Pages

Tuesday, July 31, 2018

মা বিশালাক্ষী

বিশালাক্ষী একজন হিন্দু দেবী। তিনি শিবের স্ত্রী সতীর এক রূপ। ভারতের বারাণসী শহরের বিশ্বনাথ মন্দিরের পশ্চাদে মীরঘাটে বিশালাক্ষী দেবীর প্রধান মন্দিরটি অবস্থিত। হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী এই মন্দির পুরাণে উল্লিখিত ৫১ শক্তিপীঠের অন্যতম। পশ্চিমবঙ্গের একাধিক অঞ্চলেও দেবী বিশালাক্ষীর মন্দির দেখা যায়।

পৌরাণিক উপাখ্যান

কথিত আছে, বিষ্ণুর সুদর্শন চক্রে সতীর দেহ ছিন্নভিন্ন হওয়ার সময় দেবীর কর্ণ ও কুণ্ডল এখানে পতিত হয়েছিল। সেই কারণে দেবী এখানে মণিকর্ণি নামেও পরিচিত। তবে কোনো কোনো পণ্ডিত মনে করেন, কর্ণকুণ্ডল অলংকারমাত্র, তা দেহের অঙ্গ নয়। তাই এই মন্দিরকে শক্তিপীঠ না বলে উপপীঠ বলাই শ্রেয়। অন্য একটি কাহিনিসূত্র থেকে জানা যায়, এই মন্দির একটি শক্তিপীঠ। কারণ এখানে দেবীর তিন অক্ষি বা চোখের একটি পতিত হয়েছিল। দেবীর দিব্যচক্ষু সমগ্র বিশ্বকে দেখতে পায়, তাই দেবীর নাম এখানে বিশালাক্ষী। এই পীঠের শিব কালভৈরব নামে পরিচিত।

Saturday, July 28, 2018

লক্ষ্মীদেবী

‘লক্ষ্মী মানে শ্রী, সুরুচি। লক্ষ্মীসম্পদ আর সৌন্দর্যের দেবী। বৈদিক যুগে মহাশক্তি হিসেবে তাকে পুজো করা হত। তবে পরবর্তীকালে ধনশক্তির মূর্তি নারায়ণের সঙ্গে তাকে জুড়ে দেওয়া হয়,’—বলছেন নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী।
ধন ও সৌভাগ্যের দেবী মা লক্ষ্মী। অবাঙালিদের মধ্যে লক্ষ্মীপূজার রেওয়াজ কালীপূজা বা দিওয়ালির দিনে। কিন্তু বাঙালির ঘরে ঘরে মা লক্ষ্মী পূজিতা হন দেবীপক্ষের শেষের এই পূর্ণিমাতে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে এবং বাংলাদেশে কোজাগরী লক্ষ্মীপূজার চল রয়েছে। তবে রীতিতে ফারাক রয়েছে দুই বাংলার। পশ্চিমবঙ্গে পূজা হয় মূলত মাটির প্রতিমায়, কিন্তু বাংলাদেশে প্রধানত সরায় এঁকে লক্ষ্মীর পূজা করা হয়।
কিভাবে হয় এই কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা? আশ্বিন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে অর্থাৎ কোজাগরী পূর্ণিমায় দেবী লক্ষ্মীর আরাধনা করা হয়। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘বাংলার ব্রত’ বইতে এই লক্ষ্মীপূজা সম্পর্কে বিস্তৃত আলোচনা করেছেন। সেখানে তিনি জানান, দেবীর কাছে ভালো ফলনের কামনা করাই আসলে এই পূজার নৃতাত্ত্বিক কারণ। পূজা বা ব্রত কথার সঙ্গে আলপনার একটি  সম্পর্ক রয়েছে। আলপনা আসলে ‘কামনার প্রতিচ্ছবি।’ দেবী পূজা উপাচার হিসেবে থাকে ফল, মিষ্টি, মোয়া, নাড়ু প্রভৃতি। কোজাগরী লক্ষ্মীর প্রতি আচার নিবেদনের সঙ্গেও একটি লোকবিশ্বাস জড়িত রয়েছে। পূজার সময় মোট ১৪টি পাত্রে উপাচার রাখা হয়। তারপর পূর্বপুরুষদের উদ্দেশে জল দানের রীতি রয়েছে। কাঠের জলচৌকির ওপর লক্ষ্মীর সরাটিকে স্থাপন করা হয়। এরপর কলাপাতায় টাকা, স্বর্ণ মুদ্রা, ধান, পান, কড়ি, হলুদ ও হরিতকি দিয়ে সাজানো হয় পূজার স্থানটিকে।
সব দেবদেবীরই বিভিন্ন যুগে নানা বিবর্তন হয়েছে। ঋষিরা তো এক জায়গায় বসে, কমিটি গঠন করে দেবদেবীদের নির্দিষ্ট রূপ ও গুণাবলির কথা রচনা করেননি। নানা জনে আলাদাভাবে ইচ্ছে মতো শ্লোক লিখেছেন। যুগ যুগ ধরে সেই সব পৃথক ভাবমূর্তি একটি মিলিত রূপ পেয়েছে। লক্ষ্মীও তার ব্যতিক্রম নন।
বৈদিক শাস্ত্র ও বিভিন্ন পুরাণ অনুসারে লক্ষ্মীর উদ্ভব ও পরিচিতি নিয়ে নানা রকম ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। কিছু পুরাণ অনুযায়ী লক্ষ্মী দেবসেনা রূপে জন্ম নিয়ে কার্তিকেয়র পত্নী হন। আবার কিছু পুরাণ মতে তিনি গণেশপত্নী। নদীরূপিনী সরস্বতীই আদিতে উর্বরতা ও শস্যদায়িনী দেবী। পরে লক্ষ্মী-সরস্বতী একইরূপে গণ্য হওয়ার সময় থেকে শস্য ও সম্পদের দেবী হিসেবে লক্ষ্মীকে গণ্য করা আরম্ভ হয়। আবার শস্যের দেবী হিসেবে গণ্য হওয়ার কারণে লক্ষ্মীকে ধরিত্রী বা বসুমতী হিসেবেও ভাবা শুরু হয়।

বৈদিক লক্ষ্মী কিন্তু শস্য-সম্পদের দেবী ছিলেন না। বরং নদীরূপিনী সরস্বতী শস্যদাত্রী হিসেবে গণ্য হতেন। কেন? নদী পলি মাটি ভরাট করে উর্বর করত ভূ-তট। এর পরে তো বৈদিক আর্যরা চাষাবাদ শিখল 'নিম্নবর্গ'-এর কাছে। সম্পদ এলো আর্যদের হাতে। শাসক বা শোষক হলেন তারা। আবার লক্ষ্মীর স্বামী একটা কাঁচা কাজ করে ফেললেন। কেমন কাঁচা? বেদম কাঁচা। দুর্বাসা মুনি, যিনি শুধু অভিশাপ দেওয়ার জন্যই বিখ্যাত, তার অন্য কোনও গুণের কথা বিশেষ জানা যায় না, তিনি এক দিন একটা পারিজাত ফুলের মালা উপহার দিলেন ইন্দ্রকে। এরপর ইন্দ্র যখন রম্ভা-সম্ভোগে মত্ত, ওই মালা নিজের বাহন ঐরাবতের গলায় ছুড়ে দেন। হাতি তো মালার কদর বোঝে না। তাছাড়া ঐরাবতের বোধহয় মালাটি পছন্দ হয়নি, মাথা ঝাঁকিয়ে সেটা সে ফেলে দিল মাটিতে। তারপর পা দিয়ে চেপ্টে দিল। ব্যস! রগচটা স্বভাবের ঋষি অমনি জ্বলে উঠে উচ্চারণ করলেন অভিশাপ। অদ্ভুত সেই অভিশাপ। তিনি বললেন, কী! আমার দেওয়া মালা মাটিতে ফেলে দিলে, তাই তোমার ত্রিলোক এখন লক্ষ্মীছাড়া হবে। অর্থাৎ, লক্ষ্মীর নির্বাসন। দোষ করলেন ইন্দ্র, শাস্তি পেতে হবে লক্ষ্মীকে! অভিশাপে ইন্দ্রের ইন্দ্রপুরী হলো শ্রীহীন, লক্ষ্মীছাড়া দশা। স্ত্রী লক্ষ্মী, ইন্দ্রের অনুমতি নিয়ে পাতালে, মানে সমুদ্রে প্রবেশ করলেন।

পরে দেবতাদের ব্যকুল প্রার্থনায় বিষ্ণু পরামর্শ দিলেন সমুদ্র মন্থনের। মন্থনের পর যিনি রত্নাকর থেকে উত্থিতা হলেন, তিনি কিন্তু লক্ষ্মী নন। সেই দেবীর নাম শ্রী। এই শ্রী ও লক্ষ্মী দুই পৃথক দেবী ছিলেন। বেশ কিছু কাল পরে দুজনে মিলেমিশে এক হয়ে যান। লক্ষ্মী দেবী ছিলেন  ভৃগুর কন্যা, মায়ের নাম খ্যাতি। তার এক হাতে পদ্ম, আরেক হাতে অমৃতের কলস। তার রূপে-গুণে আকৃষ্ট হয়ে দেব-দানবের মধ্যে যুদ্ধ লেগে যায়। শেষ পর্যন্ত ছলে বলে বিষ্ণু তাকে পত্নীরূপে গ্রহণ করেন। লক্ষ্মী ও শ্রী একাকার হয়ে বিষ্ণুর পত্নী হন। তিনি পদ্মাসনা আর বাহন শ্বেত পেঁচা। তবে উপপুরাণের অর্বাচীন পৃষ্ঠায় লক্ষ্মী একবার তুলসী, একবার ঘোটকী হয়েও জন্মান। জ্যোৎস্না প্লাবিত এই পৃথিবীর হেমন্তে আসেন শুধু একটি রাতের অতিথি হয়ে।

