Pages

Friday, August 24, 2018

সুগন্ধা শক্তিপীঠ

সুগন্ধা শক্তিপীঠ
সুগন্ধায়ঞ্চ নাসিকা দেবস্ত্রম্ব্যকনামা চ সুনন্দা তত্র দেবতা ।

ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গল কাব্যে লেখা আছে –

সুগন্ধায় নাসিকা পড়িল চক্রহতা ।
ত্র্যম্বক ভৈরব তাহে সুনন্দা দেবতা ।।


এখানে দেবী জগদম্বা সতী দেবীর নাসিকা পতিত হয়েছিল । ভারতচন্দ্রের ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যে এই শক্তিপীঠের নাম পাওয়া যায় । শিবচরিতে ও পীঠনির্ণয়তন্ত্রে এই সতী পীঠের কথা আছে । তবে কালিকাপুরান, দেবী ভাগবত, কুব্জিকা তন্ত্রে অবশ্য এই পীঠ সম্বন্ধে কিছুই বলা হয় নি । পণ্ডিত দের মতে এই শক্তিপীঠ বাংলাদেশের বরিশালে অবস্থিত । বরিশাল জেলা শহর থেকে ২৭ কিমি উত্তরে শিকারপুর গ্রামে এই পীঠ অবস্থিত। নদীমাতৃক বাংলাদেশে এক সময় পোনাবালিয়া ও সামরাইলের পাশ দিয়ে পবিত্র সুগন্ধা নদী প্রবাহিত হতো । কিন্তু কালের করাল গ্রাসে আজ সে নদী নাব্যতা, স্রোত হারিয়ে ক্ষীণ স্রোতা হয়েছে- যার নাম সোন্ধ । তবে মা কিন্তু এখনও আছেন। সুগন্ধা নদীর পূর্ব পাড়ে দেবীপীঠ পশ্চিম পাড়ে দেবীর ভৈরব ত্র্যম্বকেশ্বর বিরাজমান । একসময় এখানে গভীর জঙ্গল ছিল। দিনেরবেলাতেও লোকজন যেতে ভয় পেতেন । সেই সময় শিকারপুরের খুব ধনী ভূস্বামী শ্রীরাম রায় একদিন স্বপ্নে মহাদেবের আদেশ পেলেন । মহাদেব স্বপ্নে তাঁকে জানালেন – “ তোমার রাজত্বের সামরাইলে জঙ্গলে এক ঢিপির মধ্যে আমি অবস্থান করছি। তুমি সেখান হতে আমাকে উদ্ধার করো। তোমার মঙ্গল হবে।”

স্বপ্ন দেখা মাত্রই পরদিন রাম রায় প্রচুর লোকজন নিয়ে সেই জঙ্গলে তল্লাশি করতে গেলেন । সে সময় জঙ্গলে কিছু রাখাল বালক গোরু চড়াচ্ছিল্ল। অত লোকজন পাইক পেয়াদা দেখে রাখাল বালক গন ভয় পেয়ে পালাতে উদ্যত হলে রাম রায় অভয় দিয়ে বলল- “ওহে রাখাল বালক গন। আমাকে দেখে ভীত হয়ে পালানোর দরকার নেই, আমি এখানে জঙ্গলের মধ্যে কেবল একটি অলৌকিক ঢিপির খোঁজ করতে এসেছি।” রাখাল বালক গন এইরকম একটা অলৌকিক ঢিপির সন্ধান জানতো । তারা একটা ঘটনা বলল। ঘটনা টা এই । রাখাল দের গোরু গুলো আগের মতো আর দুগ্ধ প্রদান করছিল না। গোরুর মালিক ভাবল রাখাল রাই নিশ্চয়ই দুধ চুরি করে গোরু চড়ানোর সময় । একদিন গোরুর মালিক ভাবল হাতে নাতে চোর গুলোকে ধরবে । তারপর রাজার কাছে নালিশ জানাবে । এই ভেবে একদিন মালিক রাখাল দের পিছু নিলো চুপিসারে । জঙ্গলে গোরু গুলো যখন তৃন খাচ্ছিল্ল- মালিক লুকিয়ে দেখছিল। হঠাত মালিক দেখলো গোরু গুলো একে একে জঙ্গলে ঢুকে একটা উচু ঢিপিতে নিজেরাই বাঁট থেকে দুধ দিচ্ছে। মালিক ভাবল গোরু গুলো এমন করছে কেন? ঐ ঢিপিতে কি আছে ? ভেবে মালিক নিজে জঙ্গলের শুকনো কাঠ খড় জোগার করে ঐ ঢিপিতে আগুন ধরিয়ে দিলো । লেলিহান আগুনের শিখা যখন লকলক করে উঠছিল- মালিক দেখলো একটি কৃষ্ণ বর্ণা বালিকা সেই ঢিপি থেকে দৌড়ে পাশে জলাশয়ে প্রবেশ করলো । রাখাল দের কাছে এই শুনে ধনী রাম রায় সেই ঢিপির কাছে পৌছে খনন করার আদেশ দিলো। খনন করতেই লিঙ্গ মূর্তি বের হল । রাম রায় ভাবল এই লিঙ্গ তিনি গৃহে মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করে নিত্যসেবা করবেন । কিন্তু আশ্চর্য কত শত লোক মিলেও সেই লিঙ্গ তুলতে পারলো না । সেইদিন রাতে ভগবান ভোলানাথ আবার রাজাকে স্বপ্নে বললেন- ‘আমাকে ঐখানেই প্রতিষ্ঠা করো । মনে রাখবে আমার বিহারের স্থানে কোনো আচ্ছাদন থাকবে না।’ বিত্তশালী রাম রায় সেই ভাবেই বাবাকে স্থাপন করে নিত্য পূজার ব্যবস্থা করলেন ।
           

অপরদিকে আর একটি ঘটনা । শিকারপুর গ্রামে পঞ্চানন চক্রবর্তী নামে একজন নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ বাস করতো । সে ছিল সৎ, ধার্মিক, মানব প্রেমিক। একদা স্বপ্নে মা কালী তাঁকে দর্শন দিয়ে বললেন- “সুগন্ধার গর্ভে আমি শিলারূপে বিরাজিতা আছি। তুমি আমাকে সেখান থেকে তুলে এনে প্রতিষ্ঠা ও পূজোর ব্যবস্থা করো।” চক্রবর্তী মশাই সেই স্বপ্নাদেশে দেখানো জায়গা থেকে মায়ের পাষাণ মূর্তি তুলে প্রতিষ্ঠা ও নিত্য পূজা করতে লাগলেন । গ্রামের লোকেরা এসে যে যা পারে- তাই দিয়ে মায়ের সেবা করতে লাগলো । দুঃখের বিষয় সেই মূর্তি চুরি হয়ে গেছে । বর্তমানে সেখানে দেবী উগ্রতারার মূর্তি বিরাজিতা। তাঁকেই দেবী সুগন্ধা রূপে পূজা করা হয় । দেবী খড়্গ, খেটক, নীলপদ্ম, নর মুণ্ডের কঙ্কাল ধারন করে আছেন । মাথার ওপর কার্ত্তিক, ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব , গণেশ বিরাজমান । এই মূর্তি বৌদ্ধ তন্ত্রের উগ্রতারার । এথেকে প্রমানিত ভারতবর্ষের বঙ্গপ্রদেশে প্রাচীন কাল থেকেই তন্ত্র সাধনার ব্যপক প্রচার ছিল । বৌদ্ধ তন্ত্রে তারা সাধনার বিশেষ প্রনালী দেখা যায়- সেই মতেই তারা মায়ের উপাসনা হয়। বাংলায় অনেক প্রাচীন কালী মন্দির, দেবী মন্দির দেখা যায় । বাংলায় শক্তি সাধনা হতো । যাই হোক সুগন্ধা শক্তিপীঠের দেবীর প্রাচীন মন্দির এখন আর নেই। এখন যেটা আছে সেটা নবনির্মিত । তবে সতী মায়ের প্রস্তরীভূত দেবী অংশ এখানে কোথায়- তা কেউ জানেন না। একমাত্র মা জানেন । অভয়দায়িনী, শিবশক্তি, আদিভূতা সনাতনী সুগন্ধা মায়ের চরণে অনেক প্রনাম । 

Monday, August 20, 2018

যোগিনী

যোগিনী হল পুরুষবাচক সংস্কৃত শব্দ যোগীর নারীবাচক শব্দ, যেখানে "যোগিন" শব্দটি পুরুষ, নারী বা লিঙ্গ-নিরপেক্ষ ভাবে ব্যবহ্যত হয়।যোগীর সমস্ত কিছুর একটি লিঙ্গ-তকমা ছাড়াও, যোগিনী যুগপৎভাবে যোগের একজন মহিলা অভিজ্ঞ অনুশীলনকারী এবং ভারত, নেপাল ও তিব্বতে মহিলা হিন্দু বা বৌদ্ধ আধ্যাত্মিক শিক্ষকদের জন্য সম্মানের একটি প্রাতিষ্ঠানিক শব্দ উভয়েরই প্রতিনিধিত্ব করে।
হিন্দু ঐতিহ্যে, যোগিনী বলতে সেইসব নারীদের বোঝানো হয় যারা হিন্দু ঐতিহ্যের যোগশাস্ত্রের অংশ এবং যারা গোরক্ষনাথ-প্রবর্তিত নাথ যোগী ঐতিহ্যের অংশ ছিলেন। কয়েকটি প্রসঙ্গে, যোগিনী, দেবী পার্বতী-সূত্রে অবতীর্ণ পবিত্র নারীশক্তির অংশ হিসাবে উল্লিখিত হন , এবং ভারতে যোগিনী মন্দিরগুলিতে আটজন মাতৃকা বা চৌষট্টিজন যোগিনী হিসাবে সম্মানিত হন।
যোগিনী হিসাবে এমন নারীদেরও উল্লেখ করা হয়, যারা হিন্দু ও বৌদ্ধতন্ত্রের ঐতিহ্যের অংশ। তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মে, মিরান্ডা সাউ বলেন যে ডোম্বিযোগিনী, সহজযোগিচিন্তা, লক্ষ্মীঙ্করা, মেখলা, কঙ্কাল গঙ্গাধরা, সিদ্ধরাজ্ঞী ও অন্যান্যদের মত প্রচুর নারীরা সম্মানিত যোগিনী এবং আধ্যাত্মিক জ্ঞানচর্যার পথের প্রাগ্রসর অন্বেষক ছিলেন।
তিব্বতি বৌদ্ধধর্ম এবং বোন ঐতিহ্যে, ব্যবহারিকভাবে, ভারতীয় বৌদ্ধধর্মের মহাসিদ্ধ যোগিনীদের সাথে কিছু নগম তুুলনীয়।

