Pages

Monday, September 24, 2018

মহিষাসুরমর্দ্দিনী

মহিষাসুরমর্দ্দিনী (অর্থাৎ মহিষাসুরকে দমনকারী) হল ১৯৩১ সাল থেকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে আকাশবাণী বা অল ইন্ডিয়া রেডিওতে সম্প্রচারিত একটি বাংলা প্রভাতী বেতার অনুষ্ঠান। দেড় ঘণ্টার এই অনুষ্ঠানে রয়েছে শ্রীশ্রীচণ্ডী বা দুর্গা সপ্তশতী থেকে গৃহীত দেবী চণ্ডীর স্তোত্র বা চণ্ডীপাঠ, বাংলা ভক্তিগীতি, ধ্রুপদী সংগীত এবং পৌরাণিক কাহিনির নাট্যরূপ। অনুষ্ঠানটির একটি হিন্দি সংস্করণও তৈরি করা হয়, এবং বাংলা অনুষ্ঠান সম্প্রচার হওয়ার একই সময়ে সারা ভারতের শ্রোতাদের জন্য সম্প্রচার করা হয়। প্রতি বছর মহালয়ার ভোরে এই অনুষ্ঠান সম্প্রচারিত হয়। প্রথমদিকে অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচারিত হত, কিন্তু ১৯৬৬ সাল থেকে রেকর্ড করা পূর্বের অনুষ্ঠানই শোনানো হয়। এই অনুষ্ঠানটি এতটাই জনপ্রিয়তা পেয়েছিল যে, প্রায় ৮০ বছর পর আজও এর জনপ্রিয়তা তথা মহিমায় বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি।

দেবীপক্ষের সূচনায় মহালয়া অমাবস্যা ও দুর্গাপুজোর সাথে এই অনুষ্ঠানের নাড়ির যোগ। এই মহালয়ার পুণ্যলগ্নে শিশিরভেজা মৃদুশীতল ভোরে প্রায় প্রত্যেক বাঙালি জেগে ওঠেন এবং "মহিষাসুরমর্দ্দিনী" সম্প্রচার শুনবার জন্য উদ্গ্রীব হয়ে থাকেন। ইদানীং আকাশবাণীর স্বত্ব গ্রহণ করে এর রেকর্ডিং HMV-RPG-এর অডিও ক্যাসেট এবং কম্প্যাক্ট ডিস্ক রূপেও বিক্রি হচ্ছে। এর সিডি সংস্করণে (২০০২এ) ১৯টি ট্র্যাক আছে।

বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র
মহিষাসুরমর্দ্দিনী

মহিষাসুরমর্দ্দিনীর আড়ালে তাঁর মন্ত্রমুগ্ধকর কণ্ঠের জন্য এবং বাঙালির মহালয়ার প্রভাতকে মোহময় করে তোলার জন্য বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র চিরস্মরণীয় থাকবেন। এই কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী চমৎকারভাবে সংস্কৃত শ্লোক এবং দেবী দুর্গার মর্ত্যে অবতরণের কাহিনি ফুটিয়ে তুলেছেন। মহালয়া উপলক্ষ্যে দেবীপক্ষের সূচনায় দেব-দেবীরা শারদোৎসবের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করেন। ১৯৩১ সালে কলকাতার আকাশবাণী বেতারে প্রথম মহালয়া সম্প্রচারিত হয়। প্রেমাঙ্কুর আতর্থী, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র, নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় এবং রাইচাঁদ বড়াল এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন।

বীরেন্দ্রকৃষ্ণের জনপ্রিয়তা এতটাই তুঙ্গে উঠেছিল যে, ১৯৭৪ সালে বাংলার সর্বকালের সেরা অভিনেতা উত্তম কুমারকে দিয়ে সেই শ্লোকপাঠ করালে, আপামর শ্রোতা মেনে নেয়নি। বীরেন ভদ্র আবার স্বস্থানে সসম্মানে ফিরে আসেন।

