Pages

Thursday, August 2, 2018

কামাক্ষী দেবী

দক্ষিণ ভারতীয় সংস্কৃতির এক অতি গুরুত্বপূর্ণ দেবী কামাক্ষী। বলা হয়, দেবী ত্রিপুরসুন্দরীর-ই এক ভিন্ন রূপ এই দেবী কামাক্ষী।
সংস্কৃতে কাম কথাটি শুধুই শারীরিক কামনা বোঝাতে ব্যবহৃত হয় না। তা যে কোনো রকম ইচ্ছাকেই বোঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয়ে থাকে। তাই বলা হয়, এই দেবী তাঁর দৃষ্টিপাতে আমাদের মনে কামের জন্ম দেন বলেই তাঁর নাম কামাক্ষী। তা ছাড়া পুরাণ এও বলে, শিবের তৃতীয় চক্ষুর আগুনে কামদেব ভস্ম হয়ে যাওয়ার পরে এই দেবীর কৃপাতেই তিনি পুনর্জীবন লাভ করেন। সে জন্যও দেবীকে কামাক্ষী নামে অভিহিত করা হয়।
পুরাণে এবং তন্ত্রে কামাক্ষীকে উজ্জ্বল গাত্রবর্ণ সহ চতুর্ভুজা রূপে চোখে পড়ে। চার হাতে তিনি ধারণ করে থাকেন অঙ্কুশ, পাশ, পদ্ম এবং আখের ধনুক। কখনও একটি টিয়াপাখিকে তাঁর হাতের পদ্মের উপরে বসে থাকতে দেখা যায়। একটি পদ্মের উপরে উপবিষ্ট এই দেবী নানা আভরণে ভূষিতা থাকেন। এ ছাড়া একটি অর্ধচন্দ্রও শোভা পায় দেবীর মস্তকে।

তন্ত্র মতে, দেবী কামাক্ষীর দুই চক্ষু স্বয়ং দেবী লক্ষ্মী এবং দেবী সরস্বতী। কেন তন্ত্র এ কথা বলে, তা জানার জন্য আমাদের তাকাতে হবে দেবীর নামের মধ্যে বিন্যস্ত অক্ষরগুলির দিকে।
তন্ত্র বলছে, ক অক্ষরটি এ ক্ষেত্রে প্রতীকায়িত করে দেবী সরস্বতীকে এবং ম অক্ষরটি প্রতীকায়িত করে দেবী লক্ষ্মীকে। তাই বলা হয়, ভক্তের যে কোনো কামনা তার দিকে কামাক্ষী খুব হেলা ভরে তাকালেও সঙ্গে সঙ্গে পূর্ণ হয়।


স্বামীর অপমান সইতে না পেরে সতী দেহত্যাগ করলেন। প্রিয় স্ত্রীকে হারিয়ে, তাঁর দেহ নিয়ে তাণ্ডব নৃত্য করলেন মহাদেব। চারিদিক তখন তোলপাড়। শিবের নৃত্যে সব ভেঙে তছনছ হয়ে যাচ্ছে। এই জগতকে রক্ষা করতে দেবতাদের অনুরোধে ভগবান বিষ্ণু শিবের ক্রোধ দমন করার পন্থা বেছে নেন। বিষ্ণুর চক্রে সতীর দেহ খণ্ডবিখণ্ড হয়ে যায়। ৫১টি জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে শরীরের এক একটি অঙ্গ। যা আজ ৫১টি পীঠস্থান। কামাখ্যা মন্দির সেই ৫১টি পীঠস্থানের একটি। সেখানে নাকি ছিটকে পড়েছিল সতীর যৌনাঙ্গ। তাই সেখানে দেবীর মূর্তি পুজিত হয় না।

অসমের কামাখ্যা মন্দির, ধার্মিক কারণে তো বটেই, সেখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণেও জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র। প্রত্যেক বছর লক্ষ লক্ষ মানুষ ভিড় করে এই মন্দিরে। বিশেষ করে অম্বুবাচী মেলার সময় ভিড় হয় চোখে পড়ার মতো। সেই সময় পুজিত ভূগর্ভস্থ এলাকা লাল হয়ে থাকে। মন্দিরের নালা দিয়ে বেয়ে যায় লাল জল। এই ঘটনাকে মায়ের ঋতুস্রাব বলে অনেকেই মনে করেন। এই সময় নাকি দেবী ঋতুমতী হন। তিনদিন ধরে এমনটা চলতে থাকে। মন্দিরের মূল কক্ষে তখন কারও প্রবেশে অনুমতি থাকে না। মা নাকি এই সময় কারোর সঙ্গে দেখা করেন না, এমনটাই বিশ্বাস অনেকের। এসবকেই মায়ের লীলা বলে মনে করা হয়। যদিও বিজ্ঞান অন্য কথা বলছে। ওই এলাকায় আয়রন অক্সাইডের প্রভাবের কারণেই ভূগর্ভস্থ এলাকা লাল হয়ে থাকে।

মাটি ৮০০ মিটার উঁচুতে রয়েছে এই মন্দিরটি। নিলাচল পর্বতের পশ্চিমাংশে গুয়াহাটি শহরে রয়েছে এই মন্দিরটি। এই মন্দিরটির প্রতিষ্ঠা নিয়ে জড়িয়ে রয়েছে নানা ইতিহাস। ইতিহাস বলছে ১১০০ খ্রিষ্টাব্দে এই মন্দিরটির প্রতিষ্ঠা হয়। পাল বংশের রাজারাই নাকি ছিলেন কামাখ্যা মায়ে আদি ভক্ত। পরবর্তীকালে পালবংশের রাজত্ব শেষ হওয়ার পর মন্দিরটিরও বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার কথা শোনা যায়। কামরূপের শাসন ভার আসে কোচবিহারের রাজ পরিবারের হাতে। বিশ্বসিংহ নামে কোচ বংশীয় রাজা পুনরায় ওই মন্দিরটির পুনর্নিমাণ করেন। এমনই বহু ইতিহাস রয়েছে এই মন্দিরের স্থাপত্যকে ঘিরে।

এই মন্দিরে রয়েছে চারটি কক্ষ। একটি গর্ভগৃহ ও তিনটি মন্দির। গর্ভগৃহে প্রবেশ করতে সরু সিঁড়ি দিয়ে কক্ষের নীচে নেমে যেতে হয়। পৌরাণিক কাহিনি আজও মানুষকে ডেকে আনে এই মন্দিরের দর্শন করতে।

গুয়াহাটি শহর থেকে মাত্র ৮ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত এই মন্দিরটি। যেহেতু বছরের প্রায় সবসময়ই দর্শনার্থীদের ভিড় লেগেই থাকে, তাই এখানে যোগাযোগের সুব্যবস্থা রয়েছে। গুয়াহাটি শহরে সহজেই পৌঁছে যেতে পারবেন ট্রেনে। সেখান থেকে বাস বা গাড়ি করে পৌঁছে যেতে পারবেন মন্দিরে। থাকা খাওয়ার জন্য সেখানে প্রচুর হোটেল। দু’-এক দিনের ছুটিতে কামাখ্যা মায়ের দর্শনের জন্য বেরিয়ে পরুন। 

0 comments:

Post a Comment

 
Design by দেবীমা | Bloggerized by Lasantha - Premium Blogger Themes | Facebook Themes