Pages

Thursday, March 28, 2019

শাস্ত্রে দুর্গার নয়টি নির্দিষ্ট মূর্তিকে ‘নবদুর্গা’ বলে



দুর্গা—এই নামটি শুনলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটা দেবীমূর্তি। তাঁর দশ হাতে দশ রকম অস্ত্র, এক পা সিংহের পিঠে, এক পা অসুরের কাঁধে। তাঁকে ঘিরে থাকেন গণেশ, লক্ষ্মী, সরস্বতী আর কার্তিক ঠাকুর। যাঁরা সেকেলে কেতায় ঠাকুর বানান, তাঁদের ঠাকুরের পিছনে চালচিত্রে আরও নানারকম ঠাকুরদেবতার ছবিও আঁকা থাকে। আর যাঁরা আধুনিক, তাঁরা প্রতিমার মাথার উপর একখানা ক্যালেন্ডারের শিবঠাকুর ঝুলিয়ে রাখেন। মোটামুটি এই মূর্তি বছর বছর দেখে আমরা অভ্যস্ত। তবে মাঝে মাঝে পুজো উদ্যোক্তারা একটু স্বাদবদলের জন্য বানান পঞ্চদুর্গা, নবদুর্গা, একাদশ দুর্গা, একান্ন দুর্গা ইত্যাদি। শাস্ত্রে কতরকম মাতৃমূর্তির কথা আছে। তার থেকেই সামর্থ্য অনুযায়ী কয়েকটা বেছে নিয়ে পঞ্চদুর্গা, নবদুর্গা ইত্যাদি বানানো। আমাদের ছেলেবেলায় দেখেছি, থিমপুজো শুরু হওয়ার আগে এই সব প্যান্ডেল নিয়ে ঠাকুর-দর্শনার্থীদের মধ্যে একটা বিশেষ আগ্রহ থাকত। এখনও আছে। মায়ের সনাতন মূর্তির আবেদন কখনও ম্লান হয় না ঠিকই, কিন্তু মানুষ এই সুযোগে অন্যান্য রূপগুলি দেখে চোখ জুড়িয়ে নিতেও ছাড়েন না।

শাস্ত্রে দুর্গার নয়টি নির্দিষ্ট মূর্তিকে ‘নবদুর্গা’ বলে। এঁরা হলেন—ব্রহ্মাণী, কৌমারী, বৈষ্ণবী, কৌমারী, নারসিংহী, বারাহী, ইন্দ্রাণী, চামুণ্ডা, কাত্যায়নী ও চণ্ডিকা। দুর্গাপূজার সময় দেবীদুর্গার আবরণদেবতা হিসেবে এঁদের পূজা করা হয়। আবার নবপত্রিকা (কলাবউ)-এর নয়টি গাছও নয় দেবীর প্রতীক। এঁরা হলেন—ব্রহ্মাণী (কলা), কালিকা (কচু), দুর্গা (হলুদ), জয়ন্তী (জায়ফল), শিবা (বেল), রক্তদন্তিকা (ডালিম), শোকরহিতা (অশোক), চামুণ্ডা (মান) ও লক্ষ্মী (ধান)। এঁরা পূজিত হন ‘ওঁ নবপত্রিকাবাসিন্যৈ নবদুর্গায়ৈ নমঃ’ মন্ত্রে।

