Pages

Monday, January 28, 2019

একান্ন শক্তিপীঠের অন্যতম হিন্দু তীর্থক্ষেত্র কালীঘাট মন্দির


কালীঘাট মন্দির

কালীঘাট মন্দির একটি প্রসিদ্ধ কালীমন্দির এবং একান্ন শক্তিপীঠের অন্যতম হিন্দু তীর্থক্ষেত্র। এই তীর্থের পীঠদেবী দক্ষিণাকালী এবং ভৈরব বা পীঠরক্ষক দেবতা নকুলেশ্বর। পৌরাণিক কিংবদন্তি অনুসারে, সতীর দেহত্যাগের পর তাঁর ডান পায়ের চারটি (মতান্তরে একটি) আঙুল এই তীর্থে পতিত হয়েছিল। কালীঘাট একটি বহু প্রাচীন কালীক্ষেত্র। কোনো কোনো গবেষক মনে করেন, "কালীক্ষেত্র" বা "কালীঘাট" কথাটি থেকে "কলকাতা" নামটির উদ্ভব। জনশ্রুতি, ব্রহ্মানন্দ গিরি ও আত্মারাম ব্রহ্মচারী নামে দুই সন্ন্যাসী কষ্টিপাথরের একটি শিলাখণ্ডে দেবীর রূপদান করেন। ১৮০৯ সালে বড়িশার সাবর্ণ জমিদার শিবদাস চৌধুরী, তাঁর পুত্র রামলাল ও ভ্রাতুষ্পুত্র লক্ষ্মীকান্তের উদ্যোগে আদিগঙ্গার তীরে বর্তমান মন্দিরটি নির্মিত হয়েছে। পরবর্তীকালে মন্দিরের কিছু পোড়ামাটির কাজ নষ্ট হয়ে গেলে সন্তোষ রায়চৌধুরী সেগুলি সংস্কার করেন। বর্তমান এই মন্দিরটি নব্বই ফুট উঁচু। এটি নির্মাণ করতে আট বছর সময় লেগেছিল এবং খরচ হয়েছিল ৩০,০০০ টাকা। মন্দির সংলগ্ন জমিটির মোট আয়তন ১ বিঘে ১১ কাঠা ৩ ছটাক; বঙ্গীয় আটচালা স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত মূল মন্দিরটির আয়তন অবশ্য মাত্র ৮ কাঠা।মূল মন্দির সংলগ্ন অনেকগুলি ছোটো ছোটো মন্দিরে রাধাকৃষ্ণ, শিব প্রভৃতি দেবতা পূজিত হন।

কালীঘাট কালীমন্দিরের কষ্টিপাথরের কালীমূর্তিটি অভিনব রীতিতে নির্মিত। মূর্তিটির জিভ, দাঁত ও মুকুট সোনার। হাত ও মুণ্ডমালাটিও সোনার। মন্দিরে মধ্যে একটি সিন্দুকে সতীর প্রস্তরীভূত অঙ্গটি রক্ষিত আছে; এটি কারোর সম্মুখে বের করা হয় না। প্রতি বছর পয়লা বৈশাখ, দুর্গাপূজা ও দীপান্বিতা কালীপূজার দিন মন্দিরে প্রচুর ভক্ত ও পু্ণ্যার্থীর সমাগম ঘটে।

কালীঘাট মন্দিরের নিকটেই পীঠরক্ষক দেবতা নকুলেশ্বর শিবের মন্দির। ১৮৫৪ সালে তারা সিং নামে জনৈক পাঞ্জাবি ব্যবসায়ী বর্তমান নকুলেশ্বর মন্দিরটি নির্মাণ করিয়েছিলেন। শিবরাত্রি ও নীলষষ্ঠী উপলক্ষে এই মন্দিরে প্রচুর ভক্ত সমাগম হয়। কালীমন্দিরের পশ্চিম দিকে রয়েছে শ্যাম রায়ের মন্দির। ১৮৪৩ খ্রিস্টাব্দে বাওয়ালির জমিদার উদয়নারায়ণ মণ্ডল এই মন্দিরটি নির্মাণ করিয়েছিলেন। এখানে রামনবমী ও দোলযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। ১৮৬২ সালে শবদাহের জন্য মন্দিরের অদূরে নির্মিত হয় কেওড়াতলা মহাশ্মশান। বাংলার বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছে এই শ্মশানে। এখানকার শ্মশানকালী পূজা বিখ্যাত।

Friday, January 25, 2019

অর্ধনারীশ্বর হল হিন্দু দেবতা শিব ও তাঁর পত্নী পার্বতীর একটি সম্মিলিত উভলিঙ্গ মূর্তি


অর্ধনারীশ্বর

অর্ধনারীশ্বর হল হিন্দু দেবতা শিব ও তাঁর পত্নী পার্বতীর (যিনি এই মূর্তিতে মহাশক্তি ও উমা নামেও পরিচিত) একটি সম্মিলিত উভলিঙ্গ মূর্তি। অর্ধনারীশ্বর মূর্তিটি অর্ধেক পুরুষ ও অর্ধেক নারী হিসেবে দর্শিত হয়। এই মূর্তিটির ডানপার্শ্বে সাধারণত শিবকে তাঁর প্রথাগত মূর্তিতে দেখা যায়।

অর্ধনারীশ্বরের প্রাচীনতম মূর্তিটি কুষাণ যুগের। খ্রিস্টীয় ১ম শতাব্দী থেকে এই ধরনের মূর্তি নির্মাণ শুরু হয়। গুপ্ত যুগে অর্ধনারীশ্বর মূর্তিটি বিবর্তিত হয় এবং যথাযথ রূপ ধারণ করে। পুরাণ ও বিভিন্ন মূর্তিতত্ত্ব সংক্রান্ত ধর্মগ্রন্থে অর্ধনারীশ্বর বিষয়ক পৌরাণিক কাহিনি ও মূর্তিতত্ত্ব লিখিত হয়েছে। অর্ধনারীশ্বর মূর্তিটি একটি জনপ্রিয় শিল্পকলা হিসেবে ভারতের বেশিরভাগ শিব মন্দিরে দেখা গেলেও, এই মূর্তিটির নিজস্ব মন্দিরের সংখ্যা খুবই কম।

অর্ধনারীশ্বর মূর্তিটি বিশ্বের পুরুষ ও প্রকৃতির শক্তির সম্মিলিত রূপের প্রকাশ। এই মূর্তির মাধ্যমে দেখানো হয়, শক্তি অর্থাৎ ঈশ্বরের নারীসত্ত্বা ও তাঁর পুরুষ সত্ত্বা শিব থেকে অভিন্ন। এই দুই সত্ত্বার সম্মিলনকে সকল সৃষ্টির মূল ও গর্ভ বলে স্তব করা হয়। অন্য একটি মতে, অর্ধনারীশ্বর হলেন শিবের সর্বব্যাপী প্রকৃতির প্রতীক।


