Pages

Thursday, January 10, 2019

বিষ্ণু শক্তি বৈষ্ণবী দেবী দুর্গা

বিষ্ণু শক্তি বৈষ্ণবী দেবী দুর্গা
বিষ্ণু শক্তি বৈষ্ণবী দেবী দুর্গা

“বৈষ্ণবী” এই নামটির সাথে “বিষ্ণু” নামের সাদৃশ্য দেখতে পাই। ভগবান বিষ্ণুকে আমরা ‘নারায়ণ’, ‘হরি’ ইত্যাদি নামে পূজা করি। ভগবান বিষ্ণু ত্রিদেবের একজন। ইঁনি জগত পালন করেন। এই জগতে ধর্মে সংস্থাপন ও অধর্মের বিনাশের জন্য বহুবার ভগবান বিষ্ণু মর্তলোকে নরশরীর ধারণ করে অবতীর্ণ হন। এমনকি পশুর শরীর অবলম্বন করেন যেমন নৃসিংহ , বরাহ, হংস অবতার ইত্যাদি। বৈকুণ্ঠনিবাসী ভগবান বিষ্ণু যে শক্তিবলে ধরিত্রীলোকে অবতার গ্রহণ করে দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন করে সেই বৈষ্ণবী শক্তিই হলেন দেবী আদিশক্তি। তিঁনি চণ্ডীর বর্ণিত অষ্টমাতৃকার একজন বৈষ্ণবী দেবী।
ভগবান বিষ্ণুর এই বৈষ্ণবী মায়াপ্রভাবে স্বয়ং যশোদা দেবী গোপালের মুখে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড দর্শন করে আবার তা বিস্মৃতও হয়েছে। দেবতারাও প্রার্থনায় জানিয়েছেন-

ত্বং বৈষ্ণবী শক্তিরনন্তবীর্যা,
বিশ্বস্য বীজং পরমাসি মায়া ।
সন্মোহিতং দেবি সমস্তমেতৎ,
ত্বং বৈ প্রসন্না ভুবি মুক্তিহেতুঃ ।। 
অর্থাৎ- হে দেবি, তুমি অনন্তবীর্যময়ী বৈষ্ণবী শক্তি । তুমি জগতের মূল কারণ পরমাশক্তি । তুমি এই সমগ্র জগত বিমোহিত করিয়া রাখিয়াছ। আবার তুমিই প্রসন্না হইলে ইহলোকে শরণাগত ভক্তকে মুক্তি প্রদান কর।

এই দেবীর আগমন সম্বন্ধে শ্রীশ্রীচণ্ডীতে লিখিত হয়েছে-

তথৈব বৈষ্ণবীর্শক্তির্গরুড়োপরি সংস্থিতা ।
শঙ্খচক্রগদাশার্ঙ্গখড়্গহস্তাভ্যুপাযযৌ ।।


অর্থাৎ- সেইরূপে গরুড়বাহনা বৈষ্ণবী দেবী শঙ্খ , চক্র, গদা , শার্ঙ্গ ও খড়্গহস্তে চণ্ডিকার সামনে উপস্থিত হইলেন।

বিষ্ণুর শরীর থেকে তাঁরই মতোন দেখতে বৈষ্ণবী দেবী প্রকট হয়ে এলেন। ভগবান বিষ্ণুর বাহন গড়ুর পক্ষী। গড়ুর হল কশ্যপ মুনির সন্তান। তাঁর মাতার নাম বিনতা। মহাভারতে গরুড়ের মাতৃভক্তির গল্প আছে। বৈষ্ণবী দেবী গড়ুরে চলে এলেন। সাধারণত সর্পভোজী বাজপাখীকেই পুরাণকারেরা গড়ুর পক্ষীর সাথে তুলনা করেছেন। কিন্তু একটা জিনিস লক্ষ্য করেছেন- দেবী শঙ্খ, চক্র, গদা , শার্ঙ্গ নামক ধনুক ও খড়্গ এনেছেন। পদ্ম আনেন নি। কারণ দেবী যুদ্ধ করতে এসেছেন। অসুর বধের নিমিত্ত অস্ত্রের প্রয়োজন। আবার ভগবান বিষ্ণু চতুর্ভুজ সুতরাং তাঁর শক্তি বৈষ্ণবী দেবী চার হস্তে পাঁচ অস্ত্র কি ভাবে আনলেন? অবশ্য ভাগবতে ভগবান বিষ্ণুর অষ্টভুজ রূপের উল্লেখ পাওয়া যায়। এখন এই বৈষ্ণবী দেবী চতুর্ভুজ না অষ্টভুজ বা আসলে কটি ভুজা ধারণ করে এসেছেন তা নিয়ে চণ্ডীর ব্যাখা কর্তাদের মধ্যে নানা মতভেদ দেখা যায়। শার্ঙ্গ ধনুক এর হাতল অনেকটা খড়গের মতো । পুরাণে লেখা একবার এই ধনুকের ওপর ভগবান বিষ্ণু শায়িত ছিলেন, অসাবধান বশতঃ ধনুক বক্র থেকে সোজা হলে সেই আঘাতে ভগবান বিষ্ণুর শিরোচ্ছেদ হয়েছিলো। সেই ধড়ে অশ্ব মুণ্ড লাগানো হয়েছিলো। ঐ সময় অশ্বমুখাকৃতি এক দানব ব্রহ্মার থেকে চার বেদ নিয়ে নিলে, ভগবান বিষ্ণু সেই অশ্বমুখ রূপেই সেই দানব বধ করে বেদ উদ্ধার করেন। এই অস্ত্র ধনুক রূপে আবার খড়্গ রূপেও ব্যবহার করা যায়। সেদিক থেকে এক হস্তেই ধনুক ও খড়্গের ধারণ করার কথা। আবার বামন পুরাণে ষড়ভুজা বৈষ্ণবী দেবীর উল্লেখ পাওয়া যায়-

বাহুভির্গরুড়ারূঢ়া শঙ্খচক্রগদাসিনী ।
শার্ঙ্গবাণধরারাতা বৈষ্ণবী রূপশালিনী।।

অর্থাৎ- গরুড়ারূঢ়া রূপশালিনী বৈষ্ণবী ষড় হস্তে শঙ্খ, চক্র, গদা, অসি , ধনু ও বাণ ধারণপূর্বক আগতা হইলেন।

এখানে অনেকের মনে হইতে পারে দেবী শঙ্খ কেন যুদ্ধে এনেছেন ? শঙ্খ হল নাদ শক্তির প্রতীক। আর যুদ্ধ শুরু ও যুদ্ধ বিজয়ের পর শঙ্খধ্বনি করা হয়। এই দেবীর মূল অস্ত্র কিন্তু চক্র। যেমন ভগবান বিষ্ণু সুদর্শন চক্রে অসুর বধ করে ধর্ম সংস্থাপন করেন, তেমনি তেঁনার শক্তি বৈষ্ণবীদেবীর মূল অস্ত্র চক্র। শ্রীশ্রীচণ্ডীর অষ্টম অধ্যায়ের ৩৪ শ্লোকেই উল্লেখ আছে – “মাহেশ্বরী ত্রিশূলেন তথা চক্রেণ বৈষ্ণবী”- অর্থাৎ দেবী বৈষ্ণবী গরুড়ে আসীনা হয়ে চক্র চালনা করে অসুরদের ছিন্নভিন্ন করে দিলেন। চণ্ডীর অষ্টম অধ্যায়ের ৪৭ শ্লোকে আছে – এই দেবীর সাথে রক্তবীজের যুদ্ধ হয়েছিলো। দেবীর চক্রে আহত হয়ে রক্তবীজের শরীর থেকে যত রক্তবিন্দু পতিত হলো ভূমিতে ততগুলি রক্তবীজের জন্ম হয়েছিলো। পরে স্বয়ং দেবী চামুণ্ডা এই রক্তবীজের রুধির পান করে লোভের প্রতীক রক্তবীজকে বধ করেছিলেন । “বৈষ্ণবী” শব্দের অর্থ আমরা ধরি “বৈষ্ণব” শব্দের স্ত্রীলিঙ্গ। বিষ্ণুভক্ত পুরুষদের বলে “বৈষ্ণব” আর বিষ্ণুভক্ত নারীকে বলে “বৈষ্ণবী”। কিন্তু এখানে “বৈষ্ণবী” শব্দ সেই অর্থে প্রযুক্ত নয়। দেবী হলেন ভগবান বিষ্ণুর পালনী শক্তি- অর্থাৎ যে শক্তির বলে ভগবান বিষ্ণু জগত পালন করেন- সেই শক্তি হলেন বৈষ্ণবী ।

ডঃ মহানামব্রত ব্রহ্মচারী মহারাজ চণ্ডীচিন্তাতে লিখেছেন- “সর্ব নরের আশ্রয় নারায়ণের শক্তি । এই শক্তির বলেই নারায়ন জগত পালন ও রক্ষণ করেন । চারিহস্তে শঙ্খ, চক্র, গদা – যুদ্ধের জন্য পদ্মের বদলে শৃঙ্গের হাতল যুক্ত খড়্গ ধারণ করেছেন । সত্ত্বগুনী নির্লোভী গরুড় এঁনার বাহন । শঙ্খে প্রনবনাদ, চক্রে কর্ম প্রবাহ , গদায় ন্যায়দণ্ড, খড়্গে তত্ত্বজ্ঞান । ইঁহারা জগতকে স্থিত রাখেন । জগত রক্ষা ও আসুরিকভাবের ভূমিতে সত্য- ধর্ম সংস্থাপনে এই বৈষ্ণবীশক্তি নিত্য নিরত । ”

দেবীভাগবতপুরাণে এই দেবীর আগমন সম্বন্ধে লিখিত আছে-

বৈষ্ণবী গরুড়ারূঢ়া শঙ্খচক্রগদাধরা ।
পদ্মহস্তা সমায়াতা পীতাম্বর- বিভূষিতা ।।


অর্থাৎ- বিষ্ণুশক্তি বৈষ্ণবী কটিতটে পীতাম্বর পরিধান এবং করচতুষ্টয়ে শঙ্খ, চক্র, গদা, পদ্ম ধারণ করিয়া গরুড়পৃষ্ঠে আরোহিতা হয়ে এলেন।

ব্রহ্মর্ষি সত্যদেব তাঁর সাধন সমর গ্রন্থে এই দেবী সম্বন্ধে লিখেছেন- “ যে চৈতন্যসত্তা স্থিতিশক্তিকে অভিমান করেন, তিনি বিষ্ণু । স্থিতি বা পালনই তাঁহার শক্তি । শার্ঙ্গ অর্থে ধনু অর্থাৎ প্রণব এবং খড়্গ শব্দের অর্থ – দ্বৈতপ্রতীতি- বিলয়কারক অদ্বয় জ্ঞান । বিষ্ণু শব্দ ব্যাপকতা – বোধক। যে সর্বব্যাপী অখণ্ড জ্ঞানের উদয় হইলে দ্বৈতপ্রতীতি বিলয়প্রাপ্ত হয়, সেই অখণ্ড জ্ঞানই বিষ্ণুর হস্তস্থিত খড়গ”

0 comments:

Post a Comment

 
Design by দেবীমা | Bloggerized by Lasantha - Premium Blogger Themes | Facebook Themes