তবে এঁরা ছাড়াও তন্ত্রে, পুরাণে আরও কয়েকজন দুর্গা-নামধারিণী দেবীর সন্ধান পাই। আবার দেবী দুর্গার অন্যান্য কয়েকটি রূপেরও দেখা পাওয়া যায়। আমরা সাধারণত দুর্গার যে মূর্তিটি শারদীয়া উৎসবে পূজা করি, সেই মূর্তিটির শাস্ত্রসম্মত নাম মহিষাসুরমর্দিনী-দুর্গা। স্মার্তমতে যাঁরা পঞ্চদেবতার পূজা করেন, তাঁরা জয়দুর্গার নাম ও ধ্যানমন্ত্রের সঙ্গে পরিচিত। এছাড়া আছেন মহিষমর্দিনী-দুর্গা, কাত্যায়নী-দুর্গা, নীলকণ্ঠী-দুর্গা, ক্ষেমঙ্করী-দুর্গা, হরসিদ্ধি-দুর্গা, রুদ্রাংশ-দুর্গা, বনদুর্গা, অগ্নিদুর্গা, বিন্ধ্যবাসিনী-দুর্গা, রিপুমারি-দুর্গা, অপরাজিতা-দুর্গা প্রমুখ দেবীগণ। এঁরা সবাই আগম-শাস্ত্রপ্রসিদ্ধ দেবী। এছাড়া তন্ত্রশাস্ত্রে দুর্গা-নাম্নী দেবীর যে ধ্যানমন্ত্র পাওয়া যায়, সেটিও আমাদের দেখা দশভুজা-মূর্তির মতো নয়।

মহিষাসুরমর্দিনী-দুর্গাকে নিয়ে আমাদের নতুন করে কিছুর বলার নেই। দুর্গাপূজায় প্রচলিত ‘জটাজুটসমাযুক্তা’ ইত্যাদি ধ্যানমন্ত্রের আধারে নির্মিত এই দেবীমূর্তি আমাদের সকলেরই পরম-পরিচিত। তবে বিষ্ণুধর্মোত্তর পুরাণ-এ মহিষাসুরমর্দিনীর একটু আলাদা রকমের বর্ণনা আমরা পাই। চণ্ডিকা নামে উল্লিখিত এই দুর্গার দশের জায়গায় কুড়িটি হাত। শ্রীশ্রীচণ্ডী-তে অষ্টাদশভূজা মহালক্ষ্মীর কথা আছে, এঁর হাত তাঁর থেকেও দুটি বেশি। ডান দিকের দশ হাতে থাকে শূল, খড়্গ, শঙ্খ, চক্র, বাণ, শক্তি, বজ্র, অভয়, ডমরু, ছাতা; আর বাঁদিকের দশ হাতে থাকে নাগপাশ, খেটক, পরশু, অঙ্কুশ, ধনুক, ঘণ্টা, পতাকা, গদা, আয়না ও মুগুর। বাকি সবই আমাদের চেনা মূর্তিটির মতো। দেবী কাত্যায়নী-দুর্গার মূর্তিটিও আমাদের দশভূজা-দুর্গার অনুরূপ। তবে আমাদের পরিচিত মহিষাসুরমর্দিনী ও তন্ত্রকথিত মহিষমর্দিনীর রূপে সামান্য ফারাক আছে। দেবী মহিষমর্দিনী অষ্টভুজা। এঁর ধ্যানে সিংহের উল্লেখ পাওয়া যায় না। দেবীকে মহিষের মাথার উপর বসে থাকতে দেখা যায়। হাতে থাকে শঙ্খ, চক্র, খড়্গ, খেটক, ধনুক, বাণ, শূল ও তর্জনীমুদ্রা। এর পূজার বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল—শঙ্খপাত্রে অর্ঘ্যস্থাপনের উপর নিষেধাজ্ঞা; মৃৎপাত্রে এই কাজটি করতে হয়।

কুলাচারে পূজিতা দেবী জয়দুর্গার মূর্তিটি কিছুটা আমাদের পরিচিত জগদ্ধাত্রী মূর্তির মতো। শুধু দেবীর চার হাতে থাকে শঙ্খ, চক্র, খড়্গ ও ত্রিশূল এবং দেবীর গায়ের রং কালীর মতো কালো। কপালে থাকে অর্ধচন্দ্র। সিংহের পদতলে হাতি অনুপস্থিত। কেউ কেউ মনে করেন, জয়দুর্গা কালী ও দুর্গার সম্মিলিত মূর্তি।

