Pages

Tuesday, October 30, 2018

দীপাবলীকে আলোর উৎসব বলা হয়

দীপাবলি, বা, দেওয়ালি হল একটি পাঁচ দিন-ব্যাপী হিন্দু ধর্মীয় উৎসব। তবে জৈন-শিখ ধর্মালম্বীরাও এই সময়ে একই ধরনের উৎসব পালন করে থাকেন। আশ্বিন মাসের কৃষ্ণা ত্রয়োদশীর দিন ধনতেরাস অথবা ধনত্রয়োদশী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দীপাবলি উৎসবের সূচনা হয়। কার্তিক মাসের শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতে ভাইফোঁটা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই উৎসব শেষ হয়। নবরাত্রি উৎসব অথবা বাঙালিদের দুর্গোৎসব শেষ হওয়ার ১৮ দিন পর দীপাবলি শুরু হয়। গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসারে, মধ্য-অক্টোবর থেকে মধ্য-নভেম্বরের মধ্যে দীপাবলি অনুষ্ঠিত হয়।

দীপাবলি ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মায়ানমার, মরিশাস, গুয়ানা, ত্রিনিদাদ ও টোবাগো, সুরিনাম, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ফিজিতে একটি সরকারি ছুটির দিন।এই দিনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছুটি দেয়া হয়।

হিন্দুদের কাছে, দীপাবলি একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসব। এই দিন সব হিন্দুরা বাড়িতে নানা ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। বাংলা, আসাম, ওড়িশা ও মিথিলাতে এই দিনটি কালীপূজা হিসেবে উদযাপন করা হয়। ভারতীয় সমাজের দৃঢ় বিশ্বাস 'দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন' বা 'ন্যায়ের কাছে অন্যায়ের পরাজয়' এই নীতিতে। দীপাবলির মাধ্যমে উপনিষদের আজ্ঞায় এই কথাটা খুবই সদৃঢ় ভাবে চরিতার্থ হয়ে ওঠে যথা:-
 "অসতো মা সৎ গময়। 
তমসো মা জ্যোতির্গময়। 
মৃত্যোর্মা অমৃতং গময়। 
ওঁ শান্তিঃ॥ ওঁ শান্তিঃ॥ ওঁ শান্তিঃ॥" 
অর্থাৎ "অসৎ হইতে সত্যে লইয়া যাও, অন্ধকার হইতে জ্যোতিতে লইয়া যাও, মৃত্যু হইতে অমরত্বে লইয়া যাও। সর্বত্র যেন ছড়াইয়া পড়ুক শান্তির বার্তা॥" উত্তর ভারতীয় হিন্দুদের মতে দীপাবলির দিনেই শ্রীরামচন্দ্র চৌদ্দ বছরের নির্বাসনের পর অযোধ্যা ফেরেন। নিজের পরমপ্রিয় রাজাকে ফিরে পেয়ে অযোধ্যাবাসীরা ঘিয়ের প্রদীপ জ্বেলে সাজিয়ে তোলেন তাঁদের রাজধানীটাকে। এই দিনটিতে পূর্বভারত বাদে সম্পূর্ণ ভারতবর্ষে লক্ষ্মী-গণেশের পুজোর নিয়ম আছে। জৈন মতে, ৫২৭ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে মহাবীর দীপাবলির দিনেই মোক্ষ বা নির্বাণ লাভ করেছিলেন। ১৬১৯ খ্রিস্টাব্দে শিখদের ষষ্ঠ গুরু হরগোবিন্দ ও ৫২ জন রাজপুত্র দীপাবলির দিন মুক্তি পেয়েছিলেন বলে শিখরাও এই উৎসব পালন করেন। আর্য সমাজ এই দিনে স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতীর মৃত্যুদিন পালন করে। তারা এই দিনটি "শারদীয়া নব-শস্যেষ্টি" হিসেবেও পালন করেন। এছাড়া, নেপাল-ভারত-বাংলাদেশের সকল সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যেই এই উৎসব নিয়ে উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যায়।

"দীপাবলি" নামটির অর্থ "প্রদীপের সমষ্টি"। এই দিন হিন্দুরা ঘরে ঘরে ছোটো মাটির প্রদীপ জ্বালেন। এই প্রদীপ জ্বালানো অমঙ্গল বিতাড়নের প্রতীক। বাড়িঘর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে সারা রাত প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখলে ঘরে লক্ষ্মী আসেন বলে উত্তর ভারতীয় হিন্দুরা বিশ্বাস করেন। বাংলার দীপান্বিতা কালীপূজা বিশেষ জনপ্রিয়। এই উৎসব সাড়ম্বরে আলোকসজ্জা সহকারে পালিত হয়। তবে এই পূজা প্রাচীন নয়। ১৭৭৭ খ্রিস্টাব্দে কাশীনাথ রচিত শ্যামাসপর্যাবিধিগ্রন্থে এই পূজার সর্বপ্রথম উল্লেখ পাওয়া যায়। কথিত আছে, নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় অষ্টাদশ শতকে তাঁর সকল প্রজাকে শাস্তির ভীতিপ্রদর্শন করে কালীপূজা করতে বাধ্য করেন। সেই থেকে নদিয়ায় কালীপূজা বিশেষ জনপ্রিয়তা লাভ করে। কৃষ্ণচন্দ্রের পৌত্র ঈশানচন্দ্রও বহু অর্থব্যয় করে কালীপূজার আয়োজন করতেন। অমঙ্গল বিতাড়নের জন্য আতসবাজিও পোড়ানো হয়। বিশেষত উত্তর ভারতে দীপাবলির সময় নতুন পোশাক পড়া, পরিবার ও বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে মিষ্টি বিতরণের প্রথাও আছে।