অর্ধনারীশ্বর’ নামটির অর্থ ‘অর্ধেক নারী রূপী ঈশ্বর’। অর্ধনারীশ্বর অন্যান্য কিছু নামেও পরিচিত। এগুলি হল: ‘অর্ধনরনারী’ (অর্ধেক নারী-পুরুষ), ‘অর্ধনারীশ’ (অর্ধেক নারী রূপী ঈশ্বর), ‘অর্ধনারীনটেশ্বর’ (অর্ধেক নারী রূপী নটরাজ), ‘পরাঙ্গদা’, ‘নরনারী’ (পুরুষ-নারী), আম্মিয়াপ্পান (তামিল নাম, যেটির অর্থ ‘মাতা-পিতা’), ও ‘অর্ধযুবতীশ্বর’ (অসমে প্রচলিত নাম, যেটির অর্থ ‘অর্ধেক যুবতী রূপী ঈশ্বর’)।গুপ্ত যুগের লেখক পুষ্পদন্ত তাঁর মহিম্নস্তবে শিবের এই রূপটিকে ‘দেহার্ধঘটন’ (“তুমি ও তিনি একই দেহের দুই অর্ধাংশ) নামে বর্ণনা করেছেন। উৎপল তাঁর বৃহৎ সংহিতা টীকায় এই রূপটিকে ‘অর্ধগৌরীশ্বর’ (অর্ধেক গৌরী রূপী ঈশ্বর) নামে অভিহিত করেছেন।[৬] বিষ্ণুধর্মোত্তর পুরাণ গ্রন্থে এই রূপটিকে বলা হয়েছে ‘গৌরীশ্বর’।


উৎস ও প্রাচীন মূর্তিসমূহ
অর্ধনারীশ্বর ধারণাটি সম্ভবত বৈদিক সাহিত্যের যুগ্মমূর্তি যম-যমী, আদি সৃষ্টিকর্তা বিশ্বরূপ বা প্রজাপতি ও অগ্নির বৈদিক বর্ণনা “যিনি একাধারে বৃষ ও গাভী”, বৃহদারণ্যক উপনিষদ্‌ গ্রন্থে উভলিঙ্গ বিশ্বমানব পুরুষ রূপী আত্মা এবং প্রাচীন গ্রিসের হার্মাফ্রোডিটাস ও ফ্রিজিয়ান আগডিস্টিস অঙ্ক্রান্ত পুরাণকথা থেকে অণুপ্রাণিত। বৃহদারণ্যক উপনিষদ্‌ গ্রন্থে বলা হয়েছে, পুরুষ নিজেকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন। একটি ভাগ পুরুষ ও অপর ভাগ নারী। এই দুই ভাগ মিলিত হয়ে সকল প্রাণ সৃষ্টি করেছেন। অর্ধনারীশ্বর কাহিনির মূল বিষয়বস্তু। শ্বেতাশ্বেতর উপনিষদ্‌ পৌরাণিক অর্ধনারীশ্বর ধারণার বীজ বপন করেছে। এই গ্রন্থ মতে, পৌরাণিক শিবের আদি সত্ত্বা রুদ্র সব কিছুর সৃষ্টিকর্তা। তিনিই সাংখ্য দর্শনের পুরুষ (পুরুষ তত্ত্ব) ও প্রকৃতির মূল। এই ধারণা অনুসারে, রুদ্র একাধারে পুরুষ ও নারী। এই ধারণা থেকে রুদ্রের উভলিঙ্গ সত্ত্বার একটি আভাস পাওয়া যায়।

অর্ধনারীশ্বর ধারণাটির উদ্ভব ঘটেছিল যুগপৎ কুষাণ ও গ্রিক সংস্কৃতিতে। কুষাণ যুগে (৩০-৩৭৫ খ্রিস্টাব্দ) অর্ধনারীশ্বরের মূর্তিতত্ত্বটি বিবর্তিত হয়। কিন্তু গুপ্ত যুগেই (৩২০-৬০০ খ্রিস্টাব্দ) এই মূর্তিতত্ত্ব পূর্ণাঙ্গ রূপ পরিগ্রহ করে। কুষাণ যুগের (খ্রিস্টীয় ১ম শতাব্দীর মধ্যভাগের) একটি কেন্দ্রস্তম্ভ এখন মথুরা সংগ্রহালয়ে রক্ষিত আছে। এই স্তম্ভে একটি অর্ধনারী-অর্ধপুরুষ মূর্তি খোদিত রয়েছে। সেই সঙ্গে আরও তিনটি মূর্তিও খোদিত আছে। এই তিনটি মূর্তি বিষ্ণু, গজলক্ষ্মী ও কুবেরের মূর্তি হিসেবে চিহ্নিত করা গিয়েছে। অর্ধনারী-অর্ধপুরুষ মূর্তিটির পুরুষার্ধটি ‘উর্ধলিঙ্গ’ এবং এই অংশে অভয় মুদ্রা প্রদর্শিত হয়েছে। অন্যদিকে নারী-অর্ধটির স্তনটি সুডৌল এবং এই অংশে মূর্তির হাতে একটি দর্পণ দেখা যায়। এটিই অর্ধনারীশ্বর মূর্তির সর্বজনস্বীকৃত প্রাচীনতম নিদর্শন। মথুরা সংগ্রহালয়ে রাজঘাট থেকে প্রাপ্ত একটি প্রাচীন অর্ধনারীশ্বর মূর্তির মস্তকভাগও রক্ষিত আছে। এই মস্তকের পুরুষার্ধটির মাথায় নরকরোটি সংবলিত জটা অর্ধচন্দ্র এবং বাঁদিকের নারী-অর্ধে সুবিন্যস্ত ও পুষ্পশোভিত কেশ এবং কানে পত্রকুণ্ডল বা দুল দেখা যায়। এই মুখে একটিই তৃতীয় নয়ন রয়েছে। অধুনা বিহার রাজ্যের বৈশালী থেকে প্রাপ্ত একটি টেরাকোটার সিলমোহরে অর্ধনারী-অর্ধপুরুষ মূর্তির চিত্র খোদিত রয়েছে। কুষাণ যুগের অর্ধনারীশ্বর মূর্তিগুলি সাধারণ দ্বিভূজ মূর্তি। তবে পরবর্তীকালে রচিত ধর্মগ্রন্থ ও নির্মিত ভাস্কর্যগুলিতে অর্ধনারীশ্বরের মূর্তিতত্ত্বটি আরও জটিল আকার নেয়।