দুর্গাপূজা যেমন মূলত বারোয়ারি, লক্ষ্মীপূজা গৃহস্থের পূজা। যে রাতে লক্ষ্মীর পূজা হয়, সেটি হলো কোজাগরী পূর্ণিমা। কো জাগতী– অর্থাৎ কে জেগে আছ–কথাটি থেকে কোজাগরী। কোজাগর মানে, ‘কে জাগে?’ যার নেই সে পাওয়ার আশায় জাগে। যার প্রচুর আছে সে হারানোর ভয়ে জাগে! ভক্তদের বিশ্বাস, পূজার পর ওই রাতেই নাকি মা ঘরে ঘরে উঁকি দিয়ে দেখেন কে জেগে আছে। আর যে জেগে থাকে, তার হাতেই ধরিয়ে দেন ধন সম্পদে পরিপূর্ণ ঝাঁপিখানি। লক্ষ্মীপুজোয় যে আল্পনা দেওয়া হয়, তাতে মায়ের পায়ের ছাপও আঁকা হয়। বিশ্বাস ওই পথেই মা ঢুকবেন গৃহস্থের ঘরে।

লক্ষ্মী চঞ্চলা। তবে ক্রোধী দেবী নন। তাই যেকোনও গৃহস্থই লক্ষ্মীর ঝাঁপি করে লক্ষ্মীর পিঁড়ি পাতেন গৃহকোণে। স্থানাভাবে একটি মাত্র ঘরের কুলুঙ্গিতে। উপাচার তো সামান্যই। প্রতি বৃহস্পতিবারে (লক্ষ্মীবার শব্দটি ব্যবহৃত) সামান্য ফুল-বাতাসা আর ধোয়া পিঁড়িতে চাল পিটুলির আলপনা। সেটাই একটু বড় আকারের এই কোজাগরীর রাতে।

আসলে লক্ষ্মী হলো বাঙালির দেবী। লৈকিক দেবী। আগে আমাদের সমাজে বিশেষ করে গ্রামে দুর্গাপূজা নিয়ে এত মাতামাতি ছিল না। বরং কোজাগরী লক্ষ্মীপূজাই ছিল বড় উৎসব। কোজাগরীর রকমফের ছিল দেখার মতো। ছড়া কেটেই মা লক্ষ্মীকে আবাহন করত গৃহস্থ। করজোড়ে বাড়ির নারীরা একসঙ্গে বলতেন, ‘আঁকিলাম পদ দু’টি, তাই মাগো নিই লুটি। দিবারাত পা দু’টি ধরি, বন্দনা করি। আঁকি মাগো আল্পনা, এই পূজা এই বন্দনা।’ সব ছড়ার মধ্যেই থাকে বাসনা, অভিমান এবং আকাঙ্ক্ষা। পেঁচা, কড়ি, ধানের গোলা আঁকার সঙ্গে সঙ্গে তাই ছড়া কাটা হতো। ‘আমি আঁকি পিটুলির গোলা, আমার হোক ধানের গোলা।  আমি আঁকি পিটুলির বালা, আমার হোক সোনার বালা।’ সেই সঙ্গে থাকে মন শুদ্ধ করার বার্তাও। ‘আঁকিলাম আল্পনা, দূরে ফেলি আবর্জনা। শুভ-শুদ্ধ মন নিয়ে, করি তব আরাধনা।’

মৈমনসিংহ গীতিকার মতো প্রাচীন বাংলা সাহিত্যে লক্ষ্মীপূজার উল্লেখ দেখে বোঝা যায়, সেকালে এই পূজার জনপ্রিয়তা কতটা ছিল।  নীহাররঞ্জন রায় তার ‘বাঙালীর ইতিহাস’-গ্রন্থে  লিখেছেন, ‘আমাদের লক্ষ্মীর পৃথক মূর্তিপূজা খুব সুপ্রচলিত নয়।...আমাদের লোকধর্মে লক্ষ্মীর আর একটি পরিচয় আমরা জানি এবং তাঁহার পূজা বাঙালী সমাজে নারীদের মধ্যে বহুল প্রচলিত। এই লক্ষ্মী কৃষি সমাজের মানস-কল্পনার সৃষ্টি; শস্য-প্রাচূর্যের এবং সমৃদ্ধির তিনি দেবী। এই লক্ষ্মীর পূজা ঘটলক্ষ্মী বা ধান্যশীর্ষপূর্ণ চিত্রাঙ্কিত ঘটের পূজা...। বাঙালী হিন্দুর ঘরে ঘরে নারীসমাজে সে পুজা আজও অব্যাহত। বস্তুত, দ্বাদশ শতক পর্যন্ত শারদীয়া কোজাগর উৎসবের সঙ্গে লক্ষ্মীদেবীর পূজার কোনও সম্পর্কই ছিল না।’

লক্ষ্মীপূজা আমাদের জীবনে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আসলে কেবল টাকাকড়িই ধন নয়। চরিত্রধন মানুষের মহাধন। যার টাকাকড়ি নেই সে যেমন লক্ষ্মীহীন, যার চরিত্রধন নেই সে তেমনি লক্ষ্মীছাড়া। যারা সাধক তারা লক্ষ্মীর আরাধনা করেন মুক্তিধন লাভের জন্য। লক্ষ্মীর বাহন পেঁচা কেন? কেউ কেউ বলেন, লক্ষ্মীর দেওয়া ধন যারা অপব্যবহার করে, তাদের কপালে লেখা আছে যমের দণ্ড—এই কথা ঘোষণা করে লক্ষ্মীর বাহন। তাই কথায় বলে, ‘লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু’। এছাড়া ধনসম্পত্তি, সে টাকাকড়ি হোক বা সাধনধনই হোক, সদাজাগ্রত অবস্থায় রক্ষা করতে হয়। রাতে সবাই যখন ঘুমায়, তখন পেঁচা জেগে থাকে। পেঁচাই সেই ধনসম্পদ পাহারা দেয়।

Thursday, July 26, 2018

সরস্বতী দেবী

সরস্বতী  হলেন জ্ঞান, সংগীত, শিল্পকলা, বুদ্ধি ও বিদ্যার হিন্দু দেবী। তিনি সরস্বতী-লক্ষ্মী-পার্বতী এই ত্রিদেবীর অন্যতম। এই ত্রিদেবীর কাজ হল ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিবকে যথাক্রমে জগৎ সৃষ্টি পালন করতে সাহায্য করা। সরস্বতীর প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় ঋগ্বেদে। বৈদিক যুগ থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত তিনি হিন্দুধর্মের একজন গুরুত্বপূর্ণ দেবী। হিন্দুরা বসন্তপঞ্চমী (মাঘ মাসের শুক্লাপঞ্চমী তিথি) তিথিতে সরস্বতী পূজা করে। এই দিন ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েদের হাতেখড়ি হয়। বৌদ্ধ ও পশ্চিম ও মধ্য ভারতে জৈনরাও সরস্বতীর পূজা করেন। জ্ঞান, সংগীত ও শিল্পকলার দেবী হিসেবে ভারতের বাইরে জাপান, ভিয়েতনাম, বালি (ইন্দোনেশিয়া) ও মায়ানমারেও সরস্বতী পূজার চল আছে।
প্রতিমাকল্প
ধ্যানমন্ত্রে বর্ণিত প্রতিমাকল্পটিতে দেবী সরস্বতীকে শ্বেতবর্ণা, শ্বেত পদ্মে আসীনা, মুক্তার হারে ভুষিতা, পদ্মলোচনা ও বীণাপুস্তকধারিণী এক দিব্য নারীমূর্তিরূপে কল্পনা করা হয়েছে। বলা হয়েছে,

 ওঁ তরুণশকলমিন্দোর্বিভ্রতী শুভ্রকান্তিঃ
 কুচভরনমিতাঙ্গী সন্নিষণ্ণা সিতাব্জে।                        নিজকরকমলোদ্যল্লেখনীপুস্তকশ্রীঃ
 সকলবিভবসিদ্ধৈ পাতু বাগ্দেবতা নঃ।।

অর্থাৎ, “চন্দ্রের নূতন কলাধারিণী, শুভ্রকান্তি, কুচভরনমিতাঙ্গী, শ্বেত পদ্মাসনে (উত্তমরূপে) আসীনা, হস্তে ধৃত লেখনী ও পুস্তকের দ্বারা শোভমানা বাগ্‌দেবী সকল বিভবপ্রাপ্তির জন্য আমাদিগকে রক্ষা করুন।”
আবার পদ্মপুরাণ-এ উল্লিখিত সরস্বতীস্তোত্রম্-এ বর্ণিত হয়েছে,

  শ্বেতপদ্মাসনা দেবী শ্বেতপুষ্পোপশোভিতা।
   শ্বেতাম্বরধরা নিত্যা শ্বেতগন্ধানুলেপনা।।১
   শ্বেতাক্ষসূত্রহস্তা চ শ্বেতচন্দনচর্চিতা।
   শ্বেতবীণাধরা শুভ্রা শ্বেতালঙ্কারভূষিতা।।২

