রাখা যায় না। তখন গোপিনীবৃন্দ একাগ্রচিত্তে শ্রীকৃষ্ণের স্তুতি করতে শুরু করেন। ভক্তের ভক্তিতে সন্তুষ্ট হয়ে ভগবান গোপিনীদের মানব জীবনের পরমার্থ বুঝিয়ে দিয়ে তাঁদের অন্তর পরিশুদ্ধ করেন। গোপিনীদের ইচ্ছাকে তিনি সম্মান জানিয়ে ‘যতজন গোপিনী, ততজন কৃষ্ণ’ হয়ে গোপিনীদের মনের অভিলাষ পূর্ণ করেছিলেন আর গোপীবৃন্দও জাগতিক ক্লেশ থেকে মুক্তিলাভ করেছিলেন। এইভাবে জগতে রাসোৎসবের প্রচলন ঘটে। 

Monday, November 19, 2018

তুলসী জন্ম বৃন্তান্ত

তুলসী

“তুলসী জন্ম বৃন্তান্ত : ব্রহ্মবৈবর্ত্তপুরাণমতে

তুলসী নামে গোলকে শ্রীকৃষ্ণ প্রিয়া শ্রীরাধিকার এক সহচরী ছিলেন শ্রীরাধিকা তাঁকে  মানবযোনি গ্রহণের অভিশাপ দেন । তখন তুলসী শ্রীকৃষ্ণের শরণাপন্ন হন । শ্রীকৃষ্ণ তুলসীকে বললেন যে তুলসী মানব জন্ম গ্রহণ করলে তপস্যা বলে নারায়নের অংশ লাভ করবেন । শাপ হেতু তুলসী জগতে ধর্মরাজ নামে রাজার ও স্ত্রী মাধবী দেবীর কন্যারূপে জন্মগ্রহণ করেন । তুলসী অতুলনীয় রূপ লাবণ্যের অধিকারিণী হন । পরে তুলসী বনে গিয়ে ব্রহ্মার তপস্যায় নিমগ্ন হন । ধ্যানে ব্রহ্মা খুব সস্তুষ্ট হন ও তুলসীকে অভীষ্ট বর প্রার্থনা করতে বলেন । তুলসী নারায়ণকে পতিরূপে লাভের বর প্রার্থনা করেন । ব্রহ্মা বললেন যে তুলসী দানবরূপী শঙ্খচূড়কে বিবাহ করলেই নারায়ণ প্রাপ্তি সম্ভব হবে । নারায়ণের আর্শিবাদে তুলসীর বৃক্ষরূপে জন্ম হবে বিশ্বপাবকে ও পুজা পাবেন । তুলসী ব্যতীত নারায়ণ পূজা বিফল হবে ।

তদনুসারে শঙ্খচূড়ের সাথে তুলসীর বিবাহ হয় । শঙ্খচূড় স্বর্গরাজ্য অদিকার করে । তুলসীর সতীত্ব হানি না হলে শঙ্খচূড় পরাজিত হবে না ও স্বর্গরাজ্য্ও উদ্ধার সম্ভব হবে না । নারায়ণ স্বয়ং শঙ্খচূড়ের বেশে তুলসীর সতীত্ব হানি করেন তারপর শঙ্খচূড় নিহত হয় । তুলসী তা টের পেয়ে নারায়ণকে পাষাণ হওয়ার অভিশাপ দেন । ফলে নারায়ণ পাষাণ হয়(যাকে নারায়ণ শিলা বা শালগ্রাম শিলা বলা হয়) । নারীরর সতীত্ব অসাধারণ শক্তির উৎস । শাস্ত্রে তার বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে । স্বামীর মৃত্যুতে তুলসী নারায়ণের চরণে পতিত হয়ে কাঁদতে আরম্ভ করলেন । তখন নারায়ণ তুলসীকে বললেন তুলসীর এ দেহ ত্যাগে লক্ষ্মী সদৃশী নারায়নের প্রিয়া হবেন । নারায়ণের বরে তুলসীর এ দেহ গণ্ডকী নদী ও কেশদাম তুলসী বৃক্ষরূপে জন্মগ্রহণ করেন । তদবধি নারায়ণ শিলারূপে আবহন ও সর্ব্বদা তুলসী যুক্ত থাকেন । তুলসী ব্যতীত নারায়ণ পূজা হয় না ।

শাস্ত্রমতে তুলসীর মাহাত্ম্য

তুলসী কার্ত্তিক মাসের অমাবস্যা তিথিতে ধরাতলে তরুরূপে জন্মগ্রহণ করেন । কার্ত্তিক মাসে তুলসীপাতা দিয়ে যাঁরা নারায়ণ পূজা করেন এবং দর্শন, স্পর্শন, ধ্যান, প্রণাম, অর্চ্চন, রোপন ও সেবন করেন, তাঁরা কোটি সহস্র যুগ হরিগৃহে বাস করেন । যাঁরা তুলসীবৃক্ষ রোপন করেন, এবৃক্ষের মূল যতবিস্তৃত হতে থাকে,তত যুগ সহস্র পরিমাণ তাঁদের পুন্য বির্স্তৃত হতে থাকে । তুলসী পাতা দিয়ে যিনি নারায়ণ পূজা করেন, তাঁর জন্মার্জ্জিত পাতক বিনষ্ট হয় । বায়ু তুলসী গন্ধ নিয়ে যে দিকে প্রবাহিত হয়, সেদিক পবিত্র হয় । তুলসীবনে পিতৃশ্রাদ্ধ অনুষ্ঠিত হলে তা পিতৃপুরুষদের খুব প্রীতিপ্রদ হয় । সে গৃহে তুলসীতলের মৃত্তিকা থাকে, সে গৃহে যম কিস্কর প্রবেশ করতে পারে না । তুলসী মৃত্তিকা লিপ্ত হয়ে যে ব্যক্তির মৃত্যু হয়, সে ব্যক্তি যদি ঘোরতর পাপী হয়, তবে যম কিস্কর তাকে দর্মন করতে পাড়ে না । তুলসী তলে প্রদীপ জ্বালালে  বৈষ্ণব পদ লাভ হয় । যার গৃহে তুলসী কানন থাকে, সে গৃহ তীর্থস্বরূপ ।নর্ম্মদা ও গোদাবরী নদীতে স্থানে যে পুন্য হয় তুলসীবন সংসর্গে সে ফল লাভ হয় । যিনি তুলসী মঞ্জুরী দিয়ে বিষ্ণুপূজা করেন, তাঁর আর পুর্ণজন্ম হয় না অর্থাৎ মোক্ষ লাভ হয় ।

Thursday, November 15, 2018

জগদ্ধাত্রী বা জগদ্ধাত্রী দুর্গা হিন্দু শক্তি দেবী

জগদ্ধাত্রী বা জগদ্ধাত্রী দুর্গা হিন্দু শক্তি দেবী। ইনি দেবী দুর্গার অপর রূপ। উপনিষদে এঁর নাম উমা হৈমবতী। বিভিন্ন তন্ত্র ও পুরাণ গ্রন্থেও এঁর উল্লেখ পাওয়া যায়। যদিও জগদ্ধাত্রী আরাধনা বিশেষত বঙ্গদেশেই প্রচলিত। আবার পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার চন্দননগর ও নদিয়া জেলার কৃষ্ণনগরের জগদ্ধাত্রী উৎসব জগদ্বিখ্যাত। কার্তিক মাসের শুক্লা নবমী তিথিতে দেবী জগদ্ধাত্রীর বাৎসরিক পূজা অনুষ্ঠিত হয়। হিন্দু বাঙালির ধর্মীয় মানসে রাজসিক দেবী দুর্গা ও তামসিক কালীর পরেই স্থান সত্ত্বগুণের দেবী জগদ্ধাত্রীর।
জগদ্ধাত্রী

জগদ্ধাত্রী
জগদ্ধাত্রী দেবী ত্রিনয়না, চতুর্ভূজা ও সিংহবাহিনী। তাঁর হাতে শঙ্খ, চক্র, ধনুক ও বাণ; গলায় নাগযজ্ঞোপবীত। বাহন সিংহ করীন্দ্রাসুর অর্থাৎ হস্তীরূপী অসুরের পৃষ্ঠে দণ্ডায়মান। দেবীর গাত্রবর্ণ উদিয়মান সূর্যের ন্যায়।

নদিয়ারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের রাজত্বকাল থেকেই বঙ্গদেশে জগদ্ধাত্রী পূজার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়। বরিশালে প্রাপ্ত খ্রিস্টীয় অষ্টম শতকের জগদ্ধাত্রী মূর্তি, খ্রিস্টীয় পঞ্চদশ শতকে শূলপাণি রচিত গ্রন্থে জগদ্ধাত্রী পূজার উল্লেখ ও কৃষ্ণচন্দ্রের রাজত্বকালের পূর্বে নদিয়ার বিভিন্ন মন্দির-ভাস্কর্যে দেবী জগদ্ধাত্রীর উপস্থিতি থেকে প্রমাণিত হয়, বঙ্গদেশে জগদ্ধাত্রী আরাধনা কোনও অর্বাচীন প্রথা নয়।

জগদ্ধাত্রী পূজার নিয়মটি একটু স্বতন্ত্র। দুটি প্রথায় এই পূজা হয়ে থাকে। কেউ কেউ সপ্তমী থেকে নবমী অবধি দুর্গাপূজার ধাঁচে জগদ্ধাত্রী পূজা করে থাকেন। আবার কেউ কেউ নবমীর দিনই তিন বার পূজার আয়োজন করে সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমী পূজা সম্পন্ন করেন। এই পূজার অনেক প্রথাই দুর্গা
পূজার অনুরূপ।
ব্যুৎপত্তি
জগদ্ধাত্রী শব্দের আভিধানিক অর্থ “জগৎ+ধাত্রী। জগতের (ত্রিভুবনের) ধাত্রী (ধারণকর্ত্রী, পালিকা)।” ব্যাপ্ত অর্থে দুর্গা, কালী সহ অন্যান্য শক্তিদেবীগণও জগদ্ধাত্রী। তবে শাস্ত্রনির্দিষ্ট জগদ্ধাত্রী রূপের নামকরণের পশ্চাতে রয়েছে সূক্ষ্মতর ধর্মীয় দর্শন। স্বামী প্রমেয়ানন্দের মতে,

ধৃতিরূপিণী মহাশক্তি জগদ্ধাত্রী। সগুণ ব্রহ্মের সৃষ্টি, স্থিতি ও বিনাশরূপ তিনগুণের যুগপৎ প্রকাশ যেমন কালীরূপের বৈশিষ্ট্য, তাঁর ধারণী ও পোষণী গুণের যুগপৎ প্রকাশও জগদ্ধাত্রীরূপের বৈশিষ্ট্য।... ধা ধাতুর অর্থ ধারণ বা পোষণ। ভগবতী নিখিল বিশ্বকে বক্ষে ধারণ করে পরিপালন করেন বলে মুনিগণ কর্তৃক তিনি ত্রৈলোক্যজননী নামে অভিহিত।... নিয়ত-পরিবর্তনশীল এই জগতের পেছনে রয়েছে তার রক্ষণ ও পোষণের জন্য অচিন্তনীয়া মহাশক্তির এক অদ্ভুত খেলা। সতত পরিবর্তনশীল জগৎ সেই মহাশক্তির দ্বারা বিধৃত – যিনি নিত্যা, শাশ্বতী ও অপরিবর্তনীয়া। দেবী জগদ্ধাত্রীই সেই ধৃতিরূপিণী মহাশক্তি।
 জগদাত্রী

পৌরাণিক উপাখ্যান
রাঁচি রামকৃষ্ণ মিশন যক্ষা স্যানাটোরিয়ামের জগদ্ধাত্রী পূজা
কেন উপনিষদে উল্লিখিত একটি উপাখ্যান অনুসারে : একবার দেবাসুর সংগ্রামে দেবগণ অসুরদের পরাস্ত করলেন। কিন্তু তাঁরা বিস্মৃত হলেন যে নিজ শক্তিতে নয়, বরং ব্রহ্মের বলে বলীয়ান হয়েই তাঁদের এই বিজয়। ফলত তাঁরা হয়ে উঠলেন অহংকার-প্রমত্ত। তখন ব্রহ্ম যক্ষের বেশ ধারণ করে তাঁদের সম্মুখে উপস্থিত হলেন। তিনি একটি তৃণখণ্ড দেবতাদের সম্মুখে পরীক্ষার নিমিত্ত রাখলেন। অগ্নি ও বায়ু তাঁদের সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করেও সেই তৃণখণ্ডটিকে দগ্ধ বা বিধৌত করতে পারলেন না। তখন দেবগণ ইন্দ্রকে যক্ষের পরিচয় জানবার নিমিত্ত প্রেরণ করলেন। ইন্দ্র অহংকার-প্রমত্ত হয়ে যক্ষের কাছে আসেননি, এসেছিলেন জিজ্ঞাসু হয়ে। তাই ব্রহ্মরূপী যক্ষ তাঁর সম্মুখ হতে তিরোহিত হলেন। বরং তাঁর সম্মুখের আকাশে দিব্য স্ত্রীমূর্তিতে আবির্ভূত হলেন হৈমবতী উমা। উমা ব্রহ্মের স্বরূপ ব্যাখ্যা করে ইন্দ্রের জ্ঞানপিপাসা নিবৃত্ত করলেন।