Tuesday, March 26, 2019

বিষ্ণু শক্তি বৈষ্ণবী দেবী দুর্গা

“বৈষ্ণবী” এই নামটির সাথে “বিষ্ণু” নামের সাদৃশ্য দেখতে পাই। ভগবান বিষ্ণুকে আমরা ‘নারায়ণ’, ‘হরি’ ইত্যাদি নামে পূজা করি। ভগবান বিষ্ণু ত্রিদেবের একজন। ইঁনি জগত পালন করেন। এই জগতে ধর্মে সংস্থাপন ও অধর্মের বিনাশের জন্য বহুবার ভগবান বিষ্ণু মর্তলোকে নরশরীর ধারণ করে অবতীর্ণ হন।

ত্বং বৈষ্ণবী শক্তিরনন্তবীর্যা,
বিশ্বস্য বীজং পরমাসি মায়া ।
সন্মোহিতং দেবি সমস্তমেতৎ,
ত্বং বৈ প্রসন্না ভুবি মুক্তিহেতুঃ ।।
( শ্রীশ্রীচণ্ডী- একাদশ অধ্যায়- শ্লোক- ৫ )

অর্থাৎ- হে দেবি, তুমি অনন্তবীর্যময়ী বৈষ্ণবী শক্তি । তুমি জগতের মূল কারণ পরমাশক্তি । তুমি এই সমগ্র জগত বিমোহিত করিয়া রাখিয়াছ। আবার তুমিই প্রসন্না হইলে ইহলোকে শরণাগত ভক্তকে মুক্তি প্রদান কর।

এই দেবীর আগমন সম্বন্ধে শ্রীশ্রীচণ্ডীতে লিখিত হয়েছে-

তথৈব বৈষ্ণবীর্শক্তির্গরুড়োপরি সংস্থিতা ।
শঙ্খচক্রগদাশার্ঙ্গখড়্গহস্তাভ্যুপাযযৌ ।।
( শ্রীশ্রী চণ্ডী... অষ্টম অধ্যায়... শ্লোক- ১৮ )

অর্থাৎ- সেইরূপে গরুড়বাহনা বৈষ্ণবী দেবী শঙ্খ , চক্র, গদা , শার্ঙ্গ ও খড়্গহস্তে চণ্ডিকার সামনে উপস্থিত হইলেন।

বিষ্ণুর শরীর থেকে তাঁরই মতোন দেখতে বৈষ্ণবী দেবী প্রকট হয়ে এলেন। ভগবান বিষ্ণুর বাহন গড়ুর পক্ষী। গড়ুর হল কশ্যপ মুনির সন্তান। তাঁর মাতার নাম বিনতা। মহাভারতে গরুড়ের মাতৃভক্তির গল্প আছে। বৈষ্ণবী দেবী গড়ুরে চলে এলেন। সাধারণত সর্পভোজী বাজপাখীকেই পুরাণকারেরা গড়ুর পক্ষীর সাথে তুলনা করেছেন। কিন্তু একটা জিনিস লক্ষ্য করেছেন- দেবী শঙ্খ, চক্র, গদা , শার্ঙ্গ নামক ধনুক ও খড়্গ এনেছেন। পদ্ম আনেন নি। কারণ দেবী যুদ্ধ করতে এসেছেন। অসুর বধের নিমিত্ত অস্ত্রের প্রয়োজন। আবার ভগবান বিষ্ণু চতুর্ভুজ সুতরাং তাঁর শক্তি বৈষ্ণবী দেবী চার হস্তে পাঁচ অস্ত্র কি ভাবে আনলেন? অবশ্য ভাগবতে ভগবান বিষ্ণুর অষ্টভুজ রূপের উল্লেখ পাওয়া যায়। এখন এই বৈষ্ণবী দেবী চতুর্ভুজ না অষ্টভুজ বা আসলে কটি ভুজা ধারণ করে এসেছেন তা নিয়ে চণ্ডীর ব্যাখা কর্তাদের মধ্যে নানা মতভেদ দেখা যায়। শার্ঙ্গ ধনুক এর হাতল অনেকটা খড়গের মতো । পুরাণে লেখা একবার এই ধনুকের ওপর ভগবান বিষ্ণু শায়িত ছিলেন, অসাবধান বশতঃ ধনুক বক্র থেকে সোজা হলে সেই আঘাতে ভগবান বিষ্ণুর শিরোচ্ছেদ হয়েছিলো। সেই ধড়ে অশ্ব মুণ্ড লাগানো হয়েছিলো। ঐ সময় অশ্বমুখাকৃতি এক দানব ব্রহ্মার থেকে চার বেদ নিয়ে নিলে, ভগবান বিষ্ণু সেই অশ্বমুখ রূপেই সেই দানব বধ করে বেদ উদ্ধার করেন। এই অস্ত্র ধনুক রূপে আবার খড়্গ রূপেও ব্যবহার করা যায়। সেদিক থেকে এক হস্তেই ধনুক ও খড়্গের ধারণ করার কথা। আবার বামন পুরাণে ষড়ভুজা বৈষ্ণবী দেবীর উল্লেখ পাওয়া যায়-