ধনতেরাসের দিন অনেক ভারতীয় ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের অর্থবর্ষের সূচনা হয়; লোকজন নতুন বর্তন, বাসন, গয়না প্রভৃতিও কিনে থাকেন এই দিনে। তবে বেশির ভাগ বাঙালি ব্যবসায়ীদের অর্থবর্ষের সূচনা হয় পয়লা বৈশাখে। দ্বিতীয় দিনটিকে বলে ভূত চতুর্দশী। এই দিনে বাঙালিরা বাড়ির চোদ্দোটা এঁদো কোণায় চোদ্দোটা প্রদীপ জ্বালিয়ে কালো মুছিয়ে আলোকিত করে তোলেন বাড়িটাকে। কথায় আছে যে এমনটা করলে ভূতপ্রেত পরিবার আর স্বজনদের ঘাড়ের কাছে নড়তে পারে না; এমনটাও লোককথায় শোনা যায় যে এই প্রদীপসজ্জার মাধ্যমে পরিবারের পিতৃপুরুষদের অনুষ্ঠানে পদার্পণ করার জন্য নিমন্ত্রণ পাঠানো হয়, যাতে তাঁরা মায়ের বাৎসরিক আগমনে উপস্থিত হয়ে সবাইকে শুভাশীষ দিয়ে নিজেরা মায়ের আশীর্ব্বাদে মোক্ষ লাভ করবেন। তৃতীয় দিন কার্তিক অমাবস্যায় যেখানে উত্তর ভারতে লক্ষ্মীর পূজা চলছে, পশ্চিমবঙ্গে দারুণ জাঁকজমকে ঘটা করে পালন করা হয় কালীপূজা। অবশ্য সেদিন আদি পশ্চিমবঙ্গ বাসিন্দারা, ঘটিরা, বাড়িতে লক্ষ্মীর পূজাও করে থাকেন। তবে আদি বাংলাদেশি হিন্দুদের, বাঙালদের, এই নিয়ম নেই; তা অনেকে বাড়িতেও কালী পুজো করেন, যদিও এই পুজোর বারোয়ারি ভাবে পালন হওয়ার প্রচলন বেশি। কদাচিৎ কালীপুজোর দিন আর দেওয়ালির দিন পৃথকও হতে পারে; দেওয়ালির তারিখটা একদিন পরে কিংবা আগেও পড়া সম্ভব। কেননা কালীপূজার লগ্ন অমাবস্যার মাঝরাত্রিতে ঠিক হয়, আবার দীপাবলির লক্ষ্মী পূজার লগ্ন নিশ্চিত করা হয় অমাবস্যার সন্ধ্যেতে, তাই পুজোর লগ্ন অনুযায়ী দুই পুজোর তারিখে মাঝে মাঝে অন্তর ঘটে থাকে। দেওয়ালির দিনে প্রদীপের আলোয় বাড়ি-বাড়ি ঝকমক করে ওঠে। নানান রঙের বাজিতে আকাশটাও রীতিমত চকচক করে থাকে। দীপাবলি সারি-সারি প্রদীপের আলোকে স্বর্গের দেবতাকে মর্তের কুটিরে বরণ করে নেবার উৎসব। চতুর্থ দিন কার্তিক শুক্লা প্রতিপদ। এই দিন বৈষ্ণবেরা গোবর্ধন পূজা করেন। পঞ্চম দিন যমদ্বিতীয়া বা ভ্রাতৃদ্বিতীয়া বা ভাইফোঁটা। এই দিন বোনেরা তাদের ভাইদের জন্যে উপোস করে তাদের বাড়িতে নিমন্ত্রণ করে।

Monday, October 29, 2018

কালী পুজোর বিধি বিস্তারিত


কালী পুজোর বিধি  বিস্তারিত

দুর্গা পুজো ও লক্ষ্মী পুজোর পরেই সময় শক্তি সাধনার, অর্থাৎ কালী পুজো বা শ্যামা পুজোর| কালী পুজো সাধারণত অমাবস্যা তিথিতে সম্পন্ন করা হয়| ১৮ শতকে নবদ্বীপের রাজা কৃষ্ণচন্দ্র এই পুজো শুরু করেন| এর পর ১৯ শতক থেকে এই পুজো বহুল প্রচলিত হয়| আমাদের সবার কাছে এই পুজো শব্দবাজি এবং আলোর রোশনাইয়ের পুজো| পুজোয় আনন্দ করার সাথে সাথে এই পুজোর বিধি বা নিয়ম সম্পর্কেও যদি অবগত থাকেন তাহলে ক্ষতি কি? সামনেই তো পুজো তাই এখনি জেনে নিন এর সঠিক বিধি বা নিয়ম|

পুজো শুরুর নিয়মাবলী
দেবী কালী বা ভগবতী কালী মূর্তি বন্দনা সাধারণত আমরা করে থাকি| দেবী মূর্তির একটি পা মহাদেবের বুকের ওপর থাকে, এক হাতে অসুরের ছিন্ন মস্তক ও অন্য হাতে খড়গ| এবং দেবীর গলায় থাকে নরমুন্ডের মালা| তবে অনেক ক্ষেত্রে কালী দোয়াত দেবী মূর্তির পরিবর্তে দেবী ভগবতী রূপে বন্দনা করা হয়| পুজো শুরু করার পূর্বে লেখনি দোয়াত বা কালী দোয়াতটি পুজোর আসনে বসানো হয়ে থাকে| অনামিকা অঙ্গুলি দ্বারা লেখনি দোয়াতগুলিতে স্বস্তিক অঙ্কন করা হয়ে থাকে এবং এর জন্য লাল চন্দনবাটা ব্যবহৃত হয়ে থাকে|

স্তিক অঙ্কন সমাপ্ত হলে কালী পুজো শুরু হয়| বহুল আয়োজন বা ভোগ নয়, দেবী কালী শুধু জবা ফুলেই সন্তুষ্ট হন| তবে ভক্তি, আস্থা ও নিষ্ঠা এই পুজোকে সঠিক ভাবে সম্পন্ন করে| সোমরস এই পুজোয় প্রধান ভোগ হিসেবে ব্যবহৃত হয়| মধ্যরাতে পুজো শুরু হয় এবং সাধারণত ভোর রাতে এই পুজো সম্পন্ন হয়|

পুজোর বিধি
কালী পুজো অত্যন্ত নিষ্ঠা ও সঠিক বিধি মেনে করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়| সাধারণত ধ্যান, দেবীর আবাহন, পুষ্পাঞ্জলি দ্বারা এই পুজোর বিধি সম্পন্ন হয়| আসুন একটু বিস্তারে জানা যাক|

ধ্যান
দেবী ভগবতীমূর্তি বা লেখনি দোয়াত ঠিক মত প্রতিস্থাপন করা হলে ধ্যান দ্বারা এই পুজো শুরু করা হয়| একনিষ্ঠ ধ্যান এবং বিশেষ মন্ত্র উচ্চারণ দ্বারা দেবীর ধ্যান করা হয়|