গ্রিক লেখক স্টোবিয়াস(৫০০ খ্রিস্টাব্দ) বার্ডাসেনেসের (১৫৪-২২২ খ্রিস্টাব্দ) রচনা থেকে অর্ধনারীশ্বরের কথা উদ্ধৃত করেছেন। বার্ডাসেনেস এলাগাবালাসের (এমেসার অ্যান্টোনিয়াস) (২১৮-২২ খ্রিস্টাব্দ) রাজত্বকালে সিরিয়ায় একটি ভারতীয় দূতাবাসে সফরে এসে অর্ধনারীশ্বরের কথা জানতে পারেন। তক্ষশীলায় খননকার্য চালিয়ে শক-পার্থিয়ান যুগের টেরাকোটার একটি উভলিঙ্গ আবক্ষ মূর্তি পাওয়া গিয়েছে। এই মূর্তিতে নারীর স্তনবিশিষ্ট এক দাড়িওয়ালা পুরুষকে দেখা যায়।

অর্ধনারীশ্বর মূর্তিটি হিন্দুধর্মের দুটি প্রধান শাখা শৈবধর্ম ও শাক্তধর্মকে সংযুক্ত করার একটি প্রয়াস রূপে ব্যাখ্যা করা হয়। উল্লেখ্য, শৈবধর্ম শিব-উপাসনা কেন্দ্রিক এবং শাক্তধর্ম শক্তি-উপাসনা কেন্দ্রিক সম্প্রদায়। একইভাবে হরিহর মূর্তির দ্বারা শিব এবং বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের সর্বোচ্চ দেবতা বিষ্ণুকে একীভূত করা হয়েছে।

মূর্তিতত্ত্ব
১৬শ শতাব্দীর মূর্তিতত্ত্ব সংক্রান্ত গ্রন্থ শিল্পরত্ন, মৎস্যপুরাণ এবং অংশুমাদভেদাগম, কামিকাগম, সুপ্রেদাগম ও কারণাগম প্রভৃতি আগম শাস্ত্রে অর্ধনারীশ্বরের মূর্তিতত্ত্বটি বর্ণিত হয়েছে। উল্লেখ্য, উপরিউক্ত আগমগুলি প্রধানত দক্ষিণ ভারতে রচিত হয়। শরীরের ডানদিকের ভাগটি প্রধান। এই ভাগটি সাধারণত শিবের। বাঁদিকের ভাগটি পার্বতীর। কোনো কোনো দুর্লভ বিবরণ অনুসারে, ডানদিকের প্রধান অংশটি পার্বতীর। এই বিবরণগুলি শাক্ত সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত। অর্ধনারীশ্বর মূর্তি সাধারণত চতুর্ভূজ, ত্রিভুজ বা দ্বিভূজ। কোনো কোনো দোষ্প্রাপ্য অষ্টভূজ মূর্তিও পাওয়া গিয়েছে। ত্রিভুজ মূর্তিগুলির ক্ষেত্রে পার্বতীর অংশে একটি মাত্র হাত রয়েছে। এর মাধ্যমে এই মূর্তিতে পার্বতীর ভূমিকা হ্রাসের আভাস দেওয়া হয়েছে।

পুরুষার্ধ
অর্ধনারীশ্বর মূর্তির পুরুষার্ধটির মস্তকে ‘জটামুকুট’ (মুকুটের আকারে জটা) দেখা যায়। এই জটামুকুটে শোভা পায় একটি অর্ধচন্দ্র। কোনো কোনো মূর্তিতে জটামুকুটে থাকে সর্প এবং সেই জটা থেকে দেবী গঙ্গাকে নির্গত হতে দেখা যায়। ডান কানে থাকে একটি ‘নক্রকুণ্ডল’, ‘সর্পকুণ্ডল’ (সাপের দুল) বা সাধারণ কুণ্ডল বা কানের দুল। কোনো কোনো মূর্তিতে নারী-অর্ধের তৃতীয় চক্ষুটির চেয়ে পুরুষার্ধের তৃতীয় চক্ষুটি ছোটো এবং পুরুষার্ধে দেখা যায় একটি অর্ধেক গোঁফ। শাস্ত্রে পুরুষার্ধে একটি অর্ধ তৃতীয় নেত্রের উল্লেখ পাওয়া যায়। কোনো কোনো বর্ণনা অনুসারে, অর্ধনারীশ্বরের কপালের মধ্যস্থলে একটি পূর্ণাঙ্গ তৃতীয় নেত্রটি মাঝখান থেকে দুই ভাগে বিভক্ত। পার্বতীর সিন্দূর-বিন্দুর উপরে বা নিচে একটি অর্ধ নেত্রের উল্লেখও রয়েছে। মাথার পিছনে একটি একক ডিম্বাকার জ্যোতিশ্চক্রও (‘প্রভামণ্ডল’ বা ‘প্রভাবলি’) দেখা যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই জ্যোতিশ্চক্রটি দিক অনুসারে ভিন্ন প্রকার।

চতুর্ভূজ মূর্তিগুলিতে ডান হাতে থাকে একটি ‘পরশু’ (কুঠার) এবং অন্য হাতটি ‘অভয় মুদ্রা’র ভঙ্গিতে থাকে। কোনো কোনো মূর্তিতে দেখা যায়, ডান হাতদুটির একটি সামান্য বেঁকে শিবের বাহন নন্দীর উপর স্থাপিত এবং অন্য হাতে দেখা যায় ‘অভয় মুদ্রা’। অন্য একটি ধরনে দেখা যায়, ডান হাতে একটি ত্রিশূল ও অপর হাতটিতে ‘বরমুদ্রা’। অপর একটি শাস্ত্রের বর্ণনা অনুসারে, ডান হাত দুটিতে থাকে ত্রিশূল ও অক্ষমালা। দ্বিভূজ মূর্তিতে ডান হাতে থাকে ‘কপাল’ বা নরকরোটির পাত্র অথবা বরমুদ্রা। কোনো কোনো মূর্তিতে শুধুমাত্র নরকরোটিও দেখা যায়। বাদামী ভাস্কর্যে চতুর্ভূজ মূর্তিতে দেখা যায়, অর্ধনারীশ্বর বাঁ হাত ও ডান হাতের সাহায্যে বীণা বাজাচ্ছেন। তাঁর অপর ডান হাতে একটি পরশু এবং নারী-অর্ধের হাতে একটি পদ্ম রয়েছে।

ব্রোঞ্জনির্মিত ত্রিভুজ অর্ধনারীশ্বর মূর্তি
অর্ধনারীশ্বর মূর্তির শিব-অর্ধে দেখা যায় চ্যাপ্টা পুরুষালি বক্ষস্থল, ঋজু আনুভূমিক বক্ষস্থল, প্রসারিত কাঁধ, প্রসারিত কোমর ও পুরুষোচিত উরুদেশ। তাঁর বুকে ঝোলে একটি যজ্ঞোপবীত। কোথাও কোথাও এই যজ্ঞোপবীতটি হল ‘নাগযজ্ঞোপবীত’ (সর্পনির্মিত যজ্ঞোপবীত) বা মুক্তো বা মণির মালা। কোথাও কোথাও যজ্ঞোপবীতটি দেহের মধ্যভাগটিকে পুরুষ ও নারী-অর্ধে বিভক্ত করেছে। পুরুষার্ধে শিবের মূর্তিতত্ত্ব অনুসারে, সর্পভূষণ সহ নানা অলংকার দেখা যায়।