বাহুভির্গরুড়ারূঢ়া শঙ্খচক্রগদাসিনী ।
শার্ঙ্গবাণধরারাতা বৈষ্ণবী রূপশালিনী।।

অর্থাৎ- গরুড়ারূঢ়া রূপশালিনী বৈষ্ণবী ষড় হস্তে শঙ্খ, চক্র, গদা, অসি , ধনু ও বাণ ধারণপূর্বক আগতা হইলেন।
এখানে অনেকের মনে হইতে পারে দেবী শঙ্খ কেন যুদ্ধে এনেছেন ? শঙ্খ হল নাদ শক্তির প্রতীক। আর যুদ্ধ শুরু ও যুদ্ধ বিজয়ের পর শঙ্খধ্বনি করা হয়। এই দেবীর মূল অস্ত্র কিন্তু চক্র। যেমন ভগবান বিষ্ণু সুদর্শন চক্রে অসুর বধ করে ধর্ম সংস্থাপন করেন, তেমনি তেঁনার শক্তি বৈষ্ণবীদেবীর মূল অস্ত্র চক্র। শ্রীশ্রীচণ্ডীর অষ্টম অধ্যায়ের ৩৪ শ্লোকেই উল্লেখ আছে – “মাহেশ্বরী ত্রিশূলেন তথা চক্রেণ বৈষ্ণবী”- অর্থাৎ দেবী বৈষ্ণবী গরুড়ে আসীনা হয়ে চক্র চালনা করে অসুরদের ছিন্নভিন্ন করে দিলেন। চণ্ডীর অষ্টম অধ্যায়ের ৪৭ শ্লোকে আছে – এই দেবীর সাথে রক্তবীজের যুদ্ধ হয়েছিলো। দেবীর চক্রে আহত হয়ে রক্তবীজের শরীর থেকে যত রক্তবিন্দু পতিত হলো ভূমিতে ততগুলি রক্তবীজের জন্ম হয়েছিলো। পরে স্বয়ং দেবী চামুণ্ডা এই রক্তবীজের রুধির পান করে লোভের প্রতীক রক্তবীজকে বধ করেছিলেন । “বৈষ্ণবী” শব্দের অর্থ আমরা ধরি “বৈষ্ণব” শব্দের স্ত্রীলিঙ্গ।