মধ্যপ্রদেশে অবস্থিত অষ্টম শতকের চৌষট্টি যোগিনী মন্দির
ভারতে চৌষট্টি যোগিনীর (৬৪জন কিংবদন্তী যোগিনীর নামে নামকৃত) চারটি প্রধান মন্দির রয়েছে, উড়িষ্যাতে দুটি এবং মধ্যপ্রদেশে দুটি। উড়িষ্যাতে সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক যোগিনী মন্দিরগুলির মধ্যে একটি নবম শতাব্দীর ছাদবিহীন চৌষট্টি যোগিনী মন্দির, এটি ভুবনেশ্বরের ১৫ কিমি দক্ষিণে খুরদা জেলার হীরাপুরে অবস্থিত। উড়িষ্যার আরেকটি ছাদবিহীন চৌষট্টি যোগিনী মন্দির বালাঙ্গীর জেলার তিতীলগড়ের কাছে রাণীপুর-ঝড়িয়ালের চৌষট্টি যোগিনী পিঠ। এই মন্দির থেকে ৬৪ যোগিনীর দুটি ছবি হারিয়ে গেছে।

মধ্যপ্রদেশে দুটি উল্লেখযোগ্য যোগিনী মন্দির ছত্রপুর জেলার ছত্রপুরের খাজুরাহো মন্দিরের পশ্চিমাঞ্চলের দক্ষিণ-পশ্চিমে নবম শতাব্দীর চৌষট্টি যোগিনী মন্দির এবং দশম শতাব্দীর চৌষট্টি যোগিনী মন্দির, জব্বলপুর জেলার জব্বলপুরের কাছে ভেদাঘাটে অবস্থিত।
চারটি যোগিনী মন্দিরের মধ্যে যোগিনী ভাবের মূর্তিগুলি অভিন্ন নয়। হীরাপুরে মন্দিরে, সব যোগিনী মূর্তি তাদের বাহন (শকট) এবং স্থায়ী ভঙ্গিমায় রয়েছে। রাণীপুর-ঝড়িয়াল মন্দিরে যোগিনী মূর্তিগুলি নৃত্যরত ভঙ্গিমায় রয়েছে। ভেদাঘাট মন্দিরে, যোগিনী মূর্তিসমূহ ললিতাসন-এ বসে আছেন
প্রায়ই মাতৃকাদের কিংবদন্তি যোগিনীদের সঙ্গে বিভ্রান্ত করা হয়, যারা সংখ্যায় ৬৪ বা ৮১ হতে পারেন। সংস্কৃত সাহিত্যে, যোগিনীদেরকে দেবী দুর্গার শুম্ভ ও নিশুম্ভের সাথে যুদ্ধরত অবস্থায় বিভিন্ন রূপে বা আত্মীয় হিসাবে প্রকাশ করা হয় এবং প্রধান যোগিনীদের মাতৃকাদের সাথে চিহ্নিত করা হয়। অন্য যোগিনীগণকে এক বা একাধিক মাতৃকা থেকে উৎপন্ন হিসাবে বর্ণনা করা হয়। আটজন মাতৃকা থেকে ৬৪জন যোগিনীর উৎপত্তি একটি ঐতিহ্য হয়ে ওঠে। একাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে, যোগিনী ও মাতৃকাদের সম্পর্ক সাধারণ ব্যাপার হয়ে উঠেছিল। যোগিণীগুলির মণ্ডল (বৃত্ত) ও চক্র বিকল্পরূপে ব্যবহার করা হত। ৮১জন যোগিনী নয়জন মাতৃকার একটি দল থেকে বিবর্তিত হন, আটজনের পরিবর্তে। সপ্তমাতৃকা (ব্রাহ্মী, মাহেশ্বরী, কৌমারী, বৈষ্ণবী, বারাহী, ইন্দ্রাণী (ঐন্দ্রী) ও চামুণ্ডী) চণ্ডিকা এবং মহালক্ষ্মী রূপের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে নব-মাতৃকা জোট গঠন করেন। প্রতিটি মাতৃকা একজন যোগিনী বলে গণ্য হন এবং অন্য আটজন যোগিনীর সঙ্গে সম্বন্ধযুক্ত হন যাতে ৮১ (নয় গুণিতক নয়) জনের দল গঠিত হয়। কিছু ঐতিহ্যে, মাত্র সাতজন মাতৃকা, এবং এইভাবে অল্পতর যোগিনী আছেন।

Thursday, August 16, 2018

তারাপীঠ

তারাপীঠ পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার রামপুরহাট শহরের কাছে অবস্থিত একটি ক্ষুদ্র মন্দির নগরী। এই শহর তান্ত্রিক দেবী তারার মন্দির ও মন্দির-সংলগ্ন শ্মশানক্ষেত্রের জন্য বিখ্যাত। হিন্দুদের বিশ্বাসে, এই মন্দির ও শ্মশান একটি পবিত্র তীর্থক্ষেত্র। এই মন্দির শাক্তধর্মের পবিত্র একান্ন সতীপীঠের অন্যতম। এই স্থানটির নামও এখানকার ঐতিহ্যবাহী তারা আরাধনার সঙ্গে যুক্ত।
তারাপীঠ এখানকার "পাগলা সন্ন্যাসী" বামাক্ষ্যাপার জন্যও প্রসিদ্ধ। বামাক্ষেপা এই মন্দিরে পূজা করতেন এবং মন্দির-সংলগ্ন শ্মশানক্ষেত্রে কৈলাসপতি বাবা নামে এক তান্ত্রিকের কাছে তন্ত্রসাধনা করতেন। বামাক্ষ্যাপা তারা দেবীর পূজাতেই জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। মন্দিরের অদূরেই তাঁর আশ্রম অবস্থিত।

কিংবদন্তি ও গুরুত্ব
তারাপীঠ মন্দিরের উৎস ও তীর্থমাহাত্ম্য সম্পর্কে একাধিক কিংবদন্তি লোকমুখে প্রচারিত হয়ে থাকে। এগুলির মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ কিংবদন্তি হল "শক্তিপীঠ" ধারণাটির সঙ্গে যুক্ত পৌরাণিক কাহিনিটি। শিবের স্ত্রী সতী তাঁর পিতা দক্ষের "শিবহীন" যজ্ঞ সম্পাদনার ঘটনায় অপমানিত বোধ করে। স্বামীনিন্দা সহ্য করতে না পেরে তিনি যজ্ঞস্থলেই আত্মাহুতি দেন। এই ঘটনায় শিব ক্রুদ্ধ হয়ে সতীর দেহ কাঁধে নিয়ে প্রলয়নৃত্য শুরু করেন। তখন বিষ্ণু শিবের ক্রোধ শান্ত করতে সুদর্শন চক্র দ্বারা সতীর দেহ খণ্ডবিখণ্ড করে দেন। সতীর দেহ একান্নটি খণ্ডে ছিন্ন হয়ে পৃথিবীর নানা স্থানে পতিত হয়। এইসকল স্থান "শক্তিপীঠ" নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। পশ্চিমবঙ্গেও এই রকম একাধিক শক্তিপীঠ অবস্থিত। এগুলির মধ্যে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ পীঠ হল কালীঘাট ও তারাপীঠ। সতীর তৃতীয় নয়ন বা নয়নতারা তারাপুর বা তারাপীঠ গ্রামে পড়ে এবং প্রস্তরীভূত হয়ে যায়। ঋষি বশিষ্ঠ প্রথম এই রূপটি দেখতে পান এবং সতীকে তারা রূপে পূজা করেন। অপর একটি কিংবদন্তি অনুসারে: সমুদ্র মন্থনের সময় উত্থিত হলাহল বিষ পান করার পর বিষের জ্বালায় শিবের কণ্ঠ জ্বলতে শুরু করে। এই সময় তারাদেবী শিবকে আপন স্তন্য পান করিয়ে তাঁর জ্বালা নিবারণ করেন। স্থানীয় কিংবদন্তী অনুসারে, বশিষ্ঠ তারাপীঠ নামে প্রসিদ্ধ এই তীর্থে দেবী সতীর পূজা শুরু করেন। পীঠস্থানগুলির মধ্যে তারাপীঠ একটি "সিদ্ধপীঠ", অর্থাৎ এখানে সাধনা করলে সাধক জ্ঞান, আনন্দ ও সিদ্ধি বা অলৌকিক ক্ষমতা প্রাপ্ত হন।

লোকমুখে প্রচারিত অপর একটি কিংবদন্তী অনুসারে, বশিষ্ঠ এখানে তারাদেবীর তপস্যা করেছিলেন। কিন্তু তিনি অসফল হন। তখন তিনি তিব্বতে গিয়ে বিষ্ণুর অবতার বুদ্ধের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বুদ্ধ তাঁকে বামমার্গে মদ্যমাংসাদি পঞ্চমকার সহ তারাদেবীর পূজা করতে বলেন। এই সময় বুদ্ধ ধ্যানযোগে জানতে পারেন মন্দিরে তারামূর্তি প্রতিষ্ঠা করে পূজার করার আদর্শ স্থান হল তারাপীঠ। বুদ্ধের উপদেশক্রমে বশিষ্ঠ তারাপীঠে এসে ৩ লক্ষ বার তারা মন্ত্র জপ করেন। তারাদেবী প্রীত হয়ে বশিষ্ঠের সম্মুখে উপস্থিত হন। বশিষ্ঠ দেবীকে অনুরোধ করেন বুদ্ধ যে শিশু শিবকে স্তন্যপানরতা তারাদেবীকে ধ্যানে দেখেছিলেন, দেবী যেন সেই রূপেই তাঁকে দর্শন দেন। দেবী সেই রূপেই বশিষ্ঠকে দর্শন দেন এবং এই রূপটি প্রস্তরীভূত হয়। সেই থেকে তারাপীঠ মন্দিরে শিশু শিবকে স্তন্যপানরতা মূর্তিতে দেবী তারা পূজিত হয়ে আসছেন।

শাক্তধর্মের তারাপীঠ ও বৈষ্ণবধর্মের নবদ্বীপ বাঙালি হিন্দুদের নিকট সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ তীর্থ রূপে পরিগণিত হয়।

