Pages

Tuesday, April 9, 2019

নবদুর্গার নবম তথা শেষ রূপ হল সিদ্ধিদাত্রী

সিংহবাহিনী দেবীর চার হাতে আশীর্বাদী মুদ্রা | তিনি সিদ্ধি দান করেন | অর্থাত্‍ তাঁর উপাসনায় সংসারে আসে সুখ এবং সমৃদ্ধি | সবাইকে বরাভয় দেন এই মাতৃকামূর্তি | দেবী ভগবত্‍ পুরাণে আছে, স্বয়ং মহাদেব দেবী দুর্গাকে সিদ্ধিদাত্রী রূপে পুজো করেছিলেন | এবং তার ফলে মহাদেব সকল সিদ্ধি লাভ করেন | সিদ্ধিদাত্রীর আশীর্বাদেই অর্ধনারীশ্বর রূপ লাভ করেন মহাদেব |

নবরাত্রিতে দেবী দুর্গার পুজোয় যোগসাধনার যোগপদ্ধতি অত্যন্ত উচ্চ মার্গের সাধনক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত। যথা এই নবরাত্রির প্রথম দিনের পুজোয় যোগীগণ তাঁদের মনকে ‘মূলাধার’ চক্রে স্থিত করেন। যা মানুষের শরীরের অভ্যন্তরেই প্রতিষ্ঠিত ‘কুলকুণ্ডলিনী’ রূপে – যিনি স্বয়ং মহাশক্তি, দৈবী ও ঐশী শক্তি, মহামায়া, মহাদুর্গা। নবদুর্গা রূপের প্রথম দিনের রূপটি হল ‘ ‘শৈলপুত্রী’, দ্বিতীয়ায় দ্বিতীয় রূপটি হল ‘ব্রহ্মচারিণী’। বেদ-এ এর উল্লেখ আছে। এদিন যোগী সাধক তাঁর মনকে ‘স্বাধিষ্ঠান’ চক্রে স্থিত করেন যোগসাধনার মাধ্যমে। নবরাত্রি আরাধনার তৃতীয় দিনে মা দুর্গার তৃতীয় শক্তির নাম ‘চন্দ্রঘণ্টা’, উপাসনায় যোগী তাঁর মনকে ‘মণিপুর’ চক্রে প্রবিষ্ট করান। মা দুর্গার চতুর্থ রূপের নাম হল ‘কুষ্মাণ্ডা’, এই চতুর্থী তিথিতে সাধকের মন ‘অনাহত’ চক্রে অবস্থান করে। মহাপঞ্চমীতে দেবী দুর্গা ‘স্কন্দমাতা’ রূপে পূজিতা হন। এই দিনে সাধক তাঁর মনকে ‘বিশুদ্ধ’ চক্রে স্থাপন করেন। দেবী দুর্গাকে প্রথম আরাধনা করেন মহর্ষি কাত্যায়ন – কন্যারূপে। তাই দেবী দুর্গা মহাষষ্ঠীতে ‘কাত্যায়নী’ রূপে পূজিতা হন। শ্রীকৃষ্ণ-সহ সমস্ত গোপ ও গোপী দেবী কাত্যায়নীর পূজা করেন, এর উল্লেখ মহাভারতে পাওয়া যায়। দেবী কাত্যায়নীর আরাধনায় সাধক ‘আজ্ঞা’ চক্রে তাঁর মনের উত্তরণ ঘটান। দুর্গাপূজার সপ্তম দিনে মহাসপ্তমীতে দেবী দুর্গাকে ‘কালরাত্রি’ রূপে পূজা করার বিধান। সে দিন সাধকের মন ‘সহস্রার’ চক্রে অবস্থান করে। মহাষ্টমীতে দেবী দুর্গার রূপ হয় ‘মহাগৌরী’ – সন্ত তুলসীদাস এই দেবীর উপাসনা করতেন। এই দিন সাধকের সাধনা ‘সন্ধিচক্র’-এ অধিষ্ঠিত হয়। নবদুর্গার শেষ রূপটি হল ‘সিদ্ধিদাত্রী’। ‘মার্কণ্ডেয় পুরাণে’-এ ‘সিদ্ধিদাত্রী’ অষ্টভুজা, ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণের শ্রীকৃষ্ণজন্ম খণ্ডে ‘সিদ্ধিদাত্রী’ অষ্টাদশভুজা। ‘সিদ্ধিদাত্রী’ চতুর্ভুজা রূপেও দেখা যায়। সেখানে তিনি অর্ধনারীশ্বররূপী। এই হল নবদুর্গার চর্চিত কাহিনি।

মহাগৌরী হচ্ছেন কাশীর অন্নপূর্ণা দেবী, যাঁর কাশীখণ্ডের নাম ভবানী।

মহাগৌরীর মন্দিরে প্রবেশকরে সামনেই বারোটি নানা অলংকার খোদাই করা সুন্দর লাল পাথরের স্তম্ভের উপর নাটমন্দিরটি দাঁড়িয়ে আছে। নাটমন্দির তিনদিক খোলা। সাদা-কালো মার্বেল পাথরের মেঝে। এখান থেকেই ভক্তদের সামনের ছোট্ট গর্ভমন্দিরে অধিষ্ঠিতা মা অন্ন্পূর্ণাকে দর্শন করতে হয়। সিলিং থেকে ঝুলছে ছোট ঘণ্টা। গর্ভমন্দিরের তিনটি ছোট ছোট দরজা।

মা বেদীর ওপর বিরাজ করেছেন, পশ্চিমাস্যা, ফুট দুয়েক মতো উঁচু, সর্বাঙ্গ বস্ত্রবৃতা। মুখখানি শুধু একটি সোনার মুকুটসহ মুখোশ দিয়ে আবৃত। মুকুটের পিছনে আসল মূর্তির মাথায় চূড়াটি দেখা যায়। তার ওপর হলুদ-চন্দন-আলোচাল দূর্বাদিয়ে একটি অর্ঘ্য সকালেই স্নান পূজোর পরে দিয়ে রাখা হয়। দেবীর আসলমূর্তি কালো কষ্টিপাথরের। কোন কোন দিন খুব ভোরে চারটে সাড়ে চারটেয় এলে সেই মূর্তি দেখতে পাওয়া যায়। পূজারীরা দরজা বন্ধ করে স্নান-পূজা-বস্ত্রপরিবর্তন করিয়ে দরজা যখন খোলেন সেসময় মায়ের খোলামুখখানি দেখতে পাওয়া যায়। একখানি আড়াই হাত মতো পাথরের স্ল্যাবে দেবীর মূর্তি রিলিফের মতো খোদাই করা আছে। দেবী দাঁড়িয়ে আছেন। দুই হাতের একটিতে হাতা, অন্য হাতে ছোট হাঁড়ি। সবই পাথরের। মায়ের মাথায় চূড়ার মতো করে চুল বাঁধা। মুখখানি অপূর্ব। চোখে অন্য সব প্রতিমার মতো সাদা শঙ্খ বা কোন ধাতু নেই। একেবারে খোলা চোখ। এতো প্রশান্তি করুণামাখা মুখ মায়ের, দেখে আশ মেটে না। এই চূড়ার ওপরই হলুদ চন্দন এই সব দিয়ে রোজ একটি অর্ঘ্য সাজিয়ে রাখা হয়। সেটি বিশ্রাম পর্যন্ত থাকে। একটু পরেই মুখে কোনোদিন সোনা কোনোদিন রুপোর মুখোশ লাগিয়ে দেওয়া হয়। তারপরে নানাফুলের মালা দিয়ে সাজিয়ে দেওয়া হয়। দেবীর আসনের নিচে একটি অষ্টধাতুর দেবী যন্ত্র আছে। বিশেষ দিনে সেটি বাইরে আনা হয় কুঙ্কুম অভিষেক করার জন্য। দেবীর গর্ভমন্দিরে তাঁর সামনে দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে একটি ধাতুময়ী দীপধারিণী মূর্তি আছে। যাঁরা জানেন না, তাঁরা মনে করেন এটি বুঝি বাবা বিশ্বনাথের মূর্তি। কিন্তু এখানে সবসময়ের জন্য ভিখারী শিবের কোনো মূর্তি থাকে না। বিশেষ বিশেষ পর্বে দেবীর যখন বিশেষ বিগ্রহ নামিয়ে সাজানো হয় তখনই রুপোর শিবও সাজিয়ে দেওয়া হয়। তখন নিত্যপূজিতা প্রস্তরময়ী এই দেবীর বিগ্রহের সামনেই রুপোর আলাদা সিংহাসন দিয়ে রৌপ্যময়ী সিংহাসনে আসীনা দেবী অন্নপূর্ণার হাঁড়ি হাতা হাতে সুন্দর ছোট বিগ্রহ বসিয়ে দেওয়া হয় নিত্যপূজিতা দেবীকে আড়াল করে। বছরে দু’তিন দিন এই বিগ্রহ নামানো হয়। নবান্ন, রংভরি একাদশী, অন্নপূর্ণা পূজা, শিবরাত্রি-এই সব পর্বে।

আর ধনতেরস অর্থাৎ কার্তিক কৃষ্ণা ত্রয়োদশীর দিন থেকে দীপান্বিতা অমাবস্যার পরে প্রতিপদ পর্যন্ত মন্দিরের পেছনে দোতলায় সোনার অন্নপূর্ণা দর্শন হয়। ঐ প্রতিপদেই দেবীর অন্নকূট উত্সব। সে এক বিরাট পর্ব। নিরেট সোনার তিনটি বিগ্রহ-দেবী অন্নপূর্ণা আসন করে সিংহাসনে বসা, নানা রত্নালংকারে সর্বাঙ্গভূষিতা, বাঁ হাতে হাঁড়ি, আর ডান হাতে হাতা নিয়ে মাঝখানে; দুই পাশে একটু ছোট সোনার মূর্তি ঐ একই রকমভাবে বসা, নানা গয়নাতে সর্বাঙ্গ সাজানো-এঁরা শ্রীদেবী ও ভূদেবী। তন্ত্রমতে একজন সরস্বতী, অন্যজন মহালক্ষ্মী। আর দেবী মধ্যস্থিতা ভবানী মহাগৌরী অন্নপূর্ণা। তাঁদের ডান দিকে কোণে দাঁড়িয়ে আছেন রুপোর শিব, নৃত্যের ভঙ্গিতে, একটা পা একটু তোলা, সোনার বাঘছাল, একহাতে ত্রিশূল অন্যহাতে ভিক্ষাপাত্র, কাঁধে ভিক্ষার ঝোলা। মা অন্নদাত্রী অন্নপূর্ণার কাছে স্বয়ং বিশ্বনাথও কাশীতে ভিক্ষুক। বড় সুন্দর মায়েদের এই ভবময়ী মূর্তিগুলি। টানাটানা বড় বড় তিনটি চোখ, সম্পূর্ণ খোলা, অনিমেষ দৃষ্টিতে সন্তানদের দিকে চেয়ে আছেন। মুখে মৃদু হাসির রেখা। বছরের এই তিনটি দিন মায়ের এই স্বর্ণময়ী, অনিন্দ্যসুন্দর মূর্তি সর্বসাধারণের জন্য অনাবৃতদ্বার থাকে। অন্যসময় প্রত্যহ পূজারী ওপরেই মায়ের পূজা করেন। যা সর্বসাধারণের অগোচর।

দেবী মহাগৌরী, বৃষভবাহনা চতুর্ভুজা, শ্বেতবর্ণা, শ্বেতবস্ত্রাবৃতা। অলংকারাদিও শ্বেতবর্ণের-শঙ্খবলয়, কণ্ঠ ও কর্ণের ভূষণও শঙ্খনির্মিত। শিরে রজত মুকুট। সদা অষ্টবর্ষা দেবী কুন্দপুষ্পের মাল্যধারিণী বিধুমুখী সদাপ্রসন্না। এঁর ঊর্ধ্ব দক্ষিণ হস্তে ত্রিশূল, নিচের দক্ষিণ হাতে অভয় মুদ্রা। বাম ঊর্ধ্ব হস্তে বরমুদ্রা, নিচের হাতে ডমরু।

এক পুরাণের মতে দেবী শিবের তপস্যার সময় অত্যন্ত কৃচ্ছ্রতার ফলে শীর্ণ ও কৃষ্ণকায়া হয়ে গিয়েছিলেন। তখন তাঁর একটি নাম হয়েছিল অসিতা। পরে শিবের সঙ্গে বিবাহ হয়ে যাওযার পরে কোন এক সময় শিব দেবীর সেই কালো দেহবর্ণের জন্য উপহাস করে তাকে কালী বা কালোমেয়ে বলেছিলেন। এই কথা শুনে দেবী অভিমানে কৈলাস ছেড়ে চলে গিয়ে কঠোর তপস্যায় নিযুক্ত হলেন। সেই তপস্যার ফলে তাঁর দেহের কৃষ্ণ কোষ খুলে গিয়ে ভেতর থেকে এক দিব্যজ্যোতির্ময়ী রজতশুভ্রবর্ণা দেবীমূর্তি প্রকাশিত হলেন। বিদ্যুত্বর্ণা সেই দেবীই শিবের বাহন ও সব অস্ত্রাদি নিয়ে তাঁর কাছেই হাজির হলেন।শিবও অভিমানিনী দেবীর অভিমান ভাঙাতে ও তাঁর জন্য এতোদিন ব্যাকুল অপেক্ষায় থাকার পরে অপরূপা দেবীকে কাছে পেয়ে তাঁর নাম দিলেন মহাগৌরী-শুধু গৌরী নন।

আরেকটি মত আছে-শিব নিজেই সেই কৃষ্ণবর্ণা তপস্বিনীর বরতনু গঙ্গাজল দিয়ে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে তাঁকেই বিদ্যুৎবর্ণা মহাগৌরী করে তোলেন।

অন্নপূর্ণা দেবীর কাশীর আবির্ভাব নিয়েও অনেক কাহিনী আছে। হিমালয়-পত্নী মেনকার গৃহে তখন কন্যা পার্বতী তাঁর স্বামীকে নিয়ে বাস করছেন। অবশ্য কৈলাসও হিমালয়ের অন্তর্গত যদি হয়ে থাকে। দীর্ঘদিন কন্যা পিতাগৃহে আছেন। মায়ের মনে একটু ক্ষোভ-সে আর কতদিন বাপের বাড়ি থাকবে। এবার তো শ্বশুরবাড়ি যাওয়া দরকার। নইলে প্রতিবেশীরা বদনাম করবে। তাই একদিন কন্যাকে ডেকে বললেন, ‘হাঁরে মেয়ে, আমার জামাই মহেশ্বরের ঠিকানা কী? সে থাকে কোথায়? তার বন্ধু-বান্ধব সব কারা? মনে হয় জামাইয়ের আত্মীয়স্বজন বা বাড়িঘর কিছুই নেই।’ কন্যা পার্বতী মায়ের এই কথা শুনে লজ্জা পেয়ে সময়মতো একরাত্রে স্বামী ভোলানাথ শংকরের কাছে মায়ের এই অণুযোগের কথা তুললেন, ‘হে কান্ত, হে নাথ! আজই আমি এখান থেকে চলে যেতে চাই। তোমার নিজের কোন স্থান থাকলে আমাকে সেখানেই নিয়ে চলে।’ এই কথা শুনে দেবাদিদেবের বিশ্বনাথ সেইদিনই হিমালয় ছেড়ে দেবী পার্বতীকে সঙ্গে নিয়ে মর্ত্যে তাঁর আনন্দকাননে অবিমুক্ত পুরীতে এসে উপস্থিত হলেন।

পঞ্চক্রোশ পরিমিত এই স্থান শিবময়-‘কাশীকে হর কংকর হ্যায় ভোলা শংকর’। এর প্রতিটি নূড়িও শিবময়। শিবস্বরূপ। শিব স্বয়ং কাশী সৃষ্টি করে নিজের ত্রিশূলের ওপর সেটিকে ধরে রেখেছিলেন। তাই সেখানে পৃথিবীর কোন মলিনতার ছোঁয়া ছিল না। নিত্য আনন্দ বিরাজিত তাই এর নাম আনন্দকানন। জীব এখানে এসেই মরণ মাত্রই মুক্ত হয়। শিবক্ষেত্র মুক্তিক্ষেত্র -মহাশ্মশান-জীবের অন্তিম শয়ান স্থান। অন্তে মুক্তি পাওয়ার জন্য জীব এখানে মরতেই আসে। তাই এটি মহাশ্মশান। শিব তাঁর রুদ্র অনুচরদের নিয়ে এখানে নিত্য বাস করেন-তাই এটি রুদ্রাবাস। এই বিশ্বনাথের নিজের রাজ্যে এসে দেবী ভবানী ও বিশ্বেশ্বর পরমানন্দে বাস করতে লাগলেন। দুজনে এখানে কেমন করে থাকেন সেকথা কাশীখণ্ডে বলা হচ্ছে। কেমন তঁদের রূপ-‘ভালে লোচনম্ কণ্ঠে কালং বৃষধ্বজং বামাঙ্গসন্নিবিষ্টাদ্রিতনয়া চন্দ্রশেখরা। কপর্দ্দিনো বিরাজন্তং ত্রিশূলাজগবায়ুধং। স্ফুরৎ কর্পূর গৌরাঙ্গং পরিণদ্ধ গজাজিনম্ অর্কশতাধিকম্ শম্ভুম্ নমামি শ্রীচরণাজয়ো।।”