বিষ্ণুভক্ত পুরুষদের বলে “বৈষ্ণব” আর বিষ্ণুভক্ত নারীকে বলে “বৈষ্ণবী”। কিন্তু এখানে “বৈষ্ণবী” শব্দ সেই অর্থে প্রযুক্ত নয়। দেবী হলেন ভগবান বিষ্ণুর পালনী শক্তি- অর্থাৎ যে শক্তির বলে ভগবান বিষ্ণু জগত পালন করেন- সেই শক্তি হলেন বৈষ্ণবী ।

ডঃ মহানামব্রত ব্রহ্মচারী মহারাজ চণ্ডীচিন্তাতে লিখেছেন- “সর্ব নরের আশ্রয় নারায়ণের শক্তি । এই শক্তির বলেই নারায়ন জগত পালন ও রক্ষণ করেন । চারিহস্তে শঙ্খ, চক্র, গদা – যুদ্ধের জন্য পদ্মের বদলে শৃঙ্গের হাতল যুক্ত খড়্গ ধারণ করেছেন । সত্ত্বগুনী নির্লোভী গরুড় এঁনার বাহন । শঙ্খে প্রনবনাদ, চক্রে কর্ম প্রবাহ , গদায় ন্যায়দণ্ড, খড়্গে তত্ত্বজ্ঞান । ইঁহারা জগতকে স্থিত রাখেন । জগত রক্ষা ও আসুরিকভাবের ভূমিতে সত্য- ধর্ম সংস্থাপনে এই বৈষ্ণবীশক্তি নিত্য নিরত । ”

দেবীভাগবতপুরাণে এই দেবীর আগমন সম্বন্ধে লিখিত আছে-

বৈষ্ণবী গরুড়ারূঢ়া শঙ্খচক্রগদাধরা ।
পদ্মহস্তা সমায়াতা পীতাম্বর- বিভূষিতা ।।
( দেবীভাগবত... পঞ্চম স্কন্ধ... অষ্টবিংশোহধ্যায়ঃ... শ্লোক- ২১ )

অর্থাৎ- বিষ্ণুশক্তি বৈষ্ণবী কটিতটে পীতাম্বর পরিধান এবং করচতুষ্টয়ে শঙ্খ, চক্র, গদা, পদ্ম ধারণ করিয়া গরুড়পৃষ্ঠে আরোহিতা হয়ে এলেন।ব্রহ্মর্ষি সত্যদেব তাঁর সাধন সমর গ্রন্থে এই দেবী সম্বন্ধে লিখেছেন- “ যে চৈতন্যসত্তা স্থিতিশক্তিকে অভিমান করেন, তিনি বিষ্ণু । স্থিতি বা পালনই তাঁহার শক্তি । শার্ঙ্গ অর্থে ধনু অর্থাৎ প্রণব এবং খড়্গ শব্দের অর্থ –

দ্বৈতপ্রতীতি- বিলয়কারক অদ্বয় জ্ঞান । বিষ্ণু শব্দ ব্যাপকতা – বোধক। যে সর্বব্যাপী অখণ্ড জ্ঞানের উদয় হইলে দ্বৈতপ্রতীতি বিলয়প্রাপ্ত হয়, সেই অখণ্ড জ্ঞানই বিষ্ণুর হস্তস্থিত খড়গ”

এই হল মা বৈষ্ণবীর কথা। মায়ের চরণে প্রণাম জানিয়ে বলি-

শঙ্খচক্রগদাশার্ঙ্গগৃহীতপরমায়ুধে ।
প্রসীদ বৈষ্ণবীরূপে নারায়ণি নমোহস্তু তে ।।
এমনকি পশুর শরীর অবলম্বন করেন যেমন নৃসিংহ , বরাহ, হংস অবতার ইত্যাদি। বৈকুণ্ঠনিবাসী ভগবান বিষ্ণু যে শক্তিবলে ধরিত্রীলোকে অবতার গ্রহণ করে দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন করে সেই বৈষ্ণবী শক্তিই হলেন দেবী আদিশক্তি। তিঁনি চণ্ডীর বর্ণিত অষ্টমাতৃকার একজন বৈষ্ণবী দেবী। ভগবান বিষ্ণুর এই বৈষ্ণবী মায়াপ্রভাবে স্বয়ং যশোদা দেবী গোপালের মুখে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড দর্শন করে আবার তা বিস্মৃতও হয়েছে। দেবতারাও প্রার্থনায় জানিয়েছেন-