কোনো কোনো উত্তর ভারতীয় মূর্তিতে[২৭] পুরুষার্ধটির পুরুষাঙ্গটি উন্নত। এটিকে বলা হয় ‘উর্ধলিঙ্গ’ বা ‘উর্ধরেতা’। কোনো কোনো মূর্তিতে পুরুষাঙ্গটি অর্ধেক এবং ডিম্বাশয়ও একটি।যদিও দক্ষিণ ভারতে এমন কোনো মূর্তি পাওয়া যায়নি। মূর্তির কটিদেশে সাধারণত কাপড় (কোনো কোনো ক্ষেত্রে রেশম বা সূতির ধুতি অথবা বাঘ বা হরিণের চামড়া) থাকে। কাপড়টি হাঁটু অবধি ঝোলে। কোমরে থাকে ‘সর্পমেখলা’ বা সাপের তৈরি কোমরবন্ধনী বা অন্য অলংকার। ডান পাটি সামান্য বাঁকা। এটি অনেক ক্ষেত্রে ‘পদ্মপীঠ’ বা পদ্মের বেদীর উপর স্থাপিত অবস্থায় দেখা যায়। সমগ্র ডান-ভাগটি ভষ্মমাখা ও ভয়ংকর। এটি লাল বা সোনালি বা প্রবালের রঙের। যদিও এই ধরনের মূর্তিগুলির বিবরণ দুর্লভ।


Tuesday, January 22, 2019

লঙ্কা ইন্দ্রাক্ষী শক্তিপীঠ রাক্ষসেশ্বর


ইন্দ্রাক্ষী শক্তিপীঠ

“লঙ্কা” নামটা সবারই শোনা । বর্তমানে এটি শ্রীলঙ্কা নামে পরিচিত । রামায়নে এই রাজ্যের নাম পাওয়া যায় । যেখানে রাক্ষসেরা থাকতো । লঙ্কায় রাক্ষস দের রাজা ছিলেন দশানন রাবণ । বহু পূর্বে শিবের ইচ্ছায় দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা এই লঙ্কা নগরীর নির্মাণ করেন। এক সময় এখানে যক্ষাধিপতি কুবের তাঁর পরিবারবর্গ নিয়ে থাকতেন । পরে রাবণের রাজ্য হয় । বর্তমানে আলোচ্য পীঠ লঙ্কায়।

তবে এই পীঠের অবস্থান নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে মতভেদ আছে । রাবণ ছিলেন শিব শক্তি উপাসক । ভদ্রকালী দেবীকে রাবণ দুর্গা রূপে পূজা করতেন । এই পীঠ সম্বন্ধে পীঠনির্ণয়তন্ত্র গ্রন্থে লিখিত আছে –

লঙ্কায়াং নূপুরশ্চৈব ভৈরবো রাক্ষসেশ্বরঃ । 
ইন্দ্রাক্ষী দেবতা তত্র ইন্দ্রোণোপাসিতা পুরা ।।

দেবীর এখানে নূপুর পতিত হয়। দেবীর নাম ইন্দ্রাক্ষী ভৈরবের নাম রাক্ষসেশ্বর । এই দেবীকে দেবতাদের রাজা ইন্দ্রদেবতা পূজা করেছিলেন। কেন ? পরে সেই ঘটনা বলা যাবে । লঙ্কা নগরী নাকি দেবী চামুণ্ডা, শিবের আদেশে পাহাড়া দিতেন। ভগবান শিব বলেছেন- যবে হনুমান লঙ্কাতে আগমন করবে- তবে থেকে দেবীর প্রহরীর দায়িত্ব সমাপন হবে। শ্রীরামের দূত হয়ে হনুমান ভগবান রামের অঙ্গুষ্ঠি নিয়ে আসলে দেবী চামুণ্ডার সাথে সাক্ষাৎ হয়। দেবী বলেন – “এবার লঙ্কার পতনের খুব সময় নেই।” এই বলে দেবী অদৃশ্য হয়েছিলেন । প্রাচীন গ্রন্থে সিংহল নাম পাওয়া যায় । অনেকে সিংহল ও লঙ্কাকে এক ধরেন । কবিকঙ্কণ মুকুন্দরামের “চণ্ডীমঙ্গল” কাব্যে সিংহল এর নাম পাওয়া যায় । ব্রহ্মযামলের আদ্যাস্তবে বলা হয়েছে-

পাতালে বৈষ্ণবীরূপা সিংহলে দেবমোহিণী
সুরসা চ মনিদ্বীপে লঙ্কায়াং ভদ্রকালিকা ।

এখানে সিংহল ও লঙ্কাকে আলাদা বলা হয়েছে। বলা হয়েছে- সিংহলে দেবমোহিণী রূপে ভগবতী বিরাজ করেন, আবার তিনিই ভদ্রকালী রূপে লঙ্কায় বিরাজ করেন । কিন্তু দেবীকে এখানে ইন্দ্র আরাধিতা দেবী “ইন্দ্রাক্ষী” নাম বলা হয়েছে । কি কারণে ইন্দ্র এখানে দেবীর পূজা করলেন ? তিঁনি কি দেবীর কৃপায় সমস্যার সমাধান করতে পেরেছিলেন ? জানতে অপেক্ষা করুন আগামী পর্বের জন্য ।