পার্বতীকে নিয়ে শিব তাঁর বিচিত্র বেশবাসে ঘুরে বেড়ান তাঁর রাজ্যের সর্বত্র। মাও খুশি নিজের আলয়ে এসে। এখানে তাঁর নাম ভবরানী বা ভবানী। তাঁর কাজ এখানে সমগ্র কাশীর অন্নভাণ্ডার রক্ষা ও অন্নদান। এই অন্ন শুধু জীবের শরীরের পরিপুষ্টির খাদ্যই নয়। তার পরমার্থ জ্ঞান দান ও আত্মার পরিপুষ্টিও এতে আছে। তাই কাশীখণ্ডে বলা হয়েছে, ‘সর্বেভ্যঃ কাশি-সংস্থেভ্যো মোক্ষ-ভিক্ষাং প্রযচ্ছতি।’ সমগ্র বারাণসী ও বিম্বের নাথ যিনি তিনিও একবার কোথাও অন্ন জোটাতে না পেরে মায়ের কাছে এসে ভিক্ষার পাত্র হাতে দাঁড়াতে বাধ্য হন। মানতে বাধ্য হন এখানে মা অন্নপূর্ণাই রাজরাজেশ্বরী। তাঁর ইচ্ছাতেই সব কিছু হয়-রয়-যায়। তাঁর কৃপাতেই সকলেই অন্ন-পানে পরিতৃপ্ত হয়। শিবও তার বাইরে নন। শাস্ত্রমতে-‘দর্বী স্বর্ণ বিচিত্ররত্নখচিতা দক্ষে করে সংস্থিতা পলান্নঘৃতা পুরিতম্। আর বামে কারণামৃতা পুরীতম্ স্বাদু পয়োধরী মাণিক্যচষকম্।’ দুই হাতে অমৃতময় পলান্ন ও কারণবারি পান করিয়ে মা মহাদেবকে সেদিন এতো আনন্দ দিয়েছিলেন যে ভোলানাথ পরিতৃপ্তির আনন্দে উদ্বাহু হয়ে ‘পীত্বা ভূত্বানন্দময়ং নৃত্যন্তং শশিশেখরম্’ নৃত্যে মেতে উঠেছিলেন। তাঁর সেই নৃত্যরত আনন্দবিহ্বল মূর্তিই সোনার অন্নপূর্ণা দর্শনের সময় উপরে দেখা যায়।

কালরাত্রি নবদুর্গার অন্যতম এবং দেবী দুর্গার সপ্তম শক্তি

কালরাত্রি ভীষণদর্শনা দেবী। তাঁর গায়ের রং ঘন অন্ধকারের মতো কালো। তিনি এলোকেশী। তাঁর গলায় বজ্রের মালা দোলে। তিনি ত্রিনয়না এবং তাঁর চোখগুলি ব্রহ্মাণ্ডের মতো গোলাকার। তাঁর নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের সঙ্গে ভয়ংকর অগ্নিশিখা নির্গত হয়। কালরাত্রির বাহন গর্দভ বা গাধা। তিনি চতুর্ভূজা; তাঁর চার হাতে বর ও অভয়মুদ্রা এবং খড়্গ ও লোহার কাঁটা রয়েছে। কালরাত্রির রূপ ভয়ংকর হলেও তিনি শুভফলের দেবী। তাঁর অপর নাম শুভঙ্করী।
হিন্দুদের বিশ্বাস করেন, কালরাত্রি দুষ্টের দমন করেন, গ্রহের বাধা দূর করেন এবং ভক্তদের আগুন, জল, জন্তুজানোয়ার, শত্রু ও রাত্রির ভয় থেকে মুক্ত করেন। তাঁরা বিশ্বাস করেন, কালরাত্রির উপাসক তাঁকে স্মরণ করলেই দৈত্য, দানব, রাক্ষস, ভূত ও প্রেত পালিয়ে যায়।
কালরাত্রি দুর্গাপূজার সপ্তম দিনে পূজিত হন। শাক্ত শাস্ত্রানুযায়ী, "সেই দিন সাধকের মন সহস্রার চক্রে অবস্থান করে। তাঁর জন্য ব্রহ্মাণ্ডের সকল সিদ্ধির দ্বার অবারিত হয়ে যায়। এই চক্রে অবস্থিত সাধকের মন সম্পূর্ণভাবে মাতা কালরাত্রির স্বরূপে অবস্থান করে। তাঁর সাক্ষাৎ পেলে সাধক মহাপুণ্যের ভাগী হন। তাঁর সমস্ত পাপ ও বাধাবিঘ্ন নাশ হয় এবং তিনি অক্ষয় পুণ্যধাম প্রাপ্ত হন।

Monday, April 8, 2019

নবরাত্রির পঞ্চম রাতে দুর্গা পূজিত হন স্কন্দমাতা রূপে

নবদুর্গার পঞ্চম রূপ স্কন্দমাতা। নবরাত্রি উৎসবের পঞ্চম দিনে তাঁর পূজা করা হয়। দেবসেনাপতি কার্তিকের অপর নাম স্কন্দ। দেবী দুর্গা কার্তিকের মা। তাই তিনি পরিচিতা ‘স্কন্দমাতা’ নামে।

কার্তিক-জননী বেশে দুর্গার রূপটি একটু আলাদা। এই রূপে তিনি চতুর্ভুজা; উপরের দুই হাতে দুটি পদ্মফুল; নিচের এক হাতে ধরে থাকেন স্কন্দ অর্থাৎ কার্তিককে, অপর হাতে দেখান বরমুদ্রা। দেবী পদ্মাসনা, তবে দেবীর বাহন সিংহ। দেবীর কোলে স্কন্দের যে মূর্তিটি দেখা যায়, সেটি আমাদের বাংলায় সচরাচর দেখা কার্তিক মূর্তির চেয়ে একটু আলাদা। ইনি হাতে তীর-ধনুক থাকে বটে, কিন্তু এঁর ছয়টি মস্তক। ষড়ানন কার্তিকের এই শিশুমূর্তিটিই শোভা পায় দেবী স্কন্দমাতার কোলে।

দেবী স্কন্দমাতার কথা জানা যায় স্কন্দ পুরাণ থেকে। অসুররাজ তারক বরলাভ করেছিল, কেবল শিব ও দুর্গার পুত্রই তার প্রাণবধে সক্ষম হবে। তাই দেবতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে সে সহজেই দেবতাদের কাছ থেকে স্বর্গরাজ্য কেড়ে নিতে পেরেছিল। এই ঘটনার ঠিক আগেই সতী দেহত্যাগ করেছিলেন, শিবও হয়েছিলেন ধ্যানমগ্ন। তাই দেবতারা দুর্গাকে পুনরায় জন্মগ্রহণ করার অনুরোধ করলেন। দুর্গা শৈলপুত্রী রূপে গিরিরাজ হিমালয়ের গৃহে জন্ম নিলেন। তারপর ব্রহ্মচারিণী রূপে শিবকে পতিরূপে পাওয়ার জন্য করলেন কঠোর তপস্যা। শেষে শিবের সঙ্গে তাঁর বিবাহ হল। তারপর যথাসময়ে জন্ম হল শিব ও দুর্গার পুত্র কার্তিকের। কার্তিকের জন্মের বিবরণ নানা পুরাণে নানাভাবে বর্ণিত হয়েছে। সে সবের উল্লেখ এখানে না করলেও চলবে–শুধু এটুকু বলে রাখি, কার্তিকের ছিল ছয়টি মাথা। তাই তিনি পরিচিত হয়েছিলেন ষড়ানন নামে। এই ষড়ানন স্কন্দই তারককে যুদ্ধে পরাজিত করে দেবতাদের স্বর্গরাজ্য ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। স্কন্দ ও স্কন্দমাতা উভয়েই তারকাসুর বধে দেবতাদের সাহায্য করেছিলেন বলে, মাতাপুত্রের পূজা একসঙ্গে করাই নিয়ম।

দেবী স্কন্দমাতার পূজা করলে ভক্তের সকল মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হয়; তাঁর জীবন সুখ ও শান্তিময় হয়ে ওঠে এবং তাঁর মোক্ষের পথ সহজতর হয়। এছাড়া স্কন্দমাতার পূজা করলে, সেই সঙ্গে কার্তিকের পূজাও হয়ে যায়।

কাশীর নাগকুরার কাছে দেবী স্কন্দমাতা ও বাগেশ্বরীর মন্দির অবস্থিত। মন্দিরটি দোতলা, গর্ভমন্দিরটি ছোটো। সেখানে প্রমাণ আকারের স্কন্দমাতার মূর্তিটি প্রতিষ্ঠিত। বাগেশ্বরী সরস্বতীর মন্দিরটি স্কন্দমাতার মন্দিরের ঠিক পাশেই অবস্থিত। শারদীয়া ও বাসন্তী নবরাত্রি উৎসবের পঞ্চমীর দিন এই মন্দিরে প্রচুর জনসমাগম হয়।

দেবী দুর্গা তাঁর চতুর্থ স্বরূপে "কুষ্মাণ্ডা" নামে পরিচিতা

 নবরাত্রের চতুর্থদিনে, অর্থাৎ চতুর্থী তিথিতে মাতৃপ্রাণ ভক্তগণ এই কুষ্মাণ্ডারূপেই আদ্যাশক্তিকে আহ্বান করে থাকেন।
কারুণ্যে ভরপুর মায়ের সৌম্যপ্রতিমা। দেবী সিংহবাহিনী, ত্রিনয়নী ও অষ্টভুজা। আটটি হাতে সুদর্শনচক্র, ধনুর্বাণ, রক্তপদ্ম, কমণ্ডলু, ইত্যাদি দৃষ্টিগোচর হয়। মায়ের বামহস্তে একটি অমৃতপূর্ণ কলসও রয়েছে। এখানে অমৃত ব্রহ্মের রূপক, দেবী ভগবতী অমৃতপূর্ণ কলস অর্থাৎ ব্রহ্মজ্ঞানের আধার হাতে নিয়ে বসে রয়েছেন। যোগ্য সাধক আপন তপোবল ও কৃচ্ছ্রতা দ্বারা মহামায়াকে প্রসন্ন করতে পারলে তবেই মা সেই অমৃতভাণ্ডের অমৃতধারায় সাধককে স্নান করিয়ে তৃপ্ত করবেন, ব্রহ্মজ্ঞান প্রদানে কৃতার্থ করবেন।

মায়ের হাতে আরও একটি বস্তু রয়েছে, সেটি হল জপমালা। সেই জপমালা সিদ্ধমন্ত্রে মন্ত্রিত, তাহা অষ্টসিদ্ধি ও নবনিধি দান করতে সমর্থ। এবার যে ভক্ত রুচি অনুযায়ী যা চাইবে, কল্পতরু মা সেই অনুসারেই বাঞ্ছা পূর্ণ করবেন। যে সিদ্ধি ও সিদ্ধাই চাইবে, মা তাকে তাই দিয়ে ভোলাবে। আর যে পার্থিব সম্পদে অনীহা প্রকাশ করে ওই অমৃতপূর্ণ কলস, অর্থাৎ ব্রহ্মজ্ঞান চাইবে, মা তাকেও তাই দিয়েই সন্তুষ্ট করবেন।

এবার আসি মায়ের নাম বিশ্লেষণে। শাস্ত্রে বলা হয়েছে, বলিদানের মধ্যে কুমড়ো বলি মায়ের অধিক প্রিয়। কুমড়োকে সংস্কৃতে "কুষ্মাণ্ড" বলে, কুষ্মাণ্ডপ্রিয় দেবী তাই কুষ্মাণ্ডা নামে স্তুতা। এ তো গেল সহজ একটি ব্যাখ্যা, কিন্তু এর সুগভীর অর্থও রয়েছে। যেমন-

"কুৎসিত উষ্মা সন্তাপস্তাপত্রয়রূপো যস্মিন সংসারে। স সংসারে অণ্ডে উদর রূপায়াং যস্যাঃ।।"

সংসার তাপযুক্ত, ত্রিবিধ তাপে জরজর। সেই সংসারকে যিনি ভক্ষণ করেন, তিনিই কুষ্মাণ্ডা। কু- কুৎসিত, উষ্মা সন্তাপত্রয়ে পূর্ণ জগৎ যাঁর অণ্ডে (উদরে) বিদ্যমান, তিনিই কুষ্মাণ্ডা।

দেবী কুষ্মাণ্ডার যেহেতু আটটি হাত, তাই তিনি "অষ্টভুজা" নামেও পরিচিতা। এনাকে "কৃষ্ণমাণ্ড" নামেও ডাকা হয়। মহাপ্রলয়ের পরে যখন সর্বত্র শুধু নিশ্ছিদ্র অন্ধকার ছেয়ে রয়েছে, তখন এই ভগবতী কুষ্মাণ্ডা "ঈষৎ হাস্য" করে ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি করেছিলেন। তাই আদ্যাশক্তি বলতে আমরা যাঁকে বুঝি, তিনিই ইনি। দেবীর বাসস্থান সৌরমণ্ডলে। ভীমাপর্বতেও দেবী নিবাস করেন বলে উল্লেখ আছে।

মস্তকে অর্ধচন্দ্র থাকে , তাই দেবীকে চন্দ্রঘণ্টা নামে ডাকা হয়

আশ্বিনের উষালগ্নে বহুবলধারিণী, রিপুদলবারিণী দেবীর আবির্ভাবে জেগে ওঠে ধরণী। প্রাণিত হয় ভক্তকুল। মহামায়ার শাশ্বত অভয়বাণীতে দিক হারানো, শঙ্কিত মানুষজন আলোর দিশা খুঁজে পায়। আগমনির আলোয় উদ্ভাসিত হয় চারধার। দেবী অসুরবিনাশিনী। দুর্গা মানে দশভুজা, মহাশক্তি, মহামায়া। তিনি মাতৃরূপিণী, শক্তিরূপিণী, বিপত্তারিণী জননী। দেবী দুর্গা দশভুজা ছাড়াও আরও নানারূপে আবির্ভূতা হন। সব রূপেই দেবী মহাশক্তির আধার। অশুভ শক্তি বিনাশকারী মাতৃরূপা। মা দুর্গার আরেক বিশেষ রূপ হল দেবী চন্দ্রঘণ্টার রূপ। এই রূপ দেবীর শক্তির রূপ।
এই রূপে দেবী দুর্গার কপালে থাকে অর্ধচন্দ্র। যা কিনা চাঁদের মতোই সুন্দর, স্নিগ্ধ ও উজ্জ্বল। চন্দ্রঘণ্টা হলেন দেবীর সেই শক্তির রূপ, যা অসুর বিনাশিনী। তিনি দশপ্রহরণধারিণী। তাঁর গায়ের রং সোনার মতো উজ্জ্বল, পরনে লাল শাড়ি, গায়ে নানা বৈচিত্র্যময় অলঙ্কার। এই রূপে দেবী দশভুজা আটটি হাতে আটটি অস্ত্রে সজ্জিত, বাকি দুই হাতে বরাভয় মুদ্রা।
রম্ভাসুরের ছেলে মহিষাসুর যখন বীর বিক্রমে দেবতাদের হারিয়ে দিয়ে স্বর্গরাজ্যের দখল নিয়েছিল, তখন দেবতারা একত্রিত হয়ে ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বরের শরণাপন্ন হয়েছিল। সে সময় ওই তিন দেবতা অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হওয়ায় তাঁদের দেহ থেকে তেজোরাশি নির্গত হতে থাকে। ক্রমে অন্যান্য দেবতারাও নিজেদের শরীর থেকে তেজোরাশি বাইরে এনে ওই তেজকে সমৃদ্ধ করেন। দেবতাদের দেহসঞ্জাত এই সম্মিলিত তেজ থেকে সৃষ্টি হল অপরূপা এক দেবীমূর্তির। সমস্ত দেবতার শক্তিতে শক্তিময়ী দেবীর আবির্ভাবে আনন্দিত দেবতারা তাঁকে সজ্জিত করলেন নিজ নিজ অস্ত্রে। তাঁকে নানা অলঙ্কার, বস্ত্রে ও দ্রব্যসম্ভারে সাজিয়ে তুলেছিলেন। ইন্দ্র সেই সময় তাঁর বাহন ঐরাবতের গলা থেকে ঘণ্টা খুলে দিয়ে তা থেকে আরেকটি ঘণ্টা তৈরি করে দেবীর হাতে দিলেন। যুদ্ধে, উত্‌স঩বে সুপ্রাচীনকাল থেকে নানান বাদ্য বাজানো হয়ে থাকে। তবে এই দৈবশক্তিসম্পন্ন ঘণ্টার ভুবনবিদারী শব্দে দৈত্যরা ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিল। দেবী তাদের তেজ হরণ করে নিয়েছিলেন। এই কারণেই দেবীর আরেকটি নাম চন্দ্রঘণ্টা।
যুদ্ধের সময় দেবী যখন এই ঘণ্টাটি বাজান তখন অসুরকুল নিস্তেজ হয়ে পড়ে। শ্রীশ্রী চণ্ডীর স্তবেও এর উল্লেখ রয়েছে। অসীম সাহস আর সৌন্দর্যের প্রতীক হলেন এই দেবী যাঁর কপালে থাকে অর্ধচন্দ্র। নবরাত্রির উত্‌স঩বের তৃতীয় দিনে তাঁর পুজো করা হয়। চন্দ্রঘণ্টা বা চিত্রঘণ্টা নামেও তিনি পরিচিত। নবরাত্রির সময়ে দেবীকে দুধ, মিষ্টি ও ক্ষীর ভোগ হিসেবে সাজিয়ে দেন ভক্তরা।

Sunday, April 7, 2019

শৈলরাজ হিমালয়ের কন্যা হবার জন্য দেবীর এক নাম শৈলপুত্রী



আশ্বিন মাসের শুক্লা প্রতিপদ তিথিতে (সর্বপিতৃ অমাবস্যা বা মহালয়ার পরদিন) দেবী শৈলপুত্রীর পূজার মাধ্যমে শুরু হয় নবরাত্রি উৎসব। ‘শৈলপুত্রী’ নামের অর্থ ‘পর্বতের কন্যা’; সেই অর্থে ‘পার্বতী’ ও ‘শৈলপুত্রী’ সমার্থক। ইনিই দেবীকবচোক্ত নবদুর্গার প্রথম রূপ।

দেবী শৈলপুত্রী দ্বিভুজা–তাঁর এক হাতে পদ্ম, অপর হাতে ত্রিশূল। দেবীর মস্তকে অর্ধ্বচন্দ্র; বাহন বৃষ; ভৈরব শৈলেশ্বর।