কাত্যায়নী তন্ত্র
উপনিষদে উমার রূপবর্ণনা নেই। কেবলমাত্র তাঁকে হৈমবতী অর্থাৎ স্বর্ণালঙ্কারভূষিতা বলা হয়েছে। তবে এই হৈমবতী উমাই যে দেবী জগদ্ধাত্রী সে প্রত্যয় জন্মে কাত্যায়ণী তন্ত্রের ৭৬ পটলে (অধ্যায়) উল্লিখিত একটি কাহিনি থেকে। এই কাহিনি অনুসারে : একদা ইন্দ্র, অগ্নি, বায়ু ও চন্দ্র – এই চার দেবতা অহংকার-প্রমত্ত হয়ে নিজেদের ঈশ্বর মনে করতে শুরু করলেন। তাঁরা বিস্মৃত হলেন যে দেবতা হলেও তাঁদের স্বতন্ত্র কোনও শক্তি নেই – মহাশক্তির শক্তিতেই তাঁরা বলীয়ান। দেবগণের এই ভ্রান্তি অপনয়নের জন্য দেবী জগদ্ধাত্রী কোটি সূর্যের তেজ ও কোটি চন্দ্রের প্রভাযুক্ত এক দিব্য মূর্তিতে তাঁদের সম্মুখে উপস্থিত হলেন। এর পরের কাহিনি কেন উপনিষদে বর্ণিত তৃণখণ্ডের কাহিনির অনুরূপ। দেবী প্রত্যেকের সম্মুখে একটি করে তৃণখণ্ড রাখলেন; কিন্তু চার দেবতার কেউই তাকে স্থানচ্যুত বা ভষ্মীভূত করতে অসমর্থ হলেন। দেবগণ নিজেদের ভুল উপলব্ধি করলেন। তখন দেবী তাঁর তেজোরাশি স্তিমিত করে এই অনিন্দ্য মূর্তি ধারণ করলেন। এই মূর্তি ত্রিনয়না, চতুর্ভূজা, রক্তাম্বরা, সালংকারা, নাগযজ্ঞোপবীতধারিনী ও দেব-ঋষিগণ কর্তৃক অভিবন্দিতা এক মঙ্গলময়ী মহাদেবীর মূর্তি। সমগ্র জগৎকে পরিব্যাপ্ত করে দেবী দেবগণকে এই মূর্তি দেখালেন; দেবগণও তাঁর স্তবে প্রবুদ্ধ হলেন।
 জগদাত্রী

কাত্যায়নী তন্ত্র
উপনিষদে উমার রূপবর্ণনা নেই। কেবলমাত্র তাঁকে হৈমবতী অর্থাৎ স্বর্ণালঙ্কারভূষিতা বলা হয়েছে। তবে এই হৈমবতী উমাই যে দেবী জগদ্ধাত্রী সে প্রত্যয় জন্মে কাত্যায়ণী তন্ত্রের ৭৬ পটলে (অধ্যায়) উল্লিখিত একটি কাহিনি থেকে। এই কাহিনি অনুসারে : একদা ইন্দ্র, অগ্নি, বায়ু ও চন্দ্র – এই চার দেবতা অহংকার-প্রমত্ত হয়ে নিজেদের ঈশ্বর মনে করতে শুরু করলেন। তাঁরা বিস্মৃত হলেন যে দেবতা হলেও তাঁদের স্বতন্ত্র কোনও শক্তি নেই – মহাশক্তির শক্তিতেই তাঁরা বলীয়ান। দেবগণের এই ভ্রান্তি অপনয়নের জন্য দেবী জগদ্ধাত্রী কোটি সূর্যের তেজ ও কোটি চন্দ্রের প্রভাযুক্ত এক দিব্য মূর্তিতে তাঁদের সম্মুখে উপস্থিত হলেন। এর পরের কাহিনি কেন উপনিষদে বর্ণিত তৃণখণ্ডের কাহিনির অনুরূপ। দেবী প্রত্যেকের সম্মুখে একটি করে তৃণখণ্ড রাখলেন; কিন্তু চার দেবতার কেউই তাকে স্থানচ্যুত বা ভষ্মীভূত করতে অসমর্থ হলেন। দেবগণ নিজেদের ভুল উপলব্ধি করলেন। তখন দেবী তাঁর তেজোরাশি স্তিমিত করে এই অনিন্দ্য মূর্তি ধারণ করলেন। এই মূর্তি ত্রিনয়না, চতুর্ভূজা, রক্তাম্বরা, সালংকারা, নাগযজ্ঞোপবীতধারিনী ও দেব-ঋষিগণ কর্তৃক অভিবন্দিতা এক মঙ্গলময়ী মহাদেবীর মূর্তি। সমগ্র জগৎকে পরিব্যাপ্ত করে দেবী দেবগণকে এই মূর্তি দেখালেন; দেবগণও তাঁর স্তবে প্রবুদ্ধ হলেন।

কাত্যায়নী তন্ত্র
উপনিষদে উমার রূপবর্ণনা নেই। কেবলমাত্র তাঁকে হৈমবতী অর্থাৎ স্বর্ণালঙ্কারভূষিতা বলা হয়েছে। তবে এই হৈমবতী উমাই যে দেবী জগদ্ধাত্রী সে প্রত্যয় জন্মে কাত্যায়ণী তন্ত্রের ৭৬ পটলে (অধ্যায়) উল্লিখিত একটি কাহিনি থেকে। এই কাহিনি অনুসারে : একদা ইন্দ্র, অগ্নি, বায়ু ও চন্দ্র – এই চার দেবতা অহংকার-প্রমত্ত হয়ে নিজেদের ঈশ্বর মনে করতে শুরু করলেন। তাঁরা বিস্মৃত হলেন যে দেবতা হলেও তাঁদের স্বতন্ত্র কোনও শক্তি নেই – মহাশক্তির শক্তিতেই তাঁরা বলীয়ান। দেবগণের এই ভ্রান্তি অপনয়নের জন্য দেবী জগদ্ধাত্রী কোটি সূর্যের তেজ ও কোটি চন্দ্রের প্রভাযুক্ত এক দিব্য মূর্তিতে তাঁদের সম্মুখে উপস্থিত হলেন। এর পরের কাহিনি কেন উপনিষদে বর্ণিত তৃণখণ্ডের কাহিনির অনুরূপ। দেবী প্রত্যেকের সম্মুখে একটি করে তৃণখণ্ড রাখলেন; কিন্তু চার দেবতার কেউই তাকে স্থানচ্যুত বা ভষ্মীভূত করতে অসমর্থ হলেন। দেবগণ নিজেদের ভুল উপলব্ধি করলেন। তখন দেবী তাঁর তেজোরাশি স্তিমিত করে এই অনিন্দ্য মূর্তি ধারণ করলেন। এই মূর্তি ত্রিনয়না, চতুর্ভূজা, রক্তাম্বরা, সালংকারা, নাগযজ্ঞোপবীতধারিনী ও দেব-ঋষিগণ কর্তৃক অভিবন্দিতা এক মঙ্গলময়ী মহাদেবীর মূর্তি। সমগ্র জগৎকে পরিব্যাপ্ত করে দেবী দেবগণকে এই মূর্তি দেখালেন; দেবগণও তাঁর স্তবে প্রবুদ্ধ হলেন।

ইতিহাস
বারোইয়ারি প্রতিমাখানি প্রায় বিশ হাত উঁচু – ঘোড়ায় চড়া হাইল্যান্ডের গোরা, বিবি, পরী ও নানাবিধ চিড়িয়া, শোলার ফল ও পদ্ম দিয়ে সাজানো; মধ্যে মা ভগবতী জগদ্ধাত্রী-মূর্তি – সিঙ্গির গায়ে রূপুলি গিলটি ও হাতী সবুজ মখমল দিয়ে মোড়া। ঠাকরুণের বিবিয়ানা মুখ, রং ও গড়ন আদল ইহুদী ও আরমানী কেতা, ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর ও ইন্দ্র দাঁড়িয়ে জোড়হাত ক’রে স্তব কচ্চেন। প্রতিমের উপরে ছোট ছোট বিলাতী পরীরা ভেঁপু বাজাচ্চে – হাতে বাদশাই নিশেন ও মাঝে খোড়াসিঙ্গিওয়ালা কুইনের ইউনিফরম ও ফ্রেষ্ট!... বেলা আটটার সময় যাত্রা ভাঙলো, একজন বাবু মাতাল, পাত্র টেনে বিলক্ষণ পেকে যাত্রা শুনছিলেন, যাত্রা ভেঙে যাওয়াতে গলায় কাপড় দিয়ে প্রতিমে প্রণাম কত্তে গেলেন, (প্রতিমে হিন্দুশাস্ত্রসম্মত জগদ্ধাত্রী-মূর্তি)। কিন্তু প্রতিমার সিঙ্গি হাতীকে কাম্‌ড়াচ্চে দেখে, বাবু মহাত্মার বড়ই রাগ হলো, কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বাবু করুণার সুরে – ‌
তারিণী গো মা কেন হাতীর উপর এত আড়ি।
মানুষ মেলে টের্‌টা পেতে তোমায় বেতে হতো হরিণবাড়ী।
সুর্কি কুটে সারা হোতো, তোমার মুকুট যেত গড়াগড়ি।।
পুলিসের বিচারে শেষে সঁপতো তোমায় গ্র্যান্‌বুড়ি।
সিঙ্গি মামা টের্‌টা পেতেন ছুট্‌তে হতো উকীলবাড়ী।।

গান গেয়ে, প্রণাম ক’রে চলে গেলেন।

জগদ্ধাত্রী পূজা বাঙালি হিন্দু সমাজের একটি বিশিষ্ট উৎসব হলেও, দুর্গা বা কালীপূজার তুলনায় এই পূজার প্রচলন অপেক্ষাকৃত আধুনিক কালে ঘটে। অষ্টাদশ শতকে নদিয়ারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায় তাঁর রাজধানী কৃষ্ণনগরে এই পূজার প্রচলন করার পর এর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়। যদিও দেবী জগদ্ধাত্রী যে বাঙালি সমাজে একান্ত অপরিচিত ছিলেন না, তার প্রমাণও পাওয়া যায়। শূলপাণি খ্রিস্টীয় পঞ্চদশ শতকে কালবিবেক গ্রন্থে কার্তিক মাসে জগদ্ধাত্রী পূজার উল্লেখ করেন। পূর্ববঙ্গের বরিশালে খ্রিস্টীয় অষ্টম শতকে নির্মিত জগদ্ধাত্রীর একটি প্রস্তরমূর্তি পাওয়া যায়। বর্তমানে এই মূর্তিটি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশুতোষ সংগ্রহশালার প্রত্নবিভাগে রক্ষিত।  কৃষ্ণচন্দ্রের রাজত্বকালের আগে নির্মিত নদিয়ার শান্তিপুরের জলেশ্বর শিবমন্দির ও কোতোয়ালি থানার রাঘবেশ্বর শিবমন্দিরের ভাস্কর্যে জগদ্ধাত্রীর মূর্তি লক্ষিত হয়। তবে বাংলার জনসমাজে কৃষ্ণচন্দ্রে পূর্বে জগদ্ধাত্রী পূজা বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করেনি। কেবল কিছু ব্রাহ্মণগৃহে দুর্গাপূজার পাশাপাশি জগদ্ধাত্রী পূজা অনুষ্ঠিত হত।

কৃষ্ণনগর রাজবাটীর জগদ্ধাত্রী পূজা
নদিয়া জেলার সদর কৃষ্ণনগরে জগদ্ধাত্রী পূজার সূচনা করেন রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়। কিংবদন্তী অনুসারে নবাব আলিবর্দির রাজত্বকালে মহাবদজঙ্গ রাজার নিকট থেকে বারো লক্ষ টাকা নজরানা দাবি করেন। নজরানা দিতে অপারগ হলে তিনি রাজাকে বন্দী করে মুর্শিদাবাদে (মতান্তরে মুঙ্গেরে) নিয়ে যান। মুক্তির পর নদীপথে কৃষ্ণনগরে প্রত্যাবর্তনের সময় ঘাটে বিজয়াদশমীর বিসর্জনের বাজনা শুনে তিনি বুঝতে পারেন সেই বছর দুর্গাপূজার কাল উত্তীর্ণ হয়ে গিয়েছে। দুর্গাপূজার আয়োজন করতে না পেরে রাজা অত্যন্ত দুঃখিত হন। সেই রাতে দুর্গা জগদ্ধাত্রীর রূপে রাজাকে পরবর্তী শুক্লানবমী তিথিতে জগদ্ধাত্রী দুর্গার পূজা করার আদেশ দেন।অন্য এক মতে কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির জগদ্ধাত্রী পূজার সূচনা ১৭৬৬ সালে। কেউ কেউ আবার কৃষ্ণচন্দ্রের প্রপৌত্র গিরিশচন্দ্রকে কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির জগদ্ধাত্রী পূজার প্রবর্তক মনে করেন। কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির দরজা জগদ্ধাত্রী পূজার সময় আজও খোলা থাকে। পূজা পুরনো প্রথা মেনে হয় শুধুমাত্র নবমী তিথিতে।

১৭৭২ সালে রাজবাড়ির দেখাদেখি কৃষ্ণনগরের চাষাপাড়ায় রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের প্রজারা জগদ্ধাত্রী পূজা শুরু করেন। বুড়িমার পূজা নামে পরিচিত এই পূজা শুরু হয়েছিল ঘটে ও পটে। প্রথম দিকে স্থানীয় গোয়ালারা দুধ বিক্রি করে এই পূজার আয়োজন করতেন। ১৭৯০ সাল নাগাদ গোবিন্দ ঘোষ ঘটপটের পরিবর্তে প্রতিমায় জগদ্ধাত্রী পূজার সূচনা করেন। এখানকার প্রতিমার বৈশিষ্ট্য হল প্রায় সাড়ে সাতশো ভরি সোনায় গয়নায় দেবীপ্রতিমার অলংকারসজ্জা। কৃষ্ণনগরের বাসিন্দাদের মতে এই দেবী অত্যন্ত জাগ্রতা; তাঁর নিকট সকল মনোষ্কামনাই পূর্ণ হয়।