কিংবদন্তির পেছনে ঐতিহাসিকতা

রামায়ণে উল্লিখিত বশিষ্ঠ এবং গৌতম বুদ্ধের সাক্ষাৎকারের ঐতিহাসিকতার চেয়ে কল্পনাই বেশি মাত্রায় স্থান পেয়েছে। তবে সপ্তম শতাব্দীতে গৌড়ের শাসক শশাঙ্কের বিরুদ্ধে হর্ষবর্ধন ও কামরূপরাজ ভাস্করবর্মণ সামরিক অভিযানের সময়ে তিব্বত সম্রাট স্রোং-ব্ত্সন-স্গাম-পো অসম, নেপাল ও বিহারের কিছু অংশ পর্যন্ত রাজ্য বিস্তার করে নেন। এরফলে তন্ত্রমন্ত্রে পরিপূর্ণ তিব্বতী বৌদ্ধধর্মের সঙ্গে গৌড় বাংলার সাংস্কৃতিক সংঘাত ঘটে ও বাংলায় তান্ত্রিক আচার অনুষ্ঠান বৃদ্ধি পায়। ১৭৬,১৭৭ এই সময় রসায়ানাচার্য নাগার্জুন তিব্বত থেকে বৌদ্ধ দেবী তারার সাধনপদ্ধতি ভারতে নিয়ে আসেন বলে মনে করা হয়। বিনয় ঘোষের মতে পালযুগে বৌদ্ধধর্মের বিকাশের সাথে বাংলায় বৌদ্ধ দেবী তারার সাধনা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায় এবং পরবর্তীকালে হিন্দু ধর্মের উত্থানে বৌদ্ধদেবী হিন্দুদেবীতে পরিণত হনএবং রসায়ানাচার্য নাগার্জুন লোককথায় বশিষ্ঠ মুণিতে পরিণত হন।

তারাপীঠ মন্দির

তারাপীঠের তারামূর্তি
উত্তরমুখী আটচালা মন্দিরটি লাল ইঁটে নির্মিত। এর ভিতের দেওয়াল বেশ মোটা। উপরিভাগে শিখর পর্যন্ত একাধিক ধনুকাকৃতি খিলান উঠেছে। চারচালার ওপরে চার কোণে চারটি ছোট ছোট চূড়া অবস্থিত। মন্দিরের চূড়ায় একটি তামার পত্তাকাসহ ত্রিশীল তিনটি পদ্ম ভেদ করে উঠেছে। মন্দিরের প্রবেশপথের মধ্য খিলানের ওপর দুর্গার প্রতিকৃতি রয়েছে। উত্তরদিকে বামপাশের খিলানের ওপর কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের ঘটনা, ভীষ্মের শরশয্যা, অশ্বত্থমা হত প্রভৃতি মহাভারতের কাহিনী উৎকীর্ণ রয়েছে। মন্দিরের উত্তর ভিতের পূর্বদিকে সীতাহরণ, অকালবোধন, রাম ও রাবণের যুদ্ধের দৃশ্য এবং পশ্চিমদিকে কৃষ্ণলীলার চিত্র খোদিত।:১২৮,১২৯ ১২ ফুট X ৬ ফুট মাপের মন্দিরের গর্ভগৃহে দেবীমূর্তি সংস্থাপিত।

শিশু শিবকে স্তন্যপানরতা তারার মূল প্রস্তরমূর্তিটি একটি তিন ফুট উঁচু ধাতব মূর্তির মধ্যে রাখা থাকে। দর্শনার্থীরা সাধারণত ধাতব মূর্তিটিই দর্শন করে থাকেন। এই মূর্তিটি তারা দেবীর ভীষণা চতুর্ভূজা, মুণ্ডমালাধারিণী এবং লোলজিহ্বা মূর্তি। এলোকেশী দেবীর মস্তকে রৌপ্যমুকুট থাকে। বহির্মূর্তিটি সাধারণট শাড়ি-জড়ানো অবস্থায় গাঁদা ফুলের মালায় ঢাকা অবস্থায় থাকে। মূর্তির মাথার উপরে থাকে একটি রূপোর ছাতা। মূর্তিটির কপালে সিঁদুর লেপা থাকে। পুরোহিতেরা সেই সিঁদুরের টীকা পরিয়ে দেন দর্শনার্থীদের। প্রতিকৃতি বিগ্রহের নিচে গোল্কার বেদীতে দুটি রূপোর পাদপদ্ম থাকে। ভক্তরা নারকেল, কলা বা রেশমি শাড়ি দিয়ে দেবীর পূজা দেন। তারাদেবীর মূল মূর্তিটিকে "তারার কোমল রূপের একটি নাটকীয় হিন্দু প্রতিমা" বলে অভিহিত করা হয়েছে।

পূজাপদ্ধতি
তারাপীঠ মন্দিরটি গ্রাম বাংলার যে কোনো মধ্যম আকারের মন্দিরেরই অনুরূপ। কিন্তু তা সত্ত্বেও এত বৃহৎ একটি তীর্থক্ষেত্রে হিসেবে এই মন্দিরের বিকাশের কারণ হল "মন্দির-সংক্রান্ত কিংবদন্তি, পশুবলি সহ এই মন্দিরের পূজাপদ্ধতি, এখানে গেয় ভক্তিগীতিসমূহ, স্থানীয় জলাশয়গুলির অতিলৌকিক ক্ষমতা সম্পর্কে লোকবিশ্বাস, এবং শ্মশানক্ষেত্রের অধিবাসী ও সেখানকার সাধনপদ্ধতি। ভক্তেরা মন্দিরে প্রবেশের পূর্বে মন্দির-সংলগ্ন জীবিতকুন্ড নামক পবিত্র জলাশয়ে স্নান করেন। তারপর মন্দিরে প্রবেশ করে পূজা দেন। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এই জলাশয়ের জলে আরোগ্যক্ষমতা বিদ্যমান।  মন্দিরে রোজই পশুবলি হয়ে থাকে। ভক্তেরা এই মন্দিরে ছাগ বলি দিয়ে থাকেন। বলির পূর্বে ছাগটিকে পবিত্র জলাশয়ে স্নান করানো হয়। বলিদাতা নিজেও স্নান করে পবিত্র হন। ছাগটিকে হাঁড়িকাঠে খড়্গের এক কোপে বলি দেওয়া হয়। বলির পর ছাগটির রক্ত সংগ্রহ করে দেবীকে নিবেদন করা হয়। ভক্তেরা এই রক্তের তিলকও কপালে আঁকেন। প্রতি বছর আশ্বিন মাসের কোজাগরি শুক্লা চতুর্দশী তিথিতে মন্দির থেকে শিলামূর্তি এনে পশ্চিমমুখো করে বিরাম মঞ্ছে রাখা হয় এবনফ সেইদিন প্রকাশ্যে তারামূর্তিকে স্নান করানো হয়ে থাকে।

বামাক্ষ্যাপা

উনিশ শতকের তান্ত্রিক সাধক বামাক্ষ্যাপা
তারাপীঠের সর্বাধিক প্রসিদ্ধ সাধক হলেন বামাক্ষ্যাপা (১৮৪৩-১৯১১)। মন্দিরের নিকটেই তাঁর আশ্রম ছিল। বামাক্ষ্যাপা ছিলেন তারাদেবীর একনিষ্ঠ ভক্ত। তিনি মন্দিরে পূজা করতেন এবং শ্মশানে সাধনা করতেন। তিনি তারাপীঠ নিকটবর্তী মল্লরাজাদের মন্দিরময় গ্রাম মালুটি (অধুনা ঝাড়খণ্ড) তে সাধনা করেন। তিনি ছিলেন উনিশ শতকের অপর প্রসিদ্ধ কালীভক্ত রামকৃষ্ণ পরমহংসের সমসাময়িক। অল্প বয়সেই তিনি গৃহত্যাগ করেন এবং কৈলাসপতি বাবার সান্নিধ্যে তন্ত্রসাধনা শুরু করেন। পরে তিনি সমগ্র তারাপীঠের প্রধান ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠেছিলেন। ভক্তেরা তাঁর কাছে আশীর্বাদ বা আরোগ্য প্রার্থনা করতে আসত। কেউ কেউ আবার শুধুই তাঁকে দর্শন করতে আসত। তিনি মন্দিরের নিয়ম মানতেন না। একবার নৈবেদ্য নিবেদনের পূর্বে খেয়ে ফেলে তিনি পুরোহিতদের রোষ দৃষ্টিতে পড়েছিলেন। শোনা যায়, এরপর তারাদেবী নাটোরের মহারানিকে স্বপ্নে দেখা দিয়ে দেবীর পুত্র বামাক্ষ্যাপাকে প্রথমে ভোজন করাতে আদেশ দেন। এরপর থেকে মন্দিরে দেবীকে নৈবেদ্য নিবেদনের পূর্বে বামাক্ষ্যাপাকে ভোজন করানো হত এবং কেউ তাঁকে বাধা দিতেন না। কথিত আছে, তারাদেবী শ্মশানক্ষেত্রে ভীষণা বেশে বামাক্ষ্যাপাকে দর্শন দিয়ে তাঁকে স্তন্যপান করিয়েছিলেন।

Monday, August 13, 2018

নবদুর্গা

নবদুর্গা বলতে আভিধানিক ভাবে দেবী দুর্গার নয়টি রূপকে বোঝানো হয় ৷ হিন্দু পুরাণ অনুসারে এগুলো দেবী পার্বতীর নয়টি ভিন্ন রূপ ৷ এই নয় রূপ হল যথাক্রমে - শৈলপুত্রী, ব্রহ্মচারিণী, চন্দ্রঘণ্টা, কুষ্মাণ্ডা, স্কন্দমাতা, কাত্যায়নী, কালরাত্রি, মহাগৌরী এবং সিদ্ধিদাত্রী ৷ প্রতি শরৎকালে নবরাত্রির নয় দিনে প্রতিদিন দেবী দুর্গার এই নয় রূপের এক একজনকে পূজা করা হয় ৷