শৈলপুত্রী সম্পর্কে যে পৌরাণিক কাহিনিটি প্রচলিত, সেটি সতীর দেহত্যাগ ও হিমালয়ের গৃহে দুর্গার জন্মগ্রহণের বৃত্তান্ত ছাড়া আর কিছুই নয়। এই কাহিনিটি আমাদের সকলেরই জানা–সতীর পিতা দক্ষ এক শিবহীন যজ্ঞের আয়োজন করেছিলেন। এই যজ্ঞে বিনানিমন্ত্রণে উপস্থিত হওয়ায় পিতৃমুখে সতীকে শুনতে হল শিবনিন্দা। তৎক্ষণাৎ যজ্ঞস্থলেই দেহত্যাগ করলেন শিবপ্রিয়া সতী। শিব ও তাঁর অনুচরবৃন্দ দক্ষযজ্ঞ পণ্ড করলেন। তারপর সতীবিরহে কাতর শিব বসলেন ধ্যানে। এদিকে তারকাসুরের অত্যাচারে দেবতারা অস্থির হয়ে উঠলেন। তারকাসুর বর পেয়েছিল, শিবের পুত্র ভিন্ন কারো হাতে সে মরবে না। কিন্তু শিব বসেছেন ধ্যানে, সতী করেছেন দেহত্যাগ। শিব-দুর্গার পুত্র এখন আসবে কোত্থেকে? দেবতারা কাতর হয়ে মহামায়া দুর্গার নিকট প্রার্থনা জানাতে লাগলেন পরিত্রাণের জন্য। এদিকে গিরিরাজ হিমালয় ও তাঁর পত্নী মেনকা অনেক দিন ধরে দুর্গাকে কন্যারূপে লাভ করার জন্য করছিলেন তপস্যা। তাঁদের ভক্তিতে তুষ্ট হয়ে সতী দেবতাদের পরিত্রাণের জন্য হিমালয়ের গৃহেই পুনর্জন্ম গ্রহণ করলেন। শৈলরাজের পুত্রীরূপে মহামায়া দুর্গা হলেন শৈলপুত্রী। সতীর অপর নাম ‘হৈমবতী’–হিমবৎ (হিমালয়) পর্বতের কন্যা।

মা দুর্গার নবশক্তির দ্বিতীয় রূপ ব্রহ্মচারিণী

মা দুর্গার নবশক্তির দ্বিতীয় রূপ ব্রহ্মচারিণী। এখানে ‘ব্রহ্ম’ শব্দের অর্থ হল তপস্যা। ব্রহ্মচারিণী অর্থাৎ তপশ্চারিণী--- তপ আচরণকারী। দেবী ব্রহ্মচারিণীর রূপ- জ্যোতিতে পূর্ণ, অতি মহিমামণ্ডিত। তিনি ডান হাতে জপের মালা এবং বাঁ হাতে কমণ্ডলু ধারণ করে আছেন।

পূর্বজন্মে যখন হিমালয়ের কন্যারূপে জন্মেছিলেন তখন তিনি নারদের পরামর্শে ভগবান শঙ্করকে পতিরূপে লাভ করার জন্য কঠিন তপস্যা করেন। সেই কঠিন তপস্যার জন্য তাঁকে তপশ্চারিনী বা ব্রহ্মচারিণী বলা হয়। তিনি সহস্র বর্ষ ধরে মাত্র ফল-মূলের আহার করে জীবন ধারণ করেছিলেন। শতবর্ষ তিনি শাক আহার করে জীবন নির্বাহ করেছিলেন। কিছুকাল কঠিন উপবাসে থেকে খোলা আকাশের নিচে বর্ষা ও গ্রীষ্মের দাবদাহে কাটিয়েছেন। এই কঠোর তপশ্চর্যার পরে তিন সহস্র বছর শুধুমাত্র গাছ থেকে মাটিতে ঝরে পড়া বেলপাতা আহার করে অহর্নিশ ভগবান শঙ্করের আরাধনা করেছেন। তারপর তিনি সেই শুষ্ক বেলপাতা আহার করাও পরিত্যাগ করেন। অতঃপর কয়েক সহস্র বছর নির্জলা, নিরাহারে থেকে তপস্যা করতে লাগলেন। পাতা (পর্ণ) খাওয়া পর্যন্ত পরিত্যাগ করায় তাঁর অন্য একটি নাম হয় ‘অপর্ণা’। কয়েক সহস্র বছর এই তপস্যা করায় ব্রহ্মচারিণী দেবীর পূর্বজন্মের শরীর কৃশ-একদম ক্ষীণ হয়ে গেল।
 তিনি অতি কৃশকায় হয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর এই দশা দেখে মা মেনকা অত্যন্ত দুঃখিত হলেন। তিনি তাঁকে এই কঠিন তপস্যা থেকে বিরত করার জন্য বললেন, ‘উ মা, না ওরে আর না!’ তখন থেকে দেবী ব্রহ্মচারিণীর পূর্বজন্মের আর এক নাম হয় ‘উমা’। তাঁর তপস্যার কঠোরতায় ত্রিলোকে হাহাকার পড়ে গেল দেবতা, ঋষি, সিদ্ধগণ, মুণি সকলেই ব্রহ্মচারিণী দেবীর এই তপস্যাকে অভূতপূর্ব পুণ্যকাজ বলে তাঁকে প্রশংসা করতে লাগলেন। অবশেষে পিতামহ ব্রহ্মা তাঁকে সম্বোধন করে প্রসন্ন হয়ে আকাশবাণীর মাধ্যমে বললেন, হে দেবী! আজ পর্যন্ত কেউ এরূপ কঠোর তপস্যা করে নি। তোমার দ্বারাই এরূপ তপস্যা সম্ভব। তোমার এই অলৌকিক কাজে চতুর্দিকে ধন্য ধন্য রব উঠেছে। তোমার মনোষ্কামনা সর্বতোভাবে পূর্ণ হবে। ভগবান চন্দ্রমৌলি শিবকে তুমি পতিরূপে পাবে। এবার তুমি তপস্যায় বিরত হয়ে গৃহে ফিরে যাও। তোমার পিতা শীঘ্রই তোমাকে নিতে আসবেন।’ মা দুর্গার এই দ্বিতীয় রূপ ভক্ত এবং সিদ্ধদের অনন্ত ফল প্রদান করে। তাঁর উপাসনা দ্বারা মানুষের স্বভাবে তপ, ত্যাগ, বৈরাগ্য, সদাচার, সংযম বৃদ্ধি পায়। জীবনের কঠিন সংঘর্ষেও তাঁর মন কর্তব্যে বিচলিত হয় না। মা ব্রহ্মচারিণী দেবীর কৃপায় তাঁর সর্বদা সিদ্ধি ও বিজয় প্রাপ্তি হয়। দুর্গাপূজার দ্বিতীয় দিনে এঁর স্বরূপেরই আরাধনা করা হয়। এই দিন সাধকের মন ‘স্বাধিষ্ঠান চক্রে’ স্থিত হয়। এই চক্রে চিত্ত-প্রতিষ্ঠ যোগী তাঁর কৃপা ও ভক্তি লাভ করে।

Thursday, March 28, 2019

শাস্ত্রে দুর্গার নয়টি নির্দিষ্ট মূর্তিকে ‘নবদুর্গা’ বলে



দুর্গা—এই নামটি শুনলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটা দেবীমূর্তি। তাঁর দশ হাতে দশ রকম অস্ত্র, এক পা সিংহের পিঠে, এক পা অসুরের কাঁধে। তাঁকে ঘিরে থাকেন গণেশ, লক্ষ্মী, সরস্বতী আর কার্তিক ঠাকুর। যাঁরা সেকেলে কেতায় ঠাকুর বানান, তাঁদের ঠাকুরের পিছনে চালচিত্রে আরও নানারকম ঠাকুরদেবতার ছবিও আঁকা থাকে। আর যাঁরা আধুনিক, তাঁরা প্রতিমার মাথার উপর একখানা ক্যালেন্ডারের শিবঠাকুর ঝুলিয়ে রাখেন। মোটামুটি এই মূর্তি বছর বছর দেখে আমরা অভ্যস্ত। তবে মাঝে মাঝে পুজো উদ্যোক্তারা একটু স্বাদবদলের জন্য বানান পঞ্চদুর্গা, নবদুর্গা, একাদশ দুর্গা, একান্ন দুর্গা ইত্যাদি। শাস্ত্রে কতরকম মাতৃমূর্তির কথা আছে। তার থেকেই সামর্থ্য অনুযায়ী কয়েকটা বেছে নিয়ে পঞ্চদুর্গা, নবদুর্গা ইত্যাদি বানানো। আমাদের ছেলেবেলায় দেখেছি, থিমপুজো শুরু হওয়ার আগে এই সব প্যান্ডেল নিয়ে ঠাকুর-দর্শনার্থীদের মধ্যে একটা বিশেষ আগ্রহ থাকত। এখনও আছে। মায়ের সনাতন মূর্তির আবেদন কখনও ম্লান হয় না ঠিকই, কিন্তু মানুষ এই সুযোগে অন্যান্য রূপগুলি দেখে চোখ জুড়িয়ে নিতেও ছাড়েন না।

শাস্ত্রে দুর্গার নয়টি নির্দিষ্ট মূর্তিকে ‘নবদুর্গা’ বলে। এঁরা হলেন—ব্রহ্মাণী, কৌমারী, বৈষ্ণবী, কৌমারী, নারসিংহী, বারাহী, ইন্দ্রাণী, চামুণ্ডা, কাত্যায়নী ও চণ্ডিকা। দুর্গাপূজার সময় দেবীদুর্গার আবরণদেবতা হিসেবে এঁদের পূজা করা হয়। আবার নবপত্রিকা (কলাবউ)-এর নয়টি গাছও নয় দেবীর প্রতীক। এঁরা হলেন—ব্রহ্মাণী (কলা), কালিকা (কচু), দুর্গা (হলুদ), জয়ন্তী (জায়ফল), শিবা (বেল), রক্তদন্তিকা (ডালিম), শোকরহিতা (অশোক), চামুণ্ডা (মান) ও লক্ষ্মী (ধান)। এঁরা পূজিত হন ‘ওঁ নবপত্রিকাবাসিন্যৈ নবদুর্গায়ৈ নমঃ’ মন্ত্রে।

তবে এঁরা ছাড়াও তন্ত্রে, পুরাণে আরও কয়েকজন দুর্গা-নামধারিণী দেবীর সন্ধান পাই। আবার দেবী দুর্গার অন্যান্য কয়েকটি রূপেরও দেখা পাওয়া যায়। আমরা সাধারণত দুর্গার যে মূর্তিটি শারদীয়া উৎসবে পূজা করি, সেই মূর্তিটির শাস্ত্রসম্মত নাম মহিষাসুরমর্দিনী-দুর্গা। স্মার্তমতে যাঁরা পঞ্চদেবতার পূজা করেন, তাঁরা জয়দুর্গার নাম ও ধ্যানমন্ত্রের সঙ্গে পরিচিত। এছাড়া আছেন মহিষমর্দিনী-দুর্গা, কাত্যায়নী-দুর্গা, নীলকণ্ঠী-দুর্গা, ক্ষেমঙ্করী-দুর্গা, হরসিদ্ধি-দুর্গা, রুদ্রাংশ-দুর্গা, বনদুর্গা, অগ্নিদুর্গা, বিন্ধ্যবাসিনী-দুর্গা, রিপুমারি-দুর্গা, অপরাজিতা-দুর্গা প্রমুখ দেবীগণ। এঁরা সবাই আগম-শাস্ত্রপ্রসিদ্ধ দেবী। এছাড়া তন্ত্রশাস্ত্রে দুর্গা-নাম্নী দেবীর যে ধ্যানমন্ত্র পাওয়া যায়, সেটিও আমাদের দেখা দশভুজা-মূর্তির মতো নয়।

মহিষাসুরমর্দিনী-দুর্গাকে নিয়ে আমাদের নতুন করে কিছুর বলার নেই। দুর্গাপূজায় প্রচলিত ‘জটাজুটসমাযুক্তা’ ইত্যাদি ধ্যানমন্ত্রের আধারে নির্মিত এই দেবীমূর্তি আমাদের সকলেরই পরম-পরিচিত। তবে বিষ্ণুধর্মোত্তর পুরাণ-এ মহিষাসুরমর্দিনীর একটু আলাদা রকমের বর্ণনা আমরা পাই। চণ্ডিকা নামে উল্লিখিত এই দুর্গার দশের জায়গায় কুড়িটি হাত। শ্রীশ্রীচণ্ডী-তে অষ্টাদশভূজা মহালক্ষ্মীর কথা আছে, এঁর হাত তাঁর থেকেও দুটি বেশি। ডান দিকের দশ হাতে থাকে শূল, খড়্গ, শঙ্খ, চক্র, বাণ, শক্তি, বজ্র, অভয়, ডমরু, ছাতা; আর বাঁদিকের দশ হাতে থাকে নাগপাশ, খেটক, পরশু, অঙ্কুশ, ধনুক, ঘণ্টা, পতাকা, গদা, আয়না ও মুগুর। বাকি সবই আমাদের চেনা মূর্তিটির মতো। দেবী কাত্যায়নী-দুর্গার মূর্তিটিও আমাদের দশভূজা-দুর্গার অনুরূপ। তবে আমাদের পরিচিত মহিষাসুরমর্দিনী ও তন্ত্রকথিত মহিষমর্দিনীর রূপে সামান্য ফারাক আছে। দেবী মহিষমর্দিনী অষ্টভুজা। এঁর ধ্যানে সিংহের উল্লেখ পাওয়া যায় না। দেবীকে মহিষের মাথার উপর বসে থাকতে দেখা যায়। হাতে থাকে শঙ্খ, চক্র, খড়্গ, খেটক, ধনুক, বাণ, শূল ও তর্জনীমুদ্রা। এর পূজার বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল—শঙ্খপাত্রে অর্ঘ্যস্থাপনের উপর নিষেধাজ্ঞা; মৃৎপাত্রে এই কাজটি করতে হয়।

কুলাচারে পূজিতা দেবী জয়দুর্গার মূর্তিটি কিছুটা আমাদের পরিচিত জগদ্ধাত্রী মূর্তির মতো। শুধু দেবীর চার হাতে থাকে শঙ্খ, চক্র, খড়্গ ও ত্রিশূল এবং দেবীর গায়ের রং কালীর মতো কালো। কপালে থাকে অর্ধচন্দ্র। সিংহের পদতলে হাতি অনুপস্থিত। কেউ কেউ মনে করেন, জয়দুর্গা কালী ও দুর্গার সম্মিলিত মূর্তি।

Tuesday, March 26, 2019

বিষ্ণু শক্তি বৈষ্ণবী দেবী দুর্গা

“বৈষ্ণবী” এই নামটির সাথে “বিষ্ণু” নামের সাদৃশ্য দেখতে পাই। ভগবান বিষ্ণুকে আমরা ‘নারায়ণ’, ‘হরি’ ইত্যাদি নামে পূজা করি। ভগবান বিষ্ণু ত্রিদেবের একজন। ইঁনি জগত পালন করেন। এই জগতে ধর্মে সংস্থাপন ও অধর্মের বিনাশের জন্য বহুবার ভগবান বিষ্ণু মর্তলোকে নরশরীর ধারণ করে অবতীর্ণ হন।

ত্বং বৈষ্ণবী শক্তিরনন্তবীর্যা,
বিশ্বস্য বীজং পরমাসি মায়া ।
সন্মোহিতং দেবি সমস্তমেতৎ,
ত্বং বৈ প্রসন্না ভুবি মুক্তিহেতুঃ ।।
( শ্রীশ্রীচণ্ডী- একাদশ অধ্যায়- শ্লোক- ৫ )

অর্থাৎ- হে দেবি, তুমি অনন্তবীর্যময়ী বৈষ্ণবী শক্তি । তুমি জগতের মূল কারণ পরমাশক্তি । তুমি এই সমগ্র জগত বিমোহিত করিয়া রাখিয়াছ। আবার তুমিই প্রসন্না হইলে ইহলোকে শরণাগত ভক্তকে মুক্তি প্রদান কর।

এই দেবীর আগমন সম্বন্ধে শ্রীশ্রীচণ্ডীতে লিখিত হয়েছে-

তথৈব বৈষ্ণবীর্শক্তির্গরুড়োপরি সংস্থিতা ।
শঙ্খচক্রগদাশার্ঙ্গখড়্গহস্তাভ্যুপাযযৌ ।।
( শ্রীশ্রী চণ্ডী... অষ্টম অধ্যায়... শ্লোক- ১৮ )

অর্থাৎ- সেইরূপে গরুড়বাহনা বৈষ্ণবী দেবী শঙ্খ , চক্র, গদা , শার্ঙ্গ ও খড়্গহস্তে চণ্ডিকার সামনে উপস্থিত হইলেন।

বিষ্ণুর শরীর থেকে তাঁরই মতোন দেখতে বৈষ্ণবী দেবী প্রকট হয়ে এলেন। ভগবান বিষ্ণুর বাহন গড়ুর পক্ষী। গড়ুর হল কশ্যপ মুনির সন্তান। তাঁর মাতার নাম বিনতা। মহাভারতে গরুড়ের মাতৃভক্তির গল্প আছে। বৈষ্ণবী দেবী গড়ুরে চলে এলেন। সাধারণত সর্পভোজী বাজপাখীকেই পুরাণকারেরা গড়ুর পক্ষীর সাথে তুলনা করেছেন। কিন্তু একটা জিনিস লক্ষ্য করেছেন- দেবী শঙ্খ, চক্র, গদা , শার্ঙ্গ নামক ধনুক ও খড়্গ এনেছেন। পদ্ম আনেন নি। কারণ দেবী যুদ্ধ করতে এসেছেন। অসুর বধের নিমিত্ত অস্ত্রের প্রয়োজন। আবার ভগবান বিষ্ণু চতুর্ভুজ সুতরাং তাঁর শক্তি বৈষ্ণবী দেবী চার হস্তে পাঁচ অস্ত্র কি ভাবে আনলেন? অবশ্য ভাগবতে ভগবান বিষ্ণুর অষ্টভুজ রূপের উল্লেখ পাওয়া যায়। এখন এই বৈষ্ণবী দেবী চতুর্ভুজ না অষ্টভুজ বা আসলে কটি ভুজা ধারণ করে এসেছেন তা নিয়ে চণ্ডীর ব্যাখা কর্তাদের মধ্যে নানা মতভেদ দেখা যায়। শার্ঙ্গ ধনুক এর হাতল অনেকটা খড়গের মতো । পুরাণে লেখা একবার এই ধনুকের ওপর ভগবান বিষ্ণু শায়িত ছিলেন, অসাবধান বশতঃ ধনুক বক্র থেকে সোজা হলে সেই আঘাতে ভগবান বিষ্ণুর শিরোচ্ছেদ হয়েছিলো। সেই ধড়ে অশ্ব মুণ্ড লাগানো হয়েছিলো। ঐ সময় অশ্বমুখাকৃতি এক দানব ব্রহ্মার থেকে চার বেদ নিয়ে নিলে, ভগবান বিষ্ণু সেই অশ্বমুখ রূপেই সেই দানব বধ করে বেদ উদ্ধার করেন। এই অস্ত্র ধনুক রূপে আবার খড়্গ রূপেও ব্যবহার করা যায়। সেদিক থেকে এক হস্তেই ধনুক ও খড়্গের ধারণ করার কথা। আবার বামন পুরাণে ষড়ভুজা বৈষ্ণবী দেবীর উল্লেখ পাওয়া যায়-