আবাহন
ধ্যান সম্পন্ন হলে দেবী ভগবতী বা দেবী কালীর আবাহন শুরু হয়| এক্ষেত্রে হাতের একটি বিশেষ মুদ্রা এবং মন্ত্র উচ্চারণ করে দেবীর আবাহন করা হয়ে থাকে| দুটি হাত জোড় করে প্রনামের ভঙ্গিটি করে বুড়ো আঙুলটিকে ভেতরের দিকে রেখে এই বিশেষ মুদ্রাটি করা হয়ে থাকে| দেবী বন্দনায় বিভিন্ন মুদ্রা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ| কারণ প্রতিটি মুদ্রার আলাদা আলাদা অর্থ আছে| এই আবাহন দ্বারা দেবী মূর্তিতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা হয়ে থাকে|

পুষ্পাঞ্জলি
পুষ্পাঞ্জলি তিনটি ধাপে সম্পন্ন হয়| প্রথমে ধ্যান এবং আবাহন দ্বারা দেবীর প্রাণ প্রতিষ্ঠা হলে দেবী কালীকে তুষ্ট করার জন্য পুষ্পাঞ্জলি দেওয়া হয়| এক্ষেত্রে পাঁচটি লাল জবা ফুল দেবীর চরণে অর্পণ করা হয় একটি বিশেষ মন্ত্রের উচ্চারণে| এরপর একে একে চন্দন, পুষ্প, দীপ, ধূপ ও নৈবেদ্য দ্বারা দেবী বন্দনা করা হয়ে থাকে|

প্রতিটি ক্ষেত্রে আলাদা আলাদা মুদ্রা ও মন্ত্র উচ্চারণ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ| এরপর একে একে গন্ধ, অক্ষত এবং পুষ্প বাঁ হাত দিয়ে তুলে ডান হস্ত দ্বারা দেবীর চরণে অর্পণ করা হয়ে থাকে এবং নির্দিষ্ট মন্ত্র পাঠ করা হয়ে থাকে এবং পুজো গ্রহণ করা হেতু দেবী ভগবতী বা দেবী কালীকে বারংবার প্রনাম জানানো হয়ে থাকে|

আমাদের চারিদিকের অশুভ শক্তি এবং আমাদের ভেতরের অশুভ শক্তিকে পরাজিত করার কারণ স্বরূপ এই পুজো অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে সম্পন্ন করা হয়ে থাকে| নারীশক্তির স্বরূপ দেবী ভগবতী সমাজের অনিষ্টকারী শক্তিকে বিনষ্ট করে আমাদের অন্ধকার থেকে আলোর পথ দেখান| তাই আমরাও আলো, বাজি এবং অপার ভক্তি ও শ্রদ্ধার সাথে এই পুজোয় সম্মিলিত হয়ে থাকি|

Wednesday, October 24, 2018

কালীপূজা বা শ্যামাপূজা 2018


কালীপূজা

কালীপূজা বা শ্যামাপূজা হিন্দু দেবী কালীর পূজাকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত একটি হিন্দু উৎসব। প্রধানত বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে এই উৎসব উপলক্ষে প্রবল উৎসাহ উদ্দীপনা লক্ষিত হয়। বাংলায় গৃহে বা মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত কালীপ্রতিমার নিত্যপূজা হয়ে থাকে। কার্ত্তিক মাসের অমাবস্যা তিথিতে অনুষ্ঠিত সাংবাৎসরিক দীপান্বিতা কালীপূজা বিশেষ জনপ্রিয়। এই দিন আলোকসজ্জা ও আতসবাজির উৎসবের মধ্য দিয়ে সারা রাত্রিব্যাপী কালীপূজা অনুষ্ঠিত হয়। উল্লেখ্য, দীপান্বিতা কালীপূজার দিনটিতে ভারতের অন্যান্য জায়গায় দীপাবলি উৎসব পালিত হয়। সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে এই দিন লক্ষ্মীপূজা অনুষ্ঠিত হলেও বাঙালি, অসমীয়া ও ওড়িয়ারা এই দিন কালীপূজা করে থাকেন। এছাড়া মাঘ মাসের কৃষ্ণা চতুর্দশী তিথিতে রটন্তী এবং জ্যৈষ্ঠ মাসের কৃষ্ণা চতুর্দশী তিথিতে ফলহারিণী কালীপূজাও যথেষ্ট জনপ্রিয়।

ইতিহাস
চামুণ্ডাচর্চিকা কালীর পূজা বাংলা ও বহির্বঙ্গে প্রাচীন উৎসব হলেও বর্তমান আকারে কালীপূজা আধুনিক কালের। ষোড়শ শতাব্দীতে নবদ্বীপের প্রসিদ্ধ স্মার্ত পণ্ডিত তথা নব্যস্মৃতির স্রষ্টা রঘুনন্দন দীপান্বিতা অমাবস্যায় লক্ষ্মীপূজার বিধান দিলেও, কালীপূজার উল্লেখ করেননি।১৭৬৮ সালে রচিত কাশীনাথের কালী সপর্যাসবিধি গ্রন্থে দীপান্বিতা অমাবস্যায় কালীপূজার বিধান পাওয়া যায়। ডঃ শশীভূষণ দাশগুপ্তের মতে, “কাশীনাথ এই গ্রন্থে কালীপূজার পক্ষে যে ভাবে যুক্তিতর্কের অবতারণা করিয়াছেন, তাহা দেখিলেই মনে হয়, কালীপূজা তখনও পর্যন্ত বাঙলা দেশে সুগৃহীত ছিল না।” তবে খ্রিষ্টীয় সপ্তদশ শতাব্দীতে বাংলায় কালীপূজার প্রচলনের কিছু কিছু প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে।