ভগবতীর বিভিন্ন রূপ
দেবী দুর্গা আর নবদুর্গা আদ্যাশক্তিরই অন্যরূপ । মাতা পার্বতীও আদ্যাশক্তির বহিঃপ্রকাশ । আদ্যাশক্তি ঈশ্বরের মাতৃরূপের প্রকাশ ।
১।শৈলপুত্রীঃ মা শৈলপুত্রীর বাহন বৃষ । এঁনার দক্ষিণ হস্তে ত্রিশূল আর বাম হস্তে কমল আছে । ইনি পূর্ব জন্মে দক্ষ নন্দিনী সতী দেবী ছিলেন । দক্ষের অমতে তিনি শিব কেই বিবাহ করেন । প্রতিশোধে দক্ষ এক শিব হীন যজ্ঞের আয়োজন করেন । বিনা নিমন্ত্রণে সতী দেবী পিত্রালয়ে গিয়ে অনেক অপমানিত হলেন ও দেহত্যাগ করলেন । এরপর ভগবান শিব দক্ষ যজ্ঞ ধ্বংস করেন । এই দেবী পর জন্মে হিমালয় কন্যা পার্বতী রূপে জন্ম নেন । শৈলরাজ হিমালয়ের কন্যা হবার জন্য দেবীর এক নাম শৈলপুত্রী । এবং পরজন্মে তিনি দেবাদিদেব শিবকেই পতি রূপে বরন করলেন । নবরাত্রির প্রথম দিনে মা শৈলপুত্রীর আরাধনা করা হয় ।
এই দেবী হৈমবতী রূপে দেবতা দের গর্ব চূর্ণ করেছিলেন ।

২।ব্রহ্মচারিণীঃ মা দুর্গার নবশক্তির দ্বিতীয় রূপ ব্রহ্মচারিণী। এখানে ‘ব্রহ্ম’ শব্দের অর্থ হল তপস্যা। ব্রহ্মচারিণী অর্থাৎ তপশ্চারিণী--- তপ আচরণকারী। কথিত আছে যে---‘বেদস্তত্ত্বং তপো ব্রহ্ম’---বেদ, তত্ত্ব এবং তপ হল ‘ব্রহ্ম’ শব্দের অর্থ। দেবী ব্রহ্মচারিণীর রূপ- জ্যোতিতে পূর্ণ, অতি মহিমামণ্ডিত। তিনি ডান হাতে জপের মালা এবং বাঁ হাতে কমণ্ডলু ধারণ করে আছেন।

পূর্বজন্মে যখন হিমালয়ের কন্যারূপে জন্মেছিলেন তখন তিনি নারদের পরামর্শে ভগবান শঙ্করকে পতিরূপে লাভ করার জন্য কঠিন তপস্যা করেন। সেই কঠিন তপস্যার জন্য তাঁকে তপশ্চারিনী বা ব্রহ্মচারিণী বলা হয়। তিনি সহস্র বর্ষ ধরে মাত্র ফল-মূলের আহার করে জীবন ধারণ করেছিলেন। শতবর্ষ তিনি শাক আহার করে জীবন নির্বাহ করেছিলেন। কিছুকাল কঠিন উপবাসে থেকে খোলা আকাশের নিচে বর্ষা ও গ্রীষ্মের দাবদাহে কাটিয়েছেন। এই কঠোর তপশ্চর্যার পরে তিন সহস্র বছর শুধুমাত্র গাছ থেকে মাটিতে ঝরে পড়া বেলপাতা আহার করে অহর্নিশ ভগবান শঙ্করের আরাধনা করেছেন। তারপর তিনি সেই শুষ্ক বেলপাতা আহার করাও পরিত্যাগ করেন। অতঃপর কয়েক সহস্র বছর নির্জলা, নিরাহারে থেকে তপস্যা করতে লাগলেন। পাতা (পর্ণ) খাওয়া পর্যন্ত পরিত্যাগ করায় তাঁর অন্য একটি নাম হয় ‘অপর্ণা’। কয়েক সহস্র বছর এই তপস্যা করায় ব্রহ্মচারিণী দেবীর পূর্বজন্মের শরীর কৃশ-একদম ক্ষীণ হয়ে গেল। তিনি অতি কৃশকায় হয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর এই দশা দেখে মা মেনকা অত্যন্ত দুঃখিত হলেন। তিনি তাঁকে এই কঠিন তপস্যা থেকে বিরত করার জন্য বললেন, ‘উ মা, না ওরে আর না!’ তখন থেকে দেবী ব্রহ্মচারিণীর পূর্বজন্মের আর এক নাম হয় ‘উমা’। তাঁর তপস্যার কঠোরতায় ত্রিলোকে হাহাকার পড়ে গেল দেবতা, ঋষি, সিদ্ধগণ, মুণি সকলেই ব্রহ্মচারিণী দেবীর এই তপস্যাকে অভূতপূর্ব পুণ্যকাজ বলে তাঁকে প্রশংসা করতে লাগলেন। অবশেষে পিতামহ ব্রহ্মা তাঁকে সম্বোধন করে প্রসন্ন হয়ে আকাশবাণীর মাধ্যমে বললেন, হে দেবী! আজ পর্যন্ত কেউ এরূপ কঠোর তপস্যা করে নি। তোমার দ্বারাই এরূপ তপস্যা সম্ভব। তোমার এই অলৌকিক কাজে চতুর্দিকে ধন্য ধন্য রব উঠেছে। তোমার মনোষ্কামনা সর্বতোভাবে পূর্ণ হবে। ভগবান চন্দ্রমৌলি শিবকে তুমি পতিরূপে পাবে। এবার তুমি তপস্যায় বিরত হয়ে গৃহে ফিরে যাও। তোমার পিতা শীঘ্রই তোমাকে নিতে আসবেন।’ মা দুর্গার এই দ্বিতীয় রূপ ভক্ত এবং সিদ্ধদের অনন্ত ফল প্রদান করে। তাঁর উপাসনা দ্বারা মানুষের স্বভাবে তপ, ত্যাগ, বৈরাগ্য, সদাচার, সংযম বৃদ্ধি পায়। জীবনের কঠিন সংঘর্ষেও তাঁর মন কর্তব্যে বিচলিত হয় না। মা ব্রহ্মচারিণী দেবীর কৃপায় তাঁর সর্বদা সিদ্ধি ও বিজয় প্রাপ্তি হয়। দুর্গাপূজার দ্বিতীয় দিনে এঁর স্বরূপেরই আরাধনা করা হয়। এই দিন সাধকের মন ‘স্বাধিষ্ঠান চক্রে’ স্থিত হয়। এই চক্রে চিত্ত-প্রতিষ্ঠ যোগী তাঁর কৃপা ও ভক্তি লাভ করে।

৩।চন্দ্রঘণ্টাঃ দেবীর এই স্বরূপ পরম কল্যাণকারী । এঁনার মস্তকে অর্ধচন্দ্র থাকে , তাই দেবীকে চন্দ্রঘণ্টা নামে ডাকা হয় । এঁনার শরীরের রং স্বর্ণের মতো উজ্জ্বল । এই দেবী দশভুজা । এঁনার হাতে কমণ্ডলু , তরোয়াল , গদা , ত্রিশূল , ধনুর্বাণ , পদ্ম , জপ মালা থাকে । এঁনার বাহন সিংহ । দেবী তাঁর ঘণ্টার ন্যায় প্রচন্ড চন্ড ধবনিতে দুরাচারী রাক্ষস , দানব , দৈত্য দের প্রকম্পিত করেন ।

৪।কুষ্মাণ্ডাঃ দেবী দুর্গা তাঁর চতুর্থ স্বরূপে "কুষ্মাণ্ডা" নামে পরিচিতা। নবরাত্রের চতুর্থদিনে, অর্থাৎ চতুর্থী তিথিতে মাতৃপ্রাণ ভক্তগণ এই কুষ্মাণ্ডারূপেই আদ্যাশক্তিকে আহ্বান করে থাকেন।

কারুণ্যে ভরপুর মায়ের সৌম্যপ্রতিমা। দেবী সিংহবাহিনী, ত্রিনয়নী ও অষ্টভুজা। আটটি হাতে সুদর্শনচক্র, ধনুর্বাণ, রক্তপদ্ম, কমণ্ডলু, ইত্যাদি দৃষ্টিগোচর হয়। মায়ের বামহস্তে একটি অমৃতপূর্ণ কলসও রয়েছে। এখানে অমৃত ব্রহ্মের রূপক, দেবী ভগবতী অমৃতপূর্ণ কলস অর্থাৎ ব্রহ্মজ্ঞানের আধার হাতে নিয়ে বসে রয়েছেন। যোগ্য সাধক আপন তপোবল ও কৃচ্ছ্রতা দ্বারা মহামায়াকে প্রসন্ন করতে পারলে তবেই মা সেই অমৃতভাণ্ডের অমৃতধারায় সাধককে স্নান করিয়ে তৃপ্ত করবেন, ব্রহ্মজ্ঞান প্রদানে কৃতার্থ করবেন।

মায়ের হাতে আরও একটি বস্তু রয়েছে, সেটি হল জপমালা। সেই জপমালা সিদ্ধমন্ত্রে মন্ত্রিত, তাহা অষ্টসিদ্ধি ও নবনিধি দান করতে সমর্থ। এবার যে ভক্ত রুচি অনুযায়ী যা চাইবে, কল্পতরু মা সেই অনুসারেই বাঞ্ছা পূর্ণ করবেন। যে সিদ্ধি ও সিদ্ধাই চাইবে, মা তাকে তাই দিয়ে ভোলাবে। আর যে পার্থিব সম্পদে অনীহা প্রকাশ করে ওই অমৃতপূর্ণ কলস, অর্থাৎ ব্রহ্মজ্ঞান চাইবে, মা তাকেও তাই দিয়েই সন্তুষ্ট করবেন।

এবার আসি মায়ের নাম বিশ্লেষণে। শাস্ত্রে বলা হয়েছে, বলিদানের মধ্যে কুমড়ো বলি মায়ের অধিক প্রিয়। কুমড়োকে সংস্কৃতে "কুষ্মাণ্ড" বলে, কুষ্মাণ্ডপ্রিয় দেবী তাই কুষ্মাণ্ডা নামে স্তুতা। এ তো গেল সহজ একটি ব্যাখ্যা, কিন্তু এর সুগভীর অর্থও রয়েছে। যেমন-

"কুৎসিত উষ্মা সন্তাপস্তাপত্রয়রূপো যস্মিন সংসারে। স সংসারে অণ্ডে উদর রূপায়াং যস্যাঃ।।"

সংসার তাপযুক্ত, ত্রিবিধ তাপে জরজর। সেই সংসারকে যিনি ভক্ষণ করেন, তিনিই কুষ্মাণ্ডা। কু- কুৎসিত, উষ্মা সন্তাপত্রয়ে পূর্ণ জগৎ যাঁর অণ্ডে (উদরে) বিদ্যমান, তিনিই কুষ্মাণ্ডা।