বীরেন্দ্রের মৃত্যু হয়েছে অনেককাল হল, কিন্তু তাঁর কণ্ঠ ছাড়া মহালয়ার সকাল এখনও ভাবা যায় না। আশ্বিনের ভোরের দুটো ঘণ্টা তাঁর উদাত্ত কণ্ঠের উচ্চারণে নিমজ্জিত হয়, তাঁর শ্লোকপাঠে মন্ত্রমুগ্ধ বাঙালি দেবীর প্রতি সশ্রদ্ধ প্রণাম জানায়।

সংগীত
মহিষাসুরমর্দ্দিনী

পৌরাণিক পটভূমিতে আধারিত এবং বৈদিক মন্ত্র সমন্বিত হওয়া সত্ত্বেও এই অনুষ্ঠানটি একটি অতুল্য অদ্বিতীয় সৃষ্টি। এর রচনা করেছেন বাণী কুমার, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র করেছেন শ্লোকপাঠ এবং দ্বিজেন মুখোপাধ্যায় (জাগো দুর্গা দশপ্রহরণধারিণী), মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায় (তব অচিন্ত্য), সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, আরতি মুখোপাধ্যায়, উৎপলা সেন (শান্তি দিলে ভরি ), শ্যামল মিত্র (শুভ্র শঙ্খ-রবে)এবং সুপ্রীতি ঘোষ (বাজলো তোমার আলোর বেণু) তাঁদের মধুর স্বরে গান গেয়েছেন। সংগীত-পরিচালনা করেছেন পঙ্কজকুমার মল্লিক। অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার সাথে সাথে শঙ্খধ্বনিতে আকাশ-বাতাস মুখর হয়ে ওঠে।




Tuesday, September 11, 2018

দেবী পার্বতী

 পার্বতী  হলেন হিন্দু দেবী দুর্গার একটি রূপ। তিনি শিবের স্ত্রী এবং আদি পরাশক্তির এক পূর্ণ অবতার। অন্যান্য দেবীরা তাঁর অংশ থেকে জাত, বা তাঁর অবতার। পার্বতী মহাশক্তির অংশ। তিনি গৌরী নামেও পরিচিত। পার্বতী শিবের দ্বিতীয়া স্ত্রী। তবে তিনি শিবের প্রথমা স্ত্রী দাক্ষায়ণীরই অবতার। তিনি গণেশ ও কার্তিকের মা। কোনো কোনো সম্প্রদায়ে তাঁকে বিষ্ণুর ভগিনী মনে করা হয়। পার্বতী হিমালয়ের কন্যা। শিবের পাশে তাঁর যে মূর্তি দেখা যায়, সেগুলি দ্বিভূজা। তবে তাঁর একক মূর্তি চতুর্ভূজা, অষ্টভূজা বা দশভূজা হয়; এবং এই মূর্তিতে তাঁকে সিংহবাহিনী রূপে দেখানো হয়। সাধারণত তাঁকে দয়াময়ী দেবীর রূপেই দেখা হয়। তবে তাঁর কয়েকটি ভয়ংকরী মূর্তিও আছে। তাঁর দয়াময়ী মূর্তিগুলি হল কাত্যায়নী, মহাগৌরী, কমলাত্মিকা, ভুবনেশ্বরী ও ললিতা। অন্যদিকে তাঁর ভয়ংকরী রূপগুলি হল দুর্গা, কালী, তারা, চণ্ডী, দশমহাবিদ্যা ইত্যাদি।
দেবী পার্বতী

ব্যুৎপত্তি
চতুর্ভূজা ললিতা দেবীর রূপে পার্বতী, সঙ্গে তাঁর দুই পুত্র গণেশ ও স্কন্দ (কার্তিক), ওড়িশা, ভারত, একাদশ শতাব্দীর ভাস্কর্য, ব্রিটিশ মিউজিয়ামে রক্ষিত।টেমপ্লেট:British-Museum-db.
"পার্বতী" শব্দের অর্থ "পর্বতের কন্যা"। পার্বতী পর্বতের রাজা হিমালয়ের কন্যা বলে তাঁকে পার্বতী বলা হয়। হিমালয়ের কন্যা বলে তাঁর অন্য নাম "শৈলজা", "অদ্রিজা", "নগজা", "শৈলপুত্রী", "হৈমবতী", "গিরিজা" বা "গিরিজাপুত্রী"। কখনও কখনও পার্বতীকে "পবিত্রা"ও বলা হয়; কারণ, তাঁকে অপাপবিদ্ধা ও পবিত্র মনে করা হয়। শিব ও তাঁকে একত্রে শাক্ত সর্বোচ্চ ঈশ্বর আদি পরাশক্তির "সগুণ স্বরূপ" মনে করা হয়। শ্রীশ্রীচণ্ডী-তে তাঁর অনেকগুলি নামের উল্লেখ আছে। এগুলির মধ্যে দুর্গা, মহাশক্তি, অম্বিকা, গৌরী, ভৈরবী, কালী, উমা, ললিতা, মাতৃ, মাহেশ্বরী, ভবানী ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।ললিতা সহস্রনাম স্তবে পার্বতীর ১০০০টি নামের উল্লেখ আছে।

