Pages

Monday, March 19, 2018

চামুণ্ডেস্বরী দেবী কালীর অপর রূপ মনে করা হয়



চামুণ্ডা হলেন একজন হিন্দু দেবী। তিনি সপ্ত মাতৃকার অন্যতম। তাঁর অপর নাম চামুণ্ডী, চামুণ্ডেশ্বরী ও চর্চিকা। দেবী দুর্গার তন্ত্রে উল্লিখিত চৌষট্টি বা চুরাশি জন সহচরী বা যোগিনীর অন্যতম হলেন চামুণ্ডা। চণ্ড ও মুণ্ড নামে দুই অসুরকে হত্যা করে তিনি ‘চামুণ্ডা’ নামে পরিচিত হন। চামুণ্ডাকে দেবী কালীর অপর রূপ মনে করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে পার্বতী, চণ্ডী বা দুর্গাকেও চামুণ্ডা বলা হয়। কথিত আছে, চামুণ্ডার আবাসস্থল হল শ্মশানভূমি বা ডুমুর গাছ। আনুষ্ঠানিকভাবে পশুবলি দিয়ে ও মদ নিবেদন করে এই দেবীর পূজা করা হয়। প্রাচীনকালে চামুণ্ডার পূজায় নরবলিও দেওয়া হত।
চামুণ্ডা প্রকৃতপক্ষে একজন আদিবাসী দেবী ছিলেন। পরবর্তীকালে তাঁকে হিন্দুধর্মে গ্রহণ করা হয় এবং তারও পরে চামুণ্ডা হিন্দু দেবমণ্ডলীতে স্থান পান। জৈনধর্মেও চামুণ্ডার পূজা প্রচলিত আছে। তবে জৈনরা মদ ও মাংসের পরিবর্তে নিরামিষ নৈবেদ্য নিবেদন করে তাঁর পূজা করেন।

রামকৃষ্ণ ভাণ্ডারকরের মতে, চামুণ্ডা প্রকৃতপক্ষে মধ্যভারতের বিন্ধ্য অঞ্চলের অরণ্যচারী উপজাতি সমাজে পূজিত দেবী। এই সকল উপজাতিগুলির মধ্যে চামুণ্ডার উদ্দেশ্যে পশু ও নরবলি প্রদান এবং মদ উৎসর্গের প্রথা বিদ্যমান ছিল। হিন্দু দেবমণ্ডলীতে স্থানলাভের পরেও, চামুণ্ডার তান্ত্রিক উপাসনায় এই সকল প্রথা থেকেই যায়। ভাণ্ডারকরের মতে, চামুণ্ডার ভয়াল রূপের কারণ হল, বৈদিক দেবতা রুদ্র (আধুনিক হিন্দুধর্মে শিব) বা কখনও কখনও অগ্নির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক স্থাপন।ওয়াঙ্গুও দেবীর উপজাতীয় উৎস সংক্রান্ত তত্ত্বটিকে সমর্থন করেন।

দেবী চামুণ্ডা রক্ত অথবা কৃষ্ণবর্ণা; নরমুণ্ডমালা শোভিতা; বর্ণনাভেদে চতুঃ, অষ্ট, দশ বা দ্বাদশভূজা; ডমরু, ত্রিশূল, খড়্গ, সর্প, খট্বাঙ্গ, বজ্র, ছিন্নমুণ্ড ও রক্তপূর্ণ পানপাত্র ধারিণী; শব অথবা প্রেতের উপর উপবিষ্টা অথবা পরাভূত দৈত্য বা প্রেতাসনে স্থিতা; ত্রিনয়না; কঙ্কালসার দেহ, ভয়াল মুখমণ্ডল, লম্বিত স্তন, সম্মুখপ্রসারিত দন্তপংক্তি, দীর্ঘ নখর ও স্ফীত উদর যুক্তা; অস্থি, কঙ্কাল, সর্প ও বিছের অলংকারে ভূষিতা, যা ব্যাধি ও মৃত্যুর প্রতীক; নরকরোটীর যজ্ঞোপবীত ধারিণী; মস্তকে জটার মুকুট এবং কোনো কোনো বর্ণনানুসারে মস্তকে অর্ধচন্দ্র শোভিতা। তিনি তাঁর কোটরগত চক্ষু দ্বারা জগৎ ভষ্মীভূত করেন। ভূত ও প্রেতগণ তাঁর সঙ্গী। বিভিন্ন বর্ণনায় নরকঙ্কাল ও শৃগালাদি পশুও তাঁকে বেষ্টন করে থাকে। যে শবের উপর দেবী উপবিষ্ট থাকেন, তাঁর শৃগালের দল সেই শবের মাংস ভক্ষণ করে। চামুণ্ডা তাঁর পরাজিত শত্রুদের রক্ত পান করেন। সেই শত্রু দৈত্যদের ছিন্ন মুণ্ড থেকে পতিত রক্ত তাঁর সহচর প্রেত ও শৃগালেরাও পান করে থাকে। সকল মাতৃকাই, বিশেষত চামুণ্ডা, রক্তপান করে থাকেন। কোনো কোনো মতে, তিনি তাঁর বাহন পেচকের পৃষ্ঠে আরোহণ করেন। তাঁর ধ্বজায় বাজপাখির চিত্র অঙ্কিত।
দেবীমাহাত্ম্যম্ অনুসারে দেবী দুর্গার অঙ্গজাত দেবী কৌশিকীর ভ্রুকুটিকুটিল ললাটফলক থেকে কালীর আবির্ভাব হয়। অসুররাজ শুম্ভ ও নিশুম্ভের দুই সেনানায়ক চণ্ড ও মুণ্ড নিধনের দায়িত্ব তাঁর উপর অর্পিত হয়। দেবী চণ্ডিকা সেই দৈত্যদ্বয়ের সঙ্গে প্রচণ্ড যুদ্ধে লিপ্ত হন এবং শেষ পর্যন্ত তাদের বধ করতে সমর্থ হন। এরপর তিনি নিহত অসুরদ্বয়ের ছিন্ন মুণ্ডদুটি দেবী কৌশিকীর কাছে নিয়ে গেলে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত হন এবং চণ্ড ও মুণ্ড বধের স্বীকৃতি স্বরূপ কালীকে চামুণ্ডা নাম প্রদান করেন।