কষ্ঠি পাথরের অষ্টাদশী ভূজা দেবী মূর্তি বর্ধমানের অধিষ্ঠাত্রী দেবী

বর্ধমানের অধিষ্ঠাত্রী দেবী দেবী সর্বমঙ্গলা।তিনি বাংলার লৌকিক দেবতা ও বটে। তিনি মুলত বর্ধমানের সর্বমঙ্গলা মন্দিরে পুজিত হন।

কিংবদন্তি
কথিত আছে, প্রায় সাড়ে তিনশো বছর আগে শহর বর্ধমানের উত্তরাংশে বাহির সর্বমঙ্গলা পাড়ায় বাগদিরা পুকুরে মাছ ধরতে গিয়ে একটি শিলামূর্তি পেয়েছিল। সেটিকে প্রস্তর খণ্ড ভেবে তার উপরে শামুক–গুগলি থেঁতো করতো। সেই সময় দামোদর নদ লাগোয়া চুন তৈরির কারখানার জন্য শামুকের খোলা নেওয়ার সময় শিলামূর্তিটি চলে যায় চুন ভাটায়। তখন শামুকের খোলের সঙ্গে শিলামূর্তিটি পোড়ানো হলেও মূর্তির কোনো ক্ষতি হয়নি। তবে সেই রাতে স্বপ্নাদেশ পাওয়া মাত্র বর্ধমান মহারাজা সঙ্গম রায় শিলামূর্তিটিকে নিয়ে এসে সর্বমঙ্গলা নামে পুজো শুরু করেন। পরবর্তীকালে ১৭০২ সালে টেরাকোটার নিপুণ কারুকার্য খচিত সর্বমঙ্গলা মন্দির নির্মাণ করেন মহারাজাধিরাজ কীর্তিচাঁদ মহতাব। [২]ক্রমে মূল মন্দিরের আশেপাশে গড়ে ওঠে নাট মন্দির, শ্বেত পাথরের তৈরি রামেশ্বর ও বাণেশ্বর নামে দুটি শিব মন্দির। কালো পাথরে তৈরি হয় মিত্রেশ্বর, চন্দ্রশ্বর ও ইন্দ্রেশ্বর নামে আরও তিনটি শিব মন্দির।

পুজো
সর্বমঙ্গলা মন্দিরের নিত্যপুজো ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে রাজবংশের শেষ যুবরাজ উদয়চাঁদ মহতাব ট্রাস্ট কমিটি গঠন করেন।তাঁর পুজো প্রায় সাড়ে তিনশো বছরেরও বেশি পুরোনো। সর্বমঙ্গলার ঘট প্রতিষ্ঠার মধ্যে দিয়ে শারদোৎসবের আনুষ্ঠানিক সূচনা করা হয়ে থাকে পূর্ব বর্ধমানে।কুমারি পুজাও হয়। বাদ্যযন্ত্র সহকারে বিশাল শোভাযাত্রায় ঢল নামে পুণ্যার্থীদের। দেবী সর্বমঙ্গলার ঘটপূর্ণ জল নিয়ে ঘোড়ার গাড়ি নানা পথ পরিক্রমা করেন । শোভাযাত্রা সর্বমঙ্গলা মন্দিরে এসে পৌঁছতেই বাদ্যযন্ত্র, শাঁখ, ঘন্টা, কাঁসি ও হুলুধ্বনির মধ্যে দিয়ে দুর্গাপুজোর ঘট প্রতিষ্ঠা করা হয়।