এছাড়া কৃষ্ণনগরের উল্লেখযোগ্য বারোয়ারি জগদ্ধাত্রী পূজাগুলি হল প্রীতিসম্মেলনী, বালকেশ্বরী, মালোপাড়া, হাতারপাড়া, উকিলপাড়া, ষষ্ঠীতলা, বউবাজার, নেদেরপাড়া, বাঘাডাঙা, পাত্রমার্কেট, কৃষ্ণনগর স্টেশন চত্বর, বেজিখালি, চকেরপাড়া, বাগদিপাড়া, মাঝেরপাড়া, ঘূর্ণি, হরিজনপল্লি, তাঁতিপাড়া, কালীনগর ইত্যাদি। বর্তমানে কৃষ্ণনগরে বারোয়ারি জগদ্ধাত্রী পূজা হয় দুই শতেরও বেশি।

চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পূজা

পালপাড়া সর্বজনীন জগদ্ধাত্রী পূজা, চন্দননগর
চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পূজার প্রবর্তক ইন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী। জানা যায়, রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের ঘনিষ্ঠ ইন্দ্রনারায়ণ ছিলেন চন্দননগরের ফরাসি সরকারের দেওয়ান। প্রায় আড়াইশো বছর আগে, কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির পূজা দেখে মুগ্ধ হয়ে ইন্দ্রনারায়ণ চন্দননগরের লক্ষ্মীগঞ্জ চাউলপট্টির নিচুপাটিতে জগদ্ধাত্রী পূজার প্রচলন করেন। লক্ষ্মীগঞ্জ প্রতিষ্ঠার কিছুকাল পরেই এই পূজার সূচনা। এই পূজা চন্দননগরে আদি পূজা নামে পরিচিত। এখনও পর্যন্ত পুরুষানুক্রমে দেওয়ান চৌধুরীদের উত্তরপুরুষের নামে পূজার সংকল্প হয়। এখানকার প্রতিমার বৈশিষ্ট্য হল সনাতনরীতির প্রতিমায় সাদা সিংহ এবং বিপরীতমুখী অবস্থানে হাতি। শোনা যায়, বিসর্জনের সময় আদি প্রতিমা জলে পড়লেই শুশুক বা সাপের দেখা পাওয়া যায়। স্থানীয় বিশ্বাসে এই দেবী অত্যন্ত জাগ্রতা। লক্ষ্মীগঞ্জ কাপড়েপট্টির জগদ্ধাত্রী পূজা চন্দননগরে দ্বিতীয় প্রাচীনতম পূজা। ১৭৬৮ সালে চাউলপট্টির চাল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মতান্তর হওয়ায় কাপড় ব্যবসায়ী শ্রীধর বন্দ্যোপাধ্যায় (মতান্তরে শশধর) রীতিমতো চাঁদা তুলে এই পূজা প্রবর্তন করেন। এই অঞ্চলের অপর দুটি পূজা হল লক্ষ্মীগঞ্জ চৌমাথা (স্থাপিত ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দ) ও লক্ষ্মীগঞ্জ বাজারের (স্থাপিত ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দ) পূজা। উত্তর চন্দননগরের লক্ষ্মীগঞ্জ চাউলপট্টি, কাপড়েপট্টি, চৌমাথা ও বাজার – এই চার পূজাতেই সিংহের রং সাদা। উত্তর চন্দননগরের অন্যান্য বড়ো জগদ্ধাত্রী পূজাগুলি হল চন্দননগর বাগবাজার (স্থাপিত ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দ), খলিসানী কলপুকুরধার, বউবাজার শীতলাতলা, খলিসানী বউবাজার, বাগবাজার চৌমাথা, বিদ্যালঙ্কার, পালপাড়া, বিবিরহাট উত্তরাঞ্চল, বিবিরহাট চড়কতলা তেমাথা, হরিদ্রাডাঙা, হেলাপুকুরধার, নাড়ুয়া, কাঁটাপুকুর, কাঁটাপুকুর চৌমাথা, বোড়ো কালীতলা, বোড়ো পঞ্চাননতলা, বোড়ো চাঁপাতলা, বোড়ো দিঘির ধার, বোড়ো তালডাঙা ইত্যাদি।

দক্ষিণ চন্দননগরের বিখ্যাত জগদ্ধাত্রী পূজাগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য মানকুণ্ডু সার্বজনীন, মানকুণ্ডু নতুনপাড়া, নিয়োগী বাগান, সার্কাস মাঠ, তেমাথা, অম্বিকা অ্যাথলেটিক ক্লাব, মরান রোড, গোন্দলপাড়া মনসাতলা, সাতঘাটা, গোন্দলপাড়া চারমন্দিরতলা, বেশোহাটা, লিচুতলা হাজিনগর, হাটখোলা দৈবকপাড়া, মনসাতলা, ভুবনেশ্বরীতলা, নোনাটোলা, বড়বাজার, পাদ্রিপাড়া, লালবাগান, ড্যুপ্লেক্সপট্টি, শ্রমিকপল্লি, সুভাষ জাগরণ সংঘ তেমাথা, অরবিন্দ সংঘ, বারাসত দক্ষিণ, বারাসত গেট। দক্ষিণ চন্দননগরের হালদারপাড়ার আদিপুজো অশ্বত্থতলার বুড়িমার পূজা নামে পরিচিত। এই পূজা লক্ষ্মীগঞ্জ চাউলপট্টি ও কাপড়েপট্টির পূজার সমসাময়িক বলে মনে করা হয়।


জয়রামবাটীর জগদ্ধাত্রী পূজা
বাঁকুড়া জেলার জয়রামবাটী গ্রামে রামকৃষ্ণ পরমহংসের সহধর্মিণী সারদা দেবীর জন্মভিটা র জগদ্ধাত্রী পূজা বিশেষ প্রসিদ্ধ। পূজা উপলক্ষে জয়রামবাটীতে প্রচুর ভক্তসমাগম হয়। সারদা দেবীর পৈতৃক বাড়িতে এই পূজার আয়োজন করে রামকৃষ্ণ মিশন। ১৮৭৭ খ্রিস্টাব্দে (১২৮৪ বঙ্গাব্দ)সারদা দেবীর পিতৃগৃহে প্রথম জগদ্ধাত্রী পূজার আয়োজন করেছিলেন তাঁর জননী শ্যামাসুন্দরী দেবী। কিংবদন্তি অনুসারে, প্রতি বছর শ্যামাসুন্দরী দেবী প্রতিবেশী নব মুখুয্যের বাড়ির কালীপূজা উপলক্ষে নৈবেদ্যের চাল পাঠাতেন। ওইবছর কোনো বিবাদের কারণে নব মুখুজ্যে চাল নিতে অস্বীকার করেন। নৈবেদ্যদানে অসমর্থ হয়ে শ্যামাসুন্দরী দেবী অত্যন্ত মর্মাহত হন। সেই রাতেই তিনি দেবী জগদ্ধাত্রীকে স্বপ্নে দেখেন এবং তাঁর স্বপ্নাদেশে ওই চালে জগদ্ধাত্রী পূজার আয়োজন করেন। প্রথম বছর বিসর্জনের দিন বৃহস্পতিবার ছিল। তাই সারদা দেবী লক্ষ্মীবারে বিসর্জনে আপত্তি করেছিলেন। পরদিন সংক্রান্তি ও তার পরদিন মাস পয়লা থাকায় ওই দুই দিনও বিসর্জন দেওয়া যায়নি। বিসর্জন হয় চতুর্থ দিনে। আরও কথিত আছে যে, পরের বছর সারদা দেবী জগদ্ধাত্রী পূজা বন্ধ করে দিতে চাইলে দেবী জগদ্ধাত্রী তাঁকে স্বপ্নাদেশে পূজা বন্ধ করা থেকে নিরস্ত করেন। এরপর প্রথম চার বছর পূজা হয়েছিল শ্যামাসুন্দরী দেবীর নামে; দ্বিতীয় চার বছর সারদা দেবীর নামে এবং তৃতীয় চার বছর তাঁর কাকা নীলমাধব মুখোপাধ্যায়ের নামে। বারো বছর পর সারদা দেবী পুনরায় পূজা বন্ধ করবার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। শোনা যায়, এই বারও জগদ্ধাত্রীর স্বপ্নাদেশ পেয়ে তিনি নিরস্ত হন।

জীবদ্দশায় প্রতি বছরই জগদ্ধাত্রী পূজায় উপস্থিত থাকতেন সারদা দেবী। পূজা পরিচালনার জন্য তিনি সাড়ে দশ বিঘার কিছু বেশি জমি দেবোত্তর সম্পত্তিরূপে দিয়ে যান। ১৯১৯ সালে সারদা দেবী এই পূজায় শেষবার উপস্থিত ছিলেন। পরের বছর তিনি প্রয়াত হন।

প্রথম পূজার ঐতিহ্য অনুযায়ী আজও শুক্লা নবমীতে মূল পূজার পরও দুই দিন প্রতিমা রেখে দিয়ে বিশেষ পূজার আয়োজন করা হয়। দুর্গাপূজার মতোই পূজার সঙ্কল্প হয় সারদা দেবীর নামে। জগদ্ধাত্রীর প্রতিমার পাশে জয়া-বিজয়া ও নারদ মুনির প্রতিমা থাকে। নবমীতে ষোড়শোপচারে পূজা, তিন বার চণ্ডীপাঠ ও মাতৃমন্দিরে দরিদ্রনারায়ণ সেবা হয়। দশমীর দিন দশোপচারে পূজা হয়। এই দিন সন্ধ্যারতির পর যাত্রাগানের আসর বসে। একাদশীর দিনও দশোপচারে পূজা ও বিসর্জনকৃত্য সম্পন্ন হয়। এই দিন ধুনুচি নৃত্য, কর্পূরারতি, কনকাঞ্জলি প্রদান প্রভৃতিও অনুষ্ঠিত হয়। ধুনুচি নাচের পর বাদ্যঘণ্টা ও শোভাযাত্রা সহকারে মায়ের দিঘিতে প্রতিমা নিরঞ্জন হয়। প্রতিমা নিরঞ্জনে আশ্রমবাসী, অতিথি এবং গ্রামবাসী সকলে অংশ নেন। পূজা উপলক্ষে আশ্রমপ্রাঙ্গনে মেলাও বসে।

সংস্কৃত ভাষায় ‘জগদ্ধাত্রী স্তোত্রং
ওঁ আধারভূতে চাধেয়ে ধৃতিরূপে ধুরন্ধরে।

ধ্রূবে ধ্রূবপদে ধীরে জগদ্ধাত্রি নমোঽস্তু তে॥

শবাকারে শক্তিরূপে শক্তিস্থে শক্তিবিগ্রহে।

শাক্তাচার প্রিয়ে দেবি জগদ্ধাত্রি নমোঽস্তু তে॥

জয়দে জগদানন্দে জগদেক প্রপূজিতে।

জয় সর্ব্বগতে দুর্গে জগদ্ধাত্রি নমোঽস্তু তে॥

পরমাণু স্বরূপে চ দ্ব্যণুকাদি স্বরূপিণি।

স্থূলাতি সূক্ষ্ম রূপেণ জগদ্ধাত্রি নমোঽস্তু তে॥

সূক্ষ্মাতি সূক্ষ্ম রূপে চ প্রাণাপানাদিরূপিণি।

ভাবাভাব স্বরূপে চ জগদ্ধাত্রি নমোঽস্তু তে॥

কালাদি রূপে কালেশে কালাকাল বিভেদিনি।

সর্ব্ব স্বরূপে সর্ব্বজ্ঞে জগদ্ধাত্রি নমোঽস্তু তে॥

মহাবিঘ্নে মহোৎসাহে মহামায়ে বলপ্রদে।

প্রপঞ্চাসারে সাধ্বীশে জগদ্ধাত্রি নমোঽস্তু তে॥

অগম্যে জগতামাদ্যে মাহেশ্বরি বরাঙ্গনে।

অশেষ রূপে রূপস্থে জগদ্ধাত্রি নমোঽস্তু তে॥

দ্বিসপ্তকোটি মন্ত্রাণাং শক্তিরূপে সনাতনি।

সর্ব্ব শক্তি স্বরূপে চ জগদ্ধাত্রি নমোঽস্তু তে॥

তীর্থযজ্ঞ তপোদান যোগসারে জগন্ময়ি।

ত্বমেব সর্ব্বং সর্ব্বস্থে জগদ্ধাত্রি নমোঽস্তু তে॥

দয়ারূপে দয়াদৃষ্টে দয়াদ্রে দুঃখমোচনি।

সর্ব্বাপত্তারিকে দুর্গে জগদ্ধাত্রি নমোঽস্তু তে॥

অগম্য ধামাধামস্থে মহাযোগীশ হৃৎপুরে।

অমেয় ভাব কূটস্থে জগদ্ধাত্রি নমোঽস্তু তে॥

যঃ পঠেৎ স্তোত্রমেতত্তু পূজান্তে সাধক উত্তমঃ।

সর্ব্ব পাপৎ বিনির্মুক্তঃ পূজা ফলং অবামুয়াৎ॥

॥ইতি শ্রীজগদ্ধাত্রীকল্পে জগদ্ধাত্রী স্তোত্রং সমাপ্তম্॥

Friday, November 9, 2018

হিন্দিভাষী হিন্দুদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পূজা ছট্‌ পূজা



ছট পূজা (বা ছঠ পূজা) হিন্দু বর্ষপঞ্জীর কার্তিক মাসের শুক্ল পক্ষের ষষ্ঠী তিথিতে উদযাপিত একটি প্রাচীন হিন্দু পার্বণ। সূর্য্যোপাসনার এই অনুপম লৌকিক উৎসব পূর্ব ভারতের বিহার, ঝাড়খণ্ড, পূর্ব উত্তরপ্রদেশ এবং নেপালের তরাই অঞ্চলে পালিত হয়ে থাকে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হিন্দুদের দ্বারা পালিত হওয়া এই উৎসবটি ইসলাম সহ অন্য ধর্মাবলম্বী মানুষদের মধ্যেও পালিত হতে দেখা গেছে।ধীরে ধীরে এই পার্বণ প্রবাসী ভারতীয়দের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে প্রচলিত হয়েছে।  ছট পূজা সূর্য্য ও তাঁর পত্নী ঊষার (ছটী মাঈ) প্রতি সমর্পিত হয়, যেখানে তাঁকে পৃথিবীতে জীবনের স্রোত বহাল রাখার জন্য ধন্যবাদ জ্ঞাপন ও আশীর্বাদ প্রদানের কামনা করা হয়। ছটে কোনও মূর্তি পূজা করা হয় না