দেবী কুষ্মাণ্ডার যেহেতু আটটি হাত, তাই তিনি "অষ্টভুজা" নামেও পরিচিতা। এনাকে "কৃষ্ণমাণ্ড" নামেও ডাকা হয়। মহাপ্রলয়ের পরে যখন সর্বত্র শুধু নিশ্ছিদ্র অন্ধকার ছেয়ে রয়েছে, তখন এই ভগবতী কুষ্মাণ্ডা "ঈষৎ হাস্য" করে ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি করেছিলেন। তাই আদ্যাশক্তি বলতে আমরা যাঁকে বুঝি, তিনিই ইনি। দেবীর বাসস্থান সৌরমণ্ডলে। ভীমাপর্বতেও দেবী নিবাস করেন বলে উল্লেখ আছে।

৫| স্কন্দমাতা : আমরা যেমন দেবীকে গণেশজননী হিসেবে বেশি পুজো করি, পশ্চিম ভারতে আবার দেবী মান্যতা পান কার্তিকেয়র মাতা হিসেবে | কার্তিকের অরা এক নাম স্কন্দ | নবরাত্রির পঞ্চম রাতে দুর্গা পূজিত হন স্কন্দমাতা রূপে | ত্রিনয়নী দেবী চার হাতবিশিষ্টা | ডানদিকের উপরের হাতে ধরে আছেন শিশু কার্তিককে | প্রস্ফুটিত পদ্ম থাকে আর এক দক্ষিণ হস্তে | বাঁ দিকের একটি হাত বরাভয় দিচ্ছে | আর এক হাতে ধরে আছেন পদ্ম | এই রূপে দেবী দুর্গা কোনও বাহনে উপবিষ্ট নন | তিনি বসে থাকেন ফুটে থাকা কমলে | পূজিত হন নবরাত্রির পঞ্চমদিনে |

৬ | কাত্যায়নী : এই নাম এবং রূপের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক পৌরাণিক কাহিনি | বৈদিক যুগে কাত্যায়ন নামে এক ঋষি ছিলেন | এক পুত্রের পিতা কাত্যায়নের ইচ্ছে হয় একটি কন্যসন্তান লাভের | দেবী দুর্গার তপস্যা করে তিনি অভীষ্ট পূর্ণ করেন | তাঁর স্তবে তুষ্ট হয়ে স্বয়ং দেবী দুর্গা জন্ম নেন মহারিশি কাত্যায়নের কন্য রূপে | তখন তাঁর নাম হয় কাত্যায়নী | নবরাত্রির ষষ্ঠ দিনে আরাধিতা হন ভক্তদের কাছে |

৭ | কালরাত্রি : এখানে দেবী কৃষ্ণবর্ণা | আলুলায়িত কেশে তিনি ধাবিত শত্রুর দিকে | তাঁর কণ্ঠে বিদ্যুতের মালিকা | ত্রিনয়নী দেবীর শ্বাস প্রশ্বাসে বেরিয়ে আসে আগুনের হলকা | ভীষণদর্শনা দেবীর তিন হাতে অস্ত্র | এক হাতে ভক্তদের প্রতি বরাভয় | এই রূপই উপাসিত হয় কালিকা রূপে | তবে এই রূপেও দেবী ভক্তের শুভ করেন | তাই অন্যদিকে তিনি শুভঙ্করী | দেবীর বাহন গর্দভ | ভক্তরা তাঁর পুজো করেন নবরাত্রির সপ্তম রাতে |

৮| মহা গৌরী : হিমায়লকন্যা নাকি ছিলেন কৃষ্ণা | মহাদেব যখন গঙ্গাজল দিয়ে তাঁকে স্নান করান, তখন তিনি হয়ে ওঠেন ফর্সা | তাঁর এই রূপের নাম হয় মহাগৌরী | প্রচলিত বিশ্বাস, নবরাত্রির অষ্টম রাতে তাঁর পুজো করলে সব পাপ ধুয়ে যায় | সাদা পোশাক পরিহিতা, চার হাত বিশিষ্টা দেবীর বাহন ষাঁড় | দেবীর এক হাত শোভিত বরাভয় মুদ্রায় | বাকি তিন হাতে থাকে পদ্ম, ত্রিশূল এবং ডমরু |

৯ | সিদ্ধিদাত্রী : নবদুর্গার নবম তথা শেষ রূপ হল সিদ্ধিদাত্রী | সিংহবাহিনী দেবীর চার হাতে আশীর্বাদী মুদ্রা | তিনি সিদ্ধি দান করেন | অর্থাত্‍ তাঁর উপাসনায় সংসারে আসে সুখ এবং সমৃদ্ধি | সবাইকে বরাভয় দেন এই মাতৃকামূর্তি | দেবী ভগবত্‍ পুরাণে আছে, স্বয়ং মহাদেব দেবী দুর্গাকে সিদ্ধিদাত্রী রূপে পুজো করেছিলেন | এবং তার ফলে মহাদেব সকল সিদ্ধি লাভ করেন | সিদ্ধিদাত্রীর আশীর্বাদেই অর্ধনারীশ্বর রূপ লাভ করেন মহাদেব |


নবরাত্রিতে দেবী দুর্গার পুজোয় যোগসাধনার যোগপদ্ধতি অত্যন্ত উচ্চ মার্গের সাধনক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত। যথা এই নবরাত্রির প্রথম দিনের পুজোয় যোগীগণ তাঁদের মনকে ‘মূলাধার’ চক্রে স্থিত করেন। যা মানুষের শরীরের অভ্যন্তরেই প্রতিষ্ঠিত ‘কুলকুণ্ডলিনী’ রূপে – যিনি স্বয়ং মহাশক্তি, দৈবী ও ঐশী শক্তি, মহামায়া, মহাদুর্গা। নবদুর্গা রূপের প্রথম দিনের রূপটি হল ‘ ‘শৈলপুত্রী’, দ্বিতীয়ায় দ্বিতীয় রূপটি হল ‘ব্রহ্মচারিণী’। বেদ-এ এর উল্লেখ আছে। এদিন যোগী সাধক তাঁর মনকে ‘স্বাধিষ্ঠান’ চক্রে স্থিত করেন যোগসাধনার মাধ্যমে। নবরাত্রি আরাধনার তৃতীয় দিনে মা দুর্গার তৃতীয় শক্তির নাম ‘চন্দ্রঘণ্টা’, উপাসনায় যোগী তাঁর মনকে ‘মণিপুর’ চক্রে প্রবিষ্ট করান। মা দুর্গার চতুর্থ রূপের নাম হল ‘কুষ্মাণ্ডা’, এই চতুর্থী তিথিতে সাধকের মন ‘অনাহত’ চক্রে অবস্থান করে। মহাপঞ্চমীতে দেবী দুর্গা ‘স্কন্দমাতা’ রূপে পূজিতা হন। এই দিনে সাধক তাঁর মনকে ‘বিশুদ্ধ’ চক্রে স্থাপন করেন। দেবী দুর্গাকে প্রথম আরাধনা করেন মহর্ষি কাত্যায়ন – কন্যারূপে। তাই দেবী দুর্গা মহাষষ্ঠীতে ‘কাত্যায়নী’ রূপে পূজিতা হন। শ্রীকৃষ্ণ-সহ সমস্ত গোপ ও গোপী দেবী কাত্যায়নীর পূজা করেন, এর উল্লেখ মহাভারতে পাওয়া যায়। দেবী কাত্যায়নীর আরাধনায় সাধক ‘আজ্ঞা’ চক্রে তাঁর মনের উত্তরণ ঘটান। দুর্গাপূজার সপ্তম দিনে মহাসপ্তমীতে দেবী দুর্গাকে ‘কালরাত্রি’ রূপে পূজা করার বিধান। সে দিন সাধকের মন ‘সহস্রার’ চক্রে অবস্থান করে। মহাষ্টমীতে দেবী দুর্গার রূপ হয় ‘মহাগৌরী’ – সন্ত তুলসীদাস এই দেবীর উপাসনা করতেন। এই দিন সাধকের সাধনা ‘সন্ধিচক্র’-এ অধিষ্ঠিত হয়। নবদুর্গার শেষ রূপটি হল ‘সিদ্ধিদাত্রী’। ‘মার্কণ্ডেয় পুরাণে’-এ ‘সিদ্ধিদাত্রী’ অষ্টভুজা, ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণের শ্রীকৃষ্ণজন্ম খণ্ডে ‘সিদ্ধিদাত্রী’ অষ্টাদশভুজা। ‘সিদ্ধিদাত্রী’ চতুর্ভুজা রূপেও দেখা যায়। সেখানে তিনি অর্ধনারীশ্বররূপী। এই হল নবদুর্গার চর্চিত কাহিনি।