দেবীমাহাত্ম্যমের পরবর্তী একটি অধ্যায় থেকে জানা যায়, শুম্ভনিশুম্ভের সৈন্যবধের উদ্দেশ্যে দেবী দুর্গা নিজ দেহ থেকে মাতৃকাগণের সৃষ্টি করেন। এই অধ্যায়ে, কালীকে মাতৃকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনিই রক্তবীজ দৈত্যের রক্তপান করে চামুণ্ডা নামে অভিহিতা হন।এইভাবে দেবীমাহাত্ম্যম্-এ দেবী কালীর সঙ্গে দেবী চামুণ্ডার একত্ব প্রতিপন্ন করা হয়েছে।

বরাহ পুরাণেও রক্তবীজের উপাখ্যানটি কথিত হয়েছে। কিন্তু এই কাহিনি অনুসারে, মাতৃকারা একে অন্যের দেহ থেকে উৎপন্ন হয়েছিলেন। চামুণ্ডা উৎপন্ন হন দেবী নারসিংহীর পা থেকে। এই গ্রন্থে দেবী চামুণ্ডা পসুন্য বা বিরাট মিথ্যাভাষণ দোষের প্রতীক। বরাহ পুরাণে অবশ্য কালী ও চামুণ্ডাকে দুই পৃথক দেবী রূপে উল্লেখ করা হয়, যা দেবীমাহাত্ম্যম্-এ করা হয়নি।

অপর একটি কিংবদন্তি অনুসারে, দেবী পার্বতীর ভ্রুকুটি থেকে চণ্ড ও মুণ্ড বধের নিমিত্ত দেবী চামুণ্ডার উৎপত্তি হয়। এই কারণে তিনি পার্বতীর একটি রূপ।

মৎস্য পুরাণ থেকে অবশ্য চামুণ্ডার উৎপত্তি সংক্রান্ত একটি সম্পূর্ণ পৃথক কাহিনি পাওয়া যায়। এই উপাখ্যান অনুসারে, অন্ধকাসুর বধের সুবিধার্থে শিবই মাতৃকাগণের সৃষ্টি করেন। রক্তবীজের মতো অন্ধকাসুরেরও ভূপতিত রক্তবিন্দু থেকে অসুর সৃষ্টির ক্ষমতা ছিল। চামুণ্ডা ও অন্যান্য মাতৃকাগণ তার রক্ত পান করে, শিবকে অসুরবধে সাহায্য করেন।

রত্নাকরের হরবিজয় গ্রন্থেও চামুণ্ডার এই কৃতিত্বের উল্লেখ রয়েছে। তবে রত্নাকর লিখেছেন যে, চামুণ্ডা একাই অন্ধকের রক্ত পান করেন এবং রক্তপানের ফলে তাঁর গাত্রবর্ণও রক্তের মতো লাল হয়ে যায়। এই গ্রন্থে আরও লেখা আছে যে, প্রলয়কালে চামুণ্ডা এক বিরাট বীণা বাজিয়ে নৃত্য করেছিলেন; এই বীণার দণ্ডটি ছিল মেরু পর্বত, তার ছিল শেষনাগ ও তুম্বাটি ছিল অর্ধচন্দ্র।