ছট পার্বণ
ছট বা ছঠ, ষষ্ঠী নামের অপভ্রংশ। মূলত সূর্য ষষ্ঠী ব্রত হওয়ার দরুন একে ছট বলা হয়। কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথিতে দীপাবলি পালনের পর এই চার দিনের ব্রতের (কার্তিক শুক্লা চতুর্থী থেকে কার্তিক শুক্লা সপ্তমী) সবচেয়ে কঠিন ও তাৎপর্যপূর্ণ রাত্রি হল কার্তিক শুক্লা ষষ্ঠী; বিক্রম সংবৎ-এর কার্তিক মাসের শুক্লা ষষ্ঠী তিথিতে এই ব্রত উদযাপিত হওয়ার কারণে এর নাম ছট রাখা হয়েছে।

তাৎপর্য ও আচার-অনুষ্ঠান
ভারতে সূর্য্যোপাসনার জন্য প্রসিদ্ধ পার্বণ হল ছট পূজা। এটি বছরে দুবার পালিত হয় — প্রথমবার চৈত্র মাসে (চৈতী ছট) এবং দ্বিতীয়বার কার্তিক মাসে (কার্তিকী ছট)। পারিবারিক সুখ-সমৃদ্ধি তথা মনোবাঞ্ছিত ফল লাভের জন্য এটি পালন করা হয়। নারী-পুরুষ সমানভাবে এই উৎসবে অংশগ্রহণ করেন।

চারদিনের এই ব্রতের প্রথম দিনে ব্রতধারী বাড়িঘর পরিষ্কার করে স্নান সেরে শুদ্ধাচারে নিরামিষ ভোজন করেন (যাকে নহায়-খায় বলা কয়)। পরদিন থেকে উপবাস শুরু হয়; ব্রতী দিনভর নির্জলা উপবাস পালনের পর সন্ধ্যায় পূজার শেষে ক্ষীরের ভোগ গ্রহণ করেন (এটি খরনা নামে পরিচিত)। তৃতীয় দিনে নিকটবর্তী নদী বা জলাশয়ের ঘাটে গিয়ে অন্যান্য ব্রতীদের সাথে অস্তগামী সূর্যকে অর্ঘ্য অর্থাৎ দুধ অর্পণ করা হয়। ব্রতের শেষদিনে পুনরায় ঘাটে গিয়ে উদীয়মান সূর্যকে পবিত্র চিত্তে অর্ঘ্যপ্রদানের পর উপবাসভঙ্গ করে পূজার প্রসাদরূপে বাঁশ নির্মিত পাত্রে সুপ, গুড়, মিষ্টান্ন, ক্ষীর, ঠেকুয়া, ভাতের নাড়ু এবং আখ, কলা, মিষ্টি লেবু প্রভৃতি ফল জনসাধারণকে দেওয়া হয়।

Tuesday, October 30, 2018

দীপাবলীকে আলোর উৎসব বলা হয়

দীপাবলি, বা, দেওয়ালি হল একটি পাঁচ দিন-ব্যাপী হিন্দু ধর্মীয় উৎসব। তবে জৈন-শিখ ধর্মালম্বীরাও এই সময়ে একই ধরনের উৎসব পালন করে থাকেন। আশ্বিন মাসের কৃষ্ণা ত্রয়োদশীর দিন ধনতেরাস অথবা ধনত্রয়োদশী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দীপাবলি উৎসবের সূচনা হয়। কার্তিক মাসের শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতে ভাইফোঁটা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই উৎসব শেষ হয়। নবরাত্রি উৎসব অথবা বাঙালিদের দুর্গোৎসব শেষ হওয়ার ১৮ দিন পর দীপাবলি শুরু হয়। গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসারে, মধ্য-অক্টোবর থেকে মধ্য-নভেম্বরের মধ্যে দীপাবলি অনুষ্ঠিত হয়।

দীপাবলি ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মায়ানমার, মরিশাস, গুয়ানা, ত্রিনিদাদ ও টোবাগো, সুরিনাম, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ফিজিতে একটি সরকারি ছুটির দিন।এই দিনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছুটি দেয়া হয়।

হিন্দুদের কাছে, দীপাবলি একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসব। এই দিন সব হিন্দুরা বাড়িতে নানা ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। বাংলা, আসাম, ওড়িশা ও মিথিলাতে এই দিনটি কালীপূজা হিসেবে উদযাপন করা হয়। ভারতীয় সমাজের দৃঢ় বিশ্বাস 'দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন' বা 'ন্যায়ের কাছে অন্যায়ের পরাজয়' এই নীতিতে। দীপাবলির মাধ্যমে উপনিষদের আজ্ঞায় এই কথাটা খুবই সদৃঢ় ভাবে চরিতার্থ হয়ে ওঠে যথা:-
 "অসতো মা সৎ গময়। 
তমসো মা জ্যোতির্গময়। 
মৃত্যোর্মা অমৃতং গময়। 
ওঁ শান্তিঃ॥ ওঁ শান্তিঃ॥ ওঁ শান্তিঃ॥" 
অর্থাৎ "অসৎ হইতে সত্যে লইয়া যাও, অন্ধকার হইতে জ্যোতিতে লইয়া যাও, মৃত্যু হইতে অমরত্বে লইয়া যাও। সর্বত্র যেন ছড়াইয়া পড়ুক শান্তির বার্তা॥" উত্তর ভারতীয় হিন্দুদের মতে দীপাবলির দিনেই শ্রীরামচন্দ্র চৌদ্দ বছরের নির্বাসনের পর অযোধ্যা ফেরেন। নিজের পরমপ্রিয় রাজাকে ফিরে পেয়ে অযোধ্যাবাসীরা ঘিয়ের প্রদীপ জ্বেলে সাজিয়ে তোলেন তাঁদের রাজধানীটাকে। এই দিনটিতে পূর্বভারত বাদে সম্পূর্ণ ভারতবর্ষে লক্ষ্মী-গণেশের পুজোর নিয়ম আছে। জৈন মতে, ৫২৭ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে মহাবীর দীপাবলির দিনেই মোক্ষ বা নির্বাণ লাভ করেছিলেন। ১৬১৯ খ্রিস্টাব্দে শিখদের ষষ্ঠ গুরু হরগোবিন্দ ও ৫২ জন রাজপুত্র দীপাবলির দিন মুক্তি পেয়েছিলেন বলে শিখরাও এই উৎসব পালন করেন। আর্য সমাজ এই দিনে স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতীর মৃত্যুদিন পালন করে। তারা এই দিনটি "শারদীয়া নব-শস্যেষ্টি" হিসেবেও পালন করেন। এছাড়া, নেপাল-ভারত-বাংলাদেশের সকল সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যেই এই উৎসব নিয়ে উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যায়।

"দীপাবলি" নামটির অর্থ "প্রদীপের সমষ্টি"। এই দিন হিন্দুরা ঘরে ঘরে ছোটো মাটির প্রদীপ জ্বালেন। এই প্রদীপ জ্বালানো অমঙ্গল বিতাড়নের প্রতীক। বাড়িঘর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে সারা রাত প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখলে ঘরে লক্ষ্মী আসেন বলে উত্তর ভারতীয় হিন্দুরা বিশ্বাস করেন। বাংলার দীপান্বিতা কালীপূজা বিশেষ জনপ্রিয়। এই উৎসব সাড়ম্বরে আলোকসজ্জা সহকারে পালিত হয়। তবে এই পূজা প্রাচীন নয়। ১৭৭৭ খ্রিস্টাব্দে কাশীনাথ রচিত শ্যামাসপর্যাবিধিগ্রন্থে এই পূজার সর্বপ্রথম উল্লেখ পাওয়া যায়। কথিত আছে, নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় অষ্টাদশ শতকে তাঁর সকল প্রজাকে শাস্তির ভীতিপ্রদর্শন করে কালীপূজা করতে বাধ্য করেন। সেই থেকে নদিয়ায় কালীপূজা বিশেষ জনপ্রিয়তা লাভ করে। কৃষ্ণচন্দ্রের পৌত্র ঈশানচন্দ্রও বহু অর্থব্যয় করে কালীপূজার আয়োজন করতেন। অমঙ্গল বিতাড়নের জন্য আতসবাজিও পোড়ানো হয়। বিশেষত উত্তর ভারতে দীপাবলির সময় নতুন পোশাক পড়া, পরিবার ও বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে মিষ্টি বিতরণের প্রথাও আছে।

ধনতেরাসের দিন অনেক ভারতীয় ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের অর্থবর্ষের সূচনা হয়; লোকজন নতুন বর্তন, বাসন, গয়না প্রভৃতিও কিনে থাকেন এই দিনে। তবে বেশির ভাগ বাঙালি ব্যবসায়ীদের অর্থবর্ষের সূচনা হয় পয়লা বৈশাখে। দ্বিতীয় দিনটিকে বলে ভূত চতুর্দশী। এই দিনে বাঙালিরা বাড়ির চোদ্দোটা এঁদো কোণায় চোদ্দোটা প্রদীপ জ্বালিয়ে কালো মুছিয়ে আলোকিত করে তোলেন বাড়িটাকে। কথায় আছে যে এমনটা করলে ভূতপ্রেত পরিবার আর স্বজনদের ঘাড়ের কাছে নড়তে পারে না; এমনটাও লোককথায় শোনা যায় যে এই প্রদীপসজ্জার মাধ্যমে পরিবারের পিতৃপুরুষদের অনুষ্ঠানে পদার্পণ করার জন্য নিমন্ত্রণ পাঠানো হয়, যাতে তাঁরা মায়ের বাৎসরিক আগমনে উপস্থিত হয়ে সবাইকে শুভাশীষ দিয়ে নিজেরা মায়ের আশীর্ব্বাদে মোক্ষ লাভ করবেন। তৃতীয় দিন কার্তিক অমাবস্যায় যেখানে উত্তর ভারতে লক্ষ্মীর পূজা চলছে, পশ্চিমবঙ্গে দারুণ জাঁকজমকে ঘটা করে পালন করা হয় কালীপূজা। অবশ্য সেদিন আদি পশ্চিমবঙ্গ বাসিন্দারা, ঘটিরা, বাড়িতে লক্ষ্মীর পূজাও করে থাকেন। তবে আদি বাংলাদেশি হিন্দুদের, বাঙালদের, এই নিয়ম নেই; তা অনেকে বাড়িতেও কালী পুজো করেন, যদিও এই পুজোর বারোয়ারি ভাবে পালন হওয়ার প্রচলন বেশি। কদাচিৎ কালীপুজোর দিন আর দেওয়ালির দিন পৃথকও হতে পারে; দেওয়ালির তারিখটা একদিন পরে কিংবা আগেও পড়া সম্ভব। কেননা কালীপূজার লগ্ন অমাবস্যার মাঝরাত্রিতে ঠিক হয়, আবার দীপাবলির লক্ষ্মী পূজার লগ্ন নিশ্চিত করা হয় অমাবস্যার সন্ধ্যেতে, তাই পুজোর লগ্ন অনুযায়ী দুই পুজোর তারিখে মাঝে মাঝে অন্তর ঘটে থাকে। দেওয়ালির দিনে প্রদীপের আলোয় বাড়ি-বাড়ি ঝকমক করে ওঠে। নানান রঙের বাজিতে আকাশটাও রীতিমত চকচক করে থাকে। দীপাবলি সারি-সারি প্রদীপের আলোকে স্বর্গের দেবতাকে মর্তের কুটিরে বরণ করে নেবার উৎসব। চতুর্থ দিন কার্তিক শুক্লা প্রতিপদ। এই দিন বৈষ্ণবেরা গোবর্ধন পূজা করেন। পঞ্চম দিন যমদ্বিতীয়া বা ভ্রাতৃদ্বিতীয়া বা ভাইফোঁটা। এই দিন বোনেরা তাদের ভাইদের জন্যে উপোস করে তাদের বাড়িতে নিমন্ত্রণ করে।

Monday, October 29, 2018

কালী পুজোর বিধি বিস্তারিত


কালী পুজোর বিধি  বিস্তারিত

দুর্গা পুজো ও লক্ষ্মী পুজোর পরেই সময় শক্তি সাধনার, অর্থাৎ কালী পুজো বা শ্যামা পুজোর| কালী পুজো সাধারণত অমাবস্যা তিথিতে সম্পন্ন করা হয়| ১৮ শতকে নবদ্বীপের রাজা কৃষ্ণচন্দ্র এই পুজো শুরু করেন| এর পর ১৯ শতক থেকে এই পুজো বহুল প্রচলিত হয়| আমাদের সবার কাছে এই পুজো শব্দবাজি এবং আলোর রোশনাইয়ের পুজো| পুজোয় আনন্দ করার সাথে সাথে এই পুজোর বিধি বা নিয়ম সম্পর্কেও যদি অবগত থাকেন তাহলে ক্ষতি কি? সামনেই তো পুজো তাই এখনি জেনে নিন এর সঠিক বিধি বা নিয়ম|