Friday, August 10, 2018

কাত্যায়নী দেবী

কাত্যায়নী হিন্দু দেবী দুর্গার একটি বিশেষ রূপ এবং মহাশক্তির অংশবিশেষ। তিনি নবদুর্গা নামে পরিচিত দুর্গার নয়টি বিশিষ্ট রূপের মধ্যে ষষ্ঠ। নবরাত্রি উৎসবের সময় তাঁর পূজা প্রচলিত।
শাক্তধর্ম মতে, তিনি মহাশক্তির একটি ভীষণা রূপ এবং ভদ্রকালী বা চণ্ডীর মতো যুদ্ধদেবী রূপে পূজিতা। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, তাঁর গাত্রবর্ণ দুর্গার মতোই লাল। খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীতে রচিত পতঞ্জলির মহাভাষ্য গ্রন্থে তাঁকে মহাশক্তির আদিরূপ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
কৃষ্ণ যজুর্বেদের অন্তর্গত তৈত্তিরীয় আরণ্যকে দেবী কাত্যায়নীর প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায়। স্কন্দ, বামন ও কালিকা পুরাণ অনুযায়ী, মহিষাসুর বধের নিমিত্ত দেবগণের ক্রোধতেজ থেকে তাঁর জন্ম। ভারতের অধিকাংশ অঞ্চলে এই পৌরাণিক ঘটনাটির প্রেক্ষাপটেই বাৎসরিক দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। খ্রিষ্টীয় পঞ্চম-ষষ্ঠ শতাব্দী নাগাদ রচিত মার্কণ্ডেয় পুরাণের অন্তর্গত দেবীমাহাত্ম্যম্ ও একাদশ-দ্বাদশ শতাব্দীতে রচিত দেবীভাগবত পুরাণ গ্রন্থে কাত্যায়নীর দিব্যলীলা বর্ণিত হয়েছে। একাধিক বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মগ্রন্থ এবং তন্ত্রগ্রন্থেও কাত্যায়নীর উল্লেখ পাওয়া যায়। খ্রিষ্টীয় দশম শতাব্দীতে রচিত কালিকা পুরাণে বলা হয়েছে, উড্ডীয়ন বা ওড্রদেশ (ওড়িশা) দেবী কাত্যায়নী ও জগন্নাথের ক্ষেত্র। কাত্যায়নী পূজা অতি প্রাচীন কাল থেকেই প্রচলিত। আর. জি. ভাণ্ডারকরের মতে, কাত্য জাতির পূজিতা ছিলেন বলে দেবী কাত্যায়নী নামে অভিহিতা হন।
যোগশাস্ত্র ও তন্ত্র মতে, কাত্যায়নী আজ্ঞা চক্রের অধিষ্ঠাত্রী দেবী এবং এই বিন্দুতে মনোনিবেশ করতে পারলে তাঁর আশীর্বাদ পাওয়া যায়।
মূর্তিতত্ত্ব
হংসনারায়ণ ভট্টাচার্য তার হিন্দুদের দেবদেবী: উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ বইয়ে বলেছেন, তন্ত্রসারে বর্ণিত ধ্যানমন্ত্রে কাত্যায়নীকে দশভূজা মহিষাসুরমর্দিনীর রূপেই বর্ণনা করা হয়েছে:
                                   সব্যপাদসরোজেনালঙ্কৃতোরুমৃগাধিপাম্।
                                   বামপাদাগ্রদলিতমহিষাসুরনির্ভরাম্।।
                                  সুপ্রসন্নাং সুবদনাং চারুনেত্রত্রয়ান্বিতাম্।
                                  হারনূপুরকেয়ূরজটামুকুটমণ্ডিতাম্।
                                  বিচিত্রপট্টবাসামর্ধচন্দ্রবিভূষিতাম্।।
                                  খড়্গখেটকবজ্রাণি ত্রিশূলং বিশিখং তথা।
                                 ধারয়ন্তীং ধনুঃ পাশং শঙ্খং ঘণ্টাং সরোরুহাম্।
                                 বাহুভির্ললিতৈর্দেবীং কোটিচন্দ্রসমপ্রভাম্।।

—যিনি দক্ষিণ পাদপদ্ম দ্বারা বিরাট মৃগাধিপতিকে (সিংহ) অলঙ্কৃত করে বাম পদের অগ্রভাগ দ্বারা মহিষাসুরকে বিদলিত করছেন; যিনি সুপ্রসন্না ও সুন্দর বদনযুক্তা; যাঁর তিনটি নেত্রই মনোহর; যিনি হার, নূপুর, কেয়ূর ও জটামুকুটাদিতে শোভিতা; যাঁর পরিধানে বিচিত্র পট্টবস্ত্র এবং কপালে অর্ধচন্দ্র; যিনি সুকোমল দশ বাহুতে খড়্গ, খেটক, বজ্র, ত্রিশূল, বাণ, ধনুক, পাশ, শঙ্খ, ঘণ্টা ও পদ্ম ধারণ করে থাকেন; যাঁর দেহপ্রভা কোটি চন্দ্রের ন্যায়... [সেই দেবীকে ধ্যান করিবে]।
হরিবংশ গ্রন্থে দেবী অষ্টাদশভূজা। এই গ্রন্থে বর্ণিত মূর্তিটি নিম্নরূপ:
অষ্টাদশভূজা দেবী দিব্যাবরণভূষিতা। হারশোভিতাসর্বাঙ্গী মুকুটোজ্জ্বলভূষণা।। কাত্যায়নী স্তূয়সে ত্বং বরমগ্রে প্রযচ্ছসি।
—অষ্টাদশভূজা, দিব্যাবরণভূষিতা, সর্বাঙ্গে হারশোভিতা, উজ্জ্বল মুকুট ভূষণা দেবী কাত্যায়নী আপনার স্তব করি, আমাকে বর প্রদান করুন।

পৌরাণিক উপাখ্যান
প্রাচীন কিংবদন্তি অনুযায়ী, দেবী কাত্যবংশীয় ঋষি কাত্যায়নের কন্যারূপে জন্মগ্রহণ করে কাত্যায়নী নামে পরিচিতা হন। মতান্তরে, কালিকা পুরাণে বলা হয়েছে, ঋষি কাত্যায়ন প্রথম দেবীর পূজা করেন; তাই তিনি কাত্যায়নী নামে অভিহিতা হন। আবার অপর একটি মতে, তিনি দুর্গা বা শিবের পত্নী পার্বতীর রূপান্তর। নবরাত্রি উৎসবে তাঁর পূজা প্রচলিত।
বামন পুরাণ গ্রন্থে দেবী কাত্যায়নীর উদ্ভবের কাহিনি বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে: "দেবগণ চরম দুরবস্থায় বিষ্ণুর নিকট সহায়তা প্রার্থনা করলে, বিষ্ণু ও তাঁর আদেশে শিব, ব্রহ্মা ও অন্যান্য দেবগণের চক্ষু হতে দিব্য তেজ বিনির্গত হয়ে এক জ্যোতিপর্বতের সৃষ্টি করল। এই জ্যোতিপর্বত ধারণ করল অষ্টাদশভূজা, কৃষ্ণকেশী, ত্রিনয়না ও সহস্র সূর্যের প্রভাযুক্তা দেবী কাত্যায়নীর রূপ। শিব তাঁকে ত্রিশূল প্রদান করলেন। বিষ্ণু দিলেন সুদর্শন চক্র, বরুণ দিলেন শঙ্খ, অগ্নি দিলেন শক্তি, বায়ু দিলেন ধনুক, সূর্য দিলেন তীরভরা তূণীর, ইন্দ্র দিলেন বজ্র, কুবের দিলেন গদা, ব্রহ্মা দিলেন অক্ষমালা ও কমণ্ডলু, কাল দিলেন খড়্গ ও ঢাল এবং বিশ্বকর্মা দিলেন কুঠার ও অন্যান্য যুদ্ধাস্ত্র। এইভাবে অস্ত্রসজ্জিতা হয়ে দেবী গেলেন বিন্ধ্যাচলে। সেখানে চণ্ড ও মুণ্ড অসুরদ্বয় তাঁকে দেখে তাঁর রূপে মুগ্ধ হয়ে তাদের রাজা মহিষাসুরের নিকট দেবীর রূপ বর্ণনা করেন। মহিষাসুর দেবীকে লাভ করবার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে। সে দেবীর পাণিপ্রার্থনা করে। দেবী জানান, তাঁকে লাভ করতে হলে তাঁকে যুদ্ধে পরাস্ত করতে হবে। মহিষাসুর যুদ্ধ করতে এলে দেবী সিংহপৃষ্ঠে আরোহণ করে যুদ্ধ করেন। মহিষাসুর মহিষের রূপ ধরে দেবীকে আক্রমণ করলে, দেবী তাঁকে তীব্র পদাঘাত করেন। দেবীর পদাঘাতে মহিষাসুর অচৈতন্য হয়ে মাটিতে পড়ে গেলে দেবী তার মস্তক ছিন্ন করেন। এইভাবে দেবী কাত্যায়নী মহিষাসুরমর্দিনী নামে অভিহিতা হন।" বরাহ পুরাণ ও দেবীভাগবত পুরাণ গ্রন্থেও এই কাহিনির উল্লেখ রয়েছে।
তন্ত্র অনুসারে, শিবের ছয় মুখের মধ্যে উত্তর মুখ থেকে দেবী কাত্যায়নীর উদ্ভব। এই মুখ নীলবর্ণ এবং ত্রিনয়ন। দক্ষিণাকালী, মহাকালী, গুহ্যকালী, শ্মশানকালী, ভদ্রকালী, একজটা, উগ্রতারা, তারিণী, ছিন্নমস্তা, নীল সরস্বতী, দুর্গা, জয়দুর্গা, নবদুর্গা, বাশুলী, ধূমাবতী, বিশালাক্ষী, গৌরী, বগলামুখী, প্রত্যাঙ্গীরা, মাতঙ্গী ও মহিষাসুরমর্দিনী দেবী এবং তাঁদের মন্ত্র ও পূজাপদ্ধতির উদ্ভবও হয় এই মুখ থেকেই।
বেদের অন্য একটি উপাখ্যান অনুযায়ী, কাত্যায়নী ও মৈত্রেয়ী ছিলেন ঋষি যাজ্ঞবল্ক্যের দুই স্ত্রীর নাম। কথিত আছে, ঋষি যাজ্ঞবল্ক্য শতপথ ব্রাহ্মণের রচয়িতা।
কাত্যায়নী পূজা
ভাগবত পুরাণ গ্রন্থের দশম স্কন্দের দ্বাবিংশ অধ্যায়ে কাত্যায়নী ব্রতের উল্লেখ আছে। এই কাহিনি অনুযায়ী, ব্রজের গোপীগণ কৃষ্ণকে পতিরূপে কামনা করে সমগ্র মাঘ মাস জুড়ে এই ব্রত করেন। এই একমাস তাঁরা কেবলমাত্র মশলাবিহীন খিচুড়ি খেতেন এবং সকাল বেলা যমুনায় স্নান করে যমুনাতীরে মাটির কাত্যায়নী মূর্তি গড়ে চন্দন, দীপ, ফল, পান, নবপত্র, মালা ও ধূপ দিয়ে দেবীর পূজা করতেন। এরপরই যমুনায় স্নানকালে কৃষ্ণকর্তৃক গোপীদের বস্ত্রহরণের উল্লেখ রয়েছে।
মনোমতো স্বামী প্রার্থনায় এক মাস ব্যাপী উপবাস করে কাত্যায়নী ব্রত পালন করা হয়। এই একমাস তাঁকে চন্দন, ধূপ, দীপ ইত্যাদি দিয়ে পূজা করা হয়।
মকর সংক্রান্তির দিন উদযাপিত শস্য উৎসব পোঙ্গল (তাই পোঙ্গল) উপলক্ষে তামিলনাড়ুর মেয়েরা সারা মাস ধরে বৃষ্টি ও সমৃদ্ধির জন্য প্রার্থনা করেন। এই সময় তাঁরা দুগ্ধ বা দুগ্ধজাত খাদ্য গ্রহণ করেন না। সকালে স্নান করে ভিজে বালিতে খোদিত কাত্যায়নীর মূর্তি পূজা করেন তাঁরা। তামিল পঞ্জিকা অনুযায়ী পয়লা তাই (জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি) তাঁদের ব্রতের পারণ হয়।