Friday, January 18, 2019

সর্বমঙ্গলা মায়ের ঘট প্রতিষ্ঠা

সর্বমঙ্গলা  মায়ের ঘট প্রতিষ্ঠা
বর্ধমানের অধিষ্ঠাত্রী দেবী দেবী সর্বমঙ্গলা। তাঁর পুজো প্রায়  সাড়ে তিনশো বছরেরও বেশি পুরোনো। সর্বমঙ্গলার ঘট প্রতিষ্ঠার মধ্যে দিয়ে শারদোৎসবের আনুষ্ঠানিক সূচনা করা হয়ে থাকে পূর্ব বর্ধমানে। বাদ্যযন্ত্র সহকারে বিশাল শোভাযাত্রায় ঢল নামে পুণ্যার্থীদের। দেবী সর্বমঙ্গলার ঘটপূর্ণ জল নিয়ে ঘোড়ার গাড়ি নানা পথ পরিক্রমা করেন । শোভাযাত্রা  সর্বমঙ্গলা মন্দিরে এসে পৌঁছতেই বাদ্যযন্ত্র, শাঁখ, ঘন্টা, কাঁসি ও হুলুধ্বনির মধ্যে দিয়ে দুর্গাপুজোর ঘট প্রতিষ্ঠা করা হয়। এখানে সর্বমঙ্গলা দেবীর মূর্তি কষ্টি পাথরের অষ্টাদশভূজা সিংহবাহিনী ‘মহিষমর্দিনী’ মহালক্ষীরূপিণী। সর্বমঙ্গলা মন্দির অবিভক্ত বাংলার প্রথম নবরত্ন মন্দির। প্রাচীন এই মন্দির বর্ধমানের মানুষের কাছে পবিত্র তীর্থস্থান।  দেশ-বিদেশের লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থী ও পর্যটকদের সমাগম হয় এই মন্দিরে।
মন্দিরের ঐতিহাসিক গুরুত্বের কথা ভেবে প্রাচীন এই মন্দিরকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। কথিত আছে, প্রায় সাড়ে তিনশো বছর আগে শহর বর্ধমানের উত্তরাংশে বাহির সর্বমঙ্গলা পাড়ায় বাগদিরা পুকুরে মাছ ধরতে গিয়ে একটি শিলামূর্তি পেয়েছিল। সেটিকে প্রস্তর খণ্ড ভেবে তার উপরে শামুক–গুগলি থেঁতো করতো। সেই সময় দামোদর নদ লাগোয়া চুন তৈরির কারখানার জন্য শামুকের খোলা নেওয়ার সময় শিলামূর্তিটি চলে যায় চুন ভাটায়। তখন শামুকের খোলের সঙ্গে শিলামূর্তিটি পোড়ানো হলেও মূর্তির কোনো ক্ষতি হয়নি। তবে সেই রাতে স্বপ্নাদেশ পাওয়া মাত্র বর্ধমান মহারাজা সঙ্গম রায় শিলামূর্তিটিকে নিয়ে এসে সর্বমঙ্গলা নামে পুজো শুরু করেন। পরবর্তীকালে ১৭০২ সালে টেরাকোটার নিপুণ কারুকার্য খচিত মন্দির নির্মাণ করেন মহারাজাধিরাজ কীর্তিচাঁদ মহতাব। ক্রমে মূল মন্দিরের আশেপাশে গড়ে ওঠে নাট মন্দির, শ্বেত পাথরের তৈরি রামেশ্বর ও বাণেশ্বর নামে দুটি শিব মন্দির। কালো পাথরে তৈরি হয় মিত্রেশ্বর, চন্দ্রশ্বর ও ইন্দ্রেশ্বর নামে আরও তিনটি শিব মন্দির। মন্দিরের নিত্যপুজো ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে রাজবংশের শেষ যুবরাজ উদয়চাঁদ মহতাব ট্রাস্ট কমিটি গঠন করেন।

Tuesday, January 15, 2019

যশোরেশ্বরী কালী বাংলাদেশের একটি বিখ্যাত মন্দির


বিখ্যাত মন্দির

হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের যশোরেশ্বরী কালী মন্দির বাংলাদেশের একটি বিখ্যাত মন্দির। এ শক্তিপীঠটি সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার ঈশ্বরীপুর গ্রামে অবস্থিত। যশোরেশ্বরী নামের অর্থ "যশোরের দেবী"। হিন্দু ভক্তদের জন্য এটি একটি পবিত্র তীর্থস্থান।
গুরুত্ব
সত্য যুগে দক্ষ যজ্ঞের পর সতী মাতা দেহ ত্যাগ করলে মহাদেব সতীর মৃতদেহ কাঁধে নিয়ে বিশ্বব্যাপী প্রলয় নৃত্য শুরু করলে বিষ্ণু দেব সুদর্শন চক্র দ্বারা সতীর মৃতদেহ ছেদন করেন। এতে সতী মাতার দেহখণ্ডসমূহ ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন স্থানে পতিত হয় এবং এ সকল স্থানসমূহ শক্তিপীঠ হিসেবে পরিচিতি পায়।

ইতিহাস
ধারনা করা হয় যে, মন্দিরটি আনারি নামের এক ব্রাহ্মণ কর্তৃক নির্মিত হয়। তিনি এই যশোরেশ্বরী শক্তিপীঠের ১০০টি দরজা নির্মাণ করেন। কিন্তু মন্দিরটি কখন নির্মিত হয় তা জানা যায়নি। পরবর্তীকালে লক্ষ্মণ সেন ও প্রতাপাদিত্য কর্তৃক তাদের রাজত্বকালে এটির সংস্কার করা হয়েছিল

নাটমন্দির' ও স্থাপত্য
মূল মন্দির সংলগ্ন স্থানে নাটমন্দির নামে একটি বৃহ মঞ্চমণ্ডপ নির্মাণ করা হয়েছিল যেখান হতে দেবীর মুখমণ্ডল দেখা যায়। এটি লক্ষ্মণ সেন কর্তৃক ত্রয়োদশ শতাব্দীতে নির্মাণ করা হয়েছিল কিন্তু কারা এটি নির্মাণ করেছিল তা জানা যায়নি। ১৯৭১ সালের পর এটি ভেঙে পড়ে। এখন শুধুমাত্র স্তম্ভগুলি দেখা যায়।

Thursday, January 10, 2019

বিষ্ণু শক্তি বৈষ্ণবী দেবী দুর্গা

বিষ্ণু শক্তি বৈষ্ণবী দেবী দুর্গা
বিষ্ণু শক্তি বৈষ্ণবী দেবী দুর্গা

“বৈষ্ণবী” এই নামটির সাথে “বিষ্ণু” নামের সাদৃশ্য দেখতে পাই। ভগবান বিষ্ণুকে আমরা ‘নারায়ণ’, ‘হরি’ ইত্যাদি নামে পূজা করি। ভগবান বিষ্ণু ত্রিদেবের একজন। ইঁনি জগত পালন করেন। এই জগতে ধর্মে সংস্থাপন ও অধর্মের বিনাশের জন্য বহুবার ভগবান বিষ্ণু মর্তলোকে নরশরীর ধারণ করে অবতীর্ণ হন। এমনকি পশুর শরীর অবলম্বন করেন যেমন নৃসিংহ , বরাহ, হংস অবতার ইত্যাদি। বৈকুণ্ঠনিবাসী ভগবান বিষ্ণু যে শক্তিবলে ধরিত্রীলোকে অবতার গ্রহণ করে দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন করে সেই বৈষ্ণবী শক্তিই হলেন দেবী আদিশক্তি। তিঁনি চণ্ডীর বর্ণিত অষ্টমাতৃকার একজন বৈষ্ণবী দেবী।
ভগবান বিষ্ণুর এই বৈষ্ণবী মায়াপ্রভাবে স্বয়ং যশোদা দেবী গোপালের মুখে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড দর্শন করে আবার তা বিস্মৃতও হয়েছে। দেবতারাও প্রার্থনায় জানিয়েছেন-