পার্বতীর সবচেয়ে বেশি পরিচিত দুটি নাম হল উমা ও অপর্ণা। কয়েকটি প্রাচীন ধর্মগ্রন্থে দাক্ষায়ণীকে উমা বলা হলেও, রামায়ণে পার্বতীকেই উমা বলা হয়েছে। হরিবংশ-এ পার্বতীকে প্রথমে "অপর্ণা" বলে, পরে "উমা" বলা হয়েছে। অপর্ণা শব্দের অর্থ, যিনি ঘোর তপস্যা করেছেন। পার্বতীর মা মেনকা তাঁর তপস্যা দেখে বলেছিলেন, "উ মা" (আর না)। সেই থেকে পার্বতীর অপর নাম উমা।

অন্যদিকে পার্বতী একসঙ্গে "গৌরী" (গৌরবর্ণা দেবী) এবং "কালী" বা "শ্যামা" (কৃষ্ণবর্ণা দেবী) নামে অভিহিত হন। কারণ, তিনি শান্ত স্ত্রী উমা। কিন্তু বিপদের সময় ভয়ংকরী কালী দেবীতে রূপান্তরিত হন। এই দুই পরস্পর বিপরীত রূপ পার্বতীর দুই রকম প্রকৃতির কথা নির্দেশ করে। আবার "কামাক্ষ্মী" রূপে তিনি ভক্তির দেবী।

উৎসব
গৌরীরূপে পূজিত পার্বতী
ভাদ্র মাসের শুক্লপক্ষের সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমী তিথিতে গৌরীপূজা হয়। তাঁকে শস্য ও নারীর রক্ষাকারী দেবী মনে করা হয়। গৌরীপূজাও সাধারণত মেয়েরাই করে। এই উৎসবটি পার্বতীর পূত্র গণেশের পূজার (গণেশ চতুর্থী) সঙ্গে যুক্ত। মহারাষ্ট্র ও কর্ণাটকে গৌরীপূজা খুব জনপ্রিয়।[৪] রাজস্থানে গঙ্গৌর উৎসবের সময় গৌরীপূজা হয়। চৈত্র মাসের প্রথম দিন পূজা শুরু হয় এবং ১৮দিন চলে। এই সময় মাটি দিয়ে ঈশ্বর আর গৌরীমূর্তি বানানো হয়। পার্বতী পূজার একটি বিশেষ উৎসব হল নবরাত্রি ও দুর্গাপূজা। এই সময় পার্বতীর সব কটি রূপকে পূজা করা হয়। উত্তর ভারতে নবরাত্রি উৎসবের সময় শৈলপুত্রী, ব্রহ্মচারিণী, চন্দ্রঘণ্টা, কুষ্মাণ্ডা, স্কন্দমাতা, কাত্যায়ানী, কালরাত্রি, মহাগৌরী ও সিদ্ধিদাত্রী - এই নবদুর্গার পূজা হয়।
চৈত্র ও বৈশাখ মাসের শুক্লা তৃতীয়ার দিন হয় "গৌরী তৃতীয়া"। হিন্দুরা বিশ্বাস করেন, এই সময় একমাস পার্বতী বাপের বাড়িতে থাকেন। মহারাষ্ট্র ও কর্ণাটকে এই উৎসব খুব জনপ্রিয়। উত্তর ভারতে এই উৎসব ততটা জনপ্রিয় নয়। পশ্চিমবঙ্গে এই উৎসব পালিতই হয় না। এই সময় সধবা মেয়েরা পিরামিড আকৃতির ধাপযুক্ত বেদী তৈরি করে তার উপরে পার্বতীর মূর্তি ও নিচে গয়নাগাটি, অন্যান্য দেবদেবীর মূর্তি ও ছবি ইত্যাদি রাখেন। রাতে প্রার্থনা করা হয়। তামিলনাড়ু ও অন্ধ্রপ্রদেশে দীপাবলির দিন কেতরা গৌরী বৃতাম উৎসব হয়। এইদিন সধবা মেয়েরা সারাদিন উপোষ করেন এবং মিষ্টি বানিয়ে বাড়ির সকলের মঙ্গল্যের জন্য দেবীকে মিষ্টি দিয়ে পূজা করেন।