নবদ্বীপ রাসযাত্রায় কাত্যায়নী মাতার পুজো হয়। এখানকার এই পুজো অনেকদিনের পুরোনো। প্রতিবছর রাসে আড়ম্বরপূর্ণ ভাবে এই পুজো হয়ে থাকে।

Thursday, August 2, 2018

গঙ্গা দেবী

গঙ্গা নদীর মূর্তিস্বরূপ এক হিন্দু দেবী। হিন্দুধর্মে এই দেবী বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ স্থানের অধিকারিণী। হিন্দুরা বিশ্বাস করেন গঙ্গায় স্নান করলে সমস্ত পাপ মুছে যায় এবং জীব মুক্তিলাভ করে। অনেকে আত্মীয়স্বজনের দেহাবশেষ বহু দূরদূরান্ত থেকে বয়ে এনে গঙ্গায় বিসর্জন দেন; তাঁরা মনে করেন, এর ফলে মৃত ব্যক্তির আত্মা স্বর্গে গমন করেন। গঙ্গার তীরবর্তী বহু স্থান হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী পবিত্র। এর মধ্যে রয়েছে হরিদ্বার, এলাহাবাদ, বারাণসী, নবদ্বীপ, গঙ্গাসাগর প্রভৃতি। থাইল্যান্ডের লয় ক্রাথং উৎসবে পূণ্যার্থীরা নদীতে প্রদীপযুক্ত ছোটো ছোটো নৌকা ভাসিয়ে বুদ্ধ ও গঙ্গা দেবীকে শ্রদ্ধা জানান।
জন্ম
গঙ্গার জন্মকাহিনি বিষয়ে হিন্দু ধর্মগ্রন্থগুলির মধ্যে মতদ্বৈধ দৃষ্ট হয়। একটি কাহিনি অনুযায়ী ব্রহ্মার কমণ্ডলু এক নারীমূর্তির স্বরূপ প্রাপ্ত হয়। ইনিই গঙ্গা। বৈষ্ণব মতানুসারে, ব্রহ্মা তাঁর কমণ্ডলুর জল নিয়ে সশ্রদ্ধ চিত্তে বিষ্ণুর পদ ধৌত করেছিলেন। সেই থেকেই গঙ্গার জন্ম। তৃতীয় একটি মত অনুযায়ী, গঙ্গা পর্বতরাজ হিমালয় ও তাঁর পত্নী মেনকার কন্যা এবং পার্বতীর ভগিনী। তবে প্রতিটি মতেই একথা স্বীকৃত যে ব্রহ্মা গঙ্গাকে পবিত্র করে তাঁকে স্বর্গে উত্তীর্ণ করেন।
গঙ্গা নদীর মূর্তিস্বরূপ এক হিন্দু দেবী। হিন্দুধর্মে এই দেবী বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ স্থানের অধিকারিণী। হিন্দুরা বিশ্বাস করেন গঙ্গায় স্নান করলে সমস্ত পাপ মুছে যায় এবং জীব মুক্তিলাভ করে। অনেকে আত্মীয়স্বজনের দেহাবশেষ বহু দূরদূরান্ত থেকে বয়ে এনে গঙ্গায় বিসর্জন দেন; তাঁরা মনে করেন, এর ফলে মৃত ব্যক্তির আত্মা স্বর্গে গমন করেন। গঙ্গার তীরবর্তী বহু স্থান হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী পবিত্র। এর মধ্যে রয়েছে হরিদ্বার, এলাহাবাদ, বারাণসী, নবদ্বীপ, গঙ্গাসাগর প্রভৃতি। থাইল্যান্ডের লয় ক্রাথং উৎসবে পূণ্যার্থীরা নদীতে প্রদীপযুক্ত ছোটো ছোটো নৌকা ভাসিয়ে বুদ্ধ ও গঙ্গা দেবীকে শ্রদ্ধা জানান।

জন্ম
গঙ্গার জন্মকাহিনি বিষয়ে হিন্দু ধর্মগ্রন্থগুলির মধ্যে মতদ্বৈধ দৃষ্ট হয়। একটি কাহিনি অনুযায়ী ব্রহ্মার কমণ্ডলু এক নারীমূর্তির স্বরূপ প্রাপ্ত হয়। ইনিই গঙ্গা। বৈষ্ণব মতানুসারে, ব্রহ্মা তাঁর কমণ্ডলুর জল নিয়ে সশ্রদ্ধ চিত্তে বিষ্ণুর পদ ধৌত করেছিলেন। সেই থেকেই গঙ্গার জন্ম। তৃতীয় একটি মত অনুযায়ী, গঙ্গা পর্বতরাজ হিমালয় ও তাঁর পত্নী মেনকার কন্যা এবং পার্বতীর ভগিনী। তবে প্রতিটি মতেই একথা স্বীকৃত যে ব্রহ্মা গঙ্গাকে পবিত্র করে তাঁকে স্বর্গে উত্তীর্ণ করেন।

মর্ত্যাবরোহণ
"ভগীরথের তপস্যা", মহাবলীপুরমের ভাস্কর্য
মহাভারতের কাহিনি অনুসারে, রাজা সগর ষাট হাজার পুত্রের জনক হয়েছিলেন। তিনি একবার অশ্বমেধ যজ্ঞ করলে দেবরাজ ইন্দ্র তাতে ঈর্ষান্বিত হয়ে যজ্ঞের পবিত্র ঘোড়া অপহরণ করেন। সগর তাঁর ষাট হাজার পুত্রকে অশ্বের অন্বষণে প্রেরণ করেন। তাঁরা পাতালে ধ্যানমগ্ন মহর্ষি কপিলের ঘোড়াটিকে দেখতে পান। মহর্ষিকে চোর সন্দেহ করে তাঁরা তাঁর বহু বছরের ধ্যান ভঙ্গ করলে ক্রুদ্ধ মহর্ষি দৃষ্টিপাত মাত্র তাঁদের ভস্ম করে দেন। সগর রাজার ষাট হাজার সন্তানের আত্মা পারলৌকিক ক্রিয়ার অভাবে প্রেতরূপে আবদ্ধ হয়ে থাকেন।

পরে সগরের বংশধর, রাজা দিলীপের পুত্র ভগীরথ তাঁদের আত্মার মুক্তিকামনায় গঙ্গাকে মর্ত্যে নিয়ে আসার মানসে ব্রহ্মার তপস্যা শুরু করেন। তপস্যায় সন্তুষ্ট ব্রহ্মা গঙ্গাকে মর্ত্যে প্রবাহিত হয়ে সগরপুত্রদের আত্মার সদগতিতে সহায়তা করতে নির্দেশ দেন। গঙ্গা এই নির্দেশকে অসম্মানজনক মনে করে মর্ত্যলোক প্লাবিত করার ইচ্ছা পোষণ করেন। তখন ভগীরথ গঙ্গার গতিরোধ করার জন্য শিবের আরাধনা করেন।

গঙ্গাবতরণ, রাজা রবি বর্মা অঙ্কিত চিত্র
ক্রদ্ধ গঙ্গা শিবের মস্তকে পতিত হন। কিন্তু শিব শান্তভাবে নিজ জটাজালে গঙ্গাকে আবদ্ধ করেন এবং ছোটো ছোটো ধারায় তাঁকে মুক্তি দেন। শিবের স্পর্শে গঙ্গা আরও পবিত্র হন। স্বর্গনদী গঙ্গা পাতালে প্রবাহিত হওয়ার আগে মর্ত্যলোকে সাধারণ জীবের মুক্তির হেতু একটি পৃথক ধারা রেখে যান। এইভাবে স্বর্গ, মর্ত্য ও পাতাল – তিন লোকে প্রবাহিত হয়ে গঙ্গা "ত্রিপথগা" নামে পরিচিতা হন।

যেহেতু ভগীরথ গঙ্গার মর্ত্যাবতরণের প্রধান কারণ, সেই হেতু গঙ্গার অপর নাম ভাগীরথী। সংস্কৃতে ভগীরথের এই দুঃসাধ্য সাফল্যের কথা মাথায় রেখে "ভগীরথ প্রযত্ন" নামে একটি শব্দবন্ধ প্রচলিত আছে।

গঙ্গার অপর নাম জাহ্নবী। কথিত আছে, মর্ত্যে ভগীরথকে অনুসরণ করার সময় গঙ্গা ঋষি জহ্নুর আশ্রম প্লাবিত করেন। উগ্রতপা জহ্নু ক্রুদ্ধ হয়ে গঙ্গার সমস্ত জল পান করে ফেলেন। তখন দেবগণ গঙ্গার মুক্তির জন্য ঋষির কাছে প্রার্থনা করতে থাকলে নিজের জঙ্ঘা বা জানু চিরে গঙ্গাকে মুক্তি দেন। এইরূপে গঙ্গা জহ্নু ঋষির কন্যা রূপে পরিচিতা হন এবং তাঁর অপর নাম হয় জাহ্নবী।

হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী কলিযুগের অন্তে সরস্বতী নদীর মতো গঙ্গাও শুকিয়ে যাবে। তখন আবার সত্যযুগের সূচনা হবে।

অন্যান্য পৌরাণিক কাহিনি
স্কন্দপুরাণ অনুসারে, শিব ও পার্বতীর পুত্র কার্তিকেয়ের (মুরুগান) পালিকা-মাতা হলেন গঙ্গা।

একটি কাহিনি অনুযায়ী, পার্বতী তাঁর গাত্রমল হতে গণেশের মূর্তি নির্মাণ করে তা গঙ্গায় নিমজ্জিত করলে সেই মূর্তিতে প্রাণ প্রতিষ্ঠিত হয়। এই কারণে মনে করা হয় গণেশের দুই জননী – পার্বতী ও গঙ্গা। গণেশের অপর নাম তাই দ্বৈমাতুর বা গাঙ্গেয় (গঙ্গাপুত্র)।

ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ অনুসারে, বিষ্ণুর তিন স্ত্রী ছিলেন – লক্ষ্মী, গঙ্গা ও সরস্বতী। তাঁরা সবসময় পরস্পর কলহ করতেন বলে বিষ্ণু লক্ষ্মীকে নিজের কাছে রেখে শিবকে গঙ্গা ও ব্রহ্মাকে সরস্বতী দান করেন।