পুজো শুরুর নিয়মাবলী
দেবী কালী বা ভগবতী কালী মূর্তি বন্দনা সাধারণত আমরা করে থাকি| দেবী মূর্তির একটি পা মহাদেবের বুকের ওপর থাকে, এক হাতে অসুরের ছিন্ন মস্তক ও অন্য হাতে খড়গ| এবং দেবীর গলায় থাকে নরমুন্ডের মালা| তবে অনেক ক্ষেত্রে কালী দোয়াত দেবী মূর্তির পরিবর্তে দেবী ভগবতী রূপে বন্দনা করা হয়| পুজো শুরু করার পূর্বে লেখনি দোয়াত বা কালী দোয়াতটি পুজোর আসনে বসানো হয়ে থাকে| অনামিকা অঙ্গুলি দ্বারা লেখনি দোয়াতগুলিতে স্বস্তিক অঙ্কন করা হয়ে থাকে এবং এর জন্য লাল চন্দনবাটা ব্যবহৃত হয়ে থাকে|

স্তিক অঙ্কন সমাপ্ত হলে কালী পুজো শুরু হয়| বহুল আয়োজন বা ভোগ নয়, দেবী কালী শুধু জবা ফুলেই সন্তুষ্ট হন| তবে ভক্তি, আস্থা ও নিষ্ঠা এই পুজোকে সঠিক ভাবে সম্পন্ন করে| সোমরস এই পুজোয় প্রধান ভোগ হিসেবে ব্যবহৃত হয়| মধ্যরাতে পুজো শুরু হয় এবং সাধারণত ভোর রাতে এই পুজো সম্পন্ন হয়|

পুজোর বিধি
কালী পুজো অত্যন্ত নিষ্ঠা ও সঠিক বিধি মেনে করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়| সাধারণত ধ্যান, দেবীর আবাহন, পুষ্পাঞ্জলি দ্বারা এই পুজোর বিধি সম্পন্ন হয়| আসুন একটু বিস্তারে জানা যাক|

ধ্যান
দেবী ভগবতীমূর্তি বা লেখনি দোয়াত ঠিক মত প্রতিস্থাপন করা হলে ধ্যান দ্বারা এই পুজো শুরু করা হয়| একনিষ্ঠ ধ্যান এবং বিশেষ মন্ত্র উচ্চারণ দ্বারা দেবীর ধ্যান করা হয়|

আবাহন
ধ্যান সম্পন্ন হলে দেবী ভগবতী বা দেবী কালীর আবাহন শুরু হয়| এক্ষেত্রে হাতের একটি বিশেষ মুদ্রা এবং মন্ত্র উচ্চারণ করে দেবীর আবাহন করা হয়ে থাকে| দুটি হাত জোড় করে প্রনামের ভঙ্গিটি করে বুড়ো আঙুলটিকে ভেতরের দিকে রেখে এই বিশেষ মুদ্রাটি করা হয়ে থাকে| দেবী বন্দনায় বিভিন্ন মুদ্রা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ| কারণ প্রতিটি মুদ্রার আলাদা আলাদা অর্থ আছে| এই আবাহন দ্বারা দেবী মূর্তিতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা হয়ে থাকে|

পুষ্পাঞ্জলি
পুষ্পাঞ্জলি তিনটি ধাপে সম্পন্ন হয়| প্রথমে ধ্যান এবং আবাহন দ্বারা দেবীর প্রাণ প্রতিষ্ঠা হলে দেবী কালীকে তুষ্ট করার জন্য পুষ্পাঞ্জলি দেওয়া হয়| এক্ষেত্রে পাঁচটি লাল জবা ফুল দেবীর চরণে অর্পণ করা হয় একটি বিশেষ মন্ত্রের উচ্চারণে| এরপর একে একে চন্দন, পুষ্প, দীপ, ধূপ ও নৈবেদ্য দ্বারা দেবী বন্দনা করা হয়ে থাকে|

প্রতিটি ক্ষেত্রে আলাদা আলাদা মুদ্রা ও মন্ত্র উচ্চারণ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ| এরপর একে একে গন্ধ, অক্ষত এবং পুষ্প বাঁ হাত দিয়ে তুলে ডান হস্ত দ্বারা দেবীর চরণে অর্পণ করা হয়ে থাকে এবং নির্দিষ্ট মন্ত্র পাঠ করা হয়ে থাকে এবং পুজো গ্রহণ করা হেতু দেবী ভগবতী বা দেবী কালীকে বারংবার প্রনাম জানানো হয়ে থাকে|

আমাদের চারিদিকের অশুভ শক্তি এবং আমাদের ভেতরের অশুভ শক্তিকে পরাজিত করার কারণ স্বরূপ এই পুজো অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে সম্পন্ন করা হয়ে থাকে| নারীশক্তির স্বরূপ দেবী ভগবতী সমাজের অনিষ্টকারী শক্তিকে বিনষ্ট করে আমাদের অন্ধকার থেকে আলোর পথ দেখান| তাই আমরাও আলো, বাজি এবং অপার ভক্তি ও শ্রদ্ধার সাথে এই পুজোয় সম্মিলিত হয়ে থাকি|

Wednesday, October 24, 2018

কালীপূজা বা শ্যামাপূজা 2018


কালীপূজা

কালীপূজা বা শ্যামাপূজা হিন্দু দেবী কালীর পূজাকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত একটি হিন্দু উৎসব। প্রধানত বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে এই উৎসব উপলক্ষে প্রবল উৎসাহ উদ্দীপনা লক্ষিত হয়। বাংলায় গৃহে বা মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত কালীপ্রতিমার নিত্যপূজা হয়ে থাকে। কার্ত্তিক মাসের অমাবস্যা তিথিতে অনুষ্ঠিত সাংবাৎসরিক দীপান্বিতা কালীপূজা বিশেষ জনপ্রিয়। এই দিন আলোকসজ্জা ও আতসবাজির উৎসবের মধ্য দিয়ে সারা রাত্রিব্যাপী কালীপূজা অনুষ্ঠিত হয়। উল্লেখ্য, দীপান্বিতা কালীপূজার দিনটিতে ভারতের অন্যান্য জায়গায় দীপাবলি উৎসব পালিত হয়। সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে এই দিন লক্ষ্মীপূজা অনুষ্ঠিত হলেও বাঙালি, অসমীয়া ও ওড়িয়ারা এই দিন কালীপূজা করে থাকেন। এছাড়া মাঘ মাসের কৃষ্ণা চতুর্দশী তিথিতে রটন্তী এবং জ্যৈষ্ঠ মাসের কৃষ্ণা চতুর্দশী তিথিতে ফলহারিণী কালীপূজাও যথেষ্ট জনপ্রিয়।

ইতিহাস
চামুণ্ডাচর্চিকা কালীর পূজা বাংলা ও বহির্বঙ্গে প্রাচীন উৎসব হলেও বর্তমান আকারে কালীপূজা আধুনিক কালের। ষোড়শ শতাব্দীতে নবদ্বীপের প্রসিদ্ধ স্মার্ত পণ্ডিত তথা নব্যস্মৃতির স্রষ্টা রঘুনন্দন দীপান্বিতা অমাবস্যায় লক্ষ্মীপূজার বিধান দিলেও, কালীপূজার উল্লেখ করেননি।১৭৬৮ সালে রচিত কাশীনাথের কালী সপর্যাসবিধি গ্রন্থে দীপান্বিতা অমাবস্যায় কালীপূজার বিধান পাওয়া যায়। ডঃ শশীভূষণ দাশগুপ্তের মতে, “কাশীনাথ এই গ্রন্থে কালীপূজার পক্ষে যে ভাবে যুক্তিতর্কের অবতারণা করিয়াছেন, তাহা দেখিলেই মনে হয়, কালীপূজা তখনও পর্যন্ত বাঙলা দেশে সুগৃহীত ছিল না।” তবে খ্রিষ্টীয় সপ্তদশ শতাব্দীতে বাংলায় কালীপূজার প্রচলনের কিছু কিছু প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে।

সপ্তদশ শতকের নবদ্বীপের প্রথিতযশা তান্ত্রিক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশকে বাংলায় কালীমূর্তি ও কালীপূজার প্রবর্তক মনে করা হয়। তাঁর পূর্বে কালী উপাসকগণ তাম্রটাটে ইষ্টদেবীর যন্ত্র এঁকে বা খোদাই করে পূজা করতেন। পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, “কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ স্বয়ং কালীমূর্তি গড়িয়া পূজা করিতেন। আগমবাগীশের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করিয়া বাংলার সাধক সমাজ অনেকদিন চলেন নাই; লোকে ‘আগমবাগিশী’ কাণ্ড বলিয়া তাঁহার পদ্ধতিকে উপেক্ষা করিত।” অষ্টাদশ শতাব্দীতে নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় কালীপূজাকে জনপ্রিয় করে তোলেন। এই সময় রামপ্রসাদ সেনও আগমবাগীশের পদ্ধতি অনুসারে কালীপূজা করতেন। ঊনবিংশ শতাব্দীতে কৃষ্ণচন্দ্রের পৌত্র ঈশানচন্দ্র ও বাংলার ধনী জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতায় কালীপূজা ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। বর্তমানে কালীপূজা বাংলায় দুর্গাপূজার মতোই এক বিরাট উৎসব।

পূজানুষ্ঠান
দুর্গাপূজার মতো কালীপূজাতেও গৃহে বা মণ্ডপে মৃন্ময়ী প্রতিমা নির্মাণ করে পূজা করা হয়। মন্দিরে বা গৃহে প্রতিষ্ঠিত প্রস্তরময়ী বা ধাতুপ্রতিমাতেও কালীপূজা করা হয়। মধ্যরাত্রে তান্ত্রিক পদ্ধতিতে মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে পূজা অনুষ্ঠিত হয়। দেবীকে ছিন্নমস্তক সহ বলির পশুর রক্ত, মিষ্টান্ন, অন্ন বা লুচি, মাছ ও মাংস উৎসর্গ করা হয়। গৃহস্থবাড়িতে সাধারণত অতান্ত্রিক ব্রাহ্মণ্যমতে আদ্যাশক্তি কালীর রূপে কালীর পূজা হয়। দেবীর পূজায় ছাগ মেষ বা মহিষ বলির প্রথা রয়েছে।সুদূর অতীতে নরবলি দিয়েও কালীপূজা হত। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, কালী শ্মশানের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। এই কারণে কলকাতা সহ বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে শ্মশানে মহাধুমধামসহ শ্মশানকালী পূজা অনুষ্ঠিত হয়।

কোনো কোনো মণ্ডপে কালী ও শিবের মূর্তির সঙ্গে সঙ্গে বাংলার দুই বিখ্যাত কালীসাধক রামকৃষ্ণ পরমহংস ও বামাখ্যাপার মূর্তিও পূজিত হয়। কোথাও কোথাও কালীর সঙ্গে সঙ্গে দশমহাবিদ্যাও পূজিত হন। দর্শনার্থীরা সারারাত ধরে মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরে কালীপ্রতিমা দর্শন করেন। কালীপূজার রাতে গৃহে আলোকসজ্জা সাজানো হয় এবং আতসবাজি পোড়ানো হয়।


কলকাতার কালীঘাট মন্দিরে এই দিন দেবী কালীকে লক্ষ্মীরূপে পূজা করা হয়। হাজার হাজার ভক্ত এই দিন কালীঘাট মন্দিরে ভিড় করেন এবং দেবীর উদ্দেশ্যে বলি উৎসর্গ করেন। কলকাতার অপর বিখ্যাত কালীমন্দির দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়িতেও কালীপূজা উপলক্ষে মহাসমারোহ হয়। এইখানেই অতীতে রামকৃষ্ণ পরমহংস কালী আরাধনা করেছিলেন। সেই কারণে এই মন্দিরে কালীপূজা দেখতে প্রচুর পুণ্যার্থী এখানে ভিড় জমান।

আজ কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা

আজ কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা
কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা আজ । সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব। এ উপলক্ষে বাংলার হিন্দু সম্প্রদায়ের ঘরে ঘরে চলছে পূজার আনন্দ। যার যার সাধ্যমত বাসা বাড়িতে লক্ষ্মীপূজার আয়োজন করছেন।

আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের পূর্ণিমা তিথিতে এ পূজা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।

সনাতন ধর্ম‍াবলম্বীদের বিশ্বাস শ্রী শ্রী লক্ষ্মী হলেন ঈশ্বরের পালন রূপ শক্তি নারায়ণি। ভক্তরা যাকে ধন-সম্পদ-ঐশ্বর্যের অধিষ্ঠাত্রী অন্নদাত্রী দেবীরূপে পূজা করেন। তবে এই ধন শুধু পার্থিব ধন নয়, চরিত্র, ধন ও সর্বাত্মক বিকাশেরও প্রতীক।

হিন্দু শাস্ত্রমতে সাধারণত প্রতি বৃহস্পতিবার সবার ঘরে লক্ষ্মীপূজা করা হয়। পারিবারিক লক্ষ্মীপূজায় লক্ষ্মীর পাঁচালি পাঠ করা হয়। তবে আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের পূর্ণিমা তিথিতে লক্ষ্মীপূজা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এজন্য এ পূজা কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা নামে পরিচিত। লক্ষ্মীর বাহন হচ্ছে পেঁচা। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা বিশ্বাস করেন তিনি ভগবান বিষ্ণুর সহধর্মিণী। লক্ষ্মী পদ্মফুলের উপর উপবেশন করে থাকেন।

সাধারণত লক্ষ্মীপূজা পঞ্চোপচার, দশোপচার বা ষোড়শোপচারে করা হয়ে থাকে। পূজা শেষ না হওয়া পর্যন্ত গৃহবধূরা উপবাস ব্রত করেন। পূজাস্থলে বিভিন্ন আলপনাসহ গৃহের বিভিন্ন স্থানে দেবীর প্রতীকী পায়ের ছাপ আঁকা হয়। পূজা শেষে পুষ্পাঞ্জলি ও ভক্তদের মধ্যে প্রসাদ বিতরণ করা হয়।

সন্ধ্যার পর থেকে ঘরে ঘরে ধনদেবীর আরাধনায় মেতে উঠবেন গৃহিণীরা। দিনে নয়, রীতি অনুযায়ী মা লক্ষ্মী পূজা নেন রাতে। রাতে দেবীর আরাধনা করাই লক্ষ্মী আরাধনার চিরাচরিত রীতি।