বাহুভির্গরুড়ারূঢ়া শঙ্খচক্রগদাসিনী ।
শার্ঙ্গবাণধরারাতা বৈষ্ণবী রূপশালিনী।।

অর্থাৎ- গরুড়ারূঢ়া রূপশালিনী বৈষ্ণবী ষড় হস্তে শঙ্খ, চক্র, গদা, অসি , ধনু ও বাণ ধারণপূর্বক আগতা হইলেন।
এখানে অনেকের মনে হইতে পারে দেবী শঙ্খ কেন যুদ্ধে এনেছেন ? শঙ্খ হল নাদ শক্তির প্রতীক। আর যুদ্ধ শুরু ও যুদ্ধ বিজয়ের পর শঙ্খধ্বনি করা হয়। এই দেবীর মূল অস্ত্র কিন্তু চক্র। যেমন ভগবান বিষ্ণু সুদর্শন চক্রে অসুর বধ করে ধর্ম সংস্থাপন করেন, তেমনি তেঁনার শক্তি বৈষ্ণবীদেবীর মূল অস্ত্র চক্র। শ্রীশ্রীচণ্ডীর অষ্টম অধ্যায়ের ৩৪ শ্লোকেই উল্লেখ আছে – “মাহেশ্বরী ত্রিশূলেন তথা চক্রেণ বৈষ্ণবী”- অর্থাৎ দেবী বৈষ্ণবী গরুড়ে আসীনা হয়ে চক্র চালনা করে অসুরদের ছিন্নভিন্ন করে দিলেন। চণ্ডীর অষ্টম অধ্যায়ের ৪৭ শ্লোকে আছে – এই দেবীর সাথে রক্তবীজের যুদ্ধ হয়েছিলো। দেবীর চক্রে আহত হয়ে রক্তবীজের শরীর থেকে যত রক্তবিন্দু পতিত হলো ভূমিতে ততগুলি রক্তবীজের জন্ম হয়েছিলো। পরে স্বয়ং দেবী চামুণ্ডা এই রক্তবীজের রুধির পান করে লোভের প্রতীক রক্তবীজকে বধ করেছিলেন । “বৈষ্ণবী” শব্দের অর্থ আমরা ধরি “বৈষ্ণব” শব্দের স্ত্রীলিঙ্গ।

বিষ্ণুভক্ত পুরুষদের বলে “বৈষ্ণব” আর বিষ্ণুভক্ত নারীকে বলে “বৈষ্ণবী”। কিন্তু এখানে “বৈষ্ণবী” শব্দ সেই অর্থে প্রযুক্ত নয়। দেবী হলেন ভগবান বিষ্ণুর পালনী শক্তি- অর্থাৎ যে শক্তির বলে ভগবান বিষ্ণু জগত পালন করেন- সেই শক্তি হলেন বৈষ্ণবী ।

ডঃ মহানামব্রত ব্রহ্মচারী মহারাজ চণ্ডীচিন্তাতে লিখেছেন- “সর্ব নরের আশ্রয় নারায়ণের শক্তি । এই শক্তির বলেই নারায়ন জগত পালন ও রক্ষণ করেন । চারিহস্তে শঙ্খ, চক্র, গদা – যুদ্ধের জন্য পদ্মের বদলে শৃঙ্গের হাতল যুক্ত খড়্গ ধারণ করেছেন । সত্ত্বগুনী নির্লোভী গরুড় এঁনার বাহন । শঙ্খে প্রনবনাদ, চক্রে কর্ম প্রবাহ , গদায় ন্যায়দণ্ড, খড়্গে তত্ত্বজ্ঞান । ইঁহারা জগতকে স্থিত রাখেন । জগত রক্ষা ও আসুরিকভাবের ভূমিতে সত্য- ধর্ম সংস্থাপনে এই বৈষ্ণবীশক্তি নিত্য নিরত । ”

দেবীভাগবতপুরাণে এই দেবীর আগমন সম্বন্ধে লিখিত আছে-

বৈষ্ণবী গরুড়ারূঢ়া শঙ্খচক্রগদাধরা ।
পদ্মহস্তা সমায়াতা পীতাম্বর- বিভূষিতা ।।
( দেবীভাগবত... পঞ্চম স্কন্ধ... অষ্টবিংশোহধ্যায়ঃ... শ্লোক- ২১ )

অর্থাৎ- বিষ্ণুশক্তি বৈষ্ণবী কটিতটে পীতাম্বর পরিধান এবং করচতুষ্টয়ে শঙ্খ, চক্র, গদা, পদ্ম ধারণ করিয়া গরুড়পৃষ্ঠে আরোহিতা হয়ে এলেন।ব্রহ্মর্ষি সত্যদেব তাঁর সাধন সমর গ্রন্থে এই দেবী সম্বন্ধে লিখেছেন- “ যে চৈতন্যসত্তা স্থিতিশক্তিকে অভিমান করেন, তিনি বিষ্ণু । স্থিতি বা পালনই তাঁহার শক্তি । শার্ঙ্গ অর্থে ধনু অর্থাৎ প্রণব এবং খড়্গ শব্দের অর্থ –

দ্বৈতপ্রতীতি- বিলয়কারক অদ্বয় জ্ঞান । বিষ্ণু শব্দ ব্যাপকতা – বোধক। যে সর্বব্যাপী অখণ্ড জ্ঞানের উদয় হইলে দ্বৈতপ্রতীতি বিলয়প্রাপ্ত হয়, সেই অখণ্ড জ্ঞানই বিষ্ণুর হস্তস্থিত খড়গ”

এই হল মা বৈষ্ণবীর কথা। মায়ের চরণে প্রণাম জানিয়ে বলি-

শঙ্খচক্রগদাশার্ঙ্গগৃহীতপরমায়ুধে ।
প্রসীদ বৈষ্ণবীরূপে নারায়ণি নমোহস্তু তে ।।
এমনকি পশুর শরীর অবলম্বন করেন যেমন নৃসিংহ , বরাহ, হংস অবতার ইত্যাদি। বৈকুণ্ঠনিবাসী ভগবান বিষ্ণু যে শক্তিবলে ধরিত্রীলোকে অবতার গ্রহণ করে দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন করে সেই বৈষ্ণবী শক্তিই হলেন দেবী আদিশক্তি। তিঁনি চণ্ডীর বর্ণিত অষ্টমাতৃকার একজন বৈষ্ণবী দেবী। ভগবান বিষ্ণুর এই বৈষ্ণবী মায়াপ্রভাবে স্বয়ং যশোদা দেবী গোপালের মুখে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড দর্শন করে আবার তা বিস্মৃতও হয়েছে। দেবতারাও প্রার্থনায় জানিয়েছেন-

কষ্ঠি পাথরের অষ্টাদশী ভূজা দেবী মূর্তি বর্ধমানের অধিষ্ঠাত্রী দেবী

বর্ধমানের অধিষ্ঠাত্রী দেবী দেবী সর্বমঙ্গলা।তিনি বাংলার লৌকিক দেবতা ও বটে। তিনি মুলত বর্ধমানের সর্বমঙ্গলা মন্দিরে পুজিত হন।

কিংবদন্তি
কথিত আছে, প্রায় সাড়ে তিনশো বছর আগে শহর বর্ধমানের উত্তরাংশে বাহির সর্বমঙ্গলা পাড়ায় বাগদিরা পুকুরে মাছ ধরতে গিয়ে একটি শিলামূর্তি পেয়েছিল। সেটিকে প্রস্তর খণ্ড ভেবে তার উপরে শামুক–গুগলি থেঁতো করতো। সেই সময় দামোদর নদ লাগোয়া চুন তৈরির কারখানার জন্য শামুকের খোলা নেওয়ার সময় শিলামূর্তিটি চলে যায় চুন ভাটায়। তখন শামুকের খোলের সঙ্গে শিলামূর্তিটি পোড়ানো হলেও মূর্তির কোনো ক্ষতি হয়নি। তবে সেই রাতে স্বপ্নাদেশ পাওয়া মাত্র বর্ধমান মহারাজা সঙ্গম রায় শিলামূর্তিটিকে নিয়ে এসে সর্বমঙ্গলা নামে পুজো শুরু করেন। পরবর্তীকালে ১৭০২ সালে টেরাকোটার নিপুণ কারুকার্য খচিত সর্বমঙ্গলা মন্দির নির্মাণ করেন মহারাজাধিরাজ কীর্তিচাঁদ মহতাব। [২]ক্রমে মূল মন্দিরের আশেপাশে গড়ে ওঠে নাট মন্দির, শ্বেত পাথরের তৈরি রামেশ্বর ও বাণেশ্বর নামে দুটি শিব মন্দির। কালো পাথরে তৈরি হয় মিত্রেশ্বর, চন্দ্রশ্বর ও ইন্দ্রেশ্বর নামে আরও তিনটি শিব মন্দির।

পুজো
সর্বমঙ্গলা মন্দিরের নিত্যপুজো ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে রাজবংশের শেষ যুবরাজ উদয়চাঁদ মহতাব ট্রাস্ট কমিটি গঠন করেন।তাঁর পুজো প্রায় সাড়ে তিনশো বছরেরও বেশি পুরোনো। সর্বমঙ্গলার ঘট প্রতিষ্ঠার মধ্যে দিয়ে শারদোৎসবের আনুষ্ঠানিক সূচনা করা হয়ে থাকে পূর্ব বর্ধমানে।কুমারি পুজাও হয়। বাদ্যযন্ত্র সহকারে বিশাল শোভাযাত্রায় ঢল নামে পুণ্যার্থীদের। দেবী সর্বমঙ্গলার ঘটপূর্ণ জল নিয়ে ঘোড়ার গাড়ি নানা পথ পরিক্রমা করেন । শোভাযাত্রা সর্বমঙ্গলা মন্দিরে এসে পৌঁছতেই বাদ্যযন্ত্র, শাঁখ, ঘন্টা, কাঁসি ও হুলুধ্বনির মধ্যে দিয়ে দুর্গাপুজোর ঘট প্রতিষ্ঠা করা হয়।

মন্দির

বর্ধমানের সর্বমঙ্গলা মন্দির অবিভক্ত বাংলার প্রথম নবরত্ন মন্দির।

মূর্তি
এখানে সর্বমঙ্গলা দেবীর মূর্তি কষ্টি পাথরের অষ্টাদশভূজা সিংহবাহিনী ‘মহিষমর্দিনী’ মহালক্ষীরূপিণী
প্রাচীন এই মন্দির বর্ধমানের মানুষের কাছে পবিত্র তীর্থস্থান। দেশ-বিদেশের লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থী ও পর্যটকদের সমাগম হয় এই মন্দিরে।মন্দিরের ঐতিহাসিক গুরুত্বের কথা ভেবে প্রাচীন এই মন্দিরকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে।

জঙ্গল জননী বিশালাক্ষী


বিশালাক্ষী একজন হিন্দু দেবী। তিনি শিবের স্ত্রী সতীর এক রূপ। ভারতের বারাণসী শহরের বিশ্বনাথ মন্দিরের পশ্চাদে মীরঘাটে বিশালাক্ষী দেবীর প্রধান মন্দিরটি অবস্থিত। হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী এই মন্দির পুরাণে উল্লিখিত ৫১ শক্তিপীঠের অন্যতম।বাংলার লৌকিক দেবী ও বটে। পশ্চিমবঙ্গের একাধিক অঞ্চলেও দেবী বিশালাক্ষীর মন্দির দেখা যায়।বাঁকুড়া জেলার শুশুনিয়ার বিশালাক্ষী বা বাশুলি দেবীর মন্দির। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন রচয়িতা বড়ু চণ্ডীদাস যার পুজারি ছিল।

জঙ্গল জননী বিশালাক্ষী

সুন্দরবন তথা বাংলার কৃষিজীবী, জলজীবী ও বনজীবী লোকসমাজে জঙ্গলজননী বিশালাক্ষীর প্রভাব অসীম। এক সময় সুন্দরবনের জঙ্গলমহল যত প্রসারিত হয়েছে; বিশালাক্ষী পূজার ক্ষেত্র ততই বিস্তৃ্ত‌ হয়েছে। কৃষক, জেলে, মৌয়ালি-বাওয়ালি প্রভৃতি পেশার মানুষের নয়নের মণি ইনি।

পৌরাণিক উপাখ্যান
কথিত আছে, বিষ্ণুর সুদর্শন চক্রে সতীর দেহ ছিন্নভিন্ন হওয়ার সময় দেবীর কর্ণ ও কুণ্ডল এখানে পতিত হয়েছিল। সেই কারণে দেবী এখানে মণিকর্ণি নামেও পরিচিত। তবে কোনো কোনো পণ্ডিত মনে করেন, কর্ণকুণ্ডল অলংকারমাত্র, তা দেহের অঙ্গ নয়। তাই এই মন্দিরকে শক্তিপীঠ না বলে উপপীঠ বলাই শ্রেয়। অন্য একটি কাহিনিসূত্র থেকে জানা যায়, এই মন্দির একটি শক্তিপীঠ। কারণ এখানে দেবীর তিন অক্ষি বা চোখের একটি পতিত হয়েছিল। দেবীর দিব্যচক্ষু সমগ্র বিশ্বকে দেখতে পায়, তাই দেবীর নাম এখানে বিশালাক্ষী। এই পীঠের শিব কালভৈরব নামে পরিচিত।

Monday, March 18, 2019

দোল উৎসবের অনুষঙ্গে ফাল্গুনী পূর্ণিমাকে দোলপূর্ণিমা বলা হয়



দোলযাত্রা একটি হিন্দু বৈষ্ণব উৎসব। বহির্বঙ্গে পালিত হোলি উৎসবটির সঙ্গে দোলযাত্রা উৎসবটি সম্পর্কযুক্ত। এই উৎসবের অপর নাম বসন্তোৎসব। ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে দোলযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়।
বৈষ্ণব বিশ্বাস অনুযায়ী, ফাল্গুনী পূর্ণিমা বা দোলপূর্ণিমার দিন বৃন্দাবনে শ্রীকৃষ্ণ আবির বা গুলাল নিয়ে রাধিকা ও অন্যান্য গোপীগণের সহিত রং খেলায় মেতেছিলেন। সেই ঘটনা থেকেই দোল খেলার উৎপত্তি হয়। দোলযাত্রার দিন সকালে তাই রাধা ও কৃষ্ণের বিগ্রহ আবির ও গুলালে স্নাত করে দোলায় চড়িয়ে কীর্তনগান সহকারে শোভাযাত্রায় বের করা হয়। এরপর ভক্তেরা আবির ও গুলাল নিয়ে পরস্পর রং খেলেন। দোল উৎসবের অনুষঙ্গে ফাল্গুনী পূর্ণিমাকে দোলপূর্ণিমা বলা হয়। আবার এই পূর্ণিমা তিথিতেই চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্ম বলে একে গৌরপূর্ণিমা নামেও অভিহিত করা হয়।
দোলযাত্রা উৎসবের একটি ধর্মনিরপেক্ষ দিকও রয়েছে। এই দিন সকাল থেকেই নারীপুরুষ নির্বিশেষে আবির, গুলাল ও বিভিন্ন প্রকার রং নিয়ে খেলায় মত্ত হয়। শান্তিনিকেতনে বিশেষ নৃত্যগীতের মাধ্যমে বসন্তোৎসব পালনের রীতি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সময়কাল থেকেই চলে আসছে। দোলের পূর্বদিন খড়, কাঠ, বাঁশ ইত্যাদি জ্বালিয়ে এক বিশেষ বহ্ন্যুৎসবের আয়োজন করা হয়। এই বহ্ন্যুৎসব হোলিকাদহন বা নেড়াপোড়া নামে পরিচিত। উত্তর ভারতে হোলি উৎসবটি বাংলার দোলযাত্রার পরদিন পালিত হয়।


পৌরাণিক উপাখ্যান ও লোককথা
দোলযাত্রা বা হোলি উৎসব সংক্রান্ত পৌরাণিক উপাখ্যান ও লোককথাগুলি মূলত দুই প্রকার: প্রথমটি দোলযাত্রার পূর্বদিন পালিত বহ্ন্যুৎসব হোলিকাদহন বা নেড়াপোড়া সংক্রান্ত, এবং দ্বিতীয়টি রাধা ও কৃষ্ণের দোললীলা বা ফাগুখেলা কেন্দ্রিক কাহিনি।