সপ্তদশ শতকের নবদ্বীপের প্রথিতযশা তান্ত্রিক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশকে বাংলায় কালীমূর্তি ও কালীপূজার প্রবর্তক মনে করা হয়। তাঁর পূর্বে কালী উপাসকগণ তাম্রটাটে ইষ্টদেবীর যন্ত্র এঁকে বা খোদাই করে পূজা করতেন। পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, “কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ স্বয়ং কালীমূর্তি গড়িয়া পূজা করিতেন। আগমবাগীশের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করিয়া বাংলার সাধক সমাজ অনেকদিন চলেন নাই; লোকে ‘আগমবাগিশী’ কাণ্ড বলিয়া তাঁহার পদ্ধতিকে উপেক্ষা করিত।” অষ্টাদশ শতাব্দীতে নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় কালীপূজাকে জনপ্রিয় করে তোলেন। এই সময় রামপ্রসাদ সেনও আগমবাগীশের পদ্ধতি অনুসারে কালীপূজা করতেন। ঊনবিংশ শতাব্দীতে কৃষ্ণচন্দ্রের পৌত্র ঈশানচন্দ্র ও বাংলার ধনী জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতায় কালীপূজা ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। বর্তমানে কালীপূজা বাংলায় দুর্গাপূজার মতোই এক বিরাট উৎসব।

পূজানুষ্ঠান
দুর্গাপূজার মতো কালীপূজাতেও গৃহে বা মণ্ডপে মৃন্ময়ী প্রতিমা নির্মাণ করে পূজা করা হয়। মন্দিরে বা গৃহে প্রতিষ্ঠিত প্রস্তরময়ী বা ধাতুপ্রতিমাতেও কালীপূজা করা হয়। মধ্যরাত্রে তান্ত্রিক পদ্ধতিতে মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে পূজা অনুষ্ঠিত হয়। দেবীকে ছিন্নমস্তক সহ বলির পশুর রক্ত, মিষ্টান্ন, অন্ন বা লুচি, মাছ ও মাংস উৎসর্গ করা হয়। গৃহস্থবাড়িতে সাধারণত অতান্ত্রিক ব্রাহ্মণ্যমতে আদ্যাশক্তি কালীর রূপে কালীর পূজা হয়। দেবীর পূজায় ছাগ মেষ বা মহিষ বলির প্রথা রয়েছে।সুদূর অতীতে নরবলি দিয়েও কালীপূজা হত। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, কালী শ্মশানের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। এই কারণে কলকাতা সহ বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে শ্মশানে মহাধুমধামসহ শ্মশানকালী পূজা অনুষ্ঠিত হয়।

কোনো কোনো মণ্ডপে কালী ও শিবের মূর্তির সঙ্গে সঙ্গে বাংলার দুই বিখ্যাত কালীসাধক রামকৃষ্ণ পরমহংস ও বামাখ্যাপার মূর্তিও পূজিত হয়। কোথাও কোথাও কালীর সঙ্গে সঙ্গে দশমহাবিদ্যাও পূজিত হন। দর্শনার্থীরা সারারাত ধরে মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরে কালীপ্রতিমা দর্শন করেন। কালীপূজার রাতে গৃহে আলোকসজ্জা সাজানো হয় এবং আতসবাজি পোড়ানো হয়।


কলকাতার কালীঘাট মন্দিরে এই দিন দেবী কালীকে লক্ষ্মীরূপে পূজা করা হয়। হাজার হাজার ভক্ত এই দিন কালীঘাট মন্দিরে ভিড় করেন এবং দেবীর উদ্দেশ্যে বলি উৎসর্গ করেন। কলকাতার অপর বিখ্যাত কালীমন্দির দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়িতেও কালীপূজা উপলক্ষে মহাসমারোহ হয়। এইখানেই অতীতে রামকৃষ্ণ পরমহংস কালী আরাধনা করেছিলেন। সেই কারণে এই মন্দিরে কালীপূজা দেখতে প্রচুর পুণ্যার্থী এখানে ভিড় জমান।

আজ কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা

আজ কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা
কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা আজ । সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব। এ উপলক্ষে বাংলার হিন্দু সম্প্রদায়ের ঘরে ঘরে চলছে পূজার আনন্দ। যার যার সাধ্যমত বাসা বাড়িতে লক্ষ্মীপূজার আয়োজন করছেন।

আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের পূর্ণিমা তিথিতে এ পূজা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।

সনাতন ধর্ম‍াবলম্বীদের বিশ্বাস শ্রী শ্রী লক্ষ্মী হলেন ঈশ্বরের পালন রূপ শক্তি নারায়ণি। ভক্তরা যাকে ধন-সম্পদ-ঐশ্বর্যের অধিষ্ঠাত্রী অন্নদাত্রী দেবীরূপে পূজা করেন। তবে এই ধন শুধু পার্থিব ধন নয়, চরিত্র, ধন ও সর্বাত্মক বিকাশেরও প্রতীক।

হিন্দু শাস্ত্রমতে সাধারণত প্রতি বৃহস্পতিবার সবার ঘরে লক্ষ্মীপূজা করা হয়। পারিবারিক লক্ষ্মীপূজায় লক্ষ্মীর পাঁচালি পাঠ করা হয়। তবে আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের পূর্ণিমা তিথিতে লক্ষ্মীপূজা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এজন্য এ পূজা কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা নামে পরিচিত। লক্ষ্মীর বাহন হচ্ছে পেঁচা। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা বিশ্বাস করেন তিনি ভগবান বিষ্ণুর সহধর্মিণী। লক্ষ্মী পদ্মফুলের উপর উপবেশন করে থাকেন।

সাধারণত লক্ষ্মীপূজা পঞ্চোপচার, দশোপচার বা ষোড়শোপচারে করা হয়ে থাকে। পূজা শেষ না হওয়া পর্যন্ত গৃহবধূরা উপবাস ব্রত করেন। পূজাস্থলে বিভিন্ন আলপনাসহ গৃহের বিভিন্ন স্থানে দেবীর প্রতীকী পায়ের ছাপ আঁকা হয়। পূজা শেষে পুষ্পাঞ্জলি ও ভক্তদের মধ্যে প্রসাদ বিতরণ করা হয়।

সন্ধ্যার পর থেকে ঘরে ঘরে ধনদেবীর আরাধনায় মেতে উঠবেন গৃহিণীরা। দিনে নয়, রীতি অনুযায়ী মা লক্ষ্মী পূজা নেন রাতে। রাতে দেবীর আরাধনা করাই লক্ষ্মী আরাধনার চিরাচরিত রীতি।