ত্বং বৈষ্ণবী শক্তিরনন্তবীর্যা,
বিশ্বস্য বীজং পরমাসি মায়া ।
সন্মোহিতং দেবি সমস্তমেতৎ,
ত্বং বৈ প্রসন্না ভুবি মুক্তিহেতুঃ ।। 
অর্থাৎ- হে দেবি, তুমি অনন্তবীর্যময়ী বৈষ্ণবী শক্তি । তুমি জগতের মূল কারণ পরমাশক্তি । তুমি এই সমগ্র জগত বিমোহিত করিয়া রাখিয়াছ। আবার তুমিই প্রসন্না হইলে ইহলোকে শরণাগত ভক্তকে মুক্তি প্রদান কর।

এই দেবীর আগমন সম্বন্ধে শ্রীশ্রীচণ্ডীতে লিখিত হয়েছে-

তথৈব বৈষ্ণবীর্শক্তির্গরুড়োপরি সংস্থিতা ।
শঙ্খচক্রগদাশার্ঙ্গখড়্গহস্তাভ্যুপাযযৌ ।।


অর্থাৎ- সেইরূপে গরুড়বাহনা বৈষ্ণবী দেবী শঙ্খ , চক্র, গদা , শার্ঙ্গ ও খড়্গহস্তে চণ্ডিকার সামনে উপস্থিত হইলেন।

বিষ্ণুর শরীর থেকে তাঁরই মতোন দেখতে বৈষ্ণবী দেবী প্রকট হয়ে এলেন। ভগবান বিষ্ণুর বাহন গড়ুর পক্ষী। গড়ুর হল কশ্যপ মুনির সন্তান। তাঁর মাতার নাম বিনতা। মহাভারতে গরুড়ের মাতৃভক্তির গল্প আছে। বৈষ্ণবী দেবী গড়ুরে চলে এলেন। সাধারণত সর্পভোজী বাজপাখীকেই পুরাণকারেরা গড়ুর পক্ষীর সাথে তুলনা করেছেন। কিন্তু একটা জিনিস লক্ষ্য করেছেন- দেবী শঙ্খ, চক্র, গদা , শার্ঙ্গ নামক ধনুক ও খড়্গ এনেছেন। পদ্ম আনেন নি। কারণ দেবী যুদ্ধ করতে এসেছেন। অসুর বধের নিমিত্ত অস্ত্রের প্রয়োজন। আবার ভগবান বিষ্ণু চতুর্ভুজ সুতরাং তাঁর শক্তি বৈষ্ণবী দেবী চার হস্তে পাঁচ অস্ত্র কি ভাবে আনলেন? অবশ্য ভাগবতে ভগবান বিষ্ণুর অষ্টভুজ রূপের উল্লেখ পাওয়া যায়। এখন এই বৈষ্ণবী দেবী চতুর্ভুজ না অষ্টভুজ বা আসলে কটি ভুজা ধারণ করে এসেছেন তা নিয়ে চণ্ডীর ব্যাখা কর্তাদের মধ্যে নানা মতভেদ দেখা যায়। শার্ঙ্গ ধনুক এর হাতল অনেকটা খড়গের মতো । পুরাণে লেখা একবার এই ধনুকের ওপর ভগবান বিষ্ণু শায়িত ছিলেন, অসাবধান বশতঃ ধনুক বক্র থেকে সোজা হলে সেই আঘাতে ভগবান বিষ্ণুর শিরোচ্ছেদ হয়েছিলো। সেই ধড়ে অশ্ব মুণ্ড লাগানো হয়েছিলো। ঐ সময় অশ্বমুখাকৃতি এক দানব ব্রহ্মার থেকে চার বেদ নিয়ে নিলে, ভগবান বিষ্ণু সেই অশ্বমুখ রূপেই সেই দানব বধ করে বেদ উদ্ধার করেন। এই অস্ত্র ধনুক রূপে আবার খড়্গ রূপেও ব্যবহার করা যায়। সেদিক থেকে এক হস্তেই ধনুক ও খড়্গের ধারণ করার কথা। আবার বামন পুরাণে ষড়ভুজা বৈষ্ণবী দেবীর উল্লেখ পাওয়া যায়-

বাহুভির্গরুড়ারূঢ়া শঙ্খচক্রগদাসিনী ।
শার্ঙ্গবাণধরারাতা বৈষ্ণবী রূপশালিনী।।

অর্থাৎ- গরুড়ারূঢ়া রূপশালিনী বৈষ্ণবী ষড় হস্তে শঙ্খ, চক্র, গদা, অসি , ধনু ও বাণ ধারণপূর্বক আগতা হইলেন।

এখানে অনেকের মনে হইতে পারে দেবী শঙ্খ কেন যুদ্ধে এনেছেন ? শঙ্খ হল নাদ শক্তির প্রতীক। আর যুদ্ধ শুরু ও যুদ্ধ বিজয়ের পর শঙ্খধ্বনি করা হয়। এই দেবীর মূল অস্ত্র কিন্তু চক্র। যেমন ভগবান বিষ্ণু সুদর্শন চক্রে অসুর বধ করে ধর্ম সংস্থাপন করেন, তেমনি তেঁনার শক্তি বৈষ্ণবীদেবীর মূল অস্ত্র চক্র। শ্রীশ্রীচণ্ডীর অষ্টম অধ্যায়ের ৩৪ শ্লোকেই উল্লেখ আছে – “মাহেশ্বরী ত্রিশূলেন তথা চক্রেণ বৈষ্ণবী”- অর্থাৎ দেবী বৈষ্ণবী গরুড়ে আসীনা হয়ে চক্র চালনা করে অসুরদের ছিন্নভিন্ন করে দিলেন। চণ্ডীর অষ্টম অধ্যায়ের ৪৭ শ্লোকে আছে – এই দেবীর সাথে রক্তবীজের যুদ্ধ হয়েছিলো। দেবীর চক্রে আহত হয়ে রক্তবীজের শরীর থেকে যত রক্তবিন্দু পতিত হলো ভূমিতে ততগুলি রক্তবীজের জন্ম হয়েছিলো। পরে স্বয়ং দেবী চামুণ্ডা এই রক্তবীজের রুধির পান করে লোভের প্রতীক রক্তবীজকে বধ করেছিলেন । “বৈষ্ণবী” শব্দের অর্থ আমরা ধরি “বৈষ্ণব” শব্দের স্ত্রীলিঙ্গ। বিষ্ণুভক্ত পুরুষদের বলে “বৈষ্ণব” আর বিষ্ণুভক্ত নারীকে বলে “বৈষ্ণবী”। কিন্তু এখানে “বৈষ্ণবী” শব্দ সেই অর্থে প্রযুক্ত নয়। দেবী হলেন ভগবান বিষ্ণুর পালনী শক্তি- অর্থাৎ যে শক্তির বলে ভগবান বিষ্ণু জগত পালন করেন- সেই শক্তি হলেন বৈষ্ণবী ।