কোজাগরী শব্দের অর্থ ‘কে জেগে আছে?’ বিশ্বাস অনুযায়ী এই রাতে দেবী লক্ষ্মী বিষ্ণুলোক হতে ধরায় নেমে আসেন এবং মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে “কে জেগে আছ?” এই প্রশ্ন করেন (নিশীথে বরদা লক্ষ্মী কোজাগর্তিভাষিণী- অর্থ নিশীথে বরদাত্রী লক্ষ্মীদেবী কে জেগে আছ বলে সম্ভাষণ করেন)।

যে ভক্ত রাত জেগে তার আরাধনা করেন, লক্ষ্মীব্রত করে জেগে থাকেন দেবী তার কাছ থেকে সাড়া পান এবং তার গৃহে প্রবেশ তাকে আশীর্বাদ করে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য প্রদান করেন।

গৃহিণীরা নিজেরাই এই পূজা করতে পারেন। শ্বেতপদ্ম ও শ্বেতচন্দনে লক্ষ্মীর আরাধনা করতে হয়। ফল-মূলের পাশাপাশি চিড়া এবং নারিকেল লক্ষ্মীপূজায় আবশ্যিক। একে চিপিটক বলে।



Saturday, October 20, 2018

কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা


কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম ধমীয় উৎসব লক্ষ্মীপূজা। এ পূজা কোজাগরী লক্ষ্মী পূজা নামেও পরিচিত। কোজাগরী শব্দটি এসেছে 'কো জাগর্তী' থেকে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, কোজাগরী পূর্ণিমা রাতে দেবী লক্ষ্মী ধন-ধান্যে ভরিয়ে দিতে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িতে পূজা গ্রহণ করতে আসেন। আর ধন-ধান্যের আশায় এই পূজার আয়োজন করা হয়।

শাস্ত্রমতে, দেবী লক্ষ্মী ধন-সম্পদ তথা ঐশ্বর্যের প্রতীক। এ ছাড়া উন্নতি (আধ্যাত্মিক ও পার্থিক), আলো, জ্ঞান, সৌভাগ্য, উর্বরতা, দানশীলতা, সাহস ও সৌন্দর্যের দেবীও তিনি। শারদীয় দুর্গোৎসব শেষে প্রথম পূর্ণিমা তিথিতে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা এই পূজা করে থাকেন। প্রাচীনকাল থেকেই রাজা-মহারাজা, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সাধারণ গৃহস্থ পর্যন্ত সবাই এই দেবীর পূজা করে আসছেন।

হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, লক্ষ্মী দেবী সন্তুষ্ট থাকলে সংসারে অর্থকষ্ট থাকবে না ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বাড়বে। ঘরে ঘরে মা লক্ষ্মী ধন-সম্পদের দেবী হিসেবে পূজিত হন। ভক্তের ডাকে সাড়া দিয়ে এদিন লক্ষ্মী মর্ত্যে নেমে আসেন। বাঙালি বিশ্বাসে লক্ষ্মীদেবী দ্বিভূজা ও তার বাহন পেঁচা এবং হাতে থাকে শস্যের ভাণ্ডার। তবে বাংলার বাইরে লক্ষ্মীর চতুর্ভূজা কমলে-কামিনী মূর্তিই বেশি দেখা যায়। প্রায় প্রতিটি বাঙালি হিন্দুর ঘরে লক্ষ্মীপূজা করা হয়। এ উপলক্ষে হিন্দু নারীরা উপবাস ব্রত পালন করেন।

 সারা দেশের বিভিন্ন মন্দির ও মণ্ডপের পাশাপাশি হিন্দুদের ঘরে ঘরে সকালে পূজার আনুষ্ঠানিকতা শেষে অঞ্জলি, প্রসাদ বিতরণ ও অতিথি আপ্যায়ন করা হয়। পূজা-অর্চনার পাশাপাশি ঘর-বাড়ির আঙিনায় আঁকা হবে লক্ষ্মীর পায়ের ছাপের আল্পনা। সন্ধ্যায় ঘরে ঘরে প্রদীপ প্রজ্জালন করেন। বিভিন্ন মন্দিরসহ ঘরোয়া পরিবেশে লক্ষ্মীপূজার বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা হয়। 

Friday, October 19, 2018

শুভ বিজয়া দশমী

আজ বিজয়া দশমী। অশুভশক্তির বিরুদ্ধে শুভশক্তির বিজয়ের দিন আজ। বাঙালি হিন্দুধর্মাবলম্বীদের প্রধান উত্সব দুর্গাপূজা। বর্ষার অঝোরধারা আর প্যাচপেচে পরিবেশের পর দুর্গাপূজা আসে শরতের শুভ্র কাশফুলের দোলা আর পেঁজাতুলা মেঘের ভেলায় করে। অবশ্য শরতের এই উত্সবটির নেপথ্যে রহিয়াছে দশরথপুত্র শ্রীরামচন্দ্রের অবদান। কৃত্তিবাসের রামায়ণ হইতে জানা যায়, সীতা উদ্ধারের জন্য শ্রীরামচন্দ্র কালিদহ সাগর হইতে ১০১টি নীলপদ্ম সংগ্রহ করিয়া সাগরকূলে বসিয়া শরত্কালে সর্বপ্রথম শক্তি তথা দুর্গোত্সবের (অকাল বোধন) আয়োজন করেন। বসন্তকালে দেবীদুর্গার বাসন্তী পূজার নিয়ম থাকিলেও শরতে রামচন্দ্রের অকালবোধনের আয়োজনই পরবর্তীকালে জনপ্রিয়তা লাভ করে। অর্থাত্ এই শারদীয় উত্সবের সঙ্গে রহিয়াছে রামচন্দ্রের প্রতি আজ্ঞাবহের ইঙ্গিত। হিন্দু শাস্ত্রানুসারে দুর্গাপূজার বাহন সিংহ। কিন্তু পৌরাণিক মতে, দেবী দুর্গা প্রতি বত্সর কৈলাস হইতে বাপের বাড়ি মর্ত্যলোকে আগমনের সময়ে চারটি আলাদা বাহন (অশ্ব, হস্তী, নৌকা এবং দোলা) ব্যবহার করিয়া থাকেন। স্বামীর বাড়ি ফিরিয়াও যান আলাদা আলাদা বাহনে।
শুভ বিজয়া দশমী

প্রাকৃতিক বিপর্যয়, যুদ্ধ, সামাজিক অশান্তি অবশ্য সামপ্রতিককালে এই জগতের নিত্যচিত্রের রূপ ধারণ করিয়াছে। সনাতন ধর্মের প্রধান ধর্মগ্রন্থ শ্রীমদ্ভগবতগীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলিয়াছেন—‘যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত। অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম। পরিত্রাণায় সাধুনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম। ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে।’ অর্থাত্ যখনই ধর্মের অধঃপতন হয় এবং অধর্মের উত্থান ঘটে, তখনই সত্ মানুষের পরিত্রাণ ও দুষ্টলোকের বিনাশ সাধন করিতে এবং ধর্মকে পুনরায় সংস্থাপন করিতে ঈশ্বর বিভিন্নরূপে যুগে যুগে ধরাধামে অবতীর্ণ হন। দেবী দুর্গাও মর্ত্যে আসিয়া অশুভ শক্তির বিনাশের মাধ্যমে শুভশক্তিকে প্রতিস্থাপন করেন। জীবের দুর্গতি নাশ করেন বলিয়াও তাহাকে দুর্গা বলা হয়। ব্রহ্মার বরে পুরুষের অবধ্য মহিষাসুর নামে এক দানব স্বর্গরাজ্য দখল করিলে রাজ্যহারা দেবতারা বিষ্ণুর শরণাপন্ন হন। বিষ্ণুর নির্দেশে সকল দেবতার তেজঃপুঞ্জ হইতে যে দেবীর জন্ম হয় তিনিই দুর্গা। দেবতাদের শক্তিতে শক্তিময়ী এবং বিভিন্ন অস্ত্রে সজ্জিতা হইয়া এই দেবী যুদ্ধে মহিষাসুরকে বধ করেন। দেবী দুর্গা দশভুজা, ইন্দ্রিয় সংযমের প্রতীক তাঁহার দশ হাত দশ দিক রক্ষায় শক্তিসম্পন্না। দুর্গা ত্রিনয়না—অগ্নি, সূর্য ও চন্দ্রের প্রতীক ব্রহ্ম, বিষ্ণু ও মহেশ্বরের শক্তিসম্পন্না।

দুর্গাপূজার মাধ্যমে জগতের শুভশক্তিরই আরাধনা করিয়া থাকেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। তাহাদের নিকট পূজা মানে হইল—নিবেদন অর্থাত্ প্রশংসা বা শ্রদ্ধা জানানো। দিকে দিকে সুর-অসুরের যে যুদ্ধ চলিতেছে, তাহারই প্রতীকী বিজয়ের প্রকাশ দেখিতে পাওয়া যায় দুর্গোত্সবে। সকল সনাতন ধর্মাবলম্বীর প্রতি জানাই বিজয়া দশমীর শুভেচ্ছা। শুভ বিজয়া।

Monday, October 15, 2018

আজ সপ্তমী পূজা


আজ সপ্তমী পূজা


ষষ্ঠীর পর বুধবার মন্ডপে মন্ডপে আয়োজন করা হয়েছে সপ্তমী পূজার। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পাশাপাশি নানা ধর্ম-বর্ণের মানুষ দল বেঁধে পূজা দেখতে আসছে। উত্সবপ্রিয় বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায় মেতে উঠেছে পূজার আনন্দে। মণ্ডপগুলো ঝলমলে আলোকসজ্জায় রঙিন হয়ে উঠেছে। মন্দিরে মন্দিরে শোনা যাচ্ছে উলুধ্বনি, শঙ্খ, কাঁসা ও ঢাকের বাদ্য। 

মঙ্গলবার সকালে সারা দেশে ষষ্ঠী তিথিতে বেলতলায় বিহিত পূজার পর দেবীর আমন্ত্রণ ও অধিবাসের মধ্য দিয়ে মূল দুর্গোত্সবের সূচনা হয়। মাতৃবন্দনার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয় সকাল ৯টায়। নানা উপচারে ডালা সাজিয়ে মাতৃমণ্ডপে আসতে থাকেন ভক্তরা। অশুভ শক্তির বিনাশে ‘মঙ্গলময়ী’ দেবীর জাগরণে জগতে সুর শক্তি প্রতিষ্ঠার প্রার্থনা করেন তারা। 
শারদীয় দুর্গোত্সবের মহাসপ্তমী আজ শুরু হচ্ছে দেবী-দর্শন, দেবীর পায়ে ভক্তদের অঞ্জলি প্রদান ও প্রসাদ গ্রহণ। মূলত দুর্গোত্সবের মূল পর্ব শুরু হচ্ছে আজ। সপ্তমীতে ষোড়শ উপাচারে অর্থাত্ ষোলটি উপাদানে দেবীর পূজা হবে। সকালে ত্রিনয়নী দেবী দুর্গার চক্ষুদান করা হবে। দেবীকে আসন, বস্ত্র, নৈবেদ্য, স্নানীয়, পুষ্পমাল্য, চন্দন, ধূপ ও দীপ দিয়ে পূজা করবেন ভক্তরা। সপ্তমী পূজা উপলক্ষে সন্ধ্যায় বিভিন্ন পূজামণ্ডপে ভক্তিমূলক সঙ্গীত, রামায়ণ পালা, আরতিসহ নানা অনুষ্ঠান হবে। বিশুদ্ধ পঞ্জিকা মতে সকাল ৮টা ৫৮ মিনিটে দুর্গাদেবীর নবপত্রিকা প্রবেশ, স্থাপন ও সপ্তাদি কল্পারম্ভ এবং সপ্তমী বিহিত পূজা প্রশস্ত। আগামীকাল মহাষ্টমী। প্রতিবছরের মত এবারও ঢাকার রামকৃষ্ণ মঠ মিশনে কাল মহাষ্টমীতে অনুষ্ঠিত হবে ঐতিহ্যবাহী কুমারী পূজা।

Sunday, October 14, 2018

আজ দুর্গাষষ্ঠী


আজ দুর্গাষষ্ঠী

ঢাক আর ঢোলে কাঠির বাড়ি, ধূপের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন মণ্ডপ, কাঁসর ও শঙ্খের শব্দ শিহরণের মধ্যে দিয়ে আজ থেকে শুরু হলো পাঁচদিনব্যাপী দুর্গোৎসব।
মাতৃরূপে দেবী অধিষ্ঠিত হলেন মণ্ডপে মণ্ডপে। প্রার্থনার মধ্য দিয়ে জাগরিত হয়ে বিশ্ব থেকে অশুভকে বিদায় দেয়ার পণ। এভাবেই শারদীয় দুর্গোৎসবের সূচনা হলো আজ। আজ দুর্গাষষ্ঠী।
গতকাল রোববার ছিল দুর্গা দেবীর বোধন। তবে দুর্গাষষ্ঠীর মধ্য দিয়েই দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু। সারাদেশে এখন বইছে উৎসবের আমেজ। দুর্গতি নাশিনী দেবী দুর্গার আগমনে উচ্ছ্বসিত ভক্তকুল।
আনন্দমুখর পরিবেশে দুর্গোৎসব উদযাপনে রাজধানীসহ সারাদেশে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী। এদিকে শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী পৃথক বাণী দিয়েছেন।
ইতিমধ্যেই শেষ হয়েছে ৫ দিনব্যাপী হিন্দুদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজার সব প্রস্তুতি। প্রতিমায় পড়ছে রং-তুলির শেষ আঁচড়। এ উৎসব ঘিরে দেশ এখন আনন্দমুখর।
সনাতন বিশ্বাস ও বিশুদ্ধ পঞ্জিকামতে, জগতের মঙ্গল কামনায় দেবী দুর্গা এবার ঘোটকে (ঘোড়া) চড়ে মর্ত্যলোকে (পৃথিবী) আসবেন। যার ফল হচ্ছে রোগ, শোক, হানাহানি-মারামারি বাড়বে। আর দেবী স্বর্গালোকে বিদায় নেবেন দোলায় (পালকি) চড়ে। যার ফল মড়ক। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রোগ, মহামারীর প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাবে।
 এদিন বিজয়া দশমী-প্রতিমা বিসর্জন। মন্দিরে মন্দিরে মন্ত্র উচ্চারণ আর প্রার্থনার মধ্য দিয়ে বিশ্বের অশুভকে তাড়িয়ে শুভ কামনা করা হবে। সকাল থেকে চণ্ডিপাঠে মুখরিত থাকবে পূজা মণ্ডপ।
ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির মেলাঙ্গনে প্রতিদিন পূজানুষ্ঠান ছাড়াও ভক্তিমূলক সংগীতানুষ্ঠান, অঞ্জলি, প্রসাদ বিতরণ ও সন্ধ্যায় ভোগ আরতি, দুস্থদের মধ্যে বস্ত্র বিতরণ, আরতি প্রতিযোগিতা, স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। প্রায় একই ধরনের অনুষ্ঠান সূচি অন্যান্য পূজা মণ্ডপেও।