কোজাগরী শব্দের অর্থ ‘কে জেগে আছে?’ বিশ্বাস অনুযায়ী এই রাতে দেবী লক্ষ্মী বিষ্ণুলোক হতে ধরায় নেমে আসেন এবং মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে “কে জেগে আছ?” এই প্রশ্ন করেন (নিশীথে বরদা লক্ষ্মী কোজাগর্তিভাষিণী- অর্থ নিশীথে বরদাত্রী লক্ষ্মীদেবী কে জেগে আছ বলে সম্ভাষণ করেন)।

যে ভক্ত রাত জেগে তার আরাধনা করেন, লক্ষ্মীব্রত করে জেগে থাকেন দেবী তার কাছ থেকে সাড়া পান এবং তার গৃহে প্রবেশ তাকে আশীর্বাদ করে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য প্রদান করেন।

গৃহিণীরা নিজেরাই এই পূজা করতে পারেন। শ্বেতপদ্ম ও শ্বেতচন্দনে লক্ষ্মীর আরাধনা করতে হয়। ফল-মূলের পাশাপাশি চিড়া এবং নারিকেল লক্ষ্মীপূজায় আবশ্যিক। একে চিপিটক বলে।



Saturday, October 20, 2018

কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা


কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম ধমীয় উৎসব লক্ষ্মীপূজা। এ পূজা কোজাগরী লক্ষ্মী পূজা নামেও পরিচিত। কোজাগরী শব্দটি এসেছে 'কো জাগর্তী' থেকে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, কোজাগরী পূর্ণিমা রাতে দেবী লক্ষ্মী ধন-ধান্যে ভরিয়ে দিতে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িতে পূজা গ্রহণ করতে আসেন। আর ধন-ধান্যের আশায় এই পূজার আয়োজন করা হয়।

শাস্ত্রমতে, দেবী লক্ষ্মী ধন-সম্পদ তথা ঐশ্বর্যের প্রতীক। এ ছাড়া উন্নতি (আধ্যাত্মিক ও পার্থিক), আলো, জ্ঞান, সৌভাগ্য, উর্বরতা, দানশীলতা, সাহস ও সৌন্দর্যের দেবীও তিনি। শারদীয় দুর্গোৎসব শেষে প্রথম পূর্ণিমা তিথিতে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা এই পূজা করে থাকেন। প্রাচীনকাল থেকেই রাজা-মহারাজা, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সাধারণ গৃহস্থ পর্যন্ত সবাই এই দেবীর পূজা করে আসছেন।

হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, লক্ষ্মী দেবী সন্তুষ্ট থাকলে সংসারে অর্থকষ্ট থাকবে না ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বাড়বে। ঘরে ঘরে মা লক্ষ্মী ধন-সম্পদের দেবী হিসেবে পূজিত হন। ভক্তের ডাকে সাড়া দিয়ে এদিন লক্ষ্মী মর্ত্যে নেমে আসেন। বাঙালি বিশ্বাসে লক্ষ্মীদেবী দ্বিভূজা ও তার বাহন পেঁচা এবং হাতে থাকে শস্যের ভাণ্ডার। তবে বাংলার বাইরে লক্ষ্মীর চতুর্ভূজা কমলে-কামিনী মূর্তিই বেশি দেখা যায়। প্রায় প্রতিটি বাঙালি হিন্দুর ঘরে লক্ষ্মীপূজা করা হয়। এ উপলক্ষে হিন্দু নারীরা উপবাস ব্রত পালন করেন।

 সারা দেশের বিভিন্ন মন্দির ও মণ্ডপের পাশাপাশি হিন্দুদের ঘরে ঘরে সকালে পূজার আনুষ্ঠানিকতা শেষে অঞ্জলি, প্রসাদ বিতরণ ও অতিথি আপ্যায়ন করা হয়। পূজা-অর্চনার পাশাপাশি ঘর-বাড়ির আঙিনায় আঁকা হবে লক্ষ্মীর পায়ের ছাপের আল্পনা। সন্ধ্যায় ঘরে ঘরে প্রদীপ প্রজ্জালন করেন। বিভিন্ন মন্দিরসহ ঘরোয়া পরিবেশে লক্ষ্মীপূজার বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা হয়। 

Friday, October 19, 2018

শুভ বিজয়া দশমী

আজ বিজয়া দশমী। অশুভশক্তির বিরুদ্ধে শুভশক্তির বিজয়ের দিন আজ। বাঙালি হিন্দুধর্মাবলম্বীদের প্রধান উত্সব দুর্গাপূজা। বর্ষার অঝোরধারা আর প্যাচপেচে পরিবেশের পর দুর্গাপূজা আসে শরতের শুভ্র কাশফুলের দোলা আর পেঁজাতুলা মেঘের ভেলায় করে। অবশ্য শরতের এই উত্সবটির নেপথ্যে রহিয়াছে দশরথপুত্র শ্রীরামচন্দ্রের অবদান। কৃত্তিবাসের রামায়ণ হইতে জানা যায়, সীতা উদ্ধারের জন্য শ্রীরামচন্দ্র কালিদহ সাগর হইতে ১০১টি নীলপদ্ম সংগ্রহ করিয়া সাগরকূলে বসিয়া শরত্কালে সর্বপ্রথম শক্তি তথা দুর্গোত্সবের (অকাল বোধন) আয়োজন করেন। বসন্তকালে দেবীদুর্গার বাসন্তী পূজার নিয়ম থাকিলেও শরতে রামচন্দ্রের অকালবোধনের আয়োজনই পরবর্তীকালে জনপ্রিয়তা লাভ করে। অর্থাত্ এই শারদীয় উত্সবের সঙ্গে রহিয়াছে রামচন্দ্রের প্রতি আজ্ঞাবহের ইঙ্গিত। হিন্দু শাস্ত্রানুসারে দুর্গাপূজার বাহন সিংহ। কিন্তু পৌরাণিক মতে, দেবী দুর্গা প্রতি বত্সর কৈলাস হইতে বাপের বাড়ি মর্ত্যলোকে আগমনের সময়ে চারটি আলাদা বাহন (অশ্ব, হস্তী, নৌকা এবং দোলা) ব্যবহার করিয়া থাকেন। স্বামীর বাড়ি ফিরিয়াও যান আলাদা আলাদা বাহনে।
শুভ বিজয়া দশমী