মন্দির
কর্ণাটকের কল্লুর শহরে মুকাম্বিকা দেবী মন্দির হল পার্বতীর একটি বিখ্যাত মন্দির।

Monday, September 3, 2018

অষ্টলক্ষ্মী


অষ্টলক্ষ্মী

অষ্টলক্ষ্মী  হলেন হিন্দু সম্পদের দেবী লক্ষ্মীর আটটি বিশেষ রূপ। তাঁরা সম্পদের আট উৎস তথা লক্ষ্মীদেবীর শক্তির প্রতীক। অষ্টলক্ষ্মী লক্ষ্মীর অপ্রধান রূপভেদ। অষ্টলক্ষ্মী "সম্পদ" কথাটির অর্থ হল সমৃদ্ধি, সুস্বাস্থ্য, জ্ঞান, শক্তি, সন্তানাদি ও ক্ষমতা। মন্দিরে অষ্টলক্ষ্মীকে একযোগে পূজা করা হয়ে থাকে।


স্বরূপ
শ্রীঅষ্টলক্ষ্মীস্তোত্রম্ অনুযায়ী অষ্টলক্ষ্মী হলেন

আদিলক্ষ্মী  বা মহালক্ষ্মী  লক্ষ্মীর আদিরূপ এবং ঋষি ভৃগুর কন্যারূপে লক্ষ্মীর অবতার।
ধনলক্ষ্মী  লক্ষ্মীর অর্থ ও স্বর্ণদাত্রী রূপ।
ধান্যলক্ষ্মী   কৃষিসম্পদদাত্রী লক্ষ্মী।
গজলক্ষ্মী   গবাদি পশু ও হস্তীরূপ সম্পদদাত্রী লক্ষ্মী।স্বামী চিদানন্দের মতে গজলক্ষ্মী রাজক্ষমতা প্রদান করেন। হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী, গজলক্ষ্মী দেবরাজ ইন্দ্রকে সমুদ্রগর্ভ থেকে তাঁর হারানো সম্পদ ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। বসুধা নারায়ণ "গজলক্ষ্মী" শব্দটির ব্যাখ্যা করেছেন "গজ অর্থাৎ হাতিদের দ্বারা পূজিত লক্ষ্মী"।
সন্তানলক্ষ্মী   সন্তানপ্রদাত্রী লক্ষ্মী।
বীরলক্ষ্মী   বা ধৈর্যলক্ষ্মী যুদ্ধক্ষেত্রে বীরত্ব এবং জীবনের কঠিন সময়ে সাহস প্রদানকারী লক্ষ্মী।
বিজয়লক্ষ্মী  বা জয়লক্ষ্মী  বিজয় প্রদানকারিনী লক্ষ্মী, কেবলমাত্র যুদ্ধক্ষেত্রেই নয় বরং কঠিন সময়ে বাধাবিপত্তি জয় করে সাফল্য অর্জনের ক্ষেত্রেও।
বিদ্যালক্ষ্মী  , কলা ও বিজ্ঞানের জ্ঞানপ্রদানকারিনী লক্ষ্মী।
কোনো কোনো অষ্টলক্ষ্মী তালিকায় লক্ষ্মীর অন্যান্য কয়েকটি রূপও অন্তর্ভুক্ত করা হয়ে থাকে:

ঐশ্বর্যলক্ষ্মী  ঐশ্বর্যপ্রদাত্রী লক্ষ্মী।
সৌভাগ্যা  সৌভাগ্য প্রদানকারিনী।
রাজ্যলক্ষ্মী "যিনি শাসককে আশীর্বাদ করেন।
বরলক্ষ্মী যে দেবী সুন্দর বর প্রদান করেন।