অর্থাৎ, “দেবী সরস্বতী আদ্যন্তবিহীনা, শ্বেতপদ্মে আসীনা, শ্বেতপুষ্পে শোভিতা, শ্বেতবস্ত্র-পরিহিতা এবং শ্বেতগন্ধে অনুলিপ্তা। অধিকন্তু তাঁহার হস্তে শ্বেত রুদ্রাক্ষের মালা; তিনি শ্বেতচন্দনে চর্চিতা, শ্বেতবীণাধারিণী, শুভ্রবর্ণা এবং শ্বেত অলঙ্কারে ভূষিতা।

ধ্যান বা স্তোত্রবন্দনায় উল্লেখ না থাকলেও সরস্বতী ক্ষেত্রভেদে দ্বিভূজা অথবা চতুর্ভূজা এবং মরালবাহনা অথবা ময়ূরবাহনা। উত্তর ও দক্ষিণ ভারতে সাধারণত ময়ূরবাহনা চতুর্ভূজা সরস্বতী পূজিত হন। ইনি অক্ষমালা, কমণ্ডলু, বীণা ও বেদপুস্তকধারিণী। বাংলা তথা পূর্বভারতে সরস্বতী দ্বিভূজা ও রাজহংসের পৃষ্ঠে আসীনা।
বঙ্গভূমে শ্রী শ্রী সরস্বতী পুষ্পাঞ্জলী মন্ত্রঃ
ওঁ জয় জয় দেবী চরাচর সারে, কুচযুগশোভিত মুক্তাহারে। বীনারঞ্জিত পুস্তক হস্তে, ভগবতী ভারতী দেবী নমহস্তুতে।। নমঃভদ্রকাল্যৈ নমো নিত্যং সরস্বত্যৈ নমো নমঃ। বেদ-বেদাঙ্গ-বেদান্ত-বিদ্যা-স্থানেভ্য এব চ।। এস স-চন্দন পুষ্পবিল্ব পত্রাঞ্জলি সরস্বতৈ নমঃ।।
প্রনাম মন্ত্রঃ নমো সরস্বতী মহাভাগে বিদ্যে কমললোচনে। বিশ্বরূপে বিশালাক্ষ্মী বিদ্যাংদেহি নমোহস্তুতে।। জয় জয় দেবী চরাচর সারে, কুচযুগশোভিত মুক্তাহারে। বীনারঞ্জিত পুস্তক হস্তে, ভগবতী ভারতী দেবী নমহস্তুতে।।
সরস্বতীর স্তবঃ শ্বেতপদ্মাসনা দেবী শ্বেত পুষ্পোপশোভিতা। শ্বেতাম্ভরধরা নিত্যা শ্বেতাগন্ধানুলেপনা।। শ্বেতাক্ষসূত্রহস্তা চ শ্বেতচন্দনচর্চ্চিতা। শ্বেতবীণাধরা শুভ্রা শ্বেতালঙ্কারব‌ভূষিতা বন্দিতা সিদ্ধগন্ধর্ব্বৈর্চ্চিতা দেবদানবৈঃ। পূঝিতা মুনিভি: সর্ব্বৈঋষিভিঃ স্তূয়তে সদা।। স্তোত্রেণানেন তাং দেবীং জগদ্ধাত্রীং সরস্বতীম্। যে স্মরতি ত্রিসন্ধ্যায়ং সর্ব্বাং বিদ্যাং লভন্তি তে।

পৌরাণিক কাহিনি

স্কন্দপুরাণে
ব্রহ্মা তাঁর কন্যা সরস্বতীর প্রতি দুর্ব্যবহার করলে শিব তাঁকে শরবিদ্ধ করে হত্যা করেন। তখন ব্রহ্মার পত্নী গায়ত্রী কন্যা সরস্বতীকে নিয়ে স্বামীর প্রাণ ফিরিয়ে আনার জন্য গন্ধমাদন পর্বতে তপস্যা শুরু করেন। তাঁদের দীর্ঘ তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে শিব ব্রহ্মার প্রাণ ফিরিয়ে দেন। সেই থেকে শিবের নির্দেশে গায়ত্রী ও সরস্বতীর তপস্যাস্থলে দুটি প্রসিদ্ধ তীর্থ সৃষ্টি হয়।
জগতে সকল দেবতা তীর্থ আছে, শুধু ব্রহ্মার তীর্থ নেই – একথা ভেবে ব্রহ্মা পৃথিবীতে নিজের তীর্থ স্থাপনে উদ্যোগী হলেন। তিনি একটি সর্বরত্নময়ী শিলা পৃথিবীতে নিক্ষেপ করলেন। সেটি চমৎকারপুরে এসে পড়ল। ব্রহ্মা সেখানেই নিজের তীর্থ স্থাপন করবেন বলে ভাবলেন। ব্রহ্মার নির্দেশে সরস্বতী পাতাল থেকে উঠে এলেন। ব্রহ্মা তাঁকে বললেন, “তুমি এখানে আমার কাছে সব সময় থাকো। আমি তোমার জলে ত্রিসন্ধ্যা তর্পণ করব।” সরস্বতী ভয় পেয়ে বললেন, “আমি লোকের স্পর্শ ভয় পাই বলে সব সময় পাতালে থাকি। কিন্তু আপনার আদেশ আমি অমান্যও করতে পারি না। আপনি সব দিক বিচার করে একটি ব্যবস্থা করুন।” তখন ব্রহ্মা সরস্বতীর অবস্থানের জন্য একটি হ্রদ খনন করলেন। সরস্বতী সেই হ্রদে অবস্থান করতে লাগলেন। ব্রহ্মা ভয়ংকর সাপেদের সেই হ্রদ ও সরস্বতীর রক্ষক নিযুক্ত করলেন।
উপপুরাণে
দেবীভাগবত পুরাণ
দেবীভাগবত পুরাণ অনুসারে, দেবী আদ্যাপ্রকৃতির তৃতীয় অংশে দেবী সরস্বতীর জন্ম। তিনি কৃষ্ণের জিহ্বাগ্র থেকে উৎপন্ন হয়েছেন। সরস্বতী বাক্য, বুদ্ধি, বিদ্যা ও জ্ঞানের অধিষ্ঠাত্রী দেবী; সকল সংশয় ছেদকারিণী ও সর্বসিদ্ধিপ্রদায়িনী এবং বিশ্বের উপজীবিকা স্বরূপিনী। ব্রহ্মা প্রথম তাঁকে পূজা করেন। পরে জগতে তাঁর পূজা প্রতিষ্ঠিত হয়। সরস্বতী শুক্লবর্ণা, পীতবস্ত্রধারিণী এবং বীণা ও পুস্তকহস্তা। তিনি নারায়ণের অন্যতম পত্নী হয়েছিলেন। তারপর কৃষ্ণ জগতে তাঁর পূজা প্রবর্তন করেন মাঘ মাসের শুক্লপক্ষের পঞ্চমী তিথিতে তাঁর পূজা হয়।
গঙ্গা, লক্ষ্মী ও সরস্বতী ছিলেন নারায়ণের তিন পত্নী। একবার গঙ্গা ও নারায়ণ পরস্পরের দিকে তাকিয়ে হাসলে, তিন দেবীর মধ্যে তুমুল বিবাদ উপস্থিত হয়। এই বিবাদের পরিণামে একে অপরকে অভিশাপ দেন। গঙ্গার অভিশাপে সরস্বতী নদীতে পরিণত হন। পরে নারায়ণ বিধান দেন যে, সরস্বতী এক অংশে নদী, এক অংশে ব্রহ্মার পত্নী ও এক অংশে তাঁর সঙ্গিনী হবেন এবং কলিযুগের পাঁচ হাজার বছর অতিক্রান্ত হলে সরস্বতী সহ তিন দেবীরই শাপমোচন হবে।
গঙ্গার অভিশাপে সরস্বতী মর্ত্যে নদী হলেনে এবং ব্রহ্মার প্রিয়তমা পত্নী ব্রাহ্মী হলেন।
শুম্ভ ও নিশুম্ভ অসুরদ্বয়কে বধ করার সময় দেবী দুর্গার শরীর থেকে যে কৌশিকী দেবীর উৎপত্তি হয়েছিল, তাঁর অপর নাম সরস্বতী।

শুক্ল যজুর্বেদ
"শুক্ল যজুর্বেদ" অনুসারে, একসময় ইন্দ্রের শরীরের শক্তি চলে যাওয়ার ফলে তিনি মেষ আকৃতি গ্রহণ করেন। সেসময় ইন্দ্রের চিকিৎসার দায়িত্ব ছিল স্বর্গের অশ্বিনীদ্বয়ের উপর এবং সেবা-শুশ্রুষার ভার ছিল সরস্বতীর হাতে। সংগীত ও নৃত্যপ্রেমী ইন্দ্র সরস্বতীর গানবাজনা ও সেবায় সুস্থ হওয়ার পর তাকে মেষটি দান করেন।

রামায়ণ রচয়িতা বাল্মীকি যখন ক্রৌঞ্চ হননের শোকে বিহবল হয়ে পড়েছিলেন, সে সময় জ্যোতির্ময়ী সরস্বতী তার ললাটে বিদ্যুৎ রেখার মত প্রকাশিত হয়েছিলেন।

সরস+বতী=সরস্বতী অর্থ জ্যোতিময়ী। ঋগ্বেদে এবং যর্জুবেদে অনেকবার ইড়া,ভারতী, সরস্বতীকে একসঙ্গে দেখা যায়। বেদের মন্ত্রগুলো পর্যালোচনায় প্রতীতী জন্মে যে, সরস্বতী মূলত সূর্যাগ্নি।

