Pages

Wednesday, December 19, 2018

দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন করে সেই বৈষ্ণবী শক্তিই হলেন দেবী আদিশক্তি


বৈষ্ণবী দেবী

শরৎকালের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের আড়ম্বরপূর্ণ উৎসবের নাম শারদোৎসব বা দুর্গাপূজা। বলা হয়ে থাকে এ পূজা অতি প্রাচীন। শ্রীশ্রী চন্ডী গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে পুরাকালে মেধা মুনির উপদেশানুসারে রাজা সুরথ এবং সমাধি বৈশ্য দেবীর আরাধনা করেছিলেন। উল্লেখ্য ত্রেতা যুগে ভগবান শ্রী রাম চন্দ্র নাকি রাবণ বধের নিমিত্তে এ পূজা করেছিলেন। 'কৃত্তিবাসী রামায়ণে' এর উল্লেখ থাকলেও প্রামাণিক গ্রন্থ বাল্মীকি রচিত ‘রামায়ণে’ এর সত্যতা পাওয়া যায় নি। এ পূজার প্রচলন সম্পর্কে ইতিহাস থেকে জানা যায় সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে অর্থাৎ ১৫৮০ খ্রিষ্টাব্দে টীকাকার কল্লুক ভট্টের পুত্র রাজশাহী জেলার তাহেরপুরের রাজা কংস নারায়ণ তৎকালীন নয় লক্ষ টাকা ব্যয়ে বঙ্গদেশে দেবীপূজার প্রচলন করেন। সেই থেকে আজ অবধি বাংলায় এ পূজা প্রচলিত হয়ে আসছে বলে অনেকে মনে করেন। যা হোক এখন দেখা যাক, এই জড় জগতে পূজিতা দুর্গাদেবী কে, কি তার পরিচয় এবং তিনি কার ইচ্ছায় বা আজ্ঞায় এই জড় জগৎ পরিচালনা করছেন তা সম্পর্কে শাস্ত্রে কি বলা হয়েছে, তার সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ।
‘দুর্গা’ শব্দটি দুর্গবিশিষ্টা। ‘দুর্গ’ শব্দের অর্থ কারাগৃহ। তাই সংক্ষেপ বলা যায় কারাগৃহ সদৃশ জড় জগতের যিনি কর্তা তিনিই হচ্ছেন দুর্গা। আর এই জড় জগৎটা হচ্ছে দুর্গাদেবীর দুর্গ। দুর্গার উৎপত্তি সম্পর্কে শ্রী শ্রী চন্ডী গ্রন্থে  উল্লেখ আছে, অন্যেষাবৈষ্ণব দেবানাং সম্ভবস্তেজসাং শিবা অর্থাৎ বিশ্বকর্মাদি দেবতাগণের তেজঃপুঞ্জ থেকে মহামায়া দুর্গার উৎপত্তি। যিনি দশভুজাযুক্তা, সিংহবাহিনী, প্রতাপশালী, মহিষাসুরমর্দ্দিনী, সিদ্ধিরূপ সন্তানদ্বয়, কার্তিক ও গণেশের জননী, জড়ৈশ্বর্য্য ও জড়বিদ্যা প্রদায়িনী লক্ষ্মী সরস্বতীর মধ্যবর্ত্তিনী। তাঁর রয়েছে ত্রিবিধ শক্তি আদ্যাশক্তি, মহাশক্তিও যোগমায়াশক্তি। আবার মায়া শক্তির রয়েছে তিনটি গুণ সত্ত্ব, রজ ও তমঃ। যে যে গুণের অধিকারী সে ঐ গুণানুসারে দেবীর ঐ মায়াকে আরাধনা করে থাকেন। দক্ষরাজ নন্দিনী ভোলানাথের ঘরণী পরম বৈষ্ণবী দেবী শিবানী কুড়ি প্রকার অস্ত্রে সু-সজ্জিতা। এ গেল দেবীর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি। এবার দৃষ্টিপাত দেওয়া যাক-তিনি কার ইচ্ছায় এই জড় জগতের কার্যভার গ্রহণ করেছেন এবং কিভাবে তা সম্পাদন করছেন তার উপর।
পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের দু'টি প্রকৃতি রয়েছে-পরা প্রকৃতি ও অপরা প্রকৃতি। পরা প্রকৃতি হচ্ছে চিন্ময় জগৎ আর অপরা প্রকৃতি হচ্ছে জড় জগৎ। চিন্ময় জগৎটা হচ্ছে গোলক বৃন্দাবন যেখানে পরমেশ্বর ভগবান নিত্যলীলা বিলাস করছেন। আর আমরা যে প্রকৃতিতে বসবাস করছি তা হচ্ছে জড় প্রকৃতি বা জড় জগৎ। যাহা ভূমি, জল, বায়ু, অগ্নি, আকাশ, মন, বুদ্ধি ও অহংকার এই আট প্রকারের স্থূল ও সূক্ষ্ম উপাদান দ্বারা গঠিত । শাস্ত্রে বর্ণিত