দোলযাত্রা উৎসব শান্তিনিকেতনে বসন্তোৎসব নামে পরিচিত। অতীতে শান্তিনিকেতনের বিদ্যালয়ে বসন্তের আগমন উপলক্ষে একটি ছোটো ঘরোয়া অনুষ্ঠানে নাচগান, আবৃত্তি ও নাট্যাভিনয় করা হত। পরবর্তীকালে এই অনুষ্ঠানটি পরিব্যপ্ত হয়ে শান্তিনিকেতনের অন্যতম জনপ্রিয় উৎসব বসন্তোৎসবের আকার নেয়। ফাল্গুনী পূর্ণিমা অর্থাৎ দোলপূর্ণিমার দিনই শান্তিনিকেতনে বসন্তোৎসবের আয়োজন করা হয়। পূর্বরাত্রে বৈতালিক হয়। দোলের দিন সকালে ওরে গৃহবাসী খোল দ্বার খোল গানটির মাধ্যমে মূল অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। সন্ধ্যায় গৌরপ্রাঙ্গনে রবীন্দ্রনাথের কোনো নাটক অভিনীত হয়।

Tuesday, February 5, 2019

জ্ঞান, সংগীত ও শিল্পকলার দেবী সরস্বতী

সরস্বতী
ঋগ্বেদে তিনি বৈদিক সরস্বতী নদীর অভিন্ন এক রূপ। সরস্বতী সৃষ্টিদেবতা ব্রহ্মার পত্নী এবং লক্ষ্মী ও পার্বতীর সঙ্গে একযোগে ত্রিদেবী নামে পরিচিত। এ ত্রিদেবী যথাক্রমে ত্রিমূর্তি সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা, পালনকর্তা বিষ্ণু ও সংহারকর্তা শিবের পত্নী। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, সরস্বতী প্রাচীনতম ধর্মগ্রন্থ বেদ রচনা করেন। হিন্দু ধর্ম ছাড়াও খ্রিস্টীয় চতুর্থ ও পঞ্চম শতকে রচিত মহাযান বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ মহাযান সূূত্রেও সরস্বতী দেবীর উল্লেখ রয়েছে।

সরস্বতী মূলত বৈদিক দেবী। বেদে কিন্তু সরস্বতী প্রধানত নদীর অধিষ্ঠাত্রী দেবী। সরস্বতী শব্দের আদি অর্থ— জলবতী অর্থাত্ নদী। বৈদিক জ্যোতিরূপা সরস্বতী ও নদী সরস্বতী সম্মিলিতভাবে জ্ঞানের দেবী রূপে পুরাণতন্ত্র ও সাহিত্যে বিপুল শ্রদ্ধা এবং ভক্তির অধিকারিণী হয়েছেন। তিনি সনাতন সংস্কৃতি ডিঙিয়ে জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মের পূজার আসনে অধিষ্ঠিত। সরস্বতীর আরাধনা ক্রমবিস্তৃতির সঙ্গে সঙ্গে তার রূপকল্পনাও বৈচিত্র্য লাভ করেছে। সাধারণত তিনি চতুর্ভুজা, পদ্মাসনা, শুভ্রবর্ণা, বীণা-পুস্তক, জপমালা, সুধাকলসধারিণী, চন্দ্রশেখরা, ত্রিলোচনা। কখনো দেবী দ্বিভুজা। তন্ত্রে সরস্বতী বাগীশ্বরী-বর্ণেশ্বরী সারদা।

পণ্ডিতদের অনেকেই মনে করেন, সরস্বতী প্রথমে ছিলেন নদী, পরে হলেন দেবী। রমেশচন্দ্র দত্ত লিখেছেন, ‘আর্য্যাবর্তে সরস্বতী নামে যে নদী আছে, তাই প্রথমে দেবী বলে পূজিত হয়েছিলেন। বর্তমানে গঙ্গা যেমন সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উপাস্য দেবী হিসেবে পূজা পেয়ে থাকেন এবং ক্রমান্বয়ে সরস্বতী হলেন জ্ঞানের দেবী।’

বৃহস্পতি হচ্ছেন জ্ঞানের দেবতা, তিনি বাকপতিও। বৃহস্পতি-পত্নী সরস্বতীও জ্ঞানের দেবী। সব জ্ঞানের ভাণ্ডার তো ব্রহ্মা-বিষ্ণু আর মহেশ্বরের। তাদেরই শক্তিতে সরস্বতী জ্ঞানের দেবী। সরস্বতী নদীর তীরে যজ্ঞের আগুন জ্বেলে সেখানেই ঋষি লাভ করেছিলেন বেদ। সুতরাং সরস্বতী জ্ঞানের দেবী হিসেবেই পরিচিত হয়েছিলেন ধরায়। দিনে দিনে সরস্বতী তার অন্য বৈশিষ্ট্যগুলো হারিয়ে কেবল বিদ্যার দেবীতে পরিণত হলেন।

সরস্বতী বৈদিক দেবী হলেও তার পূজার বর্তমান রূপটি আধুনিককালে প্রচলিত হয়েছে। তবে প্রাচীনকালে তান্ত্রিক সাধকরা সরস্বতীসদৃশ দেবী বাগেশ্বরীর পূজা করতেন বলে জানা যায়। উনিশ শতকে পাঠশালায় প্রতি মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে ধোয়া চৌকির ওপর তালপাতা, দোয়াত-কলম রেখে পূজা করার প্রথা ছিল। শ্রীপঞ্চমী তিথিতে শিক্ষার্থীরা বাড়িতে বাংলা বা সংস্কৃত গ্রন্থ, স্লেট, দোয়াত ও কলমে সরস্বতী পূজা করত। শহরের ধনাঢ্য ব্যক্তিরাই সরস্বতীর প্রতিমা নির্মাণ করে পূজা করতেন। আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরস্বতী পূজার প্রচলন হয় বিশ শতকের প্রথমার্ধে।

ভারতবর্ষে দেবী সরস্বতী বিদ্যা ও ললিতকলার দেবী হিসেবে পূজিত হচ্ছেন সেই আদিকাল থেকে। কিন্তু ভারতবর্ষের বাইরেও দেবী সরস্বতীর পূজা হয়ে থাকে। চীনে শস্যদেবী কুয়ানজিনের সঙ্গে দেবী সরস্বতীর তুলনা করা যেতে পারে। কেউ কেউ আবার মধ্যপ্রাচ্যের মাতৃকাদেবী ইসতার বা ইনান্নার সঙ্গে দেবী সরস্বতীর তুলনা করেছেন। গ্রিক দেবী এথেনির সঙ্গে দেবী সরস্বতীর সাদৃশ্য অনেকে কল্পনা করে থাকেন। আবার রোমের দেবী মিনার্ভার সঙ্গেও সাদৃশ্য আছে বলে মনে করা হয়। রোমের দেবী মিনার্ভা ও কেলটিক দেবী বিঘ্রিদের সঙ্গে প্রকৃতিগত দিক থেকে সরস্বতীর সাদৃশ্য রয়েছে ঠিকই, তবে এ দুই দেবীর সঙ্গে ভারতবর্ষীয় সরস্বতী দেবীর সম্পর্ক নির্ণয় করা সম্ভব নয়। কেবল জাপানের বিদ্যাদেবী বেনতেন যে ভারতবর্ষীয় সরস্বতী দেবীর বিদেশে আতিথ্য গ্রহণের সাক্ষ্য, এটুকুই নিশ্চিতভাবে বলা যায়।

বর্তমানে সরস্বতী প্রায় সব জায়গায়ই দ্বিভুজা। তার হাতে বীণা অপরিহার্য। বীণা অবশ্যই সংগীত ও অন্যান্য কলাবিদ্যার প্রতীক। অক্ষরমালা বা জপমালাও অধ্যাত্মবিদ্যার প্রতীক। শুক পাখিও বিদ্যা বা বাক্যের প্রতীক হিসেবে সরস্বতীর হাতে শোভা বাড়াচ্ছে। আচার্য যোগেশচন্দ্র রায়ের মতে, ‘দ্বিভুজা বীণাপাণি সরস্বতী প্রতিমা গত ১৫০ বছরের মধ্যে কল্পিতা হয়েছেন।’

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিদ্যা ও সংগীতের দেবী সরস্বতীর আরাধনাকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠেয় একটি অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উত্সব সরস্বতী পূজা। শাস্ত্রীয় বিধান অনুসারে, শ্রীপঞ্চমীর দিন সকালেই সরস্বতী পূজা সম্পন্ন করা হয়। সরস্বতীর পূজা সাধারণ পূজার নিয়মানুসারেই হয়ে থাকে। তবে এ পূজায় কয়েকটি বিশেষ উপাচার বা সামগ্রীর প্রয়োজন হয়। যেমন— আবীর, আমের মুকুল, দোয়াত-কলম ও যবের শীষ। পূজার জন্য গাঁদা ফুলও দরকার পড়ে। লোকাচার অনুসারে, শিক্ষার্থীরা পূজার আগে কুল ভক্ষণ করে না। পূজার দিন লেখাপড়া নিষেধ থাকে। যথাবিহিত পূজার পর লক্ষ্মী-নারায়ণ, লেখনী-মস্যাধার (দোয়াত-কলম), পুস্তক ও বাদ্যযন্ত্রেরও পূজা করার প্রথা প্রচলিত আছে। পূজা শেষে পুষ্পাঞ্জলি দেয়ার প্রথাটি অত্যন্ত জনপ্রিয়। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের দলবেঁধে অঞ্জলি দিতে দেখা যায়।

Friday, February 1, 2019

সরস্বতী জ্ঞান, সংগীত ও শিল্পকলার দেবী এবং বৈদিক সরস্বতী নদীর অভিন্ন এক রূপ

সরস্বতী মূলত বৈদিক দেবী। বেদে সরস্বতী প্রধানত নদীর অধিষ্ঠাত্রী দেবী। সরস শব্দের অর্থ জল। অতএব সরস্বতী শব্দের আদি অর্থ হলো জলবতী অর্থাৎ নদী। তিনি বিদ্যাদেবী, জ্ঞানদায়িনী, বীণাপাণি, কুলপ্রিয়া, পলাশপ্রিয়া প্রভৃতি নামে অভিহিতা। তাঁর এক হাতে বীণা অন্য হাতে পুস্তক।
সরস্বতী
বৃহস্পতি হচ্ছেন জ্ঞানের দেবতা, বৃহস্পতি পত্নী সরস্বতীও জ্ঞানের দেবী। সরস্বতী নদীর তীরে যজ্ঞের আগুন জ্বেলে সেখানেই ঋষি লাভ করেছিলেন বেদ বা ঋগমন্ত্র। সুতরাং সরস্বতী জ্ঞানের দেবী হিসেবেই পরিচিত হয়েছিলেন এ ধরাতে। কালের বিবর্তনে সরস্বতী তাঁর অন্য বৈশিষ্ট্যগুলো হারিয়ে কেবল বিদ্যাদেবী অর্থাৎ জ্ঞান ও ললিতকলার দেবীতে পরিণত হলেন। সরস্বতী জ্ঞান, সংগীত ও শিল্পকলার দেবী। ঋগবেদে তিনি বৈদিক সরস্বতী নদীর অভিন্ন এক রূপ। পণ্ডিতরা অনেকেই মনে করেন যে সরস্বতী প্রথমে ছিলেন নদী পরে হলেন দেবী। এ বিষয়ে রমেশচন্দ্র দত্ত লিখেছেন, ‘আর্য্যাবর্তে সরস্বতী নামে যে নদী আছে তাই প্রথমে দেবী বলে পূজিত হয়েছিলেন। বর্তমানে গঙ্গা যেমন সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উপাস্য দেবী হিসেবে পূজা পেয়ে থাকেন তেমনি সরস্বতী হলেন জ্ঞানের দেবী। সরস্বতীর প্রকৃত তাৎপর্য নিহিত রয়েছে সূর্যাগ্নির জ্যোতিতে। সূর্যাগ্নির তেজ, তাপ ও চৈতন্যরূপে জীবদেহে বিরাজ করায় চেতনা ও জ্ঞানের দেবী সরস্বতী। ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণে গোলোকে বিষ্ণুর তিন পত্নী লক্ষ্মী, সরস্বতী ও গঙ্গার মধ্যে বিবাদের ফলে গঙ্গার অভিশাপে সরস্বতীর নদী রূপ পাওয়াই হচ্ছে সরস্বতীর পৃথিবীতে দেবীরূপে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার তত্ত্ব।
বর্তমানে সরস্বতীর বাহন হাঁস। পণ্ডিত কলহনের মতে, সরস্বতী দেবী হংসের রূপ ধারণ করে ভেড়গিরি শৃঙ্গে দেখা দিয়েছিলেন। এ ধরনের ধারণা সঙ্গত কারণ হংসবাহনা সরস্বতীর মূর্তি তো প্রচুর পাওয়া যায়। তিনি এ বাহন ব্রহ্মার কাছ থেকে পেয়েছিলেন কিন্তু ব্রহ্মা বা সরস্বতী দেবীর বাহন কিন্তু পাখি নয়। বেদে এবং উপনিষদে হংস শব্দের অর্থ সূর্য। সূর্যে সৃজনী শক্তির বিগ্রহাম্বিতরূপ ব্রহ্মা এবং সূর্যাগ্নির গতিশীল কিরণরূপা ব্রহ্মা-বিষ্ণু-শিব শক্তি সরস্বতী দেবীর বাহন হয়েছেন হংস বা সূর্য একেবারেই যুক্তিসঙ্গত কারণে। তবে বৈদিক সাক্ষ্য থেকেই জানা যায় সিংহ ও মেষ সরস্বতী দেবীর আদি বাহন ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দেবী দুর্গা সরস্বতী দেবীর কাছ থেকে সিংহ কেড়ে নিলেন আর কার্ত্তিক কেড়ে নিলেন ময়ূর। পরবর্তী সময়ে সরস্বতী দেবী হংসকেই তাঁর চিরস্থায়ী বাহনের মর্যাদা দিলেন। আর সরস্বতীর এ বাহন সম্পর্কে বলতে গেলে বলতে হয় জলে, স্থলে, অন্তরীক্ষে সর্বত্রই তাঁর সমান গতি ঠিক যেমনভাবে জ্ঞানময় পরমাত্মা সব জায়গায় বিদ্যমান। মজার ব্যাপার হলো হংস জল ও দুধের পার্থক্য করতে সক্ষম। জল ও দুধ মিশ্রিত থাকলে হাঁস শুধু সারবস্তু দুধ বা ক্ষীরটুকু গ্রহণ করে আর জল পড়ে থাকে। জ্ঞান সাধনায় হাঁসের এ স্বভাব যথেষ্ঠ তাৎপর্য বহন করে। তাই বিদ্যাদেবীর বাহন হিসেবে হাঁসকে খুব ভালোই মানায়।
হাতে বীণা ধারণ করেছেন বলেই তাঁর অপর নাম বীণাপাণি। বীণার সুর মধুর। পূজার্থী বা বিদ্যার্থীর মুখ নিঃসৃত বাক্যও যেন মধুর হয় এবং জীবনও মধুর সংগীতময় হয় এ কারণেই মায়ের হাতে বীণা।
হিন্দুদের দেবী হয়েও বৌদ্ধ বা জৈনদের কাছ থেকেও পূজা পেয়েছেন সরস্বতী। অনেক বৌদ্ধবিহারেও সরস্বতীর মূর্তি পাওয়া যায়। জৈনদের ২৪ জন শাসনদেবীর মধ্যে সরস্বতী একজন এবং ষোলজন বিদ্যাদেবীর মধ্যে অনন্যা মা সরস্বতী। সরস্বতী নদীর তীরেই বৈদিক এবং ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির উদ্ভব। শাস্ত্রীয় বিধান অনুসারে শ্রীপঞ্চমীর দিন সকালেই সরস্বতী পূজা সম্পন্ন হয়। সরস্বতী পূজা সাধারণ পূজার নিয়মানুসারেই হয়। তবে এই পূজায় আলাদা কিছু সামগ্রী যেমন : অভ্র-আবির, আমের মুকুল, দোয়াত-কলম ও যবের শিষ ছাড়াও লাগে বাসন্তী রঙের গাঁদা ফুল।
পূজার দিন লেখাপড়া একেবারেই নিষেধ থাকে। পূজার পরে দোয়াত-কলম পুস্তক ও বাদ্যযন্ত্রের পূজারও প্রচলন আছে। এ দিনেই অনেকের হাতেখড়ি দেওয়া হয়। পূজা শেষে অঞ্জলি দেওয়াটা খুব জনপ্রিয়। আর যেহেতু সরস্বতী বিদ্যার দেবী তাই সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই এ উৎসব অনেক বড় করে পালিত হয়। আর সেখানে দল বেঁধে অঞ্জলি দেয় শিক্ষার্থীরা। মানুষের ভেতরের পশুকে নিবৃত্ত করে জ্ঞান দান করেন বিদ্যার দেবী সরস্বতী।
সনাতন ধর্মের এ অন্যতম ধর্মীয় উৎসব এবার আবার ফাল্গুনের প্রথম দিনে হওয়াতে বসন্তের বাসন্তী আমেজের সাথে ধর্মীয় উৎসবের আমেজ মিলেমিশে একাকার।
মা সরস্বতী আমাদের আশীর্বাদ করছেন- জীবনকে শুভ্র ও পবিত্র রাখ। সত্যকে আঁকড়ে রাখ। মূল গ্রন্থের বাণী পালন কর। জীবন ছন্দময় কর। স্বচ্ছন্দে থাক।’ এ বিশ্বের সবাই মনের কলূষতা দূর করে জ্ঞানের আলোয় নিজেকে ও অন্যকে আলোকিত করুক মা সরস্বতীর কাছে এই প্রার্থনা ।

* সরস্বতী পূজায় প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির তালিকা*

১. পলাশ ফুল,
২. কুল(বইড়),
৩. ঘট ১টি ও আমের সখা ১টি,
৪. প্রদীপ ৫-৭টি,
৫. ডাব ১টি,
৬. ধুপচি ১টি,
৭. চাইলন ১টি,
৮. পাখা ১টি,
৯. আলতা ফাইলা ১সেট,
১০. তিল,হরতকী,
১১. পান,সুপারি,
১২. ঘি,মধু,চিনি,দুধ,দই,
১৩. বাতাসা,
১৪. ফল-মূল,
১৫. কলা ৩ছুরি,
১৬. গামছা ১টি,
১৭. শাড়ী ১টি,
১৮. সিঁন্দুর ১কৈটা ও ৩ প্যাক,
১৯. ইকরা ১টি,
২০. পঞ্চশস্য, চন্দন
২১. খাতা ও কলম,
২২. ধুপ ও কর্পুর,
২৩. যাতা ও যাতি,
২৪. চিড়া,
২৫. ভোগের দ্রব্য,
২৬. সুতা,
২৭. ৮ প্রকার খড়ি(আম, জাম, পলাশ, বট, পাখুর, কুল, ডুমুর ও চন্দন),
২৮. হোম করার জন্য বালু, পাটকাঠি
ইত্যাদি ।