মন্দির

বর্ধমানের সর্বমঙ্গলা মন্দির অবিভক্ত বাংলার প্রথম নবরত্ন মন্দির।

মূর্তি
এখানে সর্বমঙ্গলা দেবীর মূর্তি কষ্টি পাথরের অষ্টাদশভূজা সিংহবাহিনী ‘মহিষমর্দিনী’ মহালক্ষীরূপিণী
প্রাচীন এই মন্দির বর্ধমানের মানুষের কাছে পবিত্র তীর্থস্থান। দেশ-বিদেশের লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থী ও পর্যটকদের সমাগম হয় এই মন্দিরে।মন্দিরের ঐতিহাসিক গুরুত্বের কথা ভেবে প্রাচীন এই মন্দিরকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে।

জঙ্গল জননী বিশালাক্ষী


বিশালাক্ষী একজন হিন্দু দেবী। তিনি শিবের স্ত্রী সতীর এক রূপ। ভারতের বারাণসী শহরের বিশ্বনাথ মন্দিরের পশ্চাদে মীরঘাটে বিশালাক্ষী দেবীর প্রধান মন্দিরটি অবস্থিত। হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী এই মন্দির পুরাণে উল্লিখিত ৫১ শক্তিপীঠের অন্যতম।বাংলার লৌকিক দেবী ও বটে। পশ্চিমবঙ্গের একাধিক অঞ্চলেও দেবী বিশালাক্ষীর মন্দির দেখা যায়।বাঁকুড়া জেলার শুশুনিয়ার বিশালাক্ষী বা বাশুলি দেবীর মন্দির। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন রচয়িতা বড়ু চণ্ডীদাস যার পুজারি ছিল।

জঙ্গল জননী বিশালাক্ষী

সুন্দরবন তথা বাংলার কৃষিজীবী, জলজীবী ও বনজীবী লোকসমাজে জঙ্গলজননী বিশালাক্ষীর প্রভাব অসীম। এক সময় সুন্দরবনের জঙ্গলমহল যত প্রসারিত হয়েছে; বিশালাক্ষী পূজার ক্ষেত্র ততই বিস্তৃ্ত‌ হয়েছে। কৃষক, জেলে, মৌয়ালি-বাওয়ালি প্রভৃতি পেশার মানুষের নয়নের মণি ইনি।

পৌরাণিক উপাখ্যান
কথিত আছে, বিষ্ণুর সুদর্শন চক্রে সতীর দেহ ছিন্নভিন্ন হওয়ার সময় দেবীর কর্ণ ও কুণ্ডল এখানে পতিত হয়েছিল। সেই কারণে দেবী এখানে মণিকর্ণি নামেও পরিচিত। তবে কোনো কোনো পণ্ডিত মনে করেন, কর্ণকুণ্ডল অলংকারমাত্র, তা দেহের অঙ্গ নয়। তাই এই মন্দিরকে শক্তিপীঠ না বলে উপপীঠ বলাই শ্রেয়। অন্য একটি কাহিনিসূত্র থেকে জানা যায়, এই মন্দির একটি শক্তিপীঠ। কারণ এখানে দেবীর তিন অক্ষি বা চোখের একটি পতিত হয়েছিল। দেবীর দিব্যচক্ষু সমগ্র বিশ্বকে দেখতে পায়, তাই দেবীর নাম এখানে বিশালাক্ষী। এই পীঠের শিব কালভৈরব নামে পরিচিত।