এই জড় প্রকৃতি অনন্ত কোটি ব্রহ্মান্ড নিয়ে গঠিত। যেগুলো মহাবিষ্ণুর প্রতিটা লোমকূপ থেকে সৃষ্টি। আবার এই মহাবিষ্ণু যার শয্যায় শায়িত সেই অনন্তশেষ নাগ তার ফণায় প্রতিটা ব্রহ্মান্ডকে এক একটি সর্ষের দানার মতো ধারণ করে আছে। বৈদিক শাস্ত্র অনুযায়ী প্রতিটা ব্রহ্মান্ডতে আবার চৌদ্দটি ভুবন রয়েছে। এর সাতটি ভুবন উপরে এবং সাতটি ভুবন নিম্নে। ঊর্ধ্বে রয়েছে ভূলোক, ভূবলোক, স্বলোক, মহলোক, জনলোক, তপলোক এবং সত্যলোক আর নিম্নে রয়েছে অতল, বিতল, সুতল, মহাতল, তলাতল, রসাতল, পাতাল। তার মধ্যবর্তীটি হচ্ছে ভূমন্ডল, যেখানে আমরা বসবাস করছি। এই ভূমন্ডলের যে স্থানটিতে আমরা আছি তার নাম জম্বুদ্বীপ। এই জম্বুদ্বীপকে ঘিরে রয়েছে লবণ সমুদ্র। এভাবে লবণ, ইক্ষু, সুরা, সর্বি আদি সাতটি সমুদ্র রয়েছে এবং তার মধ্যে সাতটি দ্বীপ রয়েছে। এখন এই চৌদ্দভুবনাত্মক জগৎকে একত্রে বলে 'দেবীধাম "। আর এই দেবীধামের অধিষ্ঠাত্রী দেবী হচ্ছেন দুর্গা। যিনি ভগবান মদন মোহনের ইচ্ছানূরূপ আজ্ঞা পালন করছেন। দুর্গা দেবী কিভাবে ভগবানের আজ্ঞা পালন করছেন সে সম্বন্ধে ব্রহ্ম সংহিতাতে ব্রহ্মা বলেছেন-সৃষ্টি-স্থিতি প্রলয় সাধন শক্তিরেকা, ছায়েব যস্য ভুবানানি বিভর্তি দুর্গা। ইচ্ছানুরূপমপি যস্য চ চেষ্টাতে সা গোবিন্দম আদি পুরুষং তমহং ভজামি।। ব্রহ্মঃসং-৫/৪৪ অর্থঃ স্বরূপ শক্তি বা চিৎশক্তির ছায়া স্বরূপা প্রাবঞ্চিক জগতের সৃষ্টি, স্থিতি, প্রলয় সাধিনী মায়া শক্তিই ভুবন পূজিতা দুর্গা তিনি যাঁর ইচ্ছানুরূপ চেষ্টা করেন, সেই আদি পুরুষ গোবিন্দকে আমি ভজনা করি। শ্রী চন্ডী গ্রন্থেও অনুরূপ একটি উক্তি আছে, সর্বভূতেষু ছায়ারূপেন সংস্থিতা।
এখন উপরের শ্লোক সংবলিত সরলার্থের আরেকটু বিশদভাবে ব্যাখ্যা করলে প্রতীয়মান হয় যে, আমরা এই জড় জগতে যে দুর্গা দেবীর পূজা করি তিনি হচ্ছেন চিৎ শক্তির ছায়া স্বরূপা অর্থাৎ চিৎ জগতে যে দুর্গাদেবী আছেন তিনি হচ্ছেন চিন্ময়ী কৃষ্ণদাসী। আর সেই দুর্গাদেবীর ছায়াশক্তি হচ্ছেন এই জড় জগতে পূজিতা দুর্গা। যিনি পরমেশ্বর ভগবান আদি পুরুষ গোবিন্দের ইচ্ছানুরূপ তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছেন।
সমস্ত ব্রহ্মান্ডকে যদি একটি রাষ্ট্র হিসেবে ধরা হয় তবে সেই রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। আর দেব-দেবীরা হচ্ছেন তাঁর বিভিন্ন বিভাগের অধ্যক্ষ। তেমনিভাবে ভগবান দুর্গাদেবীকে এই জড় জগৎ পরিচালনার ভার দিয়েছেন, যিনি জড় জগৎ পরিচালনা বিভাগের অধ্যক্ষ। যেহেতু দুর্গাদেবী ভগবান মদন মোহনের ইচ্ছানুরূপ কার্য সম্পাদন করছেন সেহেতু বিষ্ণু শক্তিতে বলীয়ান পরম বৈষ্ণবী দুর্গাদেবীর কাছে আমরা জড়ৈশ্বর্য্য কামনা না করে তাঁর নিকট এই প্রার্থনা করি যাতে তিনি আমাদেরকে কৃষ্ণভক্তি প্রদান করেন। কারণ এই কলি যুগের যুগধর্ম হচ্ছে হরিনাম সংকীর্তন করা। 'চারিযুগের চারিধর্ম জীবের কারণ। কলি যুগে ধর্ম হয় নাম সংকীর্তন। 'যেটা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। তাই এটাই হোক আমাদের দুর্গা পূজার প্রকৃত উদ্দেশ্য।

0 comments:

Post a Comment

 
Design by দেবীমা | Bloggerized by Lasantha - Premium Blogger Themes | Facebook Themes