ডঃ মহানামব্রত ব্রহ্মচারী মহারাজ চণ্ডীচিন্তাতে লিখেছেন- “সর্ব নরের আশ্রয় নারায়ণের শক্তি । এই শক্তির বলেই নারায়ন জগত পালন ও রক্ষণ করেন । চারিহস্তে শঙ্খ, চক্র, গদা – যুদ্ধের জন্য পদ্মের বদলে শৃঙ্গের হাতল যুক্ত খড়্গ ধারণ করেছেন । সত্ত্বগুনী নির্লোভী গরুড় এঁনার বাহন । শঙ্খে প্রনবনাদ, চক্রে কর্ম প্রবাহ , গদায় ন্যায়দণ্ড, খড়্গে তত্ত্বজ্ঞান । ইঁহারা জগতকে স্থিত রাখেন । জগত রক্ষা ও আসুরিকভাবের ভূমিতে সত্য- ধর্ম সংস্থাপনে এই বৈষ্ণবীশক্তি নিত্য নিরত । ”

দেবীভাগবতপুরাণে এই দেবীর আগমন সম্বন্ধে লিখিত আছে-

বৈষ্ণবী গরুড়ারূঢ়া শঙ্খচক্রগদাধরা ।
পদ্মহস্তা সমায়াতা পীতাম্বর- বিভূষিতা ।।


অর্থাৎ- বিষ্ণুশক্তি বৈষ্ণবী কটিতটে পীতাম্বর পরিধান এবং করচতুষ্টয়ে শঙ্খ, চক্র, গদা, পদ্ম ধারণ করিয়া গরুড়পৃষ্ঠে আরোহিতা হয়ে এলেন।

ব্রহ্মর্ষি সত্যদেব তাঁর সাধন সমর গ্রন্থে এই দেবী সম্বন্ধে লিখেছেন- “ যে চৈতন্যসত্তা স্থিতিশক্তিকে অভিমান করেন, তিনি বিষ্ণু । স্থিতি বা পালনই তাঁহার শক্তি । শার্ঙ্গ অর্থে ধনু অর্থাৎ প্রণব এবং খড়্গ শব্দের অর্থ – দ্বৈতপ্রতীতি- বিলয়কারক অদ্বয় জ্ঞান । বিষ্ণু শব্দ ব্যাপকতা – বোধক। যে সর্বব্যাপী অখণ্ড জ্ঞানের উদয় হইলে দ্বৈতপ্রতীতি বিলয়প্রাপ্ত হয়, সেই অখণ্ড জ্ঞানই বিষ্ণুর হস্তস্থিত খড়গ”

Tuesday, January 8, 2019

মনসার শাপে চাঁদ সওদাগরের সকল পুত্রই সর্পদংশনে নিহত হয়

বেহুলা প্রাচীন বাংলার সুবিখ্যাত মঙ্গলকাব্য মনসামঙ্গলের প্রধান চরিত্র, চাঁদ সওদাগরের একজন অন্যতম হলেন পুত্র লখিন্দরের স্ত্রী।
বেহুলা
বেহুলা

চাঁদ সওদাগরের পুত্র লখিন্দর ও তার ব্যবসায়ীক সতীর্থ সাহার কন্যা বেহুলার জন্ম হয় সমসাময়ীক কালে। দুটি শিশুই একসাথে বেড়ে ওঠে এবং একে অপরের জন্য সম্পুর্ণ উপযুক্ত বলে গণ্য হয়। লখিন্দরের পিতা চন্দ্রবণিক বা চাঁদ সওদাগর ছিলেন হিন্দু দেবতা শিবের একনিষ্ঠ পূজারী। তাই তিনি অন্য কোন দেবতার আরাধনা করতেন না। অপরদিকে শিবের কন্যা মনসা ছিলেন সর্পদেবী, কিন্তু তিনি কোথাও পূজিতা হতেন না। তাঁর পিতা শিব তাঁকে বলেন যে যদি কোন ভক্তিমান শৈব (শিবের উপাসক) প্রথম মনসার পূজা করেন তাহলেই মর্ত্যে তাঁর পূজার প্রচলন সম্ভব। তখন মনসা চাঁদ সওদাগর কে নির্বাচন করে তাঁকেই অনুরোধ করেন মনসা পূজার আয়োজন করার জন্য, কিন্তু শিবের উপাসক চাঁদ সওদাগর মনসার প্রস্তাবে অস্বীকৃত হন। তখন ক্রোধোন্মত্ত মনসা তাঁকে শাপ দেন যে তাঁর প্রত্যেক পুত্রের জীবন তিনি বিনাশ করবেন। মনসার শাপে এইভাবে একে একে লখিন্দর ব্যতীত চাঁদ সওদাগরের সকল পুত্রই সর্পদংশনে নিহত হয়। তাই লখিন্দরের বিবাহের সময় চাঁদ সওদাগর অতিরিক্ত সতর্কতা হিসেবে দেবতা বিশ্বকর্মার সাহায্যে এমন বাসর ঘর তৈরি করেন যা সাপের পক্ষে ছিদ্র করা সম্ভব নয়।

কিন্তু সকল সাবধানতা স্বত্ত্বেও মনসা তার উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে সমর্থ হয়। তার পাঠানো একটি সাপ লখিন্দরকে হত্যা করে। প্রচলিত প্রথা অনুসারে যারা সাপের দংশনে নিহত হত তাদের সত্‌কার প্রচলিত পদ্ধতিতে না করে তাদের মৃতদেহ ভেলায় করে নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হত এ আশায় যে ব্যক্তিটি হয়ত কোন অলৌকিক পদ্ধতিতে ফিরে আসবে। বেহুলা সবার বাঁধা অগ্রাহ্য করে তার মৃত স্বামীর সাথে ভেলায় চড়ে বসে। তারা ছয় মাস ধরে যাত্রা করে এবং গ্রামের পর গ্রাম পাড়ি দিতে থাকে। এই অবস্থায় মৃতদেহ পঁচে যেতে শুরু করে এবং গ্রামবাসীরা তাকে মানসিক ভারসাম্যহীন মনে করতে থাকে। বেহুলা মনসার কাছে প্রার্থনা অব্যাহত রাখে। তবে মনসা ভেলাটিকেই কেবল ভাসিয়ে রাখতে সাহায্য করে।
একসময় ভেলাটি মনসার পালক মাতা নিতার কাছে আসে। তিনি নদীতীরে ধোপার কাজ করার সময় ভেলাটি ভূমি স্পর্শ করে। তিনি মনসার কাছে বেহুলার নিরবচ্ছিন্ন প্রার্থনা দেখে বেহুলাকে তার কাছে নিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি তার ঐশ্বরিক ক্ষমতাবলে চোখের পলকে বেহুলা ও মৃত লখিন্দরকে স্বর্গে পৌছে দেন। মনসা বলেন, তুমি তাকে (লখিন্দর) ফিরে পাবার যোগ্য, কিন্তু এটি কেবলি সম্ভব হবে যদি তুমি তোমার শ্বশুড়কে আবার আমার পূজারী করতে পার।
“আমি পারব,” বেহুলা জবাব দেয় এবং সেই সাথেই তার স্বামীর মৃতদেহে জীবন ফিরে আসতে শুরু করে। তার ক্ষয়ে যাওয়া মাংস ফিরে আসে এবং লখিন্দর তার চোখ মেলে তাকায়। এরপর লখিন্দর বেহুলার দিকে তাকিয়ে হাসে।
তাদের পথপ্রদর্শক নিতাকে নিয়ে তারা পৃথিবীতে ফিরে আসে। বেহুলা তার শ্বাশুড়ির সহযোগীতায় চাঁদ সওদাগরকে মনসার উপাসনা করতে সম্মত করেন।