লজ্জা গৌরী

লজ্জা গৌরী হচ্ছে একজন হিন্দু দেবী যাকে উর্বরতা ও প্রাচুর্যের দেবী রূপে বিশ্বস করা হয় এবং তাঁকে লজ্জার অভিব্যক্তি হিসেবে বর্ণিত করা হয়েছে।

ইতিহাস
লজ্জা গৌরীর প্রারম্ভিক বর্ণনা সিন্ধু উপত্যকার শক্তিবাদীগণের দ্বারা খোদিত শিলালিপিতে পাওয়া যায়, যদিও পরবর্তী বর্ণনাসমূহ ১ম-৩য় শতাব্দীকালের, এবং ভারতীয় উপমহাদেশের দাক্ষিণাত্য অঞ্চলে এই দেবীর উপাসনার প্রচলন ঘটে।

বিভিন্ন রূপ
হিন্দুধর্মাবম্বীদের মহান মা দেবী লজ্জা গৌরী, অদিতি, অদ্য শক্তি; ঋষি জমদগ্নির পত্নী রেণুকা নামেও পরিচিত, এছাড়া মাতঙ্গী, ইয়ালাম্মা (সকলের মাতা), কোটারী, কোটাভী (একজন নগ্ন কুলদেবী), কোট্টামহিকা, কোটমাই এবং অন্যান্য নামেও উর্বরতার (প্রজনন) দেবীরূপে উপাসনা করা হয়। তিনি বর্তমান হিন্দুধর্মের সবচেয়ে প্রাচীন দেবী রূপ, মহারাষ্ট্র, গুজরাটের গ্রামগুলোতেও এই দেবীর উপাসনার প্রচলন ঘটে, যার উল্লেখ অমরাবতী, মধ্য ভারতের গ্রামীণ অঞ্চল, অন্ধ্রপ্রদেশ, কর্ণাটকে প্রাপ্ত (বর্তমানে রাজ্য সসংগ্রহশালা, চেন্নাইতে সংরক্ষিত) ১৫০ - ৩০০ খ্রিস্টপূর্বের ভাস্কর্য থেকে জানা যায়। এখানকার বাদামি নামক শহরেটি বাদামি গুহা মন্দির-এর জন্য বিখ্যাত; এখানকার স্থানীয় প্রত্নতত্ত্ব সংগ্রহশালার শিলালিপিতেও উল্লেখিত রয়েছে; যা আসলে বিজাপুরের নাগনাথ মন্দিরে পাওয়া গেছিল।

কিরীটেশ্বরী মন্দির

কিরীটেশ্বরী মন্দির হল হিন্দুধর্মের শাক্ত মতের পবিত্র তীর্থ শক্তিপীঠগুলির অন্যতম। এটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার জেলার লালবাগ কোর্ট রোড রেলওয়ে স্টেশনের ৩ মাইল দূরে 'কিরীটকণা' (বা 'কিরীটকোণা') গ্রামে অবস্থিত। রাঢ় বাংলার প্রাচীন পীঠস্থানগুলির মধ্যে কিরীটকণা অন্যতম; যদিও বর্তমান মন্দিরটি বেশি পুরানো নয়। এই মন্দিরের নিকটে একাধিক মন্দির আছে। তান্ত্রিকমতে, এখানে দেবী দাক্ষায়ণী সতীর 'কিরীট' অর্থাৎ মুকুটের কণা পতিত হয়েছিল। যেহেতু এখানে দেবীর কোনও অঙ্গ পতিত হয়নি, তাই এই স্থানকে অনেক তন্ত্রবিদ্ 'পূর্ণ পীঠস্থান' না বলে 'উপপীঠ' বলে থাকেন। এই পীঠে দেবী 'বিমলা' এবং তাঁর ভৈরব 'সম্বর্ত' নামে পূজিত হন।