Monday, January 28, 2019

একান্ন শক্তিপীঠের অন্যতম হিন্দু তীর্থক্ষেত্র কালীঘাট মন্দির


কালীঘাট মন্দির

কালীঘাট মন্দির একটি প্রসিদ্ধ কালীমন্দির এবং একান্ন শক্তিপীঠের অন্যতম হিন্দু তীর্থক্ষেত্র। এই তীর্থের পীঠদেবী দক্ষিণাকালী এবং ভৈরব বা পীঠরক্ষক দেবতা নকুলেশ্বর। পৌরাণিক কিংবদন্তি অনুসারে, সতীর দেহত্যাগের পর তাঁর ডান পায়ের চারটি (মতান্তরে একটি) আঙুল এই তীর্থে পতিত হয়েছিল। কালীঘাট একটি বহু প্রাচীন কালীক্ষেত্র। কোনো কোনো গবেষক মনে করেন, "কালীক্ষেত্র" বা "কালীঘাট" কথাটি থেকে "কলকাতা" নামটির উদ্ভব। জনশ্রুতি, ব্রহ্মানন্দ গিরি ও আত্মারাম ব্রহ্মচারী নামে দুই সন্ন্যাসী কষ্টিপাথরের একটি শিলাখণ্ডে দেবীর রূপদান করেন। ১৮০৯ সালে বড়িশার সাবর্ণ জমিদার শিবদাস চৌধুরী, তাঁর পুত্র রামলাল ও ভ্রাতুষ্পুত্র লক্ষ্মীকান্তের উদ্যোগে আদিগঙ্গার তীরে বর্তমান মন্দিরটি নির্মিত হয়েছে। পরবর্তীকালে মন্দিরের কিছু পোড়ামাটির কাজ নষ্ট হয়ে গেলে সন্তোষ রায়চৌধুরী সেগুলি সংস্কার করেন। বর্তমান এই মন্দিরটি নব্বই ফুট উঁচু। এটি নির্মাণ করতে আট বছর সময় লেগেছিল এবং খরচ হয়েছিল ৩০,০০০ টাকা। মন্দির সংলগ্ন জমিটির মোট আয়তন ১ বিঘে ১১ কাঠা ৩ ছটাক; বঙ্গীয় আটচালা স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত মূল মন্দিরটির আয়তন অবশ্য মাত্র ৮ কাঠা।মূল মন্দির সংলগ্ন অনেকগুলি ছোটো ছোটো মন্দিরে রাধাকৃষ্ণ, শিব প্রভৃতি দেবতা পূজিত হন।

কালীঘাট কালীমন্দিরের কষ্টিপাথরের কালীমূর্তিটি অভিনব রীতিতে নির্মিত। মূর্তিটির জিভ, দাঁত ও মুকুট সোনার। হাত ও মুণ্ডমালাটিও সোনার। মন্দিরে মধ্যে একটি সিন্দুকে সতীর প্রস্তরীভূত অঙ্গটি রক্ষিত আছে; এটি কারোর সম্মুখে বের করা হয় না। প্রতি বছর পয়লা বৈশাখ, দুর্গাপূজা ও দীপান্বিতা কালীপূজার দিন মন্দিরে প্রচুর ভক্ত ও পু্ণ্যার্থীর সমাগম ঘটে।

কালীঘাট মন্দিরের নিকটেই পীঠরক্ষক দেবতা নকুলেশ্বর শিবের মন্দির। ১৮৫৪ সালে তারা সিং নামে জনৈক পাঞ্জাবি ব্যবসায়ী বর্তমান নকুলেশ্বর মন্দিরটি নির্মাণ করিয়েছিলেন। শিবরাত্রি ও নীলষষ্ঠী উপলক্ষে এই মন্দিরে প্রচুর ভক্ত সমাগম হয়। কালীমন্দিরের পশ্চিম দিকে রয়েছে শ্যাম রায়ের মন্দির। ১৮৪৩ খ্রিস্টাব্দে বাওয়ালির জমিদার উদয়নারায়ণ মণ্ডল এই মন্দিরটি নির্মাণ করিয়েছিলেন। এখানে রামনবমী ও দোলযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। ১৮৬২ সালে শবদাহের জন্য মন্দিরের অদূরে নির্মিত হয় কেওড়াতলা মহাশ্মশান। বাংলার বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছে এই শ্মশানে। এখানকার শ্মশানকালী পূজা বিখ্যাত।

Friday, January 25, 2019

অর্ধনারীশ্বর হল হিন্দু দেবতা শিব ও তাঁর পত্নী পার্বতীর একটি সম্মিলিত উভলিঙ্গ মূর্তি


অর্ধনারীশ্বর

অর্ধনারীশ্বর হল হিন্দু দেবতা শিব ও তাঁর পত্নী পার্বতীর (যিনি এই মূর্তিতে মহাশক্তি ও উমা নামেও পরিচিত) একটি সম্মিলিত উভলিঙ্গ মূর্তি। অর্ধনারীশ্বর মূর্তিটি অর্ধেক পুরুষ ও অর্ধেক নারী হিসেবে দর্শিত হয়। এই মূর্তিটির ডানপার্শ্বে সাধারণত শিবকে তাঁর প্রথাগত মূর্তিতে দেখা যায়।

অর্ধনারীশ্বরের প্রাচীনতম মূর্তিটি কুষাণ যুগের। খ্রিস্টীয় ১ম শতাব্দী থেকে এই ধরনের মূর্তি নির্মাণ শুরু হয়। গুপ্ত যুগে অর্ধনারীশ্বর মূর্তিটি বিবর্তিত হয় এবং যথাযথ রূপ ধারণ করে। পুরাণ ও বিভিন্ন মূর্তিতত্ত্ব সংক্রান্ত ধর্মগ্রন্থে অর্ধনারীশ্বর বিষয়ক পৌরাণিক কাহিনি ও মূর্তিতত্ত্ব লিখিত হয়েছে। অর্ধনারীশ্বর মূর্তিটি একটি জনপ্রিয় শিল্পকলা হিসেবে ভারতের বেশিরভাগ শিব মন্দিরে দেখা গেলেও, এই মূর্তিটির নিজস্ব মন্দিরের সংখ্যা খুবই কম।

অর্ধনারীশ্বর মূর্তিটি বিশ্বের পুরুষ ও প্রকৃতির শক্তির সম্মিলিত রূপের প্রকাশ। এই মূর্তির মাধ্যমে দেখানো হয়, শক্তি অর্থাৎ ঈশ্বরের নারীসত্ত্বা ও তাঁর পুরুষ সত্ত্বা শিব থেকে অভিন্ন। এই দুই সত্ত্বার সম্মিলনকে সকল সৃষ্টির মূল ও গর্ভ বলে স্তব করা হয়। অন্য একটি মতে, অর্ধনারীশ্বর হলেন শিবের সর্বব্যাপী প্রকৃতির প্রতীক।


অর্ধনারীশ্বর’ নামটির অর্থ ‘অর্ধেক নারী রূপী ঈশ্বর’। অর্ধনারীশ্বর অন্যান্য কিছু নামেও পরিচিত। এগুলি হল: ‘অর্ধনরনারী’ (অর্ধেক নারী-পুরুষ), ‘অর্ধনারীশ’ (অর্ধেক নারী রূপী ঈশ্বর), ‘অর্ধনারীনটেশ্বর’ (অর্ধেক নারী রূপী নটরাজ), ‘পরাঙ্গদা’, ‘নরনারী’ (পুরুষ-নারী), আম্মিয়াপ্পান (তামিল নাম, যেটির অর্থ ‘মাতা-পিতা’), ও ‘অর্ধযুবতীশ্বর’ (অসমে প্রচলিত নাম, যেটির অর্থ ‘অর্ধেক যুবতী রূপী ঈশ্বর’)।গুপ্ত যুগের লেখক পুষ্পদন্ত তাঁর মহিম্নস্তবে শিবের এই রূপটিকে ‘দেহার্ধঘটন’ (“তুমি ও তিনি একই দেহের দুই অর্ধাংশ) নামে বর্ণনা করেছেন। উৎপল তাঁর বৃহৎ সংহিতা টীকায় এই রূপটিকে ‘অর্ধগৌরীশ্বর’ (অর্ধেক গৌরী রূপী ঈশ্বর) নামে অভিহিত করেছেন।[৬] বিষ্ণুধর্মোত্তর পুরাণ গ্রন্থে এই রূপটিকে বলা হয়েছে ‘গৌরীশ্বর’।


উৎস ও প্রাচীন মূর্তিসমূহ
অর্ধনারীশ্বর ধারণাটি সম্ভবত বৈদিক সাহিত্যের যুগ্মমূর্তি যম-যমী, আদি সৃষ্টিকর্তা বিশ্বরূপ বা প্রজাপতি ও অগ্নির বৈদিক বর্ণনা “যিনি একাধারে বৃষ ও গাভী”, বৃহদারণ্যক উপনিষদ্‌ গ্রন্থে উভলিঙ্গ বিশ্বমানব পুরুষ রূপী আত্মা এবং প্রাচীন গ্রিসের হার্মাফ্রোডিটাস ও ফ্রিজিয়ান আগডিস্টিস অঙ্ক্রান্ত পুরাণকথা থেকে অণুপ্রাণিত। বৃহদারণ্যক উপনিষদ্‌ গ্রন্থে বলা হয়েছে, পুরুষ নিজেকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন। একটি ভাগ পুরুষ ও অপর ভাগ নারী। এই দুই ভাগ মিলিত হয়ে সকল প্রাণ সৃষ্টি করেছেন। অর্ধনারীশ্বর কাহিনির মূল বিষয়বস্তু। শ্বেতাশ্বেতর উপনিষদ্‌ পৌরাণিক অর্ধনারীশ্বর ধারণার বীজ বপন করেছে। এই গ্রন্থ মতে, পৌরাণিক শিবের আদি সত্ত্বা রুদ্র সব কিছুর সৃষ্টিকর্তা। তিনিই সাংখ্য দর্শনের পুরুষ (পুরুষ তত্ত্ব) ও প্রকৃতির মূল। এই ধারণা অনুসারে, রুদ্র একাধারে পুরুষ ও নারী। এই ধারণা থেকে রুদ্রের উভলিঙ্গ সত্ত্বার একটি আভাস পাওয়া যায়।

অর্ধনারীশ্বর ধারণাটির উদ্ভব ঘটেছিল যুগপৎ কুষাণ ও গ্রিক সংস্কৃতিতে। কুষাণ যুগে (৩০-৩৭৫ খ্রিস্টাব্দ) অর্ধনারীশ্বরের মূর্তিতত্ত্বটি বিবর্তিত হয়। কিন্তু গুপ্ত যুগেই (৩২০-৬০০ খ্রিস্টাব্দ) এই মূর্তিতত্ত্ব পূর্ণাঙ্গ রূপ পরিগ্রহ করে। কুষাণ যুগের (খ্রিস্টীয় ১ম শতাব্দীর মধ্যভাগের) একটি কেন্দ্রস্তম্ভ এখন মথুরা সংগ্রহালয়ে রক্ষিত আছে। এই স্তম্ভে একটি অর্ধনারী-অর্ধপুরুষ মূর্তি খোদিত রয়েছে। সেই সঙ্গে আরও তিনটি মূর্তিও খোদিত আছে। এই তিনটি মূর্তি বিষ্ণু, গজলক্ষ্মী ও কুবেরের মূর্তি হিসেবে চিহ্নিত করা গিয়েছে। অর্ধনারী-অর্ধপুরুষ মূর্তিটির পুরুষার্ধটি ‘উর্ধলিঙ্গ’ এবং এই অংশে অভয় মুদ্রা প্রদর্শিত হয়েছে। অন্যদিকে নারী-অর্ধটির স্তনটি সুডৌল এবং এই অংশে মূর্তির হাতে একটি দর্পণ দেখা যায়। এটিই অর্ধনারীশ্বর মূর্তির সর্বজনস্বীকৃত প্রাচীনতম নিদর্শন। মথুরা সংগ্রহালয়ে রাজঘাট থেকে প্রাপ্ত একটি প্রাচীন অর্ধনারীশ্বর মূর্তির মস্তকভাগও রক্ষিত আছে। এই মস্তকের পুরুষার্ধটির মাথায় নরকরোটি সংবলিত জটা অর্ধচন্দ্র এবং বাঁদিকের নারী-অর্ধে সুবিন্যস্ত ও পুষ্পশোভিত কেশ এবং কানে পত্রকুণ্ডল বা দুল দেখা যায়। এই মুখে একটিই তৃতীয় নয়ন রয়েছে। অধুনা বিহার রাজ্যের বৈশালী থেকে প্রাপ্ত একটি টেরাকোটার সিলমোহরে অর্ধনারী-অর্ধপুরুষ মূর্তির চিত্র খোদিত রয়েছে। কুষাণ যুগের অর্ধনারীশ্বর মূর্তিগুলি সাধারণ দ্বিভূজ মূর্তি। তবে পরবর্তীকালে রচিত ধর্মগ্রন্থ ও নির্মিত ভাস্কর্যগুলিতে অর্ধনারীশ্বরের মূর্তিতত্ত্বটি আরও জটিল আকার নেয়।

গ্রিক লেখক স্টোবিয়াস(৫০০ খ্রিস্টাব্দ) বার্ডাসেনেসের (১৫৪-২২২ খ্রিস্টাব্দ) রচনা থেকে অর্ধনারীশ্বরের কথা উদ্ধৃত করেছেন। বার্ডাসেনেস এলাগাবালাসের (এমেসার অ্যান্টোনিয়াস) (২১৮-২২ খ্রিস্টাব্দ) রাজত্বকালে সিরিয়ায় একটি ভারতীয় দূতাবাসে সফরে এসে অর্ধনারীশ্বরের কথা জানতে পারেন। তক্ষশীলায় খননকার্য চালিয়ে শক-পার্থিয়ান যুগের টেরাকোটার একটি উভলিঙ্গ আবক্ষ মূর্তি পাওয়া গিয়েছে। এই মূর্তিতে নারীর স্তনবিশিষ্ট এক দাড়িওয়ালা পুরুষকে দেখা যায়।

অর্ধনারীশ্বর মূর্তিটি হিন্দুধর্মের দুটি প্রধান শাখা শৈবধর্ম ও শাক্তধর্মকে সংযুক্ত করার একটি প্রয়াস রূপে ব্যাখ্যা করা হয়। উল্লেখ্য, শৈবধর্ম শিব-উপাসনা কেন্দ্রিক এবং শাক্তধর্ম শক্তি-উপাসনা কেন্দ্রিক সম্প্রদায়। একইভাবে হরিহর মূর্তির দ্বারা শিব এবং বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের সর্বোচ্চ দেবতা বিষ্ণুকে একীভূত করা হয়েছে।

মূর্তিতত্ত্ব
১৬শ শতাব্দীর মূর্তিতত্ত্ব সংক্রান্ত গ্রন্থ শিল্পরত্ন, মৎস্যপুরাণ এবং অংশুমাদভেদাগম, কামিকাগম, সুপ্রেদাগম ও কারণাগম প্রভৃতি আগম শাস্ত্রে অর্ধনারীশ্বরের মূর্তিতত্ত্বটি বর্ণিত হয়েছে। উল্লেখ্য, উপরিউক্ত আগমগুলি প্রধানত দক্ষিণ ভারতে রচিত হয়। শরীরের ডানদিকের ভাগটি প্রধান। এই ভাগটি সাধারণত শিবের। বাঁদিকের ভাগটি পার্বতীর। কোনো কোনো দুর্লভ বিবরণ অনুসারে, ডানদিকের প্রধান অংশটি পার্বতীর। এই বিবরণগুলি শাক্ত সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত। অর্ধনারীশ্বর মূর্তি সাধারণত চতুর্ভূজ, ত্রিভুজ বা দ্বিভূজ। কোনো কোনো দোষ্প্রাপ্য অষ্টভূজ মূর্তিও পাওয়া গিয়েছে। ত্রিভুজ মূর্তিগুলির ক্ষেত্রে পার্বতীর অংশে একটি মাত্র হাত রয়েছে। এর মাধ্যমে এই মূর্তিতে পার্বতীর ভূমিকা হ্রাসের আভাস দেওয়া হয়েছে।

পুরুষার্ধ
অর্ধনারীশ্বর মূর্তির পুরুষার্ধটির মস্তকে ‘জটামুকুট’ (মুকুটের আকারে জটা) দেখা যায়। এই জটামুকুটে শোভা পায় একটি অর্ধচন্দ্র। কোনো কোনো মূর্তিতে জটামুকুটে থাকে সর্প এবং সেই জটা থেকে দেবী গঙ্গাকে নির্গত হতে দেখা যায়। ডান কানে থাকে একটি ‘নক্রকুণ্ডল’, ‘সর্পকুণ্ডল’ (সাপের দুল) বা সাধারণ কুণ্ডল বা কানের দুল। কোনো কোনো মূর্তিতে নারী-অর্ধের তৃতীয় চক্ষুটির চেয়ে পুরুষার্ধের তৃতীয় চক্ষুটি ছোটো এবং পুরুষার্ধে দেখা যায় একটি অর্ধেক গোঁফ। শাস্ত্রে পুরুষার্ধে একটি অর্ধ তৃতীয় নেত্রের উল্লেখ পাওয়া যায়। কোনো কোনো বর্ণনা অনুসারে, অর্ধনারীশ্বরের কপালের মধ্যস্থলে একটি পূর্ণাঙ্গ তৃতীয় নেত্রটি মাঝখান থেকে দুই ভাগে বিভক্ত। পার্বতীর সিন্দূর-বিন্দুর উপরে বা নিচে একটি অর্ধ নেত্রের উল্লেখও রয়েছে। মাথার পিছনে একটি একক ডিম্বাকার জ্যোতিশ্চক্রও (‘প্রভামণ্ডল’ বা ‘প্রভাবলি’) দেখা যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই জ্যোতিশ্চক্রটি দিক অনুসারে ভিন্ন প্রকার।