প্রাকৃতিক বিপর্যয়, যুদ্ধ, সামাজিক অশান্তি অবশ্য সামপ্রতিককালে এই জগতের নিত্যচিত্রের রূপ ধারণ করিয়াছে। সনাতন ধর্মের প্রধান ধর্মগ্রন্থ শ্রীমদ্ভগবতগীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলিয়াছেন—‘যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত। অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম। পরিত্রাণায় সাধুনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম। ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে।’ অর্থাত্ যখনই ধর্মের অধঃপতন হয় এবং অধর্মের উত্থান ঘটে, তখনই সত্ মানুষের পরিত্রাণ ও দুষ্টলোকের বিনাশ সাধন করিতে এবং ধর্মকে পুনরায় সংস্থাপন করিতে ঈশ্বর বিভিন্নরূপে যুগে যুগে ধরাধামে অবতীর্ণ হন। দেবী দুর্গাও মর্ত্যে আসিয়া অশুভ শক্তির বিনাশের মাধ্যমে শুভশক্তিকে প্রতিস্থাপন করেন। জীবের দুর্গতি নাশ করেন বলিয়াও তাহাকে দুর্গা বলা হয়। ব্রহ্মার বরে পুরুষের অবধ্য মহিষাসুর নামে এক দানব স্বর্গরাজ্য দখল করিলে রাজ্যহারা দেবতারা বিষ্ণুর শরণাপন্ন হন। বিষ্ণুর নির্দেশে সকল দেবতার তেজঃপুঞ্জ হইতে যে দেবীর জন্ম হয় তিনিই দুর্গা। দেবতাদের শক্তিতে শক্তিময়ী এবং বিভিন্ন অস্ত্রে সজ্জিতা হইয়া এই দেবী যুদ্ধে মহিষাসুরকে বধ করেন। দেবী দুর্গা দশভুজা, ইন্দ্রিয় সংযমের প্রতীক তাঁহার দশ হাত দশ দিক রক্ষায় শক্তিসম্পন্না। দুর্গা ত্রিনয়না—অগ্নি, সূর্য ও চন্দ্রের প্রতীক ব্রহ্ম, বিষ্ণু ও মহেশ্বরের শক্তিসম্পন্না।

দুর্গাপূজার মাধ্যমে জগতের শুভশক্তিরই আরাধনা করিয়া থাকেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। তাহাদের নিকট পূজা মানে হইল—নিবেদন অর্থাত্ প্রশংসা বা শ্রদ্ধা জানানো। দিকে দিকে সুর-অসুরের যে যুদ্ধ চলিতেছে, তাহারই প্রতীকী বিজয়ের প্রকাশ দেখিতে পাওয়া যায় দুর্গোত্সবে। সকল সনাতন ধর্মাবলম্বীর প্রতি জানাই বিজয়া দশমীর শুভেচ্ছা। শুভ বিজয়া।

Monday, October 15, 2018

আজ সপ্তমী পূজা


আজ সপ্তমী পূজা


ষষ্ঠীর পর বুধবার মন্ডপে মন্ডপে আয়োজন করা হয়েছে সপ্তমী পূজার। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পাশাপাশি নানা ধর্ম-বর্ণের মানুষ দল বেঁধে পূজা দেখতে আসছে। উত্সবপ্রিয় বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায় মেতে উঠেছে পূজার আনন্দে। মণ্ডপগুলো ঝলমলে আলোকসজ্জায় রঙিন হয়ে উঠেছে। মন্দিরে মন্দিরে শোনা যাচ্ছে উলুধ্বনি, শঙ্খ, কাঁসা ও ঢাকের বাদ্য। 

মঙ্গলবার সকালে সারা দেশে ষষ্ঠী তিথিতে বেলতলায় বিহিত পূজার পর দেবীর আমন্ত্রণ ও অধিবাসের মধ্য দিয়ে মূল দুর্গোত্সবের সূচনা হয়। মাতৃবন্দনার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয় সকাল ৯টায়। নানা উপচারে ডালা সাজিয়ে মাতৃমণ্ডপে আসতে থাকেন ভক্তরা। অশুভ শক্তির বিনাশে ‘মঙ্গলময়ী’ দেবীর জাগরণে জগতে সুর শক্তি প্রতিষ্ঠার প্রার্থনা করেন তারা। 
শারদীয় দুর্গোত্সবের মহাসপ্তমী আজ শুরু হচ্ছে দেবী-দর্শন, দেবীর পায়ে ভক্তদের অঞ্জলি প্রদান ও প্রসাদ গ্রহণ। মূলত দুর্গোত্সবের মূল পর্ব শুরু হচ্ছে আজ। সপ্তমীতে ষোড়শ উপাচারে অর্থাত্ ষোলটি উপাদানে দেবীর পূজা হবে। সকালে ত্রিনয়নী দেবী দুর্গার চক্ষুদান করা হবে। দেবীকে আসন, বস্ত্র, নৈবেদ্য, স্নানীয়, পুষ্পমাল্য, চন্দন, ধূপ ও দীপ দিয়ে পূজা করবেন ভক্তরা। সপ্তমী পূজা উপলক্ষে সন্ধ্যায় বিভিন্ন পূজামণ্ডপে ভক্তিমূলক সঙ্গীত, রামায়ণ পালা, আরতিসহ নানা অনুষ্ঠান হবে। বিশুদ্ধ পঞ্জিকা মতে সকাল ৮টা ৫৮ মিনিটে দুর্গাদেবীর নবপত্রিকা প্রবেশ, স্থাপন ও সপ্তাদি কল্পারম্ভ এবং সপ্তমী বিহিত পূজা প্রশস্ত। আগামীকাল মহাষ্টমী। প্রতিবছরের মত এবারও ঢাকার রামকৃষ্ণ মঠ মিশনে কাল মহাষ্টমীতে অনুষ্ঠিত হবে ঐতিহ্যবাহী কুমারী পূজা।