Tuesday, October 9, 2018

নবরাত্রি পূজার অর্থ

আক্ষরিক অর্থেই মহালয়ার দিন থেকেই শারদীয় দূর্গোৎসব শুরু হয়।মহালয়ার পরের দিন প্রতিপদ থেকে নবমী পর্যন্ত নয় রাত্রি ব্যাপি মা দূর্গার নয়টি শক্তির আরাধনা করা হয় সেটাই নবরাত্রি। নবরাত্রির নয়দিনে আরাধ্য দেবীরা হলেনঃ প্রতিপদে শৈলপুত্রী ( পর্বতের কন্যা),দ্বিতীয়াতে ব্রহ্মচারিণী (যিনি ব্রহ্মাকে স্বয়ং জ্ঞান দান করেন, ভক্তকেও ইনি ব্রহ্মপ্রাপ্তি করান ), তৃতীয়াতে চন্দ্রঘন্টা ( দেবীদুর্গার মহিষাসুর বধের জন্য দেবরাজ ইন্দ্রের প্রদত্ত ঘন্টা যার মধ্যে গজরাজ ঐরাবতের মহাশক্তি নিহিত ছিল, চন্দ্রের চেয়েও লাবণ্যবতী ইনি ),চতুর্থীতে কুষ্মান্ডা ( উষ্মার অর্থ তাপ । দুর্বিষহ ত্রিতাপ হল কুষ্মা। আর যিনি এই ত্রিতাপ নিজের উদরে বা অন্ডে ধারণ করেন অর্থাৎ সমগ্র সংসার ভক্ষণ করেন ইনি ), পঞ্চমীতে স্কন্দমাতা ( দেব সেনাপতি কার্তিকেয় বা স্কন্দের মা ),ষষ্ঠীতে কাত্যায়নী ( কাত্যায়ন ঋষির আশ্রমে দেবকার্যের জন্য আবির্ভূতা ইনি বৃন্দাবনে দেবী গোপবালা রূপে পূজিতা। ব্রজের গোপবালারা এই কাত্যায়নীর কাছে প্রার্থণা করেছিলেন নন্দের নন্দন শ্রীকৃষ্ণকে পতিরূপে পাওয়ার জন্য তাই ব্রজের দুর্গার নাম কাত্যায়নী ), সপ্তমীতে কালরাত্রি ( ঋগ্বেদের রাত্রিসুক্তে পরমাত্মাই রাত্রিদেবী। মহাপ্রলয়কালে এই রাত্রিরূপিণী মাতার কোলেই বিলয় হয় বিশ্বের।অনন্ত মহাকাশে নৃত্যরত কালভৈরবের দেহ থেকেই আবির্ভূতা ইনি দেবী যোগনিদ্রা মহাকালিকা বা কালরাত্রি নামে আখ্যাত ), অষ্টমীতে মহাগৌরী (তিনি সন্তানবৎসলা, শিবসোহাগিনী, বিদ্যুদ্বর্ণা মা দুর্গার প্রসন্ন মূর্তি) এবং নবমীতে সিদ্ধিদাত্রী ( অপরূপ লাবণ্যময়ী চতুর্ভুজা, ত্রিনয়নী, প্রাতঃসূর্যের মত রঞ্জিতা যোগমায়া মাহেশ্বরী ইনি সকল কাজে সিদ্ধি প্রদান করেন )।
নবরাত্রি পূজার অর্থ এবং তাত্পর্য


বৃহদ্ধর্মপুরাণ-এ রামের জন্য ব্রহ্মার দুর্গাপূজার বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়। এই পুরাণের মতে, কুম্ভকর্ণের নিদ্রাভঙ্গের পর রামচন্দ্রের অমঙ্গল আশঙ্কায় দেবতারা হলেন শঙ্কিত। তখন ব্রহ্মা বললেন, দুর্গাপূজা ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। তাই রামচন্দ্রের মঙ্গলের জন্য স্বয়ং ব্রহ্মা যজমানী করতে রাজি হলেন। তখন শরৎকাল। দক্ষিণায়ণ। দেবতাদের নিদ্রার সময়। এতএব ব্রহ্মা স্তব করে দেবীকে জাগরিত করলেন। দেবী তখন কুমারীর বেশে এসে ব্রহ্মাকে বললেন, বিল্ববৃক্ষমূলে দুর্গার বোধন করতে। দেবতারা মর্ত্যে এসে দেখলেন, এক দুর্গম স্থানে একটি বেলগাছের শাখায় সবুজ পাতার রাশির মধ্যে ঘুমিয়ে রয়েছে একটি পরমাসুন্দরী বালিকা। ব্রহ্মা বুঝলেন, এই বালিকাই জগজ্জননী দুর্গা। তিনি বোধন-স্তবে তাঁকে জাগরিত করলেন। ব্রহ্মার স্তবে জাগরিতা দেবী বালিকামূর্তি ত্যাগ করে চণ্ডিকামূর্তি ধরলেন। ব্রহ্মা বললেন, "রাবণবধে রামচন্দ্রকে অনুগ্রহ করার জন্য তোমাকে অকালে জাগরিত করেছি। যতদিন না রাবণ বধ হয়, ততদিন তোমার পূজা করব। যেমন করে আমরা আজ তোমার বোধন করে পূজা করলাম, তেমন করেই মর্ত্যবাসী যুগ যুগ ধরে তোমার পূজা করবে। যতকাল সৃষ্টি থাকবে, তুমিও পূজা পাবে এইভাবেই।" একথা শুনে চণ্ডিকা বললেন, "সপ্তমী তিথিতে আমি প্রবেশ করব রামের ধনুর্বাণে। অষ্টমীতে রাম-রাবণে মহাযুদ্ধ হবে। অষ্টমী-নবমীর সন্ধিক্ষণে রাবণের দশমুণ্ড বিচ্ছিন্ন হবে। সেই দশমুণ্ড আবার জোড়া লাগবে। কিন্তু নবমীতে রাবণ নিহত হবেন। দশমীতে রামচন্দ্র করবেন বিজয়োৎসব।" হলও তাই। মহাবিপদ কেটে গেল অষ্টমীতে; তাই অষ্টমী হল মহাষ্টমী। রাবণ বধ করে মহাসম্পদ সীতাকে লাভ করলেন রাম; তাই নবমী হল মহানবমী।

বিভিন্নভাবে নবরাত্রি পালিত হয়

1.পশ্চিমবঙ্গের দুর্গাপূজা -পূর্বাঞ্চলীয় অন্যান্য রাজ্যের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গে নবরাত্রি দুর্গাপূজার জাঁকজমকের সঙ্গে উদযাপন করা হয়ে থাকে| পূজা উৎসবের ষষ্ঠ দিনে বোধন (দেবী জাগরণ) দিয়ে শুরু হয় এবং দশম দিন পর্যন্ত চলতে থাকে|এখানে দেবী দুর্গাকে কন্যা হিসেবে গণ্য করা হয় যিনি দীর্ঘ সময় পর বাপের বাড়িতে ফিরে আসেন|

2. গুজরাটের গর্ভা রাশ- - কিভাবে বিভিন্ন সম্প্রদায় বিভিন্ন ভাবে নবরাত্রি উদযাপন করে থাকে? গুজরাটে, একটি মাটির পাত্র 'গর্ভা' (গর্ভ) প্রতীক হিসেবে রাখা হয়| মহিলারা নানারকম ঝলমলে পোশাক পরে এই পাত্রের চারপাশে ঘুরে ঘুরে নাচ করে থাকেন|এছাড়াও গুজরাটের ডান্ডিয়া রাশ আরেকটি ঐতিহ্যবাহী নৃত্য যা নবরাত্রির সময় করতে দেখা যায়|

3. তামিলনাডুর বোম্মাই গলু -এখানে সুন্দর সাজানো গলু পুতুল বিজোড় সংখ্যাযুক্ত 3, 7, বা 9 স্তরে প্রদর্শিত করে দেব দেবী হিসেবে পুজো করা হয়| আলো দিয়ে সাজিয়ে এবং স্তবগান করে এই নয় দিন ব্যাপী উৎসব উদযাপন করা হয়|

5. মহারাষ্ট্রের নবরাত্রি - যদিও গর্ভা অনুষ্ঠান মহারাষ্ট্রেও উদযাপন করা হয়; সেখানে এই উৎসবে কিছু অন্যরকম আচার পালন করতে দেখা যায়| এই সময়ে, বিবাহিত নারীরা একে অপরকে আমন্ত্রণ জানিয়ে সিঁদুর, মিষ্টি, চুড়ি, বিন্দি ইত্যাদি দিয়ে নিজেদের সাজিয়ে তোলেন|

6. কেরলে নবরাত্রি - ভারতের সবচেয়ে সাক্ষর রাজ্য হিসাবে কেরলকে বিবেচনা করা হয়|এখানে, নবরাত্রি শুধুমাত্র তিন দিনের জন্য পালিত হয়|মানুষ দেবী সরস্বতীর সামনে দুই দিনের জন্য তাদের বই রেখে জ্ঞান ও বিদ্যার জন্য প্রার্থনা করে| সাধারণত, এই বিভিন্ন উপায়ে নবরাত্রি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের দ্বারা পালিত হয়|নয় দিন পর দেবী দুর্গার প্রতিমা পবিত্র জলে নিমজ্জিত করা হয়| বিহার ও উত্তরপ্রদেশে উৎসবের দশম দিনে দশেরা উপলক্ষে 'রামলীলা' উদযাপন করা হয়| বাংলার জনগণ, সম্মান ও ভালবাসা বিনিময় করে, 'বিজয়া দশমীর' মিষ্টির মাধ্যমে|প্রকার যাই হোক না কেন, এই উৎসব সব ভারতীয়দের হৃদয় জুড়ে থাকে|

Monday, September 24, 2018

মহিষাসুরমর্দ্দিনী

মহিষাসুরমর্দ্দিনী (অর্থাৎ মহিষাসুরকে দমনকারী) হল ১৯৩১ সাল থেকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে আকাশবাণী বা অল ইন্ডিয়া রেডিওতে সম্প্রচারিত একটি বাংলা প্রভাতী বেতার অনুষ্ঠান। দেড় ঘণ্টার এই অনুষ্ঠানে রয়েছে শ্রীশ্রীচণ্ডী বা দুর্গা সপ্তশতী থেকে গৃহীত দেবী চণ্ডীর স্তোত্র বা চণ্ডীপাঠ, বাংলা ভক্তিগীতি, ধ্রুপদী সংগীত এবং পৌরাণিক কাহিনির নাট্যরূপ। অনুষ্ঠানটির একটি হিন্দি সংস্করণও তৈরি করা হয়, এবং বাংলা অনুষ্ঠান সম্প্রচার হওয়ার একই সময়ে সারা ভারতের শ্রোতাদের জন্য সম্প্রচার করা হয়। প্রতি বছর মহালয়ার ভোরে এই অনুষ্ঠান সম্প্রচারিত হয়। প্রথমদিকে অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচারিত হত, কিন্তু ১৯৬৬ সাল থেকে রেকর্ড করা পূর্বের অনুষ্ঠানই শোনানো হয়। এই অনুষ্ঠানটি এতটাই জনপ্রিয়তা পেয়েছিল যে, প্রায় ৮০ বছর পর আজও এর জনপ্রিয়তা তথা মহিমায় বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি।

দেবীপক্ষের সূচনায় মহালয়া অমাবস্যা ও দুর্গাপুজোর সাথে এই অনুষ্ঠানের নাড়ির যোগ। এই মহালয়ার পুণ্যলগ্নে শিশিরভেজা মৃদুশীতল ভোরে প্রায় প্রত্যেক বাঙালি জেগে ওঠেন এবং "মহিষাসুরমর্দ্দিনী" সম্প্রচার শুনবার জন্য উদ্গ্রীব হয়ে থাকেন। ইদানীং আকাশবাণীর স্বত্ব গ্রহণ করে এর রেকর্ডিং HMV-RPG-এর অডিও ক্যাসেট এবং কম্প্যাক্ট ডিস্ক রূপেও বিক্রি হচ্ছে। এর সিডি সংস্করণে (২০০২এ) ১৯টি ট্র্যাক আছে।

বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র
মহিষাসুরমর্দ্দিনী

মহিষাসুরমর্দ্দিনীর আড়ালে তাঁর মন্ত্রমুগ্ধকর কণ্ঠের জন্য এবং বাঙালির মহালয়ার প্রভাতকে মোহময় করে তোলার জন্য বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র চিরস্মরণীয় থাকবেন। এই কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী চমৎকারভাবে সংস্কৃত শ্লোক এবং দেবী দুর্গার মর্ত্যে অবতরণের কাহিনি ফুটিয়ে তুলেছেন। মহালয়া উপলক্ষ্যে দেবীপক্ষের সূচনায় দেব-দেবীরা শারদোৎসবের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করেন। ১৯৩১ সালে কলকাতার আকাশবাণী বেতারে প্রথম মহালয়া সম্প্রচারিত হয়। প্রেমাঙ্কুর আতর্থী, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র, নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় এবং রাইচাঁদ বড়াল এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন।

বীরেন্দ্রকৃষ্ণের জনপ্রিয়তা এতটাই তুঙ্গে উঠেছিল যে, ১৯৭৪ সালে বাংলার সর্বকালের সেরা অভিনেতা উত্তম কুমারকে দিয়ে সেই শ্লোকপাঠ করালে, আপামর শ্রোতা মেনে নেয়নি। বীরেন ভদ্র আবার স্বস্থানে সসম্মানে ফিরে আসেন।

বীরেন্দ্রের মৃত্যু হয়েছে অনেককাল হল, কিন্তু তাঁর কণ্ঠ ছাড়া মহালয়ার সকাল এখনও ভাবা যায় না। আশ্বিনের ভোরের দুটো ঘণ্টা তাঁর উদাত্ত কণ্ঠের উচ্চারণে নিমজ্জিত হয়, তাঁর শ্লোকপাঠে মন্ত্রমুগ্ধ বাঙালি দেবীর প্রতি সশ্রদ্ধ প্রণাম জানায়।

সংগীত
মহিষাসুরমর্দ্দিনী

পৌরাণিক পটভূমিতে আধারিত এবং বৈদিক মন্ত্র সমন্বিত হওয়া সত্ত্বেও এই অনুষ্ঠানটি একটি অতুল্য অদ্বিতীয় সৃষ্টি। এর রচনা করেছেন বাণী কুমার, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র করেছেন শ্লোকপাঠ এবং দ্বিজেন মুখোপাধ্যায় (জাগো দুর্গা দশপ্রহরণধারিণী), মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায় (তব অচিন্ত্য), সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, আরতি মুখোপাধ্যায়, উৎপলা সেন (শান্তি দিলে ভরি ), শ্যামল মিত্র (শুভ্র শঙ্খ-রবে)এবং সুপ্রীতি ঘোষ (বাজলো তোমার আলোর বেণু) তাঁদের মধুর স্বরে গান গেয়েছেন। সংগীত-পরিচালনা করেছেন পঙ্কজকুমার মল্লিক। অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার সাথে সাথে শঙ্খধ্বনিতে আকাশ-বাতাস মুখর হয়ে ওঠে।




Tuesday, September 11, 2018

দেবী পার্বতী

 পার্বতী  হলেন হিন্দু দেবী দুর্গার একটি রূপ। তিনি শিবের স্ত্রী এবং আদি পরাশক্তির এক পূর্ণ অবতার। অন্যান্য দেবীরা তাঁর অংশ থেকে জাত, বা তাঁর অবতার। পার্বতী মহাশক্তির অংশ। তিনি গৌরী নামেও পরিচিত। পার্বতী শিবের দ্বিতীয়া স্ত্রী। তবে তিনি শিবের প্রথমা স্ত্রী দাক্ষায়ণীরই অবতার। তিনি গণেশ ও কার্তিকের মা। কোনো কোনো সম্প্রদায়ে তাঁকে বিষ্ণুর ভগিনী মনে করা হয়। পার্বতী হিমালয়ের কন্যা। শিবের পাশে তাঁর যে মূর্তি দেখা যায়, সেগুলি দ্বিভূজা। তবে তাঁর একক মূর্তি চতুর্ভূজা, অষ্টভূজা বা দশভূজা হয়; এবং এই মূর্তিতে তাঁকে সিংহবাহিনী রূপে দেখানো হয়। সাধারণত তাঁকে দয়াময়ী দেবীর রূপেই দেখা হয়। তবে তাঁর কয়েকটি ভয়ংকরী মূর্তিও আছে। তাঁর দয়াময়ী মূর্তিগুলি হল কাত্যায়নী, মহাগৌরী, কমলাত্মিকা, ভুবনেশ্বরী ও ললিতা। অন্যদিকে তাঁর ভয়ংকরী রূপগুলি হল দুর্গা, কালী, তারা, চণ্ডী, দশমহাবিদ্যা ইত্যাদি।
দেবী পার্বতী

ব্যুৎপত্তি
চতুর্ভূজা ললিতা দেবীর রূপে পার্বতী, সঙ্গে তাঁর দুই পুত্র গণেশ ও স্কন্দ (কার্তিক), ওড়িশা, ভারত, একাদশ শতাব্দীর ভাস্কর্য, ব্রিটিশ মিউজিয়ামে রক্ষিত।টেমপ্লেট:British-Museum-db.
"পার্বতী" শব্দের অর্থ "পর্বতের কন্যা"। পার্বতী পর্বতের রাজা হিমালয়ের কন্যা বলে তাঁকে পার্বতী বলা হয়। হিমালয়ের কন্যা বলে তাঁর অন্য নাম "শৈলজা", "অদ্রিজা", "নগজা", "শৈলপুত্রী", "হৈমবতী", "গিরিজা" বা "গিরিজাপুত্রী"। কখনও কখনও পার্বতীকে "পবিত্রা"ও বলা হয়; কারণ, তাঁকে অপাপবিদ্ধা ও পবিত্র মনে করা হয়। শিব ও তাঁকে একত্রে শাক্ত সর্বোচ্চ ঈশ্বর আদি পরাশক্তির "সগুণ স্বরূপ" মনে করা হয়। শ্রীশ্রীচণ্ডী-তে তাঁর অনেকগুলি নামের উল্লেখ আছে। এগুলির মধ্যে দুর্গা, মহাশক্তি, অম্বিকা, গৌরী, ভৈরবী, কালী, উমা, ললিতা, মাতৃ, মাহেশ্বরী, ভবানী ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।ললিতা সহস্রনাম স্তবে পার্বতীর ১০০০টি নামের উল্লেখ আছে।

পার্বতীর সবচেয়ে বেশি পরিচিত দুটি নাম হল উমা ও অপর্ণা। কয়েকটি প্রাচীন ধর্মগ্রন্থে দাক্ষায়ণীকে উমা বলা হলেও, রামায়ণে পার্বতীকেই উমা বলা হয়েছে। হরিবংশ-এ পার্বতীকে প্রথমে "অপর্ণা" বলে, পরে "উমা" বলা হয়েছে। অপর্ণা শব্দের অর্থ, যিনি ঘোর তপস্যা করেছেন। পার্বতীর মা মেনকা তাঁর তপস্যা দেখে বলেছিলেন, "উ মা" (আর না)। সেই থেকে পার্বতীর অপর নাম উমা।

অন্যদিকে পার্বতী একসঙ্গে "গৌরী" (গৌরবর্ণা দেবী) এবং "কালী" বা "শ্যামা" (কৃষ্ণবর্ণা দেবী) নামে অভিহিত হন। কারণ, তিনি শান্ত স্ত্রী উমা। কিন্তু বিপদের সময় ভয়ংকরী কালী দেবীতে রূপান্তরিত হন। এই দুই পরস্পর বিপরীত রূপ পার্বতীর দুই রকম প্রকৃতির কথা নির্দেশ করে। আবার "কামাক্ষ্মী" রূপে তিনি ভক্তির দেবী।

উৎসব
গৌরীরূপে পূজিত পার্বতী
ভাদ্র মাসের শুক্লপক্ষের সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমী তিথিতে গৌরীপূজা হয়। তাঁকে শস্য ও নারীর রক্ষাকারী দেবী মনে করা হয়। গৌরীপূজাও সাধারণত মেয়েরাই করে। এই উৎসবটি পার্বতীর পূত্র গণেশের পূজার (গণেশ চতুর্থী) সঙ্গে যুক্ত। মহারাষ্ট্র ও কর্ণাটকে গৌরীপূজা খুব জনপ্রিয়।[৪] রাজস্থানে গঙ্গৌর উৎসবের সময় গৌরীপূজা হয়। চৈত্র মাসের প্রথম দিন পূজা শুরু হয় এবং ১৮দিন চলে। এই সময় মাটি দিয়ে ঈশ্বর আর গৌরীমূর্তি বানানো হয়। পার্বতী পূজার একটি বিশেষ উৎসব হল নবরাত্রি ও দুর্গাপূজা। এই সময় পার্বতীর সব কটি রূপকে পূজা করা হয়। উত্তর ভারতে নবরাত্রি উৎসবের সময় শৈলপুত্রী, ব্রহ্মচারিণী, চন্দ্রঘণ্টা, কুষ্মাণ্ডা, স্কন্দমাতা, কাত্যায়ানী, কালরাত্রি, মহাগৌরী ও সিদ্ধিদাত্রী - এই নবদুর্গার পূজা হয়।
চৈত্র ও বৈশাখ মাসের শুক্লা তৃতীয়ার দিন হয় "গৌরী তৃতীয়া"। হিন্দুরা বিশ্বাস করেন, এই সময় একমাস পার্বতী বাপের বাড়িতে থাকেন। মহারাষ্ট্র ও কর্ণাটকে এই উৎসব খুব জনপ্রিয়। উত্তর ভারতে এই উৎসব ততটা জনপ্রিয় নয়। পশ্চিমবঙ্গে এই উৎসব পালিতই হয় না। এই সময় সধবা মেয়েরা পিরামিড আকৃতির ধাপযুক্ত বেদী তৈরি করে তার উপরে পার্বতীর মূর্তি ও নিচে গয়নাগাটি, অন্যান্য দেবদেবীর মূর্তি ও ছবি ইত্যাদি রাখেন। রাতে প্রার্থনা করা হয়। তামিলনাড়ু ও অন্ধ্রপ্রদেশে দীপাবলির দিন কেতরা গৌরী বৃতাম উৎসব হয়। এইদিন সধবা মেয়েরা সারাদিন উপোষ করেন এবং মিষ্টি বানিয়ে বাড়ির সকলের মঙ্গল্যের জন্য দেবীকে মিষ্টি দিয়ে পূজা করেন।

মন্দির
কর্ণাটকের কল্লুর শহরে মুকাম্বিকা দেবী মন্দির হল পার্বতীর একটি বিখ্যাত মন্দির।

Monday, September 3, 2018

অষ্টলক্ষ্মী


অষ্টলক্ষ্মী

অষ্টলক্ষ্মী  হলেন হিন্দু সম্পদের দেবী লক্ষ্মীর আটটি বিশেষ রূপ। তাঁরা সম্পদের আট উৎস তথা লক্ষ্মীদেবীর শক্তির প্রতীক। অষ্টলক্ষ্মী লক্ষ্মীর অপ্রধান রূপভেদ। অষ্টলক্ষ্মী "সম্পদ" কথাটির অর্থ হল সমৃদ্ধি, সুস্বাস্থ্য, জ্ঞান, শক্তি, সন্তানাদি ও ক্ষমতা। মন্দিরে অষ্টলক্ষ্মীকে একযোগে পূজা করা হয়ে থাকে।


স্বরূপ
শ্রীঅষ্টলক্ষ্মীস্তোত্রম্ অনুযায়ী অষ্টলক্ষ্মী হলেন

আদিলক্ষ্মী  বা মহালক্ষ্মী  লক্ষ্মীর আদিরূপ এবং ঋষি ভৃগুর কন্যারূপে লক্ষ্মীর অবতার।
ধনলক্ষ্মী  লক্ষ্মীর অর্থ ও স্বর্ণদাত্রী রূপ।
ধান্যলক্ষ্মী   কৃষিসম্পদদাত্রী লক্ষ্মী।
গজলক্ষ্মী   গবাদি পশু ও হস্তীরূপ সম্পদদাত্রী লক্ষ্মী।স্বামী চিদানন্দের মতে গজলক্ষ্মী রাজক্ষমতা প্রদান করেন। হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী, গজলক্ষ্মী দেবরাজ ইন্দ্রকে সমুদ্রগর্ভ থেকে তাঁর হারানো সম্পদ ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। বসুধা নারায়ণ "গজলক্ষ্মী" শব্দটির ব্যাখ্যা করেছেন "গজ অর্থাৎ হাতিদের দ্বারা পূজিত লক্ষ্মী"।
সন্তানলক্ষ্মী   সন্তানপ্রদাত্রী লক্ষ্মী।
বীরলক্ষ্মী   বা ধৈর্যলক্ষ্মী যুদ্ধক্ষেত্রে বীরত্ব এবং জীবনের কঠিন সময়ে সাহস প্রদানকারী লক্ষ্মী।
বিজয়লক্ষ্মী  বা জয়লক্ষ্মী  বিজয় প্রদানকারিনী লক্ষ্মী, কেবলমাত্র যুদ্ধক্ষেত্রেই নয় বরং কঠিন সময়ে বাধাবিপত্তি জয় করে সাফল্য অর্জনের ক্ষেত্রেও।
বিদ্যালক্ষ্মী  , কলা ও বিজ্ঞানের জ্ঞানপ্রদানকারিনী লক্ষ্মী।
কোনো কোনো অষ্টলক্ষ্মী তালিকায় লক্ষ্মীর অন্যান্য কয়েকটি রূপও অন্তর্ভুক্ত করা হয়ে থাকে:

ঐশ্বর্যলক্ষ্মী  ঐশ্বর্যপ্রদাত্রী লক্ষ্মী।
সৌভাগ্যা  সৌভাগ্য প্রদানকারিনী।
রাজ্যলক্ষ্মী "যিনি শাসককে আশীর্বাদ করেন।
বরলক্ষ্মী যে দেবী সুন্দর বর প্রদান করেন।

 
Design by দেবীমা | Bloggerized by Lasantha - Premium Blogger Themes | Facebook Themes