চতুর্ভূজ মূর্তিগুলিতে ডান হাতে থাকে একটি ‘পরশু’ (কুঠার) এবং অন্য হাতটি ‘অভয় মুদ্রা’র ভঙ্গিতে থাকে। কোনো কোনো মূর্তিতে দেখা যায়, ডান হাতদুটির একটি সামান্য বেঁকে শিবের বাহন নন্দীর উপর স্থাপিত এবং অন্য হাতে দেখা যায় ‘অভয় মুদ্রা’। অন্য একটি ধরনে দেখা যায়, ডান হাতে একটি ত্রিশূল ও অপর হাতটিতে ‘বরমুদ্রা’। অপর একটি শাস্ত্রের বর্ণনা অনুসারে, ডান হাত দুটিতে থাকে ত্রিশূল ও অক্ষমালা। দ্বিভূজ মূর্তিতে ডান হাতে থাকে ‘কপাল’ বা নরকরোটির পাত্র অথবা বরমুদ্রা। কোনো কোনো মূর্তিতে শুধুমাত্র নরকরোটিও দেখা যায়। বাদামী ভাস্কর্যে চতুর্ভূজ মূর্তিতে দেখা যায়, অর্ধনারীশ্বর বাঁ হাত ও ডান হাতের সাহায্যে বীণা বাজাচ্ছেন। তাঁর অপর ডান হাতে একটি পরশু এবং নারী-অর্ধের হাতে একটি পদ্ম রয়েছে।

ব্রোঞ্জনির্মিত ত্রিভুজ অর্ধনারীশ্বর মূর্তি
অর্ধনারীশ্বর মূর্তির শিব-অর্ধে দেখা যায় চ্যাপ্টা পুরুষালি বক্ষস্থল, ঋজু আনুভূমিক বক্ষস্থল, প্রসারিত কাঁধ, প্রসারিত কোমর ও পুরুষোচিত উরুদেশ। তাঁর বুকে ঝোলে একটি যজ্ঞোপবীত। কোথাও কোথাও এই যজ্ঞোপবীতটি হল ‘নাগযজ্ঞোপবীত’ (সর্পনির্মিত যজ্ঞোপবীত) বা মুক্তো বা মণির মালা। কোথাও কোথাও যজ্ঞোপবীতটি দেহের মধ্যভাগটিকে পুরুষ ও নারী-অর্ধে বিভক্ত করেছে। পুরুষার্ধে শিবের মূর্তিতত্ত্ব অনুসারে, সর্পভূষণ সহ নানা অলংকার দেখা যায়।

কোনো কোনো উত্তর ভারতীয় মূর্তিতে[২৭] পুরুষার্ধটির পুরুষাঙ্গটি উন্নত। এটিকে বলা হয় ‘উর্ধলিঙ্গ’ বা ‘উর্ধরেতা’। কোনো কোনো মূর্তিতে পুরুষাঙ্গটি অর্ধেক এবং ডিম্বাশয়ও একটি।যদিও দক্ষিণ ভারতে এমন কোনো মূর্তি পাওয়া যায়নি। মূর্তির কটিদেশে সাধারণত কাপড় (কোনো কোনো ক্ষেত্রে রেশম বা সূতির ধুতি অথবা বাঘ বা হরিণের চামড়া) থাকে। কাপড়টি হাঁটু অবধি ঝোলে। কোমরে থাকে ‘সর্পমেখলা’ বা সাপের তৈরি কোমরবন্ধনী বা অন্য অলংকার। ডান পাটি সামান্য বাঁকা। এটি অনেক ক্ষেত্রে ‘পদ্মপীঠ’ বা পদ্মের বেদীর উপর স্থাপিত অবস্থায় দেখা যায়। সমগ্র ডান-ভাগটি ভষ্মমাখা ও ভয়ংকর। এটি লাল বা সোনালি বা প্রবালের রঙের। যদিও এই ধরনের মূর্তিগুলির বিবরণ দুর্লভ।


Tuesday, January 22, 2019

লঙ্কা ইন্দ্রাক্ষী শক্তিপীঠ রাক্ষসেশ্বর


ইন্দ্রাক্ষী শক্তিপীঠ

“লঙ্কা” নামটা সবারই শোনা । বর্তমানে এটি শ্রীলঙ্কা নামে পরিচিত । রামায়নে এই রাজ্যের নাম পাওয়া যায় । যেখানে রাক্ষসেরা থাকতো । লঙ্কায় রাক্ষস দের রাজা ছিলেন দশানন রাবণ । বহু পূর্বে শিবের ইচ্ছায় দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা এই লঙ্কা নগরীর নির্মাণ করেন। এক সময় এখানে যক্ষাধিপতি কুবের তাঁর পরিবারবর্গ নিয়ে থাকতেন । পরে রাবণের রাজ্য হয় । বর্তমানে আলোচ্য পীঠ লঙ্কায়।

তবে এই পীঠের অবস্থান নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে মতভেদ আছে । রাবণ ছিলেন শিব শক্তি উপাসক । ভদ্রকালী দেবীকে রাবণ দুর্গা রূপে পূজা করতেন । এই পীঠ সম্বন্ধে পীঠনির্ণয়তন্ত্র গ্রন্থে লিখিত আছে –

লঙ্কায়াং নূপুরশ্চৈব ভৈরবো রাক্ষসেশ্বরঃ । 
ইন্দ্রাক্ষী দেবতা তত্র ইন্দ্রোণোপাসিতা পুরা ।।

দেবীর এখানে নূপুর পতিত হয়। দেবীর নাম ইন্দ্রাক্ষী ভৈরবের নাম রাক্ষসেশ্বর । এই দেবীকে দেবতাদের রাজা ইন্দ্রদেবতা পূজা করেছিলেন। কেন ? পরে সেই ঘটনা বলা যাবে । লঙ্কা নগরী নাকি দেবী চামুণ্ডা, শিবের আদেশে পাহাড়া দিতেন। ভগবান শিব বলেছেন- যবে হনুমান লঙ্কাতে আগমন করবে- তবে থেকে দেবীর প্রহরীর দায়িত্ব সমাপন হবে। শ্রীরামের দূত হয়ে হনুমান ভগবান রামের অঙ্গুষ্ঠি নিয়ে আসলে দেবী চামুণ্ডার সাথে সাক্ষাৎ হয়। দেবী বলেন – “এবার লঙ্কার পতনের খুব সময় নেই।” এই বলে দেবী অদৃশ্য হয়েছিলেন । প্রাচীন গ্রন্থে সিংহল নাম পাওয়া যায় । অনেকে সিংহল ও লঙ্কাকে এক ধরেন । কবিকঙ্কণ মুকুন্দরামের “চণ্ডীমঙ্গল” কাব্যে সিংহল এর নাম পাওয়া যায় । ব্রহ্মযামলের আদ্যাস্তবে বলা হয়েছে-

পাতালে বৈষ্ণবীরূপা সিংহলে দেবমোহিণী
সুরসা চ মনিদ্বীপে লঙ্কায়াং ভদ্রকালিকা ।

এখানে সিংহল ও লঙ্কাকে আলাদা বলা হয়েছে। বলা হয়েছে- সিংহলে দেবমোহিণী রূপে ভগবতী বিরাজ করেন, আবার তিনিই ভদ্রকালী রূপে লঙ্কায় বিরাজ করেন । কিন্তু দেবীকে এখানে ইন্দ্র আরাধিতা দেবী “ইন্দ্রাক্ষী” নাম বলা হয়েছে । কি কারণে ইন্দ্র এখানে দেবীর পূজা করলেন ? তিঁনি কি দেবীর কৃপায় সমস্যার সমাধান করতে পেরেছিলেন ? জানতে অপেক্ষা করুন আগামী পর্বের জন্য ।

Friday, January 18, 2019

সর্বমঙ্গলা মায়ের ঘট প্রতিষ্ঠা

সর্বমঙ্গলা  মায়ের ঘট প্রতিষ্ঠা
বর্ধমানের অধিষ্ঠাত্রী দেবী দেবী সর্বমঙ্গলা। তাঁর পুজো প্রায়  সাড়ে তিনশো বছরেরও বেশি পুরোনো। সর্বমঙ্গলার ঘট প্রতিষ্ঠার মধ্যে দিয়ে শারদোৎসবের আনুষ্ঠানিক সূচনা করা হয়ে থাকে পূর্ব বর্ধমানে। বাদ্যযন্ত্র সহকারে বিশাল শোভাযাত্রায় ঢল নামে পুণ্যার্থীদের। দেবী সর্বমঙ্গলার ঘটপূর্ণ জল নিয়ে ঘোড়ার গাড়ি নানা পথ পরিক্রমা করেন । শোভাযাত্রা  সর্বমঙ্গলা মন্দিরে এসে পৌঁছতেই বাদ্যযন্ত্র, শাঁখ, ঘন্টা, কাঁসি ও হুলুধ্বনির মধ্যে দিয়ে দুর্গাপুজোর ঘট প্রতিষ্ঠা করা হয়। এখানে সর্বমঙ্গলা দেবীর মূর্তি কষ্টি পাথরের অষ্টাদশভূজা সিংহবাহিনী ‘মহিষমর্দিনী’ মহালক্ষীরূপিণী। সর্বমঙ্গলা মন্দির অবিভক্ত বাংলার প্রথম নবরত্ন মন্দির। প্রাচীন এই মন্দির বর্ধমানের মানুষের কাছে পবিত্র তীর্থস্থান।  দেশ-বিদেশের লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থী ও পর্যটকদের সমাগম হয় এই মন্দিরে।
মন্দিরের ঐতিহাসিক গুরুত্বের কথা ভেবে প্রাচীন এই মন্দিরকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। কথিত আছে, প্রায় সাড়ে তিনশো বছর আগে শহর বর্ধমানের উত্তরাংশে বাহির সর্বমঙ্গলা পাড়ায় বাগদিরা পুকুরে মাছ ধরতে গিয়ে একটি শিলামূর্তি পেয়েছিল। সেটিকে প্রস্তর খণ্ড ভেবে তার উপরে শামুক–গুগলি থেঁতো করতো। সেই সময় দামোদর নদ লাগোয়া চুন তৈরির কারখানার জন্য শামুকের খোলা নেওয়ার সময় শিলামূর্তিটি চলে যায় চুন ভাটায়। তখন শামুকের খোলের সঙ্গে শিলামূর্তিটি পোড়ানো হলেও মূর্তির কোনো ক্ষতি হয়নি। তবে সেই রাতে স্বপ্নাদেশ পাওয়া মাত্র বর্ধমান মহারাজা সঙ্গম রায় শিলামূর্তিটিকে নিয়ে এসে সর্বমঙ্গলা নামে পুজো শুরু করেন। পরবর্তীকালে ১৭০২ সালে টেরাকোটার নিপুণ কারুকার্য খচিত মন্দির নির্মাণ করেন মহারাজাধিরাজ কীর্তিচাঁদ মহতাব। ক্রমে মূল মন্দিরের আশেপাশে গড়ে ওঠে নাট মন্দির, শ্বেত পাথরের তৈরি রামেশ্বর ও বাণেশ্বর নামে দুটি শিব মন্দির। কালো পাথরে তৈরি হয় মিত্রেশ্বর, চন্দ্রশ্বর ও ইন্দ্রেশ্বর নামে আরও তিনটি শিব মন্দির। মন্দিরের নিত্যপুজো ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে রাজবংশের শেষ যুবরাজ উদয়চাঁদ মহতাব ট্রাস্ট কমিটি গঠন করেন।

Tuesday, January 15, 2019

যশোরেশ্বরী কালী বাংলাদেশের একটি বিখ্যাত মন্দির


বিখ্যাত মন্দির

হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের যশোরেশ্বরী কালী মন্দির বাংলাদেশের একটি বিখ্যাত মন্দির। এ শক্তিপীঠটি সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার ঈশ্বরীপুর গ্রামে অবস্থিত। যশোরেশ্বরী নামের অর্থ "যশোরের দেবী"। হিন্দু ভক্তদের জন্য এটি একটি পবিত্র তীর্থস্থান।
গুরুত্ব
সত্য যুগে দক্ষ যজ্ঞের পর সতী মাতা দেহ ত্যাগ করলে মহাদেব সতীর মৃতদেহ কাঁধে নিয়ে বিশ্বব্যাপী প্রলয় নৃত্য শুরু করলে বিষ্ণু দেব সুদর্শন চক্র দ্বারা সতীর মৃতদেহ ছেদন করেন। এতে সতী মাতার দেহখণ্ডসমূহ ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন স্থানে পতিত হয় এবং এ সকল স্থানসমূহ শক্তিপীঠ হিসেবে পরিচিতি পায়।

ইতিহাস
ধারনা করা হয় যে, মন্দিরটি আনারি নামের এক ব্রাহ্মণ কর্তৃক নির্মিত হয়। তিনি এই যশোরেশ্বরী শক্তিপীঠের ১০০টি দরজা নির্মাণ করেন। কিন্তু মন্দিরটি কখন নির্মিত হয় তা জানা যায়নি। পরবর্তীকালে লক্ষ্মণ সেন ও প্রতাপাদিত্য কর্তৃক তাদের রাজত্বকালে এটির সংস্কার করা হয়েছিল

নাটমন্দির' ও স্থাপত্য
মূল মন্দির সংলগ্ন স্থানে নাটমন্দির নামে একটি বৃহ মঞ্চমণ্ডপ নির্মাণ করা হয়েছিল যেখান হতে দেবীর মুখমণ্ডল দেখা যায়। এটি লক্ষ্মণ সেন কর্তৃক ত্রয়োদশ শতাব্দীতে নির্মাণ করা হয়েছিল কিন্তু কারা এটি নির্মাণ করেছিল তা জানা যায়নি। ১৯৭১ সালের পর এটি ভেঙে পড়ে। এখন শুধুমাত্র স্তম্ভগুলি দেখা যায়।

Thursday, January 10, 2019

বিষ্ণু শক্তি বৈষ্ণবী দেবী দুর্গা

বিষ্ণু শক্তি বৈষ্ণবী দেবী দুর্গা
বিষ্ণু শক্তি বৈষ্ণবী দেবী দুর্গা

“বৈষ্ণবী” এই নামটির সাথে “বিষ্ণু” নামের সাদৃশ্য দেখতে পাই। ভগবান বিষ্ণুকে আমরা ‘নারায়ণ’, ‘হরি’ ইত্যাদি নামে পূজা করি। ভগবান বিষ্ণু ত্রিদেবের একজন। ইঁনি জগত পালন করেন। এই জগতে ধর্মে সংস্থাপন ও অধর্মের বিনাশের জন্য বহুবার ভগবান বিষ্ণু মর্তলোকে নরশরীর ধারণ করে অবতীর্ণ হন। এমনকি পশুর শরীর অবলম্বন করেন যেমন নৃসিংহ , বরাহ, হংস অবতার ইত্যাদি। বৈকুণ্ঠনিবাসী ভগবান বিষ্ণু যে শক্তিবলে ধরিত্রীলোকে অবতার গ্রহণ করে দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন করে সেই বৈষ্ণবী শক্তিই হলেন দেবী আদিশক্তি। তিঁনি চণ্ডীর বর্ণিত অষ্টমাতৃকার একজন বৈষ্ণবী দেবী।
ভগবান বিষ্ণুর এই বৈষ্ণবী মায়াপ্রভাবে স্বয়ং যশোদা দেবী গোপালের মুখে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড দর্শন করে আবার তা বিস্মৃতও হয়েছে। দেবতারাও প্রার্থনায় জানিয়েছেন-

ত্বং বৈষ্ণবী শক্তিরনন্তবীর্যা,
বিশ্বস্য বীজং পরমাসি মায়া ।
সন্মোহিতং দেবি সমস্তমেতৎ,
ত্বং বৈ প্রসন্না ভুবি মুক্তিহেতুঃ ।। 
অর্থাৎ- হে দেবি, তুমি অনন্তবীর্যময়ী বৈষ্ণবী শক্তি । তুমি জগতের মূল কারণ পরমাশক্তি । তুমি এই সমগ্র জগত বিমোহিত করিয়া রাখিয়াছ। আবার তুমিই প্রসন্না হইলে ইহলোকে শরণাগত ভক্তকে মুক্তি প্রদান কর।

এই দেবীর আগমন সম্বন্ধে শ্রীশ্রীচণ্ডীতে লিখিত হয়েছে-

তথৈব বৈষ্ণবীর্শক্তির্গরুড়োপরি সংস্থিতা ।
শঙ্খচক্রগদাশার্ঙ্গখড়্গহস্তাভ্যুপাযযৌ ।।


অর্থাৎ- সেইরূপে গরুড়বাহনা বৈষ্ণবী দেবী শঙ্খ , চক্র, গদা , শার্ঙ্গ ও খড়্গহস্তে চণ্ডিকার সামনে উপস্থিত হইলেন।