Sunday, January 6, 2019

জ্বালামুখী দেবীর শক্তিপীঠ


মা জ্বালা দেবীর  শক্তিপীঠ

মা জ্বালা দেবীর এর একটি লীলার কথা শোনা যায়। ঘটনা টা ঐতিহাসিক। মধ্যযুগের ঘটনা । ১১৯২ খ্রীঃ রাজপুত সূর্য বংশীয় রাজা পৃথ্বীরাজ চৌহান নিহত হন। তরাইণের দ্বিতীয় যুদ্ধে মোহম্মদ ঘোরী তাঁকে ছল চাতুরী করে যুদ্ধে বধ করেন। এরপর ভারতবর্ষে দিল্লীতে সুলতানী সাম্রাজ্যের সূচনা হয় । সুলতানী বংশের পরে ভারতে তুঘলক বংশের সূচনা হয় । মোহম্মদ- বিন-তুঘলক কে ‘পাগলা রাজা’ বলা হয় আদতে তিনি তা ছিলেন না। বরং তাঁর সময়ে হিন্দু নির্যাতন ছিল তুলনামূলক ভাবে অনেক কম। কিন্তু ফিরোজ শাহ তুঘলক ছিলেন ঠিক উল্টো। ঘোর ভাবে হিন্দু বিরোধী। এমনকি ইনি স্বধর্মের শিয়া সম্প্রদায়ের বই পত্র পর্যন্ত পুড়িয়ে দেন । ডঃ হীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, ডঃ অসিত কুমার হাজরার ‘ভারতের ইতিহাস’ এ লিখেছেন ইনি প্রচুর মন্দির ধ্বংস করেন, প্রচুর হিন্দু রাজ্য দখল করে লুঠপাঠ, নারী হরণ ইত্যাদি কুকাজ করেন । ডঃ প্রভাতাংশু মাইতির ‘ভারতের ইতিহাস’ এ লিখেছেন- ইনি পুরীর জগন্নাথ মন্দির আক্রমণ করেন, লুঠপাঠ চালান অবাধে ।
 ডঃ মাইতির ‘ভারত ইতিহাস পরিক্রমা’ থেকে জানা যায় ফিরোজ শাহ কাংরা আক্রমণ করেছিলেন । যদিও সেই আক্রমণ সফল হয় নি। বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে ফিরোজ শাহ জ্বালা দেবীর মন্দির লুঠপাঠ ও ধ্বংস করার জন্য রওনা হলেন । তাঁর সেনারা নানান অস্ত্র নিয়ে অশ্ব ছুটিয়ে ধাবমান হলেন । কিন্তু পথে এক জায়গা তে তারা মৌমাছিল আক্রমণের শিকার হলেন । মৌমাছির সাথে কি লড়াই করে পারা যায় ? কাতারে কাতারে ফিরোজের সেনারা মৌমাছির বিষাক্ত হূলে মারা পড়তে লাগলো । মৌমাছির কামড়ে অস্থির হয়ে ফিরোজের বিশাল সেনা অল্প সময়েই ধ্বংস হল। শেষে নিঃসম্বল ফিরোজ অল্প হাতে গোনা সেনা নিয়ে ফিরে গেলো। জ্বালা পীঠ ধ্বংস তার আর করা হল না। মার্কণ্ড পুরানে আছে দেবী শয়ে শয়ে ভীমরুলের রূপ ধরে অরুনাসুর কে বধ করেছিলেন । এখনও স্থানীয় লোকের বিশ্বাস মা জ্বালা সেদিন শত মৌমাছির রূপ ধরে ফিরোজের সেনাকে ধ্বংস করেছিলেন । ফিরোজ ছিল ধর্মান্ধ । স্বজাতির লোককেও অনেক সময় বিশাল অপরাধে নাম মাত্র শাস্তি দিয়ে ছেড়ে দিতেন, বা শাস্তি দিতেন ই না। শিয়া সম্প্রদায়ের ওপর তিনি হামলা চালান বহুবার । হিন্দুদের ওপর নানান কর চাপান । ফিরোজ শাহ শেষ জীবনে খুব দুঃখের সাথে কাটান । তাঁর নিজের লোকেরাই তার সাথে বেইমানী করে প্রচুর যাতনা দেয় । কষ্ট পেয়ে তিনি মারা যান । এবার মন্দির সম্বন্ধে আসি । শিখদের দশম গুরু গোবিন্দ সিং এই মন্দিরে তাঁদের ধর্মগ্রন্থ ‘গ্রন্থসাহিব’ নিত্য পাঠ ও দেবীর পূজা করতেন । তিনি ১৮১৫ খ্রীঃ মন্দির সংস্কার করে এক ভব্য মন্দির নির্মাণ করেন । তাঁর পুত্র খড়গ সিং মন্দিরের দরজা, চৌকাঠ রূপো দিয়ে মুড়ে দেন । দেবীর অগ্নি শিখার বাদিকে গণেশ ও গুরু আচার্য শঙ্করের মূর্তি আছে। সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠলে মহাকাল, মহাবীর, কালভৈরব মূর্তি দেখা যায়। মন্দিরে পাণ্ডার কোন উৎপাত নেই। পুরোহিতের হাতে ডালা দিলে তিনিই পূজো দিয়ে ডাল ফেরত দিয়ে দেন । মন্দির প্রাঙ্গনে রুদ্রকুন্ড, গোমুখী, ব্রহ্মকুন্ড নামক তিনটি কুণ্ড দেখা যায় । রুদ্রকূন্ডর জল অনবরত ফোটে, তবে তাপমাত্রা কম। এই পবিত্র জল স্পর্শের জন্য দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। এখানে নাকি অনেকে দিব্য জ্যোতি দেখেন । একে স্থানীয় ভাষায় ‘লন্ঠনওয়ালী’ বলে ডাকা হয় । ছবিতে দেখুন মায়ের সেই দিব্য জ্যোতি ।

 
Design by দেবীমা | Bloggerized by Lasantha - Premium Blogger Themes | Facebook Themes