Sunday, October 14, 2018

আজ দুর্গাষষ্ঠী


আজ দুর্গাষষ্ঠী

ঢাক আর ঢোলে কাঠির বাড়ি, ধূপের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন মণ্ডপ, কাঁসর ও শঙ্খের শব্দ শিহরণের মধ্যে দিয়ে আজ থেকে শুরু হলো পাঁচদিনব্যাপী দুর্গোৎসব।
মাতৃরূপে দেবী অধিষ্ঠিত হলেন মণ্ডপে মণ্ডপে। প্রার্থনার মধ্য দিয়ে জাগরিত হয়ে বিশ্ব থেকে অশুভকে বিদায় দেয়ার পণ। এভাবেই শারদীয় দুর্গোৎসবের সূচনা হলো আজ। আজ দুর্গাষষ্ঠী।
গতকাল রোববার ছিল দুর্গা দেবীর বোধন। তবে দুর্গাষষ্ঠীর মধ্য দিয়েই দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু। সারাদেশে এখন বইছে উৎসবের আমেজ। দুর্গতি নাশিনী দেবী দুর্গার আগমনে উচ্ছ্বসিত ভক্তকুল।
আনন্দমুখর পরিবেশে দুর্গোৎসব উদযাপনে রাজধানীসহ সারাদেশে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী। এদিকে শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী পৃথক বাণী দিয়েছেন।
ইতিমধ্যেই শেষ হয়েছে ৫ দিনব্যাপী হিন্দুদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজার সব প্রস্তুতি। প্রতিমায় পড়ছে রং-তুলির শেষ আঁচড়। এ উৎসব ঘিরে দেশ এখন আনন্দমুখর।
সনাতন বিশ্বাস ও বিশুদ্ধ পঞ্জিকামতে, জগতের মঙ্গল কামনায় দেবী দুর্গা এবার ঘোটকে (ঘোড়া) চড়ে মর্ত্যলোকে (পৃথিবী) আসবেন। যার ফল হচ্ছে রোগ, শোক, হানাহানি-মারামারি বাড়বে। আর দেবী স্বর্গালোকে বিদায় নেবেন দোলায় (পালকি) চড়ে। যার ফল মড়ক। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রোগ, মহামারীর প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাবে।
 এদিন বিজয়া দশমী-প্রতিমা বিসর্জন। মন্দিরে মন্দিরে মন্ত্র উচ্চারণ আর প্রার্থনার মধ্য দিয়ে বিশ্বের অশুভকে তাড়িয়ে শুভ কামনা করা হবে। সকাল থেকে চণ্ডিপাঠে মুখরিত থাকবে পূজা মণ্ডপ।
ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির মেলাঙ্গনে প্রতিদিন পূজানুষ্ঠান ছাড়াও ভক্তিমূলক সংগীতানুষ্ঠান, অঞ্জলি, প্রসাদ বিতরণ ও সন্ধ্যায় ভোগ আরতি, দুস্থদের মধ্যে বস্ত্র বিতরণ, আরতি প্রতিযোগিতা, স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। প্রায় একই ধরনের অনুষ্ঠান সূচি অন্যান্য পূজা মণ্ডপেও।

Tuesday, October 9, 2018

নবরাত্রি পূজার অর্থ

আক্ষরিক অর্থেই মহালয়ার দিন থেকেই শারদীয় দূর্গোৎসব শুরু হয়।মহালয়ার পরের দিন প্রতিপদ থেকে নবমী পর্যন্ত নয় রাত্রি ব্যাপি মা দূর্গার নয়টি শক্তির আরাধনা করা হয় সেটাই নবরাত্রি। নবরাত্রির নয়দিনে আরাধ্য দেবীরা হলেনঃ প্রতিপদে শৈলপুত্রী ( পর্বতের কন্যা),দ্বিতীয়াতে ব্রহ্মচারিণী (যিনি ব্রহ্মাকে স্বয়ং জ্ঞান দান করেন, ভক্তকেও ইনি ব্রহ্মপ্রাপ্তি করান ), তৃতীয়াতে চন্দ্রঘন্টা ( দেবীদুর্গার মহিষাসুর বধের জন্য দেবরাজ ইন্দ্রের প্রদত্ত ঘন্টা যার মধ্যে গজরাজ ঐরাবতের মহাশক্তি নিহিত ছিল, চন্দ্রের চেয়েও লাবণ্যবতী ইনি ),চতুর্থীতে কুষ্মান্ডা ( উষ্মার অর্থ তাপ । দুর্বিষহ ত্রিতাপ হল কুষ্মা। আর যিনি এই ত্রিতাপ নিজের উদরে বা অন্ডে ধারণ করেন অর্থাৎ সমগ্র সংসার ভক্ষণ করেন ইনি ), পঞ্চমীতে স্কন্দমাতা ( দেব সেনাপতি কার্তিকেয় বা স্কন্দের মা ),ষষ্ঠীতে কাত্যায়নী ( কাত্যায়ন ঋষির আশ্রমে দেবকার্যের জন্য আবির্ভূতা ইনি বৃন্দাবনে দেবী গোপবালা রূপে পূজিতা। ব্রজের গোপবালারা এই কাত্যায়নীর কাছে প্রার্থণা করেছিলেন নন্দের নন্দন শ্রীকৃষ্ণকে পতিরূপে পাওয়ার জন্য তাই ব্রজের দুর্গার নাম কাত্যায়নী ), সপ্তমীতে কালরাত্রি ( ঋগ্বেদের রাত্রিসুক্তে পরমাত্মাই রাত্রিদেবী। মহাপ্রলয়কালে এই রাত্রিরূপিণী মাতার কোলেই বিলয় হয় বিশ্বের।অনন্ত মহাকাশে নৃত্যরত কালভৈরবের দেহ থেকেই আবির্ভূতা ইনি দেবী যোগনিদ্রা মহাকালিকা বা কালরাত্রি নামে আখ্যাত ), অষ্টমীতে মহাগৌরী (তিনি সন্তানবৎসলা, শিবসোহাগিনী, বিদ্যুদ্বর্ণা মা দুর্গার প্রসন্ন মূর্তি) এবং নবমীতে সিদ্ধিদাত্রী ( অপরূপ লাবণ্যময়ী চতুর্ভুজা, ত্রিনয়নী, প্রাতঃসূর্যের মত রঞ্জিতা যোগমায়া মাহেশ্বরী ইনি সকল কাজে সিদ্ধি প্রদান করেন )।
নবরাত্রি পূজার অর্থ এবং তাত্পর্য