Monday, March 18, 2019

দোল উৎসবের অনুষঙ্গে ফাল্গুনী পূর্ণিমাকে দোলপূর্ণিমা বলা হয়



দোলযাত্রা একটি হিন্দু বৈষ্ণব উৎসব। বহির্বঙ্গে পালিত হোলি উৎসবটির সঙ্গে দোলযাত্রা উৎসবটি সম্পর্কযুক্ত। এই উৎসবের অপর নাম বসন্তোৎসব। ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে দোলযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়।
বৈষ্ণব বিশ্বাস অনুযায়ী, ফাল্গুনী পূর্ণিমা বা দোলপূর্ণিমার দিন বৃন্দাবনে শ্রীকৃষ্ণ আবির বা গুলাল নিয়ে রাধিকা ও অন্যান্য গোপীগণের সহিত রং খেলায় মেতেছিলেন। সেই ঘটনা থেকেই দোল খেলার উৎপত্তি হয়। দোলযাত্রার দিন সকালে তাই রাধা ও কৃষ্ণের বিগ্রহ আবির ও গুলালে স্নাত করে দোলায় চড়িয়ে কীর্তনগান সহকারে শোভাযাত্রায় বের করা হয়। এরপর ভক্তেরা আবির ও গুলাল নিয়ে পরস্পর রং খেলেন। দোল উৎসবের অনুষঙ্গে ফাল্গুনী পূর্ণিমাকে দোলপূর্ণিমা বলা হয়। আবার এই পূর্ণিমা তিথিতেই চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্ম বলে একে গৌরপূর্ণিমা নামেও অভিহিত করা হয়।
দোলযাত্রা উৎসবের একটি ধর্মনিরপেক্ষ দিকও রয়েছে। এই দিন সকাল থেকেই নারীপুরুষ নির্বিশেষে আবির, গুলাল ও বিভিন্ন প্রকার রং নিয়ে খেলায় মত্ত হয়। শান্তিনিকেতনে বিশেষ নৃত্যগীতের মাধ্যমে বসন্তোৎসব পালনের রীতি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সময়কাল থেকেই চলে আসছে। দোলের পূর্বদিন খড়, কাঠ, বাঁশ ইত্যাদি জ্বালিয়ে এক বিশেষ বহ্ন্যুৎসবের আয়োজন করা হয়। এই বহ্ন্যুৎসব হোলিকাদহন বা নেড়াপোড়া নামে পরিচিত। উত্তর ভারতে হোলি উৎসবটি বাংলার দোলযাত্রার পরদিন পালিত হয়।


পৌরাণিক উপাখ্যান ও লোককথা
দোলযাত্রা বা হোলি উৎসব সংক্রান্ত পৌরাণিক উপাখ্যান ও লোককথাগুলি মূলত দুই প্রকার: প্রথমটি দোলযাত্রার পূর্বদিন পালিত বহ্ন্যুৎসব হোলিকাদহন বা নেড়াপোড়া সংক্রান্ত, এবং দ্বিতীয়টি রাধা ও কৃষ্ণের দোললীলা বা ফাগুখেলা কেন্দ্রিক কাহিনি।

দোলযাত্রা উৎসব শান্তিনিকেতনে বসন্তোৎসব নামে পরিচিত। অতীতে শান্তিনিকেতনের বিদ্যালয়ে বসন্তের আগমন উপলক্ষে একটি ছোটো ঘরোয়া অনুষ্ঠানে নাচগান, আবৃত্তি ও নাট্যাভিনয় করা হত। পরবর্তীকালে এই অনুষ্ঠানটি পরিব্যপ্ত হয়ে শান্তিনিকেতনের অন্যতম জনপ্রিয় উৎসব বসন্তোৎসবের আকার নেয়। ফাল্গুনী পূর্ণিমা অর্থাৎ দোলপূর্ণিমার দিনই শান্তিনিকেতনে বসন্তোৎসবের আয়োজন করা হয়। পূর্বরাত্রে বৈতালিক হয়। দোলের দিন সকালে ওরে গৃহবাসী খোল দ্বার খোল গানটির মাধ্যমে মূল অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। সন্ধ্যায় গৌরপ্রাঙ্গনে রবীন্দ্রনাথের কোনো নাটক অভিনীত হয়।

 
Design by দেবীমা | Bloggerized by Lasantha - Premium Blogger Themes | Facebook Themes