হিন্দু মহাকাব্য মহাভারত অনুসারে, বশিষ্ট কর্তৃক অভিশপ্ত বসুগণ গঙ্গাকে তাঁদের জননী হওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। গঙ্গা রাজা শান্তনুকে এই শর্তে পতিত্বে বরণ করেন যে গঙ্গার কোনো কাজে রাজা বাধাস্বরূপ হবেন না। একে একে অষ্টবসুর সাত জন গঙ্গাগর্ভে জন্মগ্রহণ করেন এবং জন্মমাত্রেই গঙ্গা তাঁদের জলে নিমজ্জিত করে হত্যা করেন এবং তাঁরা শাপমুক্ত হন। রাজা তাঁকে বাধা না দিলেও অষ্টম সন্তান জন্মের পর শান্তনু গঙ্গাকে বাধা দিতে বাধ্য হন। এই কারণে গঙ্গার অষ্টম সন্তানটি জীবিত রয়ে যান। এই ব্যক্তিই মহাকাব্যের সর্বজনশ্রদ্ধেয় চরিত্র ভীষ্ম।

ঋগ্বেদে গঙ্গা
হিন্দুদের প্রাচীনতম ধর্মগ্রন্থ ঋগ্বেদে গঙ্গার উল্লেখ পাওয়া যায়। এই গ্রন্থের নদীস্তুতি (ঋগ্বেদ ১০।৭৫) অংশে পূর্ব থেকে পশ্চিমে প্রবাহিত নদীগুলির তালিকা পাওয়া যায়। গ্রন্থের ৬।৪৫।৩১ অংশে গঙ্গা শব্দটির উল্লেখ আছে, তবে নদী অর্থে কিনা সেটি এখানে পরিষ্কার নয়।

ঋগ্বেদ ৩।৫৮।৬ অংশে বলা হয়েছে "হে বীরগণ, তোমাদের আদিভূমি, তোমাদের পবিত্র সঙ্গীগণ, তোমাদের ধনসম্পদ সবই জাহ্নবীর তীরে।" সম্ভবত এই স্তোত্রে গঙ্গার কথাই বলা হয়েছে। ঋগ্বেদ ১।১১৬।১৮-১৯ অংশে জাহ্নবী ও গাঙ্গেয় ডলফিনের উল্লেখ পাওয়া যায়।

মূর্তিতত্ত্ব
ভারতের জাতীয় সংগ্রহশালায় গঙ্গা ভাস্কর্য
ভারতীয় শিল্পকলার ধর্মীয় অনুশাসন অনুসারে গঙ্গা এক ইন্দ্রিয়পরায়ণা, সুন্দরী নারী। তাঁর হাতে একটি উচ্ছলিত জলপাত্র। এই পাত্রটি অফুরন্ত জীবন ও উর্বরাশক্তির প্রতীক, যা মহাবিশ্বের গতিকে পুষ্ট ও সচল রাখে।

গঙ্গামূর্তির দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল তাঁর বাহন মকর। এটি একটি কুমির (দেহাংশ) ও মাছের (লেজ) সংকর। পশ্চিমা জ্যোতিষশাস্ত্রের ক্যাপ্রিকন হিন্দু মকরের একটি রূপ। অন্যদিকে মকর ঋগ্বৈদিক দেবতা বরুণেরও বাহন। এই কারণে গঙ্গা বৈদিক শিকড়ের ধারণাটি দৃঢ় হয়।

কামাক্ষী দেবী

দক্ষিণ ভারতীয় সংস্কৃতির এক অতি গুরুত্বপূর্ণ দেবী কামাক্ষী। বলা হয়, দেবী ত্রিপুরসুন্দরীর-ই এক ভিন্ন রূপ এই দেবী কামাক্ষী।
সংস্কৃতে কাম কথাটি শুধুই শারীরিক কামনা বোঝাতে ব্যবহৃত হয় না। তা যে কোনো রকম ইচ্ছাকেই বোঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয়ে থাকে। তাই বলা হয়, এই দেবী তাঁর দৃষ্টিপাতে আমাদের মনে কামের জন্ম দেন বলেই তাঁর নাম কামাক্ষী। তা ছাড়া পুরাণ এও বলে, শিবের তৃতীয় চক্ষুর আগুনে কামদেব ভস্ম হয়ে যাওয়ার পরে এই দেবীর কৃপাতেই তিনি পুনর্জীবন লাভ করেন। সে জন্যও দেবীকে কামাক্ষী নামে অভিহিত করা হয়।
পুরাণে এবং তন্ত্রে কামাক্ষীকে উজ্জ্বল গাত্রবর্ণ সহ চতুর্ভুজা রূপে চোখে পড়ে। চার হাতে তিনি ধারণ করে থাকেন অঙ্কুশ, পাশ, পদ্ম এবং আখের ধনুক। কখনও একটি টিয়াপাখিকে তাঁর হাতের পদ্মের উপরে বসে থাকতে দেখা যায়। একটি পদ্মের উপরে উপবিষ্ট এই দেবী নানা আভরণে ভূষিতা থাকেন। এ ছাড়া একটি অর্ধচন্দ্রও শোভা পায় দেবীর মস্তকে।

তন্ত্র মতে, দেবী কামাক্ষীর দুই চক্ষু স্বয়ং দেবী লক্ষ্মী এবং দেবী সরস্বতী। কেন তন্ত্র এ কথা বলে, তা জানার জন্য আমাদের তাকাতে হবে দেবীর নামের মধ্যে বিন্যস্ত অক্ষরগুলির দিকে।
তন্ত্র বলছে, ক অক্ষরটি এ ক্ষেত্রে প্রতীকায়িত করে দেবী সরস্বতীকে এবং ম অক্ষরটি প্রতীকায়িত করে দেবী লক্ষ্মীকে। তাই বলা হয়, ভক্তের যে কোনো কামনা তার দিকে কামাক্ষী খুব হেলা ভরে তাকালেও সঙ্গে সঙ্গে পূর্ণ হয়।


স্বামীর অপমান সইতে না পেরে সতী দেহত্যাগ করলেন। প্রিয় স্ত্রীকে হারিয়ে, তাঁর দেহ নিয়ে তাণ্ডব নৃত্য করলেন মহাদেব। চারিদিক তখন তোলপাড়। শিবের নৃত্যে সব ভেঙে তছনছ হয়ে যাচ্ছে। এই জগতকে রক্ষা করতে দেবতাদের অনুরোধে ভগবান বিষ্ণু শিবের ক্রোধ দমন করার পন্থা বেছে নেন। বিষ্ণুর চক্রে সতীর দেহ খণ্ডবিখণ্ড হয়ে যায়। ৫১টি জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে শরীরের এক একটি অঙ্গ। যা আজ ৫১টি পীঠস্থান। কামাখ্যা মন্দির সেই ৫১টি পীঠস্থানের একটি। সেখানে নাকি ছিটকে পড়েছিল সতীর যৌনাঙ্গ। তাই সেখানে দেবীর মূর্তি পুজিত হয় না।

অসমের কামাখ্যা মন্দির, ধার্মিক কারণে তো বটেই, সেখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণেও জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র। প্রত্যেক বছর লক্ষ লক্ষ মানুষ ভিড় করে এই মন্দিরে। বিশেষ করে অম্বুবাচী মেলার সময় ভিড় হয় চোখে পড়ার মতো। সেই সময় পুজিত ভূগর্ভস্থ এলাকা লাল হয়ে থাকে। মন্দিরের নালা দিয়ে বেয়ে যায় লাল জল। এই ঘটনাকে মায়ের ঋতুস্রাব বলে অনেকেই মনে করেন। এই সময় নাকি দেবী ঋতুমতী হন। তিনদিন ধরে এমনটা চলতে থাকে। মন্দিরের মূল কক্ষে তখন কারও প্রবেশে অনুমতি থাকে না। মা নাকি এই সময় কারোর সঙ্গে দেখা করেন না, এমনটাই বিশ্বাস অনেকের। এসবকেই মায়ের লীলা বলে মনে করা হয়। যদিও বিজ্ঞান অন্য কথা বলছে। ওই এলাকায় আয়রন অক্সাইডের প্রভাবের কারণেই ভূগর্ভস্থ এলাকা লাল হয়ে থাকে।

মাটি ৮০০ মিটার উঁচুতে রয়েছে এই মন্দিরটি। নিলাচল পর্বতের পশ্চিমাংশে গুয়াহাটি শহরে রয়েছে এই মন্দিরটি। এই মন্দিরটির প্রতিষ্ঠা নিয়ে জড়িয়ে রয়েছে নানা ইতিহাস। ইতিহাস বলছে ১১০০ খ্রিষ্টাব্দে এই মন্দিরটির প্রতিষ্ঠা হয়। পাল বংশের রাজারাই নাকি ছিলেন কামাখ্যা মায়ে আদি ভক্ত। পরবর্তীকালে পালবংশের রাজত্ব শেষ হওয়ার পর মন্দিরটিরও বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার কথা শোনা যায়। কামরূপের শাসন ভার আসে কোচবিহারের রাজ পরিবারের হাতে। বিশ্বসিংহ নামে কোচ বংশীয় রাজা পুনরায় ওই মন্দিরটির পুনর্নিমাণ করেন। এমনই বহু ইতিহাস রয়েছে এই মন্দিরের স্থাপত্যকে ঘিরে।

এই মন্দিরে রয়েছে চারটি কক্ষ। একটি গর্ভগৃহ ও তিনটি মন্দির। গর্ভগৃহে প্রবেশ করতে সরু সিঁড়ি দিয়ে কক্ষের নীচে নেমে যেতে হয়। পৌরাণিক কাহিনি আজও মানুষকে ডেকে আনে এই মন্দিরের দর্শন করতে।

গুয়াহাটি শহর থেকে মাত্র ৮ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত এই মন্দিরটি। যেহেতু বছরের প্রায় সবসময়ই দর্শনার্থীদের ভিড় লেগেই থাকে, তাই এখানে যোগাযোগের সুব্যবস্থা রয়েছে। গুয়াহাটি শহরে সহজেই পৌঁছে যেতে পারবেন ট্রেনে। সেখান থেকে বাস বা গাড়ি করে পৌঁছে যেতে পারবেন মন্দিরে। থাকা খাওয়ার জন্য সেখানে প্রচুর হোটেল। দু’-এক দিনের ছুটিতে কামাখ্যা মায়ের দর্শনের জন্য বেরিয়ে পরুন। 

 
Design by দেবীমা | Bloggerized by Lasantha - Premium Blogger Themes | Facebook Themes