লোকবিশ্বাস
কিরীটেশ্বরী মন্দির

লোকবিশ্বাস অনুসারে, শক্তিপীঠ নামাঙ্কিত তীর্থগুলিতে দেবী সতীর দেহের নানান অঙ্গ ও অলঙ্কার প্রস্তরীভূত অবস্থায় রক্ষিত আছে। "শক্তি" অর্থাৎ প্রত্যেক "পীঠস্থানে" পূজিতা দেবী, যিনি দাক্ষায়ণী, দুর্গা বা পার্বতীর বিভিন্ন রূপ; "ভৈরব" অর্থাৎ ঐ দেবীর স্বামী (সঙ্গী), যারা প্রত্যেকেই শিবের বিভিন্ন রূপ; "দেহ খণ্ড বা অলঙ্কার" অর্থাৎ সতী দেবীর শরীরের বিভিন্ন অংশ বা অলঙ্কার যা ভগবান বিষ্ণুর সুদর্শন চক্র দ্বারা ছেদনের পর সেই "পীঠস্থানে" পতিত হয়েছিল। সাধারণত ৫১টি শক্তিপীঠের কথা বলা হয়ে থাকলেও, শাস্ত্রভেদে পীঠের সংখ্যা ও অবস্থান নিয়ে মতভেদ আছে।

বিবরণ
শাক্তধর্মে এই স্থান একটি প্রাচীন মহাপীঠ হিসাবে প্রসিদ্ধ। পাঠান-মুঘল শাসনকালেও এই স্থানের খ্যাতি ছিল। রিয়াজুস সালতীন গ্রন্থে ও রেনেলের কাশীমবাজার দ্বীপের মানচিত্রে কিরীটকোণাকে 'তীরতকোণা' বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

পৌষ মাসের প্রতি মঙ্গলবার এখানে দেবী কিরীটেশ্বরীর মেলা বসে। মন্দিরে দেবীর কোনও প্রতিমূর্তি নেই, একটি উঁচু পাথরের উপর বেদী আছে; এই বেদীর উপর আরেকটি ছোট বেদী আছে যা দেবীর কিরীট বলে পূজা করা হয়। কিরীটেশ্বরী মন্দিরের চারিদিকে অনেক ছোট-ছোট মন্দির আছে; তারমধ্যে একটি চারচালা মন্দিরকে সপ্তদশ শতাব্দীর তৈরি বলে মনে করা হয়। রাজা রাজবল্লভের প্রতিষ্ঠিত শিবমন্দিরও এখানে আছে। গ্রামের মধ্যে গুপ্তমঠ নামে এক নতুন মন্দিরে কিরীটেশ্বরীর পূজার ব্যবস্থা আছে।[১] নাটোরের সাধন-অনুরাগী রাজা রামকৃষ্ণ বড়নগর থেকে এখানে আসতেন। এখনও মন্দির-প্রাঙ্গনে দুটি পাথরখণ্ড দেখা যায়, যার উপর বসে রাজা রামকৃষ্ণ সাধনা করতেন। কথিত আছে মুর্শিদাবাদের নবাব মীর জাফর আলী খান কুষ্ঠরোগগ্রস্ত হলে শেষ জীবনে তার হিন্দু দেওয়ানের পরামর্শ অনুযায়ী কিরীটেশ্বরী দেবীর চরণামৃত পান করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন।

দেবীর ভৈরব 'সম্বর্ত' বলে যে মূর্তিটি পূজা করা হয়, সেটি আসলে একটি বুদ্ধমূর্তি। এই মূর্তি রাঢ়ের এই অঞ্চলের সঙ্গে বৌদ্ধসংস্কৃতির পরিচয় দেয়।

১১৭৭ বঙ্গাব্দে বিজয়রাম সেন রচিত 'তীর্থ-মঙ্গল' কাব্যে কিরীটেশ্বরীর বর্ণনা আছেঃ

কিরীটেশ্বরী পূজা দিতে গেলা শীঘ্রগতি।
কথোগুলি বাত্রী গেলা কর্ত্তার সংহতি।।
মহাসরঞ্জাম সঙ্গে গিয়া কিরীটকোণা।
দেবীকে প্রণাম কৈল দিয়া কিছু সোনা।।
ষোড়শোপচারে পূজা কৈল ভগবানে।
দক্ষিণা করিলা কত কৈল বিতরণে।।

 
Design by দেবীমা | Bloggerized by Lasantha - Premium Blogger Themes | Facebook Themes