বিষ্ণুর শরীর থেকে তাঁরই মতোন দেখতে বৈষ্ণবী দেবী প্রকট হয়ে এলেন। ভগবান বিষ্ণুর বাহন গড়ুর পক্ষী। গড়ুর হল কশ্যপ মুনির সন্তান। তাঁর মাতার নাম বিনতা। মহাভারতে গরুড়ের মাতৃভক্তির গল্প আছে। বৈষ্ণবী দেবী গড়ুরে চলে এলেন। সাধারণত সর্পভোজী বাজপাখীকেই পুরাণকারেরা গড়ুর পক্ষীর সাথে তুলনা করেছেন। কিন্তু একটা জিনিস লক্ষ্য করেছেন- দেবী শঙ্খ, চক্র, গদা , শার্ঙ্গ নামক ধনুক ও খড়্গ এনেছেন। পদ্ম আনেন নি। কারণ দেবী যুদ্ধ করতে এসেছেন। অসুর বধের নিমিত্ত অস্ত্রের প্রয়োজন। আবার ভগবান বিষ্ণু চতুর্ভুজ সুতরাং তাঁর শক্তি বৈষ্ণবী দেবী চার হস্তে পাঁচ অস্ত্র কি ভাবে আনলেন? অবশ্য ভাগবতে ভগবান বিষ্ণুর অষ্টভুজ রূপের উল্লেখ পাওয়া যায়। এখন এই বৈষ্ণবী দেবী চতুর্ভুজ না অষ্টভুজ বা আসলে কটি ভুজা ধারণ করে এসেছেন তা নিয়ে চণ্ডীর ব্যাখা কর্তাদের মধ্যে নানা মতভেদ দেখা যায়। শার্ঙ্গ ধনুক এর হাতল অনেকটা খড়গের মতো । পুরাণে লেখা একবার এই ধনুকের ওপর ভগবান বিষ্ণু শায়িত ছিলেন, অসাবধান বশতঃ ধনুক বক্র থেকে সোজা হলে সেই আঘাতে ভগবান বিষ্ণুর শিরোচ্ছেদ হয়েছিলো। সেই ধড়ে অশ্ব মুণ্ড লাগানো হয়েছিলো। ঐ সময় অশ্বমুখাকৃতি এক দানব ব্রহ্মার থেকে চার বেদ নিয়ে নিলে, ভগবান বিষ্ণু সেই অশ্বমুখ রূপেই সেই দানব বধ করে বেদ উদ্ধার করেন। এই অস্ত্র ধনুক রূপে আবার খড়্গ রূপেও ব্যবহার করা যায়। সেদিক থেকে এক হস্তেই ধনুক ও খড়্গের ধারণ করার কথা। আবার বামন পুরাণে ষড়ভুজা বৈষ্ণবী দেবীর উল্লেখ পাওয়া যায়-

বাহুভির্গরুড়ারূঢ়া শঙ্খচক্রগদাসিনী ।
শার্ঙ্গবাণধরারাতা বৈষ্ণবী রূপশালিনী।।

অর্থাৎ- গরুড়ারূঢ়া রূপশালিনী বৈষ্ণবী ষড় হস্তে শঙ্খ, চক্র, গদা, অসি , ধনু ও বাণ ধারণপূর্বক আগতা হইলেন।

এখানে অনেকের মনে হইতে পারে দেবী শঙ্খ কেন যুদ্ধে এনেছেন ? শঙ্খ হল নাদ শক্তির প্রতীক। আর যুদ্ধ শুরু ও যুদ্ধ বিজয়ের পর শঙ্খধ্বনি করা হয়। এই দেবীর মূল অস্ত্র কিন্তু চক্র। যেমন ভগবান বিষ্ণু সুদর্শন চক্রে অসুর বধ করে ধর্ম সংস্থাপন করেন, তেমনি তেঁনার শক্তি বৈষ্ণবীদেবীর মূল অস্ত্র চক্র। শ্রীশ্রীচণ্ডীর অষ্টম অধ্যায়ের ৩৪ শ্লোকেই উল্লেখ আছে – “মাহেশ্বরী ত্রিশূলেন তথা চক্রেণ বৈষ্ণবী”- অর্থাৎ দেবী বৈষ্ণবী গরুড়ে আসীনা হয়ে চক্র চালনা করে অসুরদের ছিন্নভিন্ন করে দিলেন। চণ্ডীর অষ্টম অধ্যায়ের ৪৭ শ্লোকে আছে – এই দেবীর সাথে রক্তবীজের যুদ্ধ হয়েছিলো। দেবীর চক্রে আহত হয়ে রক্তবীজের শরীর থেকে যত রক্তবিন্দু পতিত হলো ভূমিতে ততগুলি রক্তবীজের জন্ম হয়েছিলো। পরে স্বয়ং দেবী চামুণ্ডা এই রক্তবীজের রুধির পান করে লোভের প্রতীক রক্তবীজকে বধ করেছিলেন । “বৈষ্ণবী” শব্দের অর্থ আমরা ধরি “বৈষ্ণব” শব্দের স্ত্রীলিঙ্গ। বিষ্ণুভক্ত পুরুষদের বলে “বৈষ্ণব” আর বিষ্ণুভক্ত নারীকে বলে “বৈষ্ণবী”। কিন্তু এখানে “বৈষ্ণবী” শব্দ সেই অর্থে প্রযুক্ত নয়। দেবী হলেন ভগবান বিষ্ণুর পালনী শক্তি- অর্থাৎ যে শক্তির বলে ভগবান বিষ্ণু জগত পালন করেন- সেই শক্তি হলেন বৈষ্ণবী ।

ডঃ মহানামব্রত ব্রহ্মচারী মহারাজ চণ্ডীচিন্তাতে লিখেছেন- “সর্ব নরের আশ্রয় নারায়ণের শক্তি । এই শক্তির বলেই নারায়ন জগত পালন ও রক্ষণ করেন । চারিহস্তে শঙ্খ, চক্র, গদা – যুদ্ধের জন্য পদ্মের বদলে শৃঙ্গের হাতল যুক্ত খড়্গ ধারণ করেছেন । সত্ত্বগুনী নির্লোভী গরুড় এঁনার বাহন । শঙ্খে প্রনবনাদ, চক্রে কর্ম প্রবাহ , গদায় ন্যায়দণ্ড, খড়্গে তত্ত্বজ্ঞান । ইঁহারা জগতকে স্থিত রাখেন । জগত রক্ষা ও আসুরিকভাবের ভূমিতে সত্য- ধর্ম সংস্থাপনে এই বৈষ্ণবীশক্তি নিত্য নিরত । ”

দেবীভাগবতপুরাণে এই দেবীর আগমন সম্বন্ধে লিখিত আছে-

বৈষ্ণবী গরুড়ারূঢ়া শঙ্খচক্রগদাধরা ।
পদ্মহস্তা সমায়াতা পীতাম্বর- বিভূষিতা ।।


অর্থাৎ- বিষ্ণুশক্তি বৈষ্ণবী কটিতটে পীতাম্বর পরিধান এবং করচতুষ্টয়ে শঙ্খ, চক্র, গদা, পদ্ম ধারণ করিয়া গরুড়পৃষ্ঠে আরোহিতা হয়ে এলেন।

ব্রহ্মর্ষি সত্যদেব তাঁর সাধন সমর গ্রন্থে এই দেবী সম্বন্ধে লিখেছেন- “ যে চৈতন্যসত্তা স্থিতিশক্তিকে অভিমান করেন, তিনি বিষ্ণু । স্থিতি বা পালনই তাঁহার শক্তি । শার্ঙ্গ অর্থে ধনু অর্থাৎ প্রণব এবং খড়্গ শব্দের অর্থ – দ্বৈতপ্রতীতি- বিলয়কারক অদ্বয় জ্ঞান । বিষ্ণু শব্দ ব্যাপকতা – বোধক। যে সর্বব্যাপী অখণ্ড জ্ঞানের উদয় হইলে দ্বৈতপ্রতীতি বিলয়প্রাপ্ত হয়, সেই অখণ্ড জ্ঞানই বিষ্ণুর হস্তস্থিত খড়গ”

Tuesday, January 8, 2019

মনসার শাপে চাঁদ সওদাগরের সকল পুত্রই সর্পদংশনে নিহত হয়

বেহুলা প্রাচীন বাংলার সুবিখ্যাত মঙ্গলকাব্য মনসামঙ্গলের প্রধান চরিত্র, চাঁদ সওদাগরের একজন অন্যতম হলেন পুত্র লখিন্দরের স্ত্রী।
বেহুলা
বেহুলা

চাঁদ সওদাগরের পুত্র লখিন্দর ও তার ব্যবসায়ীক সতীর্থ সাহার কন্যা বেহুলার জন্ম হয় সমসাময়ীক কালে। দুটি শিশুই একসাথে বেড়ে ওঠে এবং একে অপরের জন্য সম্পুর্ণ উপযুক্ত বলে গণ্য হয়। লখিন্দরের পিতা চন্দ্রবণিক বা চাঁদ সওদাগর ছিলেন হিন্দু দেবতা শিবের একনিষ্ঠ পূজারী। তাই তিনি অন্য কোন দেবতার আরাধনা করতেন না। অপরদিকে শিবের কন্যা মনসা ছিলেন সর্পদেবী, কিন্তু তিনি কোথাও পূজিতা হতেন না। তাঁর পিতা শিব তাঁকে বলেন যে যদি কোন ভক্তিমান শৈব (শিবের উপাসক) প্রথম মনসার পূজা করেন তাহলেই মর্ত্যে তাঁর পূজার প্রচলন সম্ভব। তখন মনসা চাঁদ সওদাগর কে নির্বাচন করে তাঁকেই অনুরোধ করেন মনসা পূজার আয়োজন করার জন্য, কিন্তু শিবের উপাসক চাঁদ সওদাগর মনসার প্রস্তাবে অস্বীকৃত হন। তখন ক্রোধোন্মত্ত মনসা তাঁকে শাপ দেন যে তাঁর প্রত্যেক পুত্রের জীবন তিনি বিনাশ করবেন। মনসার শাপে এইভাবে একে একে লখিন্দর ব্যতীত চাঁদ সওদাগরের সকল পুত্রই সর্পদংশনে নিহত হয়। তাই লখিন্দরের বিবাহের সময় চাঁদ সওদাগর অতিরিক্ত সতর্কতা হিসেবে দেবতা বিশ্বকর্মার সাহায্যে এমন বাসর ঘর তৈরি করেন যা সাপের পক্ষে ছিদ্র করা সম্ভব নয়।

কিন্তু সকল সাবধানতা স্বত্ত্বেও মনসা তার উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে সমর্থ হয়। তার পাঠানো একটি সাপ লখিন্দরকে হত্যা করে। প্রচলিত প্রথা অনুসারে যারা সাপের দংশনে নিহত হত তাদের সত্‌কার প্রচলিত পদ্ধতিতে না করে তাদের মৃতদেহ ভেলায় করে নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হত এ আশায় যে ব্যক্তিটি হয়ত কোন অলৌকিক পদ্ধতিতে ফিরে আসবে। বেহুলা সবার বাঁধা অগ্রাহ্য করে তার মৃত স্বামীর সাথে ভেলায় চড়ে বসে। তারা ছয় মাস ধরে যাত্রা করে এবং গ্রামের পর গ্রাম পাড়ি দিতে থাকে। এই অবস্থায় মৃতদেহ পঁচে যেতে শুরু করে এবং গ্রামবাসীরা তাকে মানসিক ভারসাম্যহীন মনে করতে থাকে। বেহুলা মনসার কাছে প্রার্থনা অব্যাহত রাখে। তবে মনসা ভেলাটিকেই কেবল ভাসিয়ে রাখতে সাহায্য করে।
একসময় ভেলাটি মনসার পালক মাতা নিতার কাছে আসে। তিনি নদীতীরে ধোপার কাজ করার সময় ভেলাটি ভূমি স্পর্শ করে। তিনি মনসার কাছে বেহুলার নিরবচ্ছিন্ন প্রার্থনা দেখে বেহুলাকে তার কাছে নিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি তার ঐশ্বরিক ক্ষমতাবলে চোখের পলকে বেহুলা ও মৃত লখিন্দরকে স্বর্গে পৌছে দেন। মনসা বলেন, তুমি তাকে (লখিন্দর) ফিরে পাবার যোগ্য, কিন্তু এটি কেবলি সম্ভব হবে যদি তুমি তোমার শ্বশুড়কে আবার আমার পূজারী করতে পার।
“আমি পারব,” বেহুলা জবাব দেয় এবং সেই সাথেই তার স্বামীর মৃতদেহে জীবন ফিরে আসতে শুরু করে। তার ক্ষয়ে যাওয়া মাংস ফিরে আসে এবং লখিন্দর তার চোখ মেলে তাকায়। এরপর লখিন্দর বেহুলার দিকে তাকিয়ে হাসে।
তাদের পথপ্রদর্শক নিতাকে নিয়ে তারা পৃথিবীতে ফিরে আসে। বেহুলা তার শ্বাশুড়ির সহযোগীতায় চাঁদ সওদাগরকে মনসার উপাসনা করতে সম্মত করেন।

Sunday, January 6, 2019

জ্বালামুখী দেবীর শক্তিপীঠ


মা জ্বালা দেবীর  শক্তিপীঠ

মা জ্বালা দেবীর এর একটি লীলার কথা শোনা যায়। ঘটনা টা ঐতিহাসিক। মধ্যযুগের ঘটনা । ১১৯২ খ্রীঃ রাজপুত সূর্য বংশীয় রাজা পৃথ্বীরাজ চৌহান নিহত হন। তরাইণের দ্বিতীয় যুদ্ধে মোহম্মদ ঘোরী তাঁকে ছল চাতুরী করে যুদ্ধে বধ করেন। এরপর ভারতবর্ষে দিল্লীতে সুলতানী সাম্রাজ্যের সূচনা হয় । সুলতানী বংশের পরে ভারতে তুঘলক বংশের সূচনা হয় । মোহম্মদ- বিন-তুঘলক কে ‘পাগলা রাজা’ বলা হয় আদতে তিনি তা ছিলেন না। বরং তাঁর সময়ে হিন্দু নির্যাতন ছিল তুলনামূলক ভাবে অনেক কম। কিন্তু ফিরোজ শাহ তুঘলক ছিলেন ঠিক উল্টো। ঘোর ভাবে হিন্দু বিরোধী। এমনকি ইনি স্বধর্মের শিয়া সম্প্রদায়ের বই পত্র পর্যন্ত পুড়িয়ে দেন । ডঃ হীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, ডঃ অসিত কুমার হাজরার ‘ভারতের ইতিহাস’ এ লিখেছেন ইনি প্রচুর মন্দির ধ্বংস করেন, প্রচুর হিন্দু রাজ্য দখল করে লুঠপাঠ, নারী হরণ ইত্যাদি কুকাজ করেন । ডঃ প্রভাতাংশু মাইতির ‘ভারতের ইতিহাস’ এ লিখেছেন- ইনি পুরীর জগন্নাথ মন্দির আক্রমণ করেন, লুঠপাঠ চালান অবাধে ।
 ডঃ মাইতির ‘ভারত ইতিহাস পরিক্রমা’ থেকে জানা যায় ফিরোজ শাহ কাংরা আক্রমণ করেছিলেন । যদিও সেই আক্রমণ সফল হয় নি। বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে ফিরোজ শাহ জ্বালা দেবীর মন্দির লুঠপাঠ ও ধ্বংস করার জন্য রওনা হলেন । তাঁর সেনারা নানান অস্ত্র নিয়ে অশ্ব ছুটিয়ে ধাবমান হলেন । কিন্তু পথে এক জায়গা তে তারা মৌমাছিল আক্রমণের শিকার হলেন । মৌমাছির সাথে কি লড়াই করে পারা যায় ? কাতারে কাতারে ফিরোজের সেনারা মৌমাছির বিষাক্ত হূলে মারা পড়তে লাগলো । মৌমাছির কামড়ে অস্থির হয়ে ফিরোজের বিশাল সেনা অল্প সময়েই ধ্বংস হল। শেষে নিঃসম্বল ফিরোজ অল্প হাতে গোনা সেনা নিয়ে ফিরে গেলো। জ্বালা পীঠ ধ্বংস তার আর করা হল না। মার্কণ্ড পুরানে আছে দেবী শয়ে শয়ে ভীমরুলের রূপ ধরে অরুনাসুর কে বধ করেছিলেন । এখনও স্থানীয় লোকের বিশ্বাস মা জ্বালা সেদিন শত মৌমাছির রূপ ধরে ফিরোজের সেনাকে ধ্বংস করেছিলেন । ফিরোজ ছিল ধর্মান্ধ । স্বজাতির লোককেও অনেক সময় বিশাল অপরাধে নাম মাত্র শাস্তি দিয়ে ছেড়ে দিতেন, বা শাস্তি দিতেন ই না। শিয়া সম্প্রদায়ের ওপর তিনি হামলা চালান বহুবার । হিন্দুদের ওপর নানান কর চাপান । ফিরোজ শাহ শেষ জীবনে খুব দুঃখের সাথে কাটান । তাঁর নিজের লোকেরাই তার সাথে বেইমানী করে প্রচুর যাতনা দেয় । কষ্ট পেয়ে তিনি মারা যান । এবার মন্দির সম্বন্ধে আসি । শিখদের দশম গুরু গোবিন্দ সিং এই মন্দিরে তাঁদের ধর্মগ্রন্থ ‘গ্রন্থসাহিব’ নিত্য পাঠ ও দেবীর পূজা করতেন । তিনি ১৮১৫ খ্রীঃ মন্দির সংস্কার করে এক ভব্য মন্দির নির্মাণ করেন । তাঁর পুত্র খড়গ সিং মন্দিরের দরজা, চৌকাঠ রূপো দিয়ে মুড়ে দেন । দেবীর অগ্নি শিখার বাদিকে গণেশ ও গুরু আচার্য শঙ্করের মূর্তি আছে। সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠলে মহাকাল, মহাবীর, কালভৈরব মূর্তি দেখা যায়। মন্দিরে পাণ্ডার কোন উৎপাত নেই। পুরোহিতের হাতে ডালা দিলে তিনিই পূজো দিয়ে ডাল ফেরত দিয়ে দেন । মন্দির প্রাঙ্গনে রুদ্রকুন্ড, গোমুখী, ব্রহ্মকুন্ড নামক তিনটি কুণ্ড দেখা যায় । রুদ্রকূন্ডর জল অনবরত ফোটে, তবে তাপমাত্রা কম। এই পবিত্র জল স্পর্শের জন্য দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। এখানে নাকি অনেকে দিব্য জ্যোতি দেখেন । একে স্থানীয় ভাষায় ‘লন্ঠনওয়ালী’ বলে ডাকা হয় । ছবিতে দেখুন মায়ের সেই দিব্য জ্যোতি ।

 
Design by দেবীমা | Bloggerized by Lasantha - Premium Blogger Themes | Facebook Themes