বৃহদ্ধর্মপুরাণ-এ রামের জন্য ব্রহ্মার দুর্গাপূজার বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়। এই পুরাণের মতে, কুম্ভকর্ণের নিদ্রাভঙ্গের পর রামচন্দ্রের অমঙ্গল আশঙ্কায় দেবতারা হলেন শঙ্কিত। তখন ব্রহ্মা বললেন, দুর্গাপূজা ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। তাই রামচন্দ্রের মঙ্গলের জন্য স্বয়ং ব্রহ্মা যজমানী করতে রাজি হলেন। তখন শরৎকাল। দক্ষিণায়ণ। দেবতাদের নিদ্রার সময়। এতএব ব্রহ্মা স্তব করে দেবীকে জাগরিত করলেন। দেবী তখন কুমারীর বেশে এসে ব্রহ্মাকে বললেন, বিল্ববৃক্ষমূলে দুর্গার বোধন করতে। দেবতারা মর্ত্যে এসে দেখলেন, এক দুর্গম স্থানে একটি বেলগাছের শাখায় সবুজ পাতার রাশির মধ্যে ঘুমিয়ে রয়েছে একটি পরমাসুন্দরী বালিকা। ব্রহ্মা বুঝলেন, এই বালিকাই জগজ্জননী দুর্গা। তিনি বোধন-স্তবে তাঁকে জাগরিত করলেন। ব্রহ্মার স্তবে জাগরিতা দেবী বালিকামূর্তি ত্যাগ করে চণ্ডিকামূর্তি ধরলেন। ব্রহ্মা বললেন, "রাবণবধে রামচন্দ্রকে অনুগ্রহ করার জন্য তোমাকে অকালে জাগরিত করেছি। যতদিন না রাবণ বধ হয়, ততদিন তোমার পূজা করব। যেমন করে আমরা আজ তোমার বোধন করে পূজা করলাম, তেমন করেই মর্ত্যবাসী যুগ যুগ ধরে তোমার পূজা করবে। যতকাল সৃষ্টি থাকবে, তুমিও পূজা পাবে এইভাবেই।" একথা শুনে চণ্ডিকা বললেন, "সপ্তমী তিথিতে আমি প্রবেশ করব রামের ধনুর্বাণে। অষ্টমীতে রাম-রাবণে মহাযুদ্ধ হবে। অষ্টমী-নবমীর সন্ধিক্ষণে রাবণের দশমুণ্ড বিচ্ছিন্ন হবে। সেই দশমুণ্ড আবার জোড়া লাগবে। কিন্তু নবমীতে রাবণ নিহত হবেন। দশমীতে রামচন্দ্র করবেন বিজয়োৎসব।" হলও তাই। মহাবিপদ কেটে গেল অষ্টমীতে; তাই অষ্টমী হল মহাষ্টমী। রাবণ বধ করে মহাসম্পদ সীতাকে লাভ করলেন রাম; তাই নবমী হল মহানবমী।

বিভিন্নভাবে নবরাত্রি পালিত হয়

1.পশ্চিমবঙ্গের দুর্গাপূজা -পূর্বাঞ্চলীয় অন্যান্য রাজ্যের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গে নবরাত্রি দুর্গাপূজার জাঁকজমকের সঙ্গে উদযাপন করা হয়ে থাকে| পূজা উৎসবের ষষ্ঠ দিনে বোধন (দেবী জাগরণ) দিয়ে শুরু হয় এবং দশম দিন পর্যন্ত চলতে থাকে|এখানে দেবী দুর্গাকে কন্যা হিসেবে গণ্য করা হয় যিনি দীর্ঘ সময় পর বাপের বাড়িতে ফিরে আসেন|

2. গুজরাটের গর্ভা রাশ- - কিভাবে বিভিন্ন সম্প্রদায় বিভিন্ন ভাবে নবরাত্রি উদযাপন করে থাকে? গুজরাটে, একটি মাটির পাত্র 'গর্ভা' (গর্ভ) প্রতীক হিসেবে রাখা হয়| মহিলারা নানারকম ঝলমলে পোশাক পরে এই পাত্রের চারপাশে ঘুরে ঘুরে নাচ করে থাকেন|এছাড়াও গুজরাটের ডান্ডিয়া রাশ আরেকটি ঐতিহ্যবাহী নৃত্য যা নবরাত্রির সময় করতে দেখা যায়|

3. তামিলনাডুর বোম্মাই গলু -এখানে সুন্দর সাজানো গলু পুতুল বিজোড় সংখ্যাযুক্ত 3, 7, বা 9 স্তরে প্রদর্শিত করে দেব দেবী হিসেবে পুজো করা হয়| আলো দিয়ে সাজিয়ে এবং স্তবগান করে এই নয় দিন ব্যাপী উৎসব উদযাপন করা হয়|

5. মহারাষ্ট্রের নবরাত্রি - যদিও গর্ভা অনুষ্ঠান মহারাষ্ট্রেও উদযাপন করা হয়; সেখানে এই উৎসবে কিছু অন্যরকম আচার পালন করতে দেখা যায়| এই সময়ে, বিবাহিত নারীরা একে অপরকে আমন্ত্রণ জানিয়ে সিঁদুর, মিষ্টি, চুড়ি, বিন্দি ইত্যাদি দিয়ে নিজেদের সাজিয়ে তোলেন|

6. কেরলে নবরাত্রি - ভারতের সবচেয়ে সাক্ষর রাজ্য হিসাবে কেরলকে বিবেচনা করা হয়|এখানে, নবরাত্রি শুধুমাত্র তিন দিনের জন্য পালিত হয়|মানুষ দেবী সরস্বতীর সামনে দুই দিনের জন্য তাদের বই রেখে জ্ঞান ও বিদ্যার জন্য প্রার্থনা করে| সাধারণত, এই বিভিন্ন উপায়ে নবরাত্রি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের দ্বারা পালিত হয়|নয় দিন পর দেবী দুর্গার প্রতিমা পবিত্র জলে নিমজ্জিত করা হয়| বিহার ও উত্তরপ্রদেশে উৎসবের দশম দিনে দশেরা উপলক্ষে 'রামলীলা' উদযাপন করা হয়| বাংলার জনগণ, সম্মান ও ভালবাসা বিনিময় করে, 'বিজয়া দশমীর' মিষ্টির মাধ্যমে|প্রকার যাই হোক না কেন, এই উৎসব সব ভারতীয়দের হৃদয় জুড়ে থাকে|

 
Design by দেবীমা | Bloggerized by Lasantha - Premium Blogger Themes | Facebook Themes