মহাভারত (বনপর্ব), দেবীপুরাণ ও বিষ্ণুধর্মোত্তর পুরাণ অনুযায়ী, চামুণ্ডা সপ্তমাতৃকার অন্যতম। ইলোরা ও এলিফান্টা গুহাচিত্র সহ একাধিক ভাস্কর্যে সপ্তমাতৃকার মধ্যেই তাঁর মূর্তি অঙ্কিত হয়েছে। কোথাও কোথাও তাঁকে সপ্তমাতৃকার শেষ মাতৃকারূপে কল্পনা করা হলেও, অনেক স্থলেই তাঁকে সপ্তমাতৃকার নেতৃস্থানে রাখা হয়েছে।অন্যান্য মাতৃকাগণ কোনো না কোনো পুরুষ দেবতার শক্তিরূপে কল্পিত, কিন্তু চামুণ্ডাই একমাত্র মাতৃকা যিনি স্বয়ং দিব্যজননীর শক্তি। তাছাড়া অন্যান্য মাতৃকাদের একক পূজার প্রচলন নেই, কিন্তু চামুণ্ডার আছে।

দেবীপুরাণ অনুযায়ী, অসুর নিধনকালে পঞ্চমাতৃকা গণেশকে সাহায্য করেছিলেন। মাণ্ডব্য ঋষি যে মাতৃপঞ্চকের পূজার বর্ণনা দিয়েছেন, চামুণ্ডা তাঁদের অন্যতমা। কথিত আছে, ব্রহ্মা রাজা হরিশ্চন্দ্রকে বিপদের হাত থেকে রক্ষা করতে মাতৃকাদের নিয়োগ করেন। দেবীপুরাণে চামুণ্ডা নামের একটি ভিন্নতর ব্যাখ্যাও পাওয়া যায়: এখানে চণ্ড শব্দের অর্থ ভয়ংকর ও মুণ্ড শব্দের অর্থ ব্রহ্মার মস্তক বা প্রভু বা পতি।
বিষ্ণুধর্মোত্তর পুরাণে মাতৃকারা পাপের প্রতীক। এই পুরাণে চামুণ্ডা অনৈতিকতার প্রতীক। প্রত্যেক মাতৃকা এক একটি দিকে রক্ষাকর্ত্রী। চামুণ্ডা দক্ষিণ-পূর্বের রক্ষাকর্ত্রী

মাতৃকারূপে চামুণ্ডা অন্যতম প্রধানা যোগিনী রূপে কল্পিত হন। এই যোগিনীগণ আসলে মাতৃকাদের কন্যা অথবা রূপান্তর। চৌষট্টি যোগিনীর মধ্যে তিনি অপর সাত জন যোগিনীর সৃষ্টিকারিণী এবং তাঁদের সঙ্গে অষ্টমাতৃকা নামে পরিচিত। অপর মতে, একাশি যোগিনীর মধ্যে তিনি নয় জনকে সৃষ্টি করেন।

একটি দক্ষিণ ভারতীয় লেখ থেকে জানা যায়, চামুণ্ডা পূজায় মেষ বলি দেওয়া হত। খ্রিষ্টীয় অষ্টম শতাব্দীতে রচিত ভবভূতির সংস্কৃত নাটক মালতীমাধবে দেবীর এক ভক্ত শ্মশানের নিকটে অবস্থিত চামুণ্ডার মন্দিরে নায়িকাকে বলি দিতে গিয়েছিলেন। রাজস্থানের গঙ্গাধরে প্রাপ্ত একটি শিলালিপি থেকে দেবী চামুণ্ডা ও অন্যান্য মাতৃকাদের এক মন্দিরের কথা জানা যায়। এই মন্দিরে "ডাকিনীরা থাকতেন" এবং বলি ইত্যাদি তন্ত্রোভূত বা তান্ত্রিক পূজানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হত।

অনেক ক্ষত্রিয় ও জৈন পরিবারে চামুণ্ডা কূলদেবী রূপে পূজিতা হন। চওডা রাজবংশের কূলদেবী ছিলেন চামুণ্ডা। চওডাদের অপর শাখা কচ্ছ গুজ্জর ক্ষত্রিয়রাও তাঁকে কূলদেবী রূপে পূজা করতেন। সিনুগ্রা ও চণ্ডিয়ায় তাঁদের নির্মিত চামুণ্ডা মন্দির রয়েছে

 
Design by দেবীমা | Bloggerized by Lasantha - Premium Blogger Themes | Facebook Themes