Wednesday, July 25, 2018

শীতলা দেবী

শীতলা লৌকিক দেবী। শীতলা পুরাণে গৃহীত হয়ে পৌরাণিক দেবীতে পরিণত হয়েছেন। সাধারণভাবে এ দেবী বসন্ত রোগের জ্বালা নিবারণ করে শীতল করেন বলে শীতলা নামে পরিচিত হয়েছেন। বসন্ত ও চর্মরোগ থেকে পরিত্রাণের উদ্দেশ্যে শীতলা পূজা করা হয়। দেবী শীতলাকে ঠাকুরানি জাগরণী, করুণাময়ী, দয়াময়ী প্রভৃতি নামে অভিহিত করা হয়। শীতলা কুমারী, মাতায় কূলাকৃতির মুকুট এবং গর্দভের উপর উপবিষ্ট। গর্দভ তাঁর বাহন। স্কন্দপুরাণে শীতলা দেবী শ্বেতবর্ণা ও দুহাত বিশিষ্ট। তাঁর দুহাতে রয়েছে পূর্ণকুম্ভ ও সম্মার্জনীধারণী। কথিত আছে সম্মার্জনীর মাধ্যমে তিনি অমৃতময় শীতল জল ছিটিয়ে রোগ, তাপ, শোক দূর করেন। কখনো কখনো তিনি নিমের পাতা বহন করে থাকেন। নিম রোগ প্রতিরোধকারী উদ্ভিদ। শীতলা পূজা সাধারণত শ্রাবণ মাসের শুক্লা সপ্তমী তিথিতে দেবী শীতলার পূজা করা হয়। পূজামন্দিরে বা শীতলা পূজার নির্দিষ্ট স্থানে পুরোহিতের মাধ্যমে শীতলা পূজা করা হয়। পূজার পদ্ধতি অন্যান্য পূজার অনুরূপ হলেও এ পূজার সময় ঠাণ্ডা জাতীয় ফলের প্রয়োজন হয়। পেঁপে, নারিকেল, তরমুজ, কলা ও অন্যান্য মিষ্টিজাতীয় উপকরণ দেবীর উদ্দেশে সমর্পণ করা হয়। এ পূজায় সকল শ্রেণির ভক্ত অংশ্রহণ করে থাকে।

পূজার প্রণাম মন্ত্র
 ওঁ নমামি শীতলাং দেবীং রাসভস্থাং দিগম্বরীম্।
মার্জ্জনীকলসোপেতাং সূর্পালঙ্কৃতমস্তকাম্।

শীতলা পূজার গুরুত্ব
 ১. শীতলা দেবী বসন্ত রোগ থেকে আমাদের মুক্ত করে আমাদের শীতল করেন। এ কারণে তিনি সকলের কাছে সমাদৃত হয়েছেন।
 ২. দেবী শীতলাকে স্বাস্থ্যবিধি পালন বা পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার দেবী বলা হয়। শীতলা পূজার মাধ্যমে আমরা স্বাস্থ্য বিধি ও পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে সচেতন হয়ে থাকি।
৩. দেবী শীতলার দুই হাতে রয়েছে পূর্ণকুম্ভ ও সম্মার্জনী। কথিত আছে সম্মার্জনীর মাধ্যমে তিনি অমৃতময় শীতল জল ছিটিয়ে রোগ, তাপ, শোক দূর করে শীতল করেন। আমরাও বসন্তে আক্রান্ত রোগীদের সেবা করে তাদের শীতল করব। শীতলা পূজার মধ্য দিয়ে আমরা এ ধরনের সেবামূলক কাজ করার জন্য উদ্বুদ্ধ হই। কখনো কখনো তিনি নিমের পাতা বহন করে থাকেন। নিম বৃক্ষ রোগ প্রতিরোধকারী উদ্ভিদ। আমরা বাড়ির অঙ্গিনায় রোগ প্রতিরোধের জন্য নিম গাছ রোপণ করতে পারি।

Tuesday, July 24, 2018

দেবী বিমলা

বিমলা মন্দির হল ভারতের ওড়িশা রাজ্যের পুরী শহরের জগন্নাথ মন্দির চত্বরে অবস্থিত একটি হিন্দু মন্দির। এটি দেবী বিমলার মন্দির। হিন্দুরা এই মন্দিরটিকে একটি শক্তিপীঠ (শাক্ত সম্প্রদায়ের কাছে পবিত্র প্রধান তীর্থগুলির অন্যতম) মনে করেন।
বিমলা মন্দির জগন্নাথ মন্দির চত্বরের ভিতরের অংশের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে এবং জগন্নাথের মিনারের পশ্চিম কোণে অবস্থিত। এই মন্দিরের পাশেই পবিত্র জলাধার রোহিণীকুণ্ড অবস্থিত। মন্দিরটি পূর্বমুখী এবং বেলেপাথর ও ল্যাটেরাইটে নির্মিত। এই মন্দির "দেউল" স্থাপত্যশৈলীর একটি নিদর্শন। মন্দিরের চারটি অংশ দেখা যায়: বিমান (গর্ভগৃহ-সম্বলিত অংশ), জগমোহন (সভাকক্ষ), নাট-মণ্ডপ (উৎসব কক্ষ) ও ভোগ-মণ্ডপ (ভোগ নিবেদনের কক্ষ)।
২০০৫ সালে মন্দিরটি সংস্কার হয়। বর্তমানে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার ভুবনেশ্বর শাখা এই মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণ করে থাকে। বিমলা মন্দিরটি জগন্নাথ মন্দির চত্বরের একটি ছোটো মন্দির হলেও শাক্ত ও তান্ত্রিকদের কাছে একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ তীর্থ। তাঁরা মূল জগন্নাথ মন্দিরের চেয়েও এই মন্দিরটিকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। তান্ত্রিক মতে, বিমলা জগন্নাথের শক্তি এবং মন্দির চত্বরের রক্ষয়িত্রী। ভক্তেরা মূল মন্দিরে জগন্নাথকে পূজা করার আগে বিমলাকে পূজা করেন। জগন্নাথের প্রসাদ বিমলাকে নিবেদন করার পরেই মহাপ্রসাদ হিসেবে গণ্য হয়। প্রতি বছর আশ্বিন মাসে (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর) উদযাপিত দুর্গাপূজা এই মন্দিরের প্রধান উৎসব।
ইতিহাস
বিমলার আদিমূর্তিটি খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীতে নির্মিত। বর্তমান মন্দিরটি সম্ভবত সম্ভবত খ্রিস্টীয় নবম শতাব্দীতে পূর্ব গঙ্গ রাজবংশের রাজত্বকালে আগের মন্দিরটির ধ্বংসাবশেষের উপর নির্মিত হয়েছে। জগন্নাথ মন্দির চত্বরের মুক্তিমণ্ডপের কাছে খ্রিস্টীয় নবম শতাব্দীতে নির্মিত যে নৃসিংহ মন্দিরটি আছে, তার সঙ্গে বিমলা মন্দিরের স্থাপত্যগত মিল দেখা যায়।[১] মাদলা পাঁজি অনুসারে, দক্ষিণ কোশলের সোমবংশী রাজবংশের রাজা যযাতি কেশরী এই মন্দিরটি নির্মাণ করিয়েছিলেন। রাজা প্রথম যযাতি (খ্রিস্টীয় ৯২২–৯৫৫) ও দ্বিতীয় যযাতি (খ্রিস্টীয় ১০২৫–১০৪০)–উভয়েই "যযাতি কেশরী" নামে পরিচিত ছিলেন। মন্দিরের স্থাপত্যশৈলী–বিশেষত পার্শ্বদেবতাদের মূর্তি ও মূল মূর্তিটির পিছনের প্রস্তরখণ্ডটি–সোমবংশী শৈলীর নিদর্শন বহন করে। এগুলি সম্ভবত সেই প্রথম মন্দিরের অংশ ছিল, যার ধ্বংসাবশেষের উপর বর্তমান মন্দিরটি গড়ে উঠেছে। এই মন্দিরটিকে মন্দির চত্বরের প্রধান মন্দির জগন্নাথ মন্দিরের চেয়েও পুরনো বলে মনে করা হয়।
মনে করা হয়, হিন্দু দার্শনিক ও সন্ত আদি শঙ্কর (খ্রিস্টীয় অষ্টম শতাব্দী) বিমলাকে প্রধান দেবী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে পুরীতে গোবর্ধন মঠ স্থাপন করেছিলেন। দ্য জগন্নাথ টেম্পল অ্যাট পুরী গ্রন্থের লেখক স্টারজার মতে, প্রাচীনকালে জগন্নাথ মন্দির ছিল ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিব–এই ত্রিমূর্তি পূজার কেন্দ্র। উক্ত তিন দেবতার শক্তিগণ তথা হিন্দু দেবমণ্ডলীর তিন প্রধান দেবী সরস্বতী, লক্ষ্মী ও পার্বতীও (বিমলার মূর্তিতে) এখানে পূজিত হতেন। খ্রিস্টীয় সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত এখানে শাক্ত শ্রীবিদ্যা-উপাসকদের ভাল প্রভাব ছিল। পরবর্তীকালে বৈষ্ণবধর্ম এই মন্দির চত্বরে প্রাধান্য অর্জন করলে শ্রীবিদ্যা ও শৈব-তান্ত্রিক প্রভাব কমে যায়। তবে এই প্রভাব একেবারে লুপ্ত হয়নি। তান্ত্রিক "পঞ্চমকার" উপচারের পরিবর্তে মন্দিরে নিরামিষ ভোগ ও দেবদাসী নৃত্যের প্রথা চালু হয়। অবশ্য মাছ ভোগ দেবার প্রথাও প্রচলিত ছিল। রাজা নরসিংহদেব (শাসনকাল ১৬৩২–৪৭ খ্রিস্টাব্দ) মন্দিরে মাছ ও মাংস ভোগের প্রথা বন্ধ করে দেন। যদিও পরবর্তীকালে এই প্রথা আংশিকভাবে চালু করা হয়েছিল। বর্তমানে, বিশেষ বিশেষ দিনে বিমলাকে মাছ ও মাংস ভোগ দেওয়া হয়।
স্থাপত্য
বিমলা মন্দির জগন্নাথ মন্দির চত্বরের ভিতরের দিকে দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে এবং জগন্নাথের মিনারের পশ্চিম কোণের ডান দিকে অবস্থিত। এই মন্দিরের পাশে রোহিণীকুণ্ড নামে একটি জলাধার রয়েছে। এটিকে হিন্দুরা পবিত্র মনে করেন। মন্দিরটি বেলেপাথর ও ল্যাটেরাইটে নির্মিত। বিমলা মন্দির "দেউল" স্থাপত্যশৈলীর একটি নিদর্শন। এই মন্দিরের চারটি অংশ দেখা যায়: বিমান (যে অংশে গর্ভগৃহ অবস্থিত), জগমোহন (সভাকক্ষ), নাট-মণ্ডপ (উৎসব কক্ষ) ও ভোগ-মণ্ডপ (ভোগ নিবেদনের কক্ষ)। ২০০৫ সালে মন্দিরটি সংস্কার করা হয়েছে। বর্তমানে এটির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে আছে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার ভুবনেশ্বর সার্কেল।
বিমান
বিমান হল একটি রেখ দেউল (শম্বুকাকার চিনির ডেলার মতো আকৃতিবিশিষ্ট একটি দীর্ঘাকার ভবন)। বিমলা মন্দিরের বিমানটির উচ্চতা ৬০ ফুট (১৮ মি)। এটি ১৫ ফুট (৪.৬ মি) আয়তনের বর্গাকার আকৃতিবিশিষ্ট। মন্দিরটি ২ ফুট (০.৬১ মি) উচ্চতার একটি বেদীর উপর দাঁড়িয়ে আছে। বেদীটি পদ্ম ও অন্যান্য ফুল পাতা ও অন্যান্য ছবিতে চিত্রিত। বিমানের বাইরের দেওয়ালটি পাঁচটি ভাগে বিভক্ত (ভিত্তি থেকে শীর্ষভাগ পর্যন্ত): "পাভাগ", "তলজঙ্ঘা", "বন্ধন", "উপর জঙ্ঘা" ও "বারান্দা"। দেওয়ালের প্রথম অংশের কুলুঙ্গি ও সংযোগরক্ষাকারী জায়গাগুলিতে "খখর মুন্ডি" (এক ধরনের কুলুঙ্গি), পুথিচিত্র, ফুল-পাতার ছবি, সংগমরত যুগল ও নাগের (সর্প-পুরুষ) ছবি অলংকৃত রয়েছে। দ্বিতীয় অংশের কুলুঙ্গি ও যোগাযোগরক্ষাকারী জায়গাগুলিতে "খখর মুন্ডি", "সিংহবিদল" (একটি সিংহমুখী জন্তু), "গজবিদল" (সিংহ-মর্দনকারী একটি হস্তিমুখী সিংহ), জালিচিত্র, পুথিচিত্র, "শিক্ষাদান" চিত্র (ঋষিগণের উপদেশ দানের দৃশ্য) ও "কীর্তিমুখ" (একটি দানব মুখ) এবং অষ্ট দিকপাল (দিকের দেবতা) ও কয়েকটি দেবীমূর্তি চিত্রিত আছে। বাইরের দেওয়ালের তৃতীয় অংশে দুটি আনুভূমিক তলে "অলসকন্যা" (সুন্দরী নারী), পুথিচিত্র এবং পদ্ম ও অন্যান্য ফুলের মোটিফ খোদাই করা আছে। চতুর্থ অংশের কুলুঙ্গি ও সংযোগরক্ষাকারী জায়গায় "পীঢ়া-মুন্ডি" (এক ধরনের কুলুঙ্গি), "সিংহবিদল", কামোদ্দীপক দৃশ্যাবলি, "অলসকন্যা", পুথিচিত্র, জালিচিত্র, ফুলের নকশা এবং দিকপালদের স্ত্রী, নাগ ও তাঁদের স্ত্রী নাগিনীগণ সহ অন্যান্য দেবীমূর্তি খোদিত আছে। দিকপাল ও তাঁদের স্ত্রীদের নিজ নিজ বাহন-সহ যাঁরা যে দিকের অধিপতি তাঁদের সেই দিকেই রাখা হয়েছে।
পার্শ্বদেবতাদের মূর্তিগুলি তিন দিকের বাইরের দেওয়ালে ("বড়") কেন্দ্রীয় কুলুঙ্গিতে রাখা আছে: দক্ষিণে মহিষাসুর-বধকারিনী অষ্টভূজা দুর্গা ও পশ্চিমে শিবের উপর দণ্ডায়মান ষড়ভূজা চামুণ্ডা। উত্তরের কুলুঙ্গিটি খালি। সম্ভবত এখানে যে দেবীমূর্তিটি ছিল, সেটি চুরি হয়ে গিয়েছে। পার্শ্বদেবতাদের বেদীর আনুভূমিক পাটাতনে গজলক্ষ্মী মূর্তি দেখা যায়। কুলুঙ্গির চারদিক পুথিচিত্র ও "কীর্তিমুখ" মোটিফ এবং কুলুঙ্গি-প্রতি দু-জন সখির চিত্রে শোভিত। বাইরের দেওয়ালের সবচেয়ে উপরের অংশটিতে দশটি আনুভূমিক তলে পুথিচিত্র, কীর্তিমুখ এবং পদ্ম ও অন্যান্য ফুলের মোটিফ দেখা যায়। বিমানের মধ্যে "গর্ভগৃহ" অংশটি রয়েছে। এই অংশের উপরিভাগ "পঞ্চরথ" শৈলীতে নির্মিত। শীর্ষভাগ খাঁজবিশিষ্ট।
বিমলার মূর্তি রাখা আছে কেন্দ্রীয় গর্ভগৃহে। এটি খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতকে নির্মিত একটি কক্ষ। এখানকার দেওয়ালে কোনো ছবি দেখা যায় না।বিমলার কেন্দ্রীয় মূর্তিটির উপরের ডান হাতে একটি জপমালা এবং নিচের ডানহাতে বরদামুদ্রা; অন্যদিকে নিচের বাঁ হাতে একটি কুম্ভ (সম্ভবত অমৃতকুম্ভ) আছে। উপরের বাঁ হাতের বস্তুটি নিয়ে তীব্র মতভেদ আছে। এছাড়া একটি নারীমূর্তি, একটি নাগিনী, একটি মৎস্যকন্যা, একটি নাগ-পাশ ও অন্যান্য কয়েকটি বস্তু রয়েছে। বিমলার হাতে এমন কোনো অস্ত্র নেই যেগুলি সচরাচর দুর্গার হাতে দেখা যায়। মূর্তিটি একটি সিংহাসনে রাখা থাকে। মূর্তির দুই পাশে বিমলার দুই সখি ছায়া ও মায়ার মূর্তি রয়েছে। মূর্তিটি লাক্ষা দিয়ে নির্মিত বলে শোনা যায়। এটির উচ্চতা ৪ ফুট (১.২ মি)-এর কিছু বেশি।
গর্ভগৃহের দরজাটি থেকে একটি সিঁড়ি উঠে যাচ্ছে জগমোহনে। এখানে বেদীর গায়ের ফ্রেমে অপ্সরা-পরিবেষ্টিত গজলক্ষ্মী-মূর্তি দেখা যায়। বেদীর উপরের ফ্রেমে নবগ্রহ অঙ্কিত আছে। দরজার দুপাশের পাটাতনে পুথিচিত্র, লতাপাতা, ফুল ও ক্রীড়ারত বালকের ছবি দেখা যায়। দরজার ধারে দুটি দ্বারপাল মূর্তি দেখা যায়।
পূজা
ওড়িশাবাসী হিন্দুরা বিমলা মন্দিরকে প্রধান শাক্ত তীর্থ মনে করেন। ভক্তেরা প্রতিদিন এই মন্দিরে মার্কণ্ডেয় পুরাণ-ভুক্ত দেবীমাহাত্ম্যম্, আদি শঙ্কর রচিত দেব্যাপরাধক্ষমাপণ স্তোত্রম্‌ ও পুরুষোত্তম রক্ষিত রচিত বিমলাষ্টকম্‌ পাঠ করেন।জগন্নাথ মন্দিরের নিয়ম অনুসারে, মূল মন্দিরে জগন্নাথকে পূজার আগে বিমলাকে পূজা করতে হয়। বিমলার "তীর্থ" বা পবিত্র জলাধার রোহিণীকুণ্ডের জল পবিত্র মনে করা হয়।তান্ত্রিকদের কাছে বিমলা মন্দিরের গুরুত্ব মূল জগন্নাথ মন্দিরের চেয়েও বেশি।
দুর্গাপূজা বিমলা মন্দিরের প্রধান উৎসব। প্রতি বছর আশ্বিন (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর) মাসে ষোলো দিন ধরে দুর্গাপূজা উদ্‌যাপিত হয়। দুর্গাপূজার শেষ দিন, অর্থাৎ বিজয়াদশমীতে পুরীর গজপতি-বংশীয় রাজা (ইনি নামমাত্র রাজা) বিমলাকে মহিষাসুরমর্দিনী দুর্গা রূপে পূজা করেন। নতুন দিল্লি কোণার্ক শিলালেখ-এ এই পূজার প্রাচীনতম উল্লেখ পাওয়া যায়। এই শিলালেখের তথ্য অনুসারে, রাজা প্রথম নরসিংহদেব (রাজত্বকাল: ১২৩৮–১২৬৪) বিজয়াদশমীর দিন দুর্গা-মাধব (বিমলা-জগন্নাথ) পূজা করেছিলেন। জগন্নাথ মন্দিরের প্রথা অনুসারে, মেয়েদের "দুর্বল-হৃদয়" মনে করা হয়। তাই বিমলার ধ্বংসাত্মিকা রূপ মহিষাসুরমর্দিনীর পূজা হয় বলে, বিমলা মন্দিরে দুর্গাপূজা মেয়েদের দেখতে দেওয়া হয় না।

আগমেশ্বরী

আগমেশ্বরী মাতা হল নবদ্বীপে পূজিত কালী প্রতিমা। নবদ্বীপের সুপন্ডিত তথা কালীসাধক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ এই পুজো শুরু করেন। এই পুজো প্রায় ৪০০ বছরের প্রাচীন
কৃষ্ণানন্দ দীপান্বিতা অমাবস্যায় একই দিনে ছোট আকারের কালীমূর্তি নির্মাণ করে রাত্রে পূজার্চনা শেষে ভোরে বিসর্জন দিতেন। এই কারণে লোকে বলতো আগমবাগীশি কান্ত। কথাটি প্রবাদে পরিণত হয়েছিল। পরবর্তীতে তাঁর পূজিত দেবী আগমেশ্বরী মাতা নামে প্রতিবছর নবদ্বীপে পূজিত হয়।
কৃষ্ণানন্দ দীপান্বিতা অমাবস্যায় একই দিনে ছোট আকারের কালীমূর্তি নির্মাণ করে রাত্রে পূজার্চনা শেষে ভোরে বিসর্জন দিতেন। বর্তমানে এত বড় প্রতিমা এক দিনে গড়া সম্ভব হয় না। এখন কোজাগরী পূর্ণিমার পর কৃষ্ণাপঞ্চমী তিথিতে প্রতিমা নির্মানের কাজ শুরু হয়। একাদশীতে একটি ছোট কালীমূর্তি তৈরি করে বড় মূর্তির হৃদয়ে বসিয়ে দেওয়া হয়। একাদশীতে যখন বড় প্রতিমার খড় বাঁধা হয় তখন ছোট ৫ পোয়ার প্রতিমাকে স্থাপন করা হয় বড় প্রতিমার হৃদয়ে। তারপর একমেটে-দোমেটের পর বিগ্রহ রঙ করা হয়। অমাবস্যায় দেবীর চক্ষুদান করা হয়। গভীর রাতে হয় আরাধনা। পরদিন দুপুরে প্রতিমা নিরঞ্জন।
বর্তমানে আগমেশ্বরীপাড়ায় যেখানে আগমেশ্বরী মন্দিরটি অবস্থিত ওই অঞ্চলটি কৃষ্ণানন্দের সময়ে কিছুটা ঝোপঝার জঙ্গলাকীর্ণ আর কিছুটা গোপ-সম্প্রদায়ের বাস। আগমেশ্বরী মন্দিরটি পঞ্চমুণ্ডীর আসনের উপর নির্মিত। আনুমানিক ১৮০০ খ্রিস্টাব্দের শেষ দিকে ছোট আকারের মন্দির নির্মিত হয়েছিল। ২০০৩ খ্রিস্টাব্দে মন্দির সংস্কার করে নতুন করে গড়ে তোলা হয়। এই পঞ্চমুণ্ডীর আসনেই সাধনা করে কৃষ্ণানন্দ আগমসিদ্ধ হয়ে আগমবাগীশ হয়ে ওঠেন। 

বনদেবী

বনবিবি বা বনদেবী বা ব্যাঘ্রদেবী একইসাথে হিন্দু ধর্মের দেবী ও কিছু কিছু বনবাসী মুসলমানদের পীরানি। সুন্দরবনের বাংলাদেশ ও ভারতীয় অংশ ও এর আশেপাশের এলাকার মধু আহরণকারী ও কাঠুরে জনগোষ্ঠী বাঘের আক্রমণ হতে রক্ষা পেতে বনবিবির পূজো করেন। এ কথা প্রচলিত আছে যে, নিষ্ঠুর রাজা দক্ষিণরায় (রায়মণি) হিংস্র বাঘের ছদ্মবেশে মানুষের উপর হামলা করেন। তার পিতার নাম ইব্রাহীম ও মাতার নাম গুলালবিবি।
ইতিহাস
সুন্দরবন অঞ্চলের লোকায়ত দেবী যিনি হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে পূজিত হন। মধু সংগ্রাহক, কাঠুরে, মৎসজীবী মানুষের দেবী বনবিবি, বাঘের তথা দক্ষিণ রায়ের হাত থেকে তাদের রক্ষা করবেন এই বিশ্বাস প্রচলিত। ইতিহাসবিদ সতীশ চন্দ্র মিত্রের যশোহর-খুলনার ইতিহাস বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৫০০ সালের কাছাকাছি সময়ে সুন্দরবন এলাকায় দক্ষিণ রায়, বণিক ধোনাই ও মোনাই এবং গাজীর অস্তিত্ব পাওয়া যায়। বনবিবি ইব্রাহিম (মতান্তরে বেরাহিম) নামে এক আরবদেশির কন্যা। ইব্রাহিমের স্ত্রী গুলাল বিবি সতিনের প্ররোচনায় সুন্দরবনে পরিত্যক্ত হন। সেখানে বনবিবির জন্ম। দক্ষিণ রায় যশোরের ব্রাহ্মণনগরের রাজা মুকুট রায়ের অধীন ভাটির দেশের রাজা ছিলেন। তাঁর সঙ্গে বনবিবির একাধিক যুদ্ধ হয়। দক্ষিণ রায় পরাজিত হয়ে সন্ধি করেন। দক্ষিণ রায়ের পরাজয় অর্থে বাঘ বা অপশক্তির পরাজয়। বাংলাদেশ ও ভারতের সুন্দরবনের বহু অঞ্চলে লোকসংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেন দেবী বনবিবি। দেবীর পীরমাহাত্ম্যবিষয়ক কাব্যের নাম বনবিবির জহুরানামা। এই আখ্যান মঙ্গলকাব্যের ঢঙে রচিত হলেও আল্লাহ-রসুল, মক্কা, পীর-পীরানি যুক্ত আছে। অরণ্যচারী মানুষের বিশ্বাস, ভক্তি ও জীবনধারা এতে বর্ণিত হয়েছে।

মন্দির
দুই বাংলার সুন্দরবনের ভেতরে বিভিন্ন জায়গায় অধিবাসীরা বনবিবির মন্দির স্থাপনা করেছেন। সজনেখালি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, দো বাঁকি অভয়ারণ্য ও দয়াপুর গ্রামে বনবিবির মন্দির চোখে পড়ে।

Tuesday, July 17, 2018

মনসা দেবী

মনসা হলেন একজন লৌকিক হিন্দু দেবী। তিনি সর্পদেবী। প্রধানত বাংলা অঞ্চল এবং উত্তর ও উত্তরপূর্ব ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে তাঁর পূজা প্রচলিত আছে। সর্পদংশনের হাত থেকে রক্ষা পেতে, সর্পদংশনের প্রতিকার পেতে, প্রজনন ও ঐশ্বর্যলাভের উদ্দেশ্যে তাঁর পূজা করা হয়। মনসা ঘট স্থাপন করে পুজো করা হয়। মনসা নাগ-রাজ (সর্পরাজ) বাসুকীর ভগিনী এবং ঋষি জরৎকারুর (জগৎকারু) স্ত্রী। তাঁর অপর নামগুলি হল বিষহরি বা বিষহরা (বিষ ধ্বংসকারিণী), নিত্যা (চিরন্তনী) ও পদ্মাবতী।

পুরাণ ও কিংবদন্তি অনুসারে, মনসার পিতা শিব ও স্বামী জরৎকারু মনসাকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। মনসার সৎ-মা চণ্ডী (শিবের স্ত্রী পার্বতী) তাঁকে ঘৃণা করতেন। এই কারণে মনসা অত্যন্ত উগ্র স্বভাব ও অসুখী এক দেবী। কোনো কোনো ধর্মগ্রন্থে আছে, শিব নয়, ঋষি কাশ্যপ হলেন মনসার পিতা। মনসাকে ভক্তবৎসল বলে বর্ণনা করা হলেও, যিনি তাঁর পূজা করতে অস্বীকার করেন, তাঁর প্রতি তিনি নির্দয়।জন্ম-সংক্রান্ত কারণে মনসার পূর্ণ দেবীত্ব প্রথমে অস্বীকার করা হয়েছিল। তাই মনসার উদ্দেশ্য ছিল দেবী হিসেবে নিজের কর্তৃত্ব স্থাপন করা এবং একটি একনিষ্ঠ মানব ভক্তমণ্ডলী গড়ে তোলা।

উৎস:-
সর্পদেবী হিসেবে মনসার প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় হিন্দু ধর্মগ্রন্থ অথর্ববেদে। পুরাণে তাঁকে ঋষি কাশ্যপ ও নাগ-জননী কদ্রুর কন্যা বলা হয়েছে। খ্রিস্টীয় ১৪শ শতাব্দী নাগাদ মনসা প্রজনন ও বিবাহের দেবী হিসেবে চিহ্নিত হন এবং শিবের আত্মীয় হিসেবে শৈব দেবমণ্ডলীর অন্তর্ভুক্ত হন। কিংবদন্তি অনুসারে, শিব বিষ পান করার পর মনসা তাঁকে রক্ষা করেন এবং ‘বিষহরা’ নামে পরিচিত হন। মনসার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায় এবং তা দক্ষিণ ভারত পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে মনসা-কেন্দ্রিক ধর্মীয় গোষ্ঠীটি শৈবধর্মের প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত হয়। এর ফলে শিবের কন্যা রূপে মনসার জন্মের উপাখ্যানটি রচিত হয় এবং শেষ পর্যন্ত শৈবধর্মও এই আদিবাসী দেবীকে মূলধারার হিন্দুধর্মের ব্রাহ্মণ্য ধারার অন্তর্ভুক্ত করে ।

মূর্তিতত্ত্ব:-

আস্তিককে কোলে নিয়ে মনসা। পালযুগীয় ব্রোঞ্জ মূর্তি, ১০ম শতাব্দী; অধুনা বিহার থেকে প্রাপ্ত।
মনসার মূর্তিতে তাঁকে সর্প-পরিবেষ্টিত নারী রূপে দেখা যায়। তিনি একটি পদ্মের উপর বসে থাকেন বা একটি সাপের উপর দাঁড়িয়ে থাকেন। সাতটি গোখরো সাপের ফনা তাঁর মাথার উপর ছাউনির আকারে বিরাজ করে। কোনো কোনো মূর্তিতে তাঁর কোলে একটি শিশুকে দেখা যায়। এই শিশুটি সম্ভবত তাঁর পুত্র আস্তিক। তাঁকে ‘একচক্ষু-বিশিষ্ট দেবী’ বলা হয়। উত্তরপূর্ব ভারতের হাজং উপজাতির মানুষেরা তাঁকে এই কারণে ‘কাণি দেউও’ (অন্ধ দেবী) বলেন। কিংবদন্তি অনুসারে, মনসার সৎ-মা চণ্ডী তাঁর একটি চোখ পুড়িয়ে দিয়েছিলেন।

মনসা ঘট:-
মানব সমজের গতি অর্থাৎ প্রবাহমানতার মাধ্যম হলো সৃষ্টি। এই মনসা ঘট হলো গর্ভবতী নারীর প্রতীক। যেখান থেকে প্রাণ সঞ্চার হয়ে মানব জীবন ক্রম বিবর্তনের মাধ্যমে এগিয়ে চলছে। মনসা ঘট যেমন গর্ভবতী নারীর প্রতীক তেমনই ফসলের উর্বরতার প্রতীক। যাকে প্রজনন শক্তির প্রতীক হিসাবে কল্পনা করা হয়েছে।

কিংবদন্তি মহাভারত:-
মহাভারতে মনসার বিবাহের উপাখ্যানটি রয়েছে। জরৎকারু নামে এক ঋষি কঠোর তপস্যা করছিলেন। তিনি স্থির করেছিলেন যে, বিবাহ করবেন না। একবার তিনি কয়েকজনকে একটি গাছ থেকে হেঁটমুণ্ড উর্ধ্বপদ অবস্থায় ঝুলতে দেখলেন। তাঁরা ছিলেন জরৎকারুরই পূর্বপুরুষ। তাঁদের সন্তানসন্ততিগণ তাঁদের পারলৌকিক ক্রিয়াদি না করার কারণে তাঁদের ওই অবস্থা হয়েছিল। তাই তাঁরা জরৎকারুকে বিবাহ করে একটি পুত্রসন্তান উৎপাদনের পরামর্শ দিলেন, যাতে সেই পুত্র তাঁদের পারলৌকিক ক্রিয়াদি সম্পন্ন করে তাঁদের মুক্তি দিতে পারেন। বাসুকী তাঁর ভগিনী মনসার সঙ্গে জরৎকারুর বিবাহ দিলেন। মনসার একটি পুত্রসন্তান হল। তাঁর নাম ছিল আস্তিক। তিনি তাঁর পূর্বপুরুষদের মুক্ত করলেন। এছাড়া রাজা জনমেজয় যখন সর্পকুল বিনষ্ট করার উদ্দেশ্যে যজ্ঞ করছিলেন, তখন আস্তিক নাগ বংশকে রক্ষাও করেছিলেন।

ঘন জঙ্গলে সর্পবেষ্টিত মনসা দেবী:-

পুরাণেই প্রথম মনসার জন্ম-সংক্রান্ত উপাখ্যানটি পাওয়া যায় । পুরাণ মতে , মনসা ঋষি কশ্যপের সন্তান তথা কাশ্যপ গোত্রজ । উল্লেখ্য , মঙ্গলকাব্যে শিবকে মনসার পিতা বলা হলেও , পুরাণে সেই তথ্যের সমর্থন পাওয়া যায় না । একবার সাপ ও সরীসৃপরা পৃথিবীতে উৎপাত শুরু করলে , ঋষি কশ্যপ নিজের মন থেকে মনসা দেবীর জন্ম দেন । মন থেকে জন্ম বলে তাঁর নাম হয় ‘মনসা’ । সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা তাঁকে সর্প ও সরীসৃপদের দেবী করে দেন । মনসা তাঁর মন্ত্রবলে পৃথিবীতে নিজের কর্তৃত্ব বিস্তার করেন । এরপর মনসা শিবকে প্রসন্ন করেন । শিব তাঁকে বলেন কৃষ্ণকে প্রসন্ন করতে । মনসার প্রতি প্রসন্ন হয়ে কৃষ্ণ তাঁকে সিদ্ধি নামক দৈবী ক্ষমতা প্রদান করেন । এর ফলে দেবী হিসেবে মনসার কর্তৃত্ব সুবিদিত হয় ।

কশ্যপ ঋষি জরৎকারুর সঙ্গে মনসার বিয়ে দেন । জরৎকারু এই শর্তে মনসাকে বিবাহ করতে রাজি হয়েছিলেন যে , যদি মনসা তাঁর কথার অবাধ্য হন , তবে তিনি মনসাকে পরিত্যাগ করবেন । একবার মনসা জরৎকারুর নিদ্রাভঙ্গ করতে দেরি করেছিলেন । এতে সেদিন জরৎকারুর পূজা করা হয়ে ওঠেনি । এই ঘটনায় দুঃখিত হয়ে জরৎকারু মনসাকে ত্যাগ করেন । পরে দেবতাদের অনুরোধে তিনি মনসার কাছে ফিরে আসেন এবং আস্তিক নামে এক পুত্রের জন্ম দেন ।

মঙ্গলকাব্য:-
খ্রিস্টীয় ১৩শ থেকে ১৮শ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে ভারতীয় উপমহাদেশের বাংলা অঞ্চলে মনসা প্রমুখ দেবদেবীদের নিয়ে মঙ্গলকাব্য নামক এক শ্রেণির ভক্তিমূলক লৌকিক গাথাকাব্য রচিত হয়েছিল। এর মধ্যে বিজয়গুপ্তের মনসামঙ্গল কাব্য ও বিপ্রদাস পিপলাইয়ের মনসাবিজয় (১৪৯৫) কাব্যে দেবী মনসার উৎপত্তি ও কিংবদন্তিগুলি বর্ণিত হয়েছে।

মনসাবিজয় কাব্যে আছে, বাসুকীর মাতা একটি বালিকার মূর্তি নির্মাণ করেছিলেন। সেই মূর্তিতে শিবের বীর্য নিক্ষিপ্ত হলে তা থেকে মনসার জন্ম হয়। বাসুকী মনসাকে নিজ ভগিনী বলে স্বীকার করে নেন। রাজা পৃথু যখন গাভীরূপী পৃথিবীকে দোহন করছিলেন, তখন তা থেকে বিষের উৎপত্তি হয়। বাসুকী মনসাকে সেই বিষের কর্তৃত্ব প্রদান করেন। শিব মনসাকে দেখে আকৃষ্ট হন। কিন্তু মনসা তাঁকে নিজ পিতৃপরিচয় দান করলে, শিব মনসাকে গৃহে নিয়ে আসেন। শিবের স্ত্রী চণ্ডী মনে করেন, মনসা শিবের অপর স্ত্রী বা তাঁর জারজ সন্তান। তিনি মনসাকে অপমান করে তাঁর একটি চোখ দগ্ধ করেন। মনসা একচক্ষু-বিশিষ্ট দেবীতে পরিণত হন। পরে সমুদ্রমন্থনের সময় হলাহল বিষের প্রভাবে শিব যখন মৃতপ্রায় হন, তখন মনসা তাঁর প্রাণরক্ষা করেন। একদিন চণ্ডী মনসাকে লাথি মারেন। মনসা তখন বিষদৃষ্টি দিয়ে চণ্ডীকে অজ্ঞান করে দেন। শেষে চণ্ডী ও মনসার বিবাদে বীতশ্রদ্ধ হয়ে শিব মনসাকে একটি গাছের নিচে পরিত্যাগ করেন। তবে তিনি মনসার চোখের জল থেকে নেতো বা নেতা নামে মনসার এক সঙ্গিনীকে সৃষ্টি করেন।

পরে ঋষি জরৎকারু মনসাকে বিবাহ করেন। কিন্তু চণ্ডী মনসার ফুলশয্যার রাত্রিটি মাটি করে দেন। তিনি মনসাকে সর্পালঙ্কার পরিধান করতে বলেছিলেন। তারপর তিনি ফুলশয্যার ঘরে একটি ব্যাঙ ছেড়ে দেন। ফলে সাপগুলি ঘরময় ছুটে বেড়াতে শুরু করে। ভয় পেয়ে জরৎকারু ঘর ছেড়ে পালিয়ে যান। কয়েক দিন পর অবশ্য তিনি ফিরে আসেন। এরপর তাঁদের পুত্র আস্তিকের জন্ম হয়।

পটচিত্রে মনসামঙ্গল:-
নেতোর পরামর্শে মনসা মর্ত্যে নেমে আসেন মানব ভক্ত সংগ্রহের উদ্দেশ্যে। প্রথম দিকে মানুষ তাঁকে উপহাস করত। কিন্তু যারা মনসার ক্ষমতা অস্বীকার করল, তাদের জীবন দুর্বিসহ করে তুলে মনসা তাদের বাধ্য করলেন তাঁর পূজা করতে। মুসলমান শাসক হাসানের মতো বিভিন্ন জাতির মানুষকে মনসা তাঁর ভক্ত করে তুললেন। কিন্তু চাঁদ সদাগর তাঁর পূজা করলেন না। মনসা লক্ষ্মী ও সরস্বতীর মতো একজন দেবী হতে চাইছিলেন। তাতে সফল হওয়ার জন্য চাঁদ সদাগরের হাতে পূজাগ্রহণ তাঁর কাছে বাধ্যতামূলক ছিল। কিন্তু চাঁদ সঙ্কল্প করেছিলেন, তিনি মনসার পূজা করবেন না। মনসা চাঁদকে ভয় দেখানোর জন্য একে একে চাঁদের ছয় পুত্রকে হত্যা করলেন। শেষে মনসা ইন্দ্রের রাজসভার দুই নর্তক-নর্তকীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করলেন। এঁদের নাম ছিল অনিরুদ্ধ ও ঊষা। অনিরুদ্ধ চাঁদ ও তাঁর স্ত্রী সনকার সপ্তম পুত্র রূপে জন্মগ্রহণ করলেন। তাঁর নাম হল লখিন্দর। ঊষা বেহুলা নামে জন্মগ্রহণ করলেন। লখিন্দর ও বেহুলার বিবাহ হল। মনসা লখিন্দরকে হত্যা করলেন। কিন্তু বেহুলা স্বামীর মৃতদেহ নিয়ে নদীতে ভেসে চললেন। শেষে তিনি চাঁদের সাত পুত্রের প্রাণ ও হারানো সম্পদ পুনরুদ্ধার করার উপায় জেনে ফিরে এলেন। চাঁদ মনসার দিকে না তাকিয়েই বাঁ হাতে তাঁর দিকে ফুল ছুঁড়ে দিলেন। মনসা এতেই খুশি হলেন। তিনি চাঁদের পুত্রদের জীবন ফিরিয়ে দিলেন এবং তাঁর হারানো সম্পদও ফিরিয়ে দিলেন। মঙ্গলকাব্যে রয়েছে, এরপর মনসার জনপ্রিয়তাও বৃদ্ধি পেল।

মনসামঙ্গল কাব্য গ্রন্থে রয়েছে, পূর্বজন্মে মনসা চাঁদকে বিনা কারণে অভিশাপ দিয়েছিলেন। তাই চাঁদও মনসাকে অভিশাপ দিয়েছিলেন যে, তিনি মনসার পূজা না করলে, মনসাপূজা মর্ত্যে জনপ্রিয়তা পাবে না। এই কারণেই, ভক্তদের আকর্ষণ করতে মনসার অসুবিধা হচ্ছিল।

পূজা:-

মনসার মৃন্ময়ী মূর্তি। সুন্দরবন, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত।
সাধারণত মনসার মূর্তি পূজা হয় না। সীজ বৃক্ষের শাখায়, ঘটে বা সর্প-অঙ্কিত ঝাঁপিতে মনসার পূজা হয়। তবে কোথাও কোথাও মনসার মূর্তিও পূজিত হয়। প্রধানত সর্পদংশনের হাত থেকে রক্ষা পেতে বা সর্পদংশনের প্রতিকার পেতে মনসার পূজা করা হয়।

বাংলা অঞ্চলেই মনসার পূজা সর্বাধিক জনপ্রিয়। এই অঞ্চলে অনেক মন্দিরেও বিধিপূর্বক মনসার পূজা হয়। বর্ষাকালে যখন সাপের উপদ্রব বৃদ্ধি পায়, তখন মনসার পূজা মহাসমারোহে হয়ে থাকে। নিম্নবর্ণীয় হিন্দুদের কাছে মনসা একজন গুরুত্বপূর্ণ প্রজনন দেবতা। তাঁরা বিবাহের সময় ও সন্তানকামনায় মনসার পূজা করেন। বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে মনসার সঙ্গে নেতোর (যিনি নেতা, নেতিধোপানি, নেতলসুন্দরী ইত্যাদি নামেও পরিচিত) পূজাও করা হয়।


উত্তরবঙ্গ অঞ্চলে রাজবংশী জাতির কাছে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ দেবদেবীদের অন্যতম হলেন মনসা। প্রায় প্রত্যেক কৃষক গৃহেই মনসার ‘থান’ বা বেদী দেখা যায়। পূর্ববঙ্গের (অধুনা বাংলাদেশ) নিম্নবর্ণীয় হিন্দুদের মধ্যেও মনসাপূজা বিশেষ জনপ্রিয়।

বাংলার বণিক সম্প্রদায়ের মধ্যেও মনসাপূজা বিশেষ প্রচলিত। এর কারণ মনসামঙ্গল কাব্যের চাঁদ সদাগর, যিনি প্রথম মনসার পূজা করেছিলেন, তিনি ছিলেন একজন বণিক। এই কাব্যের নায়িকা বেহুলাও সাহা নামক এক শক্তিশালী বণিক সম্প্রদায়ের গৃহে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।

ভারতের অসম রাজ্যেও মনসাপূজা বিশেষ জনপ্রিয়। এই রাজ্যে ওজা-পালি নামে একধরনের সংগীতবহুল যাত্রাপালা সম্পূর্ণত মনসার কিংবদন্তিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।

নাগপঞ্চমী তিথিতে মনসার বিধিপূর্বক পূজা প্রচলিত। এই উৎসবটি হল একটি সর্পকেন্দ্রিক উৎসব। হিন্দু পঞ্জিকা অনুসারে শ্রাবণ (জুলাই-অগস্ট) মাসে এই উৎসব পালিত হয়। বাঙালি মেয়েরা এই দিন উপবাস করে ব্রত পালন করেন এবং সাপের গর্তে দুধ ঢালে।

Wednesday, July 11, 2018

তারা মা

কলকাতার একটি কালীপূজা মণ্ডপে পূজিত তারা প্রতিমা| তারা হিন্দু দেবী কালীর একটি বিশিষ্ট রূপ। ইনি দশমহাবিদ্যার দ্বিতীয় মহাবিদ্যা। কালীর মতোই তারা ভীষণা দেবী। তারার বিভিন্ন রূপান্তর উগ্রতারা, নীল সরস্বতী, কুরুকুল্লা তারা, খদির বাহিনী তারা, মহাশ্রী তারা, বশ্যতারা, সিতাতারা, ষড়ভূজ সিতাতারা, মহামায়া বিজয়বাহিনী তারা ইত্যাদি। বৌদ্ধধর্মেও তারাদেবীর পূজা প্রচলিত। তারার মূর্তিকল্পনা কালী অপেক্ষাও প্রাচীনতর। কোনো কোনো মতে তারা দুর্গা বা চণ্ডীর রূপান্তর। পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার তারাপীঠে অবস্থিত দেবী তারার মন্দির বিখ্যাত। তন্ত্রসারে দেবী তারার যে রূপ বর্ণিত হয়েছে তা নিম্নরূপ: "তারা প্রত্যালীঢ়পদা অর্থাৎ শববক্ষে দক্ষিণপদ স্থাপিতা। ভয়ংকরী, মুণ্ডমালাভূষিতা, খর্বা, লম্বোদরী, ভীষণা, কটিতে ব্যাঘ্রচর্মাবৃতা, নবযৌবনা, পঞ্চমুদ্রা শোভিতা, চতুর্ভূজা, লোলজিহ্বা, মহাভীমা, বরদা, খড়্গ কাতরি দক্ষিণহস্তে ধৃতা, বামহস্তদ্বয়ে কপাল ও নীলপদ্ম, পিঙ্গলবর্ণ একজটাধারিণী, ললাটে অক্ষোভ্য প্রভাতসূর্যের মতো গোলাকার তিন নয়নশোভা, প্রজ্জ্বলিত চিতামধ্যে অবস্থিতা, ভীষণদন্তা, করালবদনা, নিজের আবেশে হাস্যমুখী, বিশ্বব্যাপ্ত জলের মধ্যে শ্বেতপদ্মের উপর অবস্থিতা।" তন্ত্রসারে তারার আরও একটি ধ্যানমন্ত্র বর্ণিত হয়েছে: "শ্যামবর্ণা ত্রিনয়না দ্বিভূজা, বরমুদ্রা ও পদ্মধারিণী, চতুর্দিকে বহুবর্ণা ও বহুরূপা শক্তির দ্বারা বেষ্টিতা, হাস্যমুখী মুক্তাভূষিতা, রত্নপাদুকায় পাদদ্বয় স্থাপনকারিণী তারাকে ধ্যান করবে।"বৃহদ্ধর্ম পুরাণে তারাকে কেবল শ্যামবর্ণা ও কালরূপিণী বলে উল্লেখ করা হয়েছে।তন্ত্রসারে তারাকেই মহানীল সরস্বতী বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

 
Design by দেবীমা | Bloggerized by Lasantha - Premium Blogger Themes | Facebook Themes