Pages

Tuesday, February 5, 2019

জ্ঞান, সংগীত ও শিল্পকলার দেবী সরস্বতী

সরস্বতী
ঋগ্বেদে তিনি বৈদিক সরস্বতী নদীর অভিন্ন এক রূপ। সরস্বতী সৃষ্টিদেবতা ব্রহ্মার পত্নী এবং লক্ষ্মী ও পার্বতীর সঙ্গে একযোগে ত্রিদেবী নামে পরিচিত। এ ত্রিদেবী যথাক্রমে ত্রিমূর্তি সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা, পালনকর্তা বিষ্ণু ও সংহারকর্তা শিবের পত্নী। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, সরস্বতী প্রাচীনতম ধর্মগ্রন্থ বেদ রচনা করেন। হিন্দু ধর্ম ছাড়াও খ্রিস্টীয় চতুর্থ ও পঞ্চম শতকে রচিত মহাযান বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ মহাযান সূূত্রেও সরস্বতী দেবীর উল্লেখ রয়েছে।

সরস্বতী মূলত বৈদিক দেবী। বেদে কিন্তু সরস্বতী প্রধানত নদীর অধিষ্ঠাত্রী দেবী। সরস্বতী শব্দের আদি অর্থ— জলবতী অর্থাত্ নদী। বৈদিক জ্যোতিরূপা সরস্বতী ও নদী সরস্বতী সম্মিলিতভাবে জ্ঞানের দেবী রূপে পুরাণতন্ত্র ও সাহিত্যে বিপুল শ্রদ্ধা এবং ভক্তির অধিকারিণী হয়েছেন। তিনি সনাতন সংস্কৃতি ডিঙিয়ে জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মের পূজার আসনে অধিষ্ঠিত। সরস্বতীর আরাধনা ক্রমবিস্তৃতির সঙ্গে সঙ্গে তার রূপকল্পনাও বৈচিত্র্য লাভ করেছে। সাধারণত তিনি চতুর্ভুজা, পদ্মাসনা, শুভ্রবর্ণা, বীণা-পুস্তক, জপমালা, সুধাকলসধারিণী, চন্দ্রশেখরা, ত্রিলোচনা। কখনো দেবী দ্বিভুজা। তন্ত্রে সরস্বতী বাগীশ্বরী-বর্ণেশ্বরী সারদা।

পণ্ডিতদের অনেকেই মনে করেন, সরস্বতী প্রথমে ছিলেন নদী, পরে হলেন দেবী। রমেশচন্দ্র দত্ত লিখেছেন, ‘আর্য্যাবর্তে সরস্বতী নামে যে নদী আছে, তাই প্রথমে দেবী বলে পূজিত হয়েছিলেন। বর্তমানে গঙ্গা যেমন সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উপাস্য দেবী হিসেবে পূজা পেয়ে থাকেন এবং ক্রমান্বয়ে সরস্বতী হলেন জ্ঞানের দেবী।’

বৃহস্পতি হচ্ছেন জ্ঞানের দেবতা, তিনি বাকপতিও। বৃহস্পতি-পত্নী সরস্বতীও জ্ঞানের দেবী। সব জ্ঞানের ভাণ্ডার তো ব্রহ্মা-বিষ্ণু আর মহেশ্বরের। তাদেরই শক্তিতে সরস্বতী জ্ঞানের দেবী। সরস্বতী নদীর তীরে যজ্ঞের আগুন জ্বেলে সেখানেই ঋষি লাভ করেছিলেন বেদ। সুতরাং সরস্বতী জ্ঞানের দেবী হিসেবেই পরিচিত হয়েছিলেন ধরায়। দিনে দিনে সরস্বতী তার অন্য বৈশিষ্ট্যগুলো হারিয়ে কেবল বিদ্যার দেবীতে পরিণত হলেন।

সরস্বতী বৈদিক দেবী হলেও তার পূজার বর্তমান রূপটি আধুনিককালে প্রচলিত হয়েছে। তবে প্রাচীনকালে তান্ত্রিক সাধকরা সরস্বতীসদৃশ দেবী বাগেশ্বরীর পূজা করতেন বলে জানা যায়। উনিশ শতকে পাঠশালায় প্রতি মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে ধোয়া চৌকির ওপর তালপাতা, দোয়াত-কলম রেখে পূজা করার প্রথা ছিল। শ্রীপঞ্চমী তিথিতে শিক্ষার্থীরা বাড়িতে বাংলা বা সংস্কৃত গ্রন্থ, স্লেট, দোয়াত ও কলমে সরস্বতী পূজা করত। শহরের ধনাঢ্য ব্যক্তিরাই সরস্বতীর প্রতিমা নির্মাণ করে পূজা করতেন। আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরস্বতী পূজার প্রচলন হয় বিশ শতকের প্রথমার্ধে।

ভারতবর্ষে দেবী সরস্বতী বিদ্যা ও ললিতকলার দেবী হিসেবে পূজিত হচ্ছেন সেই আদিকাল থেকে। কিন্তু ভারতবর্ষের বাইরেও দেবী সরস্বতীর পূজা হয়ে থাকে। চীনে শস্যদেবী কুয়ানজিনের সঙ্গে দেবী সরস্বতীর তুলনা করা যেতে পারে। কেউ কেউ আবার মধ্যপ্রাচ্যের মাতৃকাদেবী ইসতার বা ইনান্নার সঙ্গে দেবী সরস্বতীর তুলনা করেছেন। গ্রিক দেবী এথেনির সঙ্গে দেবী সরস্বতীর সাদৃশ্য অনেকে কল্পনা করে থাকেন। আবার রোমের দেবী মিনার্ভার সঙ্গেও সাদৃশ্য আছে বলে মনে করা হয়। রোমের দেবী মিনার্ভা ও কেলটিক দেবী বিঘ্রিদের সঙ্গে প্রকৃতিগত দিক থেকে সরস্বতীর সাদৃশ্য রয়েছে ঠিকই, তবে এ দুই দেবীর সঙ্গে ভারতবর্ষীয় সরস্বতী দেবীর সম্পর্ক নির্ণয় করা সম্ভব নয়। কেবল জাপানের বিদ্যাদেবী বেনতেন যে ভারতবর্ষীয় সরস্বতী দেবীর বিদেশে আতিথ্য গ্রহণের সাক্ষ্য, এটুকুই নিশ্চিতভাবে বলা যায়।

বর্তমানে সরস্বতী প্রায় সব জায়গায়ই দ্বিভুজা। তার হাতে বীণা অপরিহার্য। বীণা অবশ্যই সংগীত ও অন্যান্য কলাবিদ্যার প্রতীক। অক্ষরমালা বা জপমালাও অধ্যাত্মবিদ্যার প্রতীক। শুক পাখিও বিদ্যা বা বাক্যের প্রতীক হিসেবে সরস্বতীর হাতে শোভা বাড়াচ্ছে। আচার্য যোগেশচন্দ্র রায়ের মতে, ‘দ্বিভুজা বীণাপাণি সরস্বতী প্রতিমা গত ১৫০ বছরের মধ্যে কল্পিতা হয়েছেন।’

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিদ্যা ও সংগীতের দেবী সরস্বতীর আরাধনাকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠেয় একটি অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উত্সব সরস্বতী পূজা। শাস্ত্রীয় বিধান অনুসারে, শ্রীপঞ্চমীর দিন সকালেই সরস্বতী পূজা সম্পন্ন করা হয়। সরস্বতীর পূজা সাধারণ পূজার নিয়মানুসারেই হয়ে থাকে। তবে এ পূজায় কয়েকটি বিশেষ উপাচার বা সামগ্রীর প্রয়োজন হয়। যেমন— আবীর, আমের মুকুল, দোয়াত-কলম ও যবের শীষ। পূজার জন্য গাঁদা ফুলও দরকার পড়ে। লোকাচার অনুসারে, শিক্ষার্থীরা পূজার আগে কুল ভক্ষণ করে না। পূজার দিন লেখাপড়া নিষেধ থাকে। যথাবিহিত পূজার পর লক্ষ্মী-নারায়ণ, লেখনী-মস্যাধার (দোয়াত-কলম), পুস্তক ও বাদ্যযন্ত্রেরও পূজা করার প্রথা প্রচলিত আছে। পূজা শেষে পুষ্পাঞ্জলি দেয়ার প্রথাটি অত্যন্ত জনপ্রিয়। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের দলবেঁধে অঞ্জলি দিতে দেখা যায়।

0 comments:

Post a Comment

 
Design by দেবীমা | Bloggerized by Lasantha - Premium Blogger